Skip to content

‘আঁধারে ডোবা চাঁদ’

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

সুমি গোসল করে আয়নার দিকে তাকায়। চেহারাটা মিষ্টি আছে। কিন্তু রঙটা কাল। আর শরীর বেঢব সাইজের মোটা। সেই শরীরের দিকে তাকিয়ে সুমির প্রায় কান্না এসে যায়। ছোট থেকেই এই অবস্থা। সে কাল এবং মোটা। কাল রঙ পেয়েছে তাও মানা যায়। কিন্তু এত মোটা হবে কেন? সে তো বেশি খাওয়া দাওয়া করে না। ঘন্টার পর ঘন্টা শুয়ে বসেও থাকে না। তাহলে কি ব্যাপারটা জেনেটিক ? কিন্তু তা কি করে হয়? তার বাবা ধবধবে ফর্সা, মা উজ্জ্বল শ্যমলা। দুজনের শরীরই ছিপছিপে চিকন আকর্ষনীয়। তবে সে কেন মোটা আর কাল হবে? এটা কি বিধাতার নিষ্ঠুর কোন খেলা? প্রতিদিনের মত এক রাশ দুঃখ নিয়ে সে বাথরুমের আয়নাটার দিকে তাকিয়ে থাকে। দুঃখের মাঝে একটাই স্বান্তনা, তার বুকগুলো সুন্দর। অনেক সুগঠিত। কিন্তু সুন্দর বুক দিয়ে সে করবে কি? মানুষ তো দেখে তার বেঢব মোটা একটা শরীর। সবাই কেমন যেন সূক্ষ্ণ এক করুনার চোখে তার দেহের দিকে তাকাতে থাকে।
‘আপা, এই আপা! বের হো! গোসল করব!
আইরিন ডাকছে। তার ছোটবোন। সুমি জলদি বাথরুম থেকে বের হয়ে আসে।
আইরিন বলে,’ কি রে আপা! এত সময় ধরে গোসল করিস কেন? গোসল করিস না সাজগোজ করিস?’
সুমি বলে,’ তোর মত না আমি! পাঁচ মিনিটেই গোসল শেষ! শরীরের কিছু কি পরিষ্কার করিস নাকি সেটাই সন্দেহ হয়!’
-আপা মাইর খাবি কিন্তু।
-যা যা। বাথরুমে ঢুক।
সুমি আইরিনের ছিপছিপে দেহটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। কি সুন্দর দেহ! একদম যেন সিনেমার নায়িকা। এতটুকু বাড়তি মেদ নেই। ওর শরীরটা কেন আইরিনের মত হল না? অনেক চেষ্টা করেছে, খাওয়া কমিয়েছে, ব্যায়াম করেছে। কিন্তু শরীরটাকে আর কমানো গেল না।
সুমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। অনেক দেশি বিদেশি ক্রিম মেখেও চেহারটাকে একটু ফর্সা করা গেল
না । অথচ ছোট বোন আইরিন টুকটুকে ফর্সা। বাবাও ফর্সা। মাকেও ফর্সাই বলা চলে। ওরা তিনজন একই রকম। ফর্সা, ছিপছিপে গড়নের। মাঝখান থেকে সে কোত্থেকে এল? প্রায়ই গ্রাঢ় সন্দেহ হয়, মা-বাবা কি তাকে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনল? হ্যা সেটাই হবে। না হলে পরিবারের সবাই এক রকম আর সে এরকম অন্যরকম হবে কেন?
বাসার সবাই নিশ্চয় তার রঙ আর শরীর নিয়ে হতাশ। এটা তাদের চোখমুখ দেখলেই বোঝা যায়। আইরিন তাকে সারাদিন মোটা মোটা বলে খোঁচাতে থাকে। রাগে মাথায় রক্ত চড়ে যায়। কিন্তু সে কিছুই বলে না। বলে কি হবে? আর মা তো একদিন খাবারের সময় বলেই বসলেন, ‘সুমি একটু খাওয়া দাওয়া কমা, শরীরের কি অবস্থা হয়েছে দেখেছিস? পরে তোকে বিয়ে দিতে কিন্তু কষ্ট হয়ে যাবে!’
বাবা বলে উঠেন,’ এই কি করছ! মেয়েটাকে একটু শান্তিতে খেতেও দিবে না নাকি?’
সুমি সেদিন খাওয়া ছেড়ে উঠে গিয়েছিল। নিজের রুমে গিয়ে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগল। বাবা রুমে এলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘মা, তোর মায়ের কথায় কিছু মনে করিস না। মা তোকে নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তা করে তো, তাই এসব বলে।‘
সুমি বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল,’ বাবা আমি এরকম হলাম কেন?’
বাবা নরম গলায় বললেন, ‘কাঁদিস না মা, সব ঠিক হয়ে যাবে।‘
‘সব ঠিক হয়ে যাবে’ – এটা হচ্ছে প্রাচীন কাল থেকে চলে আসা বাবামায়ের অর্থহীন এক স্বান্তনাবুলি। মা বাবা যখন এটা বলেন, তখন মনে হয় আসলেই বুঝি একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। আসলে কিছুই ঠিক হয় না। জীবন জীবনের মত চলতেই থাকে। নদী নদীর মত বয়েই যেতে থাকে। শুধু কষ্ট গুলো আরো গভীর হয়। সেই কষ্টগুলো মেনে নেওয়ার হয়ত একটা ক্ষমতা জন্মায় একসময়। এর বেশি কিছু না।
কষ্টকে মেনে নেয়ার ক্ষমতা সুমির এখনো জন্মায় নি। তাই আয়নায় নিজেকে দেখে প্রায়ই তার কান্না চলে আসে। যে কান্না কাউকে সে দেখতে দেয় না। সবার সামনে এমন ভাব দেখায় যেন সে দুনিয়ার সবচেয়ে সুখি মানুষগুলোর একজন। মুখে হাসি লেগেই আছে। সুমি একটা বড় নিশ্বাস ফেলে খাবার টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়। দুপুরের খাবারের সময় হয়েছে। সে আজ একমুঠো ভাত খাবে। সাথে কোন একটা তরকারি। এর বেশি কিছু না। সে জানে, এতে বাবা মা আর আইরিন কিছু বলবে না। কেউ বলবে না, এত কম খাচ্ছিস কেন? আর একটু খা। যেন সুমির এতটুকুই খাওয়া উচিত। আসলেই কি তার এতটুকুই খাওয়া উচিত? সুমি কিছুতেই বুঝে না। সুমি শুধু জানে, খাওয়া দাওয়া তার মোটা হওয়ার কারণ নয়। কারণ অন্য। কোন অজানা কারণ। হয়ত জন্মগত। কিন্তু এটা আর কে বুঝবে?

সুমির দিন এভাবেই কেটে যেতে থাকে। মোটা শরীরের জ্বালা নিয়ে। মানসিক কষ্টের পাশাপাশি শারীরিক কষ্টও তাকে বয়ে বেড়াতে হয়। একটু বেশি চলাফেরা করলেই সে ভয়ানক হাঁপিয়ে পড়ে। হার্টটা বুকে হাতুড়ি পেটাতে থাকে থাকে। মনে হয় শরীর চিঁড়ে বের হয়ে আসবে। এজন্য সে রিকশা ছাড়া চলাফেরা করতে পারে না। রিকশায় উঠলেও আরেক সমস্যা। রিকশায় উঠলে অন্য কোন বান্ধবী বা বন্ধুকে তার পাশে উঠানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। একে তো ভীষণ কষ্ট করে দুইজন আঁটে, তার উপর রিকশাওয়ালা সমানে হাঁপাতে থাকে। শেষে রিকশাওয়ালা ভাড়াও বেশি চেয়ে বসে। হাইরে দুনিয়া! একটু পর পরই সুমির বুক চিঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসতে থাকে। তারপরও সুমি হাসতে থাকে। প্রাণখুলে আড্ডা মারতে থাকে। বন্ধু বান্ধব বলতে থাকে, সুমির মত হাসিখুশি মেয়ে নাকি পাওয়াই মুশকিল! তখন সুমির প্রাণটা একটু হলেও ঠান্ডা হয়। বন্ধু বান্ধবরা সুমিকে পছন্দ করে। ভালই পছন্দ করে। তার শরীরের দিকে সূক্ষ্ণ করুনার চোখে কেউ তাকায় না। এটা কি একটা বড় ব্যাপার নয়? হ্যা , তার কাছে এটাই অনেক বড় ব্যাপার।

সুমির জীবনে যে প্রেম আসবে, সুমি তা ভাবতেও পারে না। তার এই বিচ্ছিরি সাইজের শরীর দেখে কে তার প্রেমে পড়বে? সুমি নিজে ছোটবেলায় একটা ছেলেকে ভীষণ পছন্দ করত। মায়াকাড়া চেহারা। বড় বড় চোখ! কি নিষ্পাপ লাগত ছেলেটাকে! প্রায়ই ইচ্ছা হত ছেলেটার গালে চুমু দিয়ে ফেলে! এটা মনে করে ছোটবেলায় সে কি লজ্জা তার! কিন্তু ছেলেটাকে বলার কোন সাহস কোনদিন হয় নি। না জানি ছেলেটা এখন কেমন আছে, কি করছে! ছেলেটা কি তাকে পছন্দ করত? সে তো তখনো ভীষণ মোটা ছিল। এই প্রশ্নের উত্তর সুমি আর জানার প্রয়োজন মনে করে না।

হটাত করেই সুমির জীবনে প্রেম এল। ফোর্থ ইয়ার শেষ করে মাস্টার্সে উঠার পর পরই প্রেম যেন নিজে থেকে সুমির পায়ের নিচে এসে পড়ল! একদিন ইউনিভার্সিটির ক্লাশ চলছে, আবুল স্যারের ক্লাশ। আবুল স্যার গম্ভীর রোবটিক গলায় লেকচার দিচ্ছেন। স্যারের কথা বুঝা গেলে ক্লাশে মনোযোগ দেয়া যেত। কিন্তু স্যারের কন্ঠ থেকে ঘর ঘর জাতীয় একটা শব্দ বের হয়। যার জন্য কোন কথাই বোখা যায় না। তাই মনোযোগও থাকে না। সবাই ড্যাব ড্যাব করে কিছু না বুঝে স্যারের দিকে তাকিয়ে আছে। এ সময় ক্লাশের এক সুন্দর ছেলে সুমির পাশে বসা। ছেলেটা সুমির ভাল বন্ধু। কিন্তু সে সময় হটাত ছেলেটি আর ভাল বন্ধু থাকতে চাইল না। ক্লাশ চলছে, এ সময় ছেলেটি ফিস ফিস করে সুমিকে বলল,’ সুমি, তোমার চোখের দিকে তাকালে আমি কোথায় যেন হারিয়ে যাই, তুমি কি আমার ভালবাসার সাথি হবে?’
সুমির বুকে যেন একটা ধাক্কা লাগল। সে সামলে নিয়ে বলল,’রাহাত, তুই কি ফাইজলামি করছিস?’
রাহাত বলল,’একদম ফাইজলামি না। খোদার কসম!’
সাথে সাথে সুমির বুকে যেন একটা আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। তার চোখ ছল ছল করে উঠল। রাহাতকে কিছু বলার শক্তিও সে পেল না।
রাহাত সাথে সাথে বলল,’মোনতাই সম্মতির লক্ষণ। তাহলে আমি হ্যা ধরে নেই?’
সুমি সেটারও কোন জবাব দিতে পারল না। আনন্দে তার চোখে একট পর পর পানি জমতে লাগল।
আবুল স্যার সেটা লক্ষ্য করে বলে উঠলেন,’ এই মেয়ে তুমি কাঁদছ কেন? কি হয়ছে?’
সুমি ধরা গলায় কোনমতে বলল,’ না স্যার, চোখে কি যেন ঢুকেছে, তাই চোখে পানি আসছে!’
রাহাত মুখ টিপে হাসতে লাগল। আর সুমির চোখে তাকাতে লাগল। ওর দৃষ্টি প্রেমে পরিপূর্ণ।

রাহাতের সাথে প্রেমটা ছিল সুমির জন্য বড়ই মধুর। প্রথম একটা ছেলের সাথে এতটা ঘনিষ্ঠ হল। ওর সাথেই সারাদিন, সারা সন্ধ্যা কাটানো। হাসাহাসি, বিভিন্ন গল্প। রসময় প্রেমের কথা। হাতে হাত ধরে নির্জনে চলে যাওয়া। হাত ধরে দিঘির কাছে ঘন্টার পর ধন্টা বসে থাকে। ওর কাঁধে মাথা রেখে ঝিমানো। চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকা দীর্ঘসময়। সুমির বুকে যেন স্নিগ্ধ বাতাস বইতে থাকে। বসন্তের পাগলা বাতাস। সেই বাতাস থেকে মুক্তির কোন উপায় সুমি খুঁজে পায় না। হারিয়ে ডুবে যেতে থাকে বসন্ত বাতাসে রাহাতের প্রেমের সাথে।
একদিন নির্জন দিঘির পাড়ে ঘনিষ্ঠ হতে হতে রাহাতের হাত সুমির দেহে এলোমেলোভাবে ঘুরে বেড়াতে থাকে। যেন সুমির দেহে হাত দুটো কোন আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু পাচ্ছে না। খুঁজেই যাচ্ছে পাগলের মত। সুমিও রাহাতকে জড়িয়ে যেন শান্তির এক আশ্রয় খুঁজে বেড়ায়। একসময় রাহাত গভীর একেক চুম্বন এঁকে দিতে থাকে সুমির গালে, ঘাড়ে, গলায় আর সবশেষে ঠোঁটে। সুমি যেন এক অন্য ভুবনে হারিয়ে যায়। যে ভুবনের দেখা আগে সে পায় নি।
রাহাত একসময় চূড়ান্তভাবে ঘনিষ্ঠ হতে চাইলে সুমি বাঁধা দিয়ে বলে,’ রাহাত কি করছ? একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে!’
রাহাত মাতালের মত বলে,’ ভালবাসায় বেশি বলে কিছু নেই। তুমি আমাকে ভালবাস, নাকি না?’
-অবশ্যই বাসি রাহাত।
-তবে এসো না ডুবে যাই, প্রেমের সমুদ্রে।
-কিন্তু রাহাত...
-কোন কিন্তু নয়, চুপ!
দুই দেহ এক হয়ে যায়। নির্জন দিঘিটা সাক্ষী হয়ে থাকে তাদের অদম্য প্রেমের।

এরপর থেকেই রাহাত প্রতিরাতেই মিলিত হতে চায়। সুমির অতটা মন সায় দেয় না। কিন্তু রাহাতের মন রক্ষা করে সুমিও নিজের দেহকে বিলিয়ে দেয় রাহাতের সুন্দর সুঠাম পুরুষালি দেহের কাছে। এভাবে কয়েকরাত কেটে যায়। বাসায় গিয়ে সুমি আর ঘুমাতে পারে না। রাহাতকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকে। সুখের স্বপ্ন দেখে একের পর এক। প্রায়ই দেখে, দুজনের এক ফুটফুটে সন্তান হয়েছে। কন্যা সন্তান। স্বপ্নেই সুমি ভেবে অবাক হয়, এত সুন্দর কন্যা তার কিভাবে হল? স্বপ্নের মাঝেই লজ্জায় সে মরে যেতে থাকে। দেখে, কন্যাকে নিয়ে কত জায়গায় তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে! স্বপ্ন ভেঙে গেলে এক অনাবিল সুখের আবেশ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেহে। সারারাত সেই সুখটা নিয়েই সুমি জেগে থাকে। বুকের মাঝে রাহাত আর তার ভভিষ্যত কন্যার ছবি নিয়ে।
এক রাতে কিছুতেই ঘুম আসছে না। সুমি রাহাতকে ফোন করে বলে, ‘এই কি করছ? জান আমি না স্বপ্নে দেখেছি, আমাদের খুব সুন্দর একটা কন্যা সন্তান হয়ছে। তুমি ওকে বুকে নিয়ে ভীষণ আদর করছ। মেয়েটা খিল খিল করে হাসছে। কি সুন্দর তার হাসি!’
রাহাত ঘুম ঘুম গলায় বলে,’ ধুর সুমি! এসব কি স্বপ্ন দেখ? সন্তান কোত্থেকে আসল? এত রাতে ফোন করে ঘুম ভাঙ্গিয়্যো না তো!’
সুমি আহত হয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে। রাহাতের কন্ঠ এত অন্যরকম লাগছে কেন?

পরদিন ক্লাশে গিয়ে দেখে, রাহাত তার দিকে তাকাচ্ছেই না। অন্য বন্ধুদের সাথে হাসাহসি করে যাচ্ছে। তার দিকে একবার আসছেও না। কি ব্যাপার? কিছু তো গোলমাল মনে হচ্ছে। তার মনে যেন আগুন জ্বলে উঠে।
ক্লাশ শেষে রাহাতকে ধরতে গেলে , রাহাত জলদি চলে গেল। রাহাত কি তাকে দেখেও না দেখার ভান করল না? সে কি তাকে এড়িয়ে চলে গেল?
সেদিন রাতে সুমি রাহাতকে ফোন করতে গিয়ে দেখে, রাহাতের ফোন বন্ধ। মেসেজ করতে গিয়ে দেখে, মেসেজ যাচ্ছে না। আশঙ্কায় সুমির বুক কেঁপে উঠে। তার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করে। রাহাত এরকম করছে কেন? কি হল? কি হল?

কয়েকদিন এভাবেই কাটতে থাকে। ক্লাশে রাহাত তাকে না দেখার ভান করে। সে কেমন আছে এটা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করে না। সে সামনে গিয়ে রাহাত কেমন আছে জিজ্ঞেস করলে রাহাত শুধু বলে,’ ভাল।‘ ক্লাশের শেষে দেখা করতে চাইলে রাহাত এড়িয়ে চলে যায়। তাকে ফোনে পাওয়া যায় না। মেসেজ করা যায় না। সুমির জীবন যেন ঘন কাল অন্ধকারে ঢেকে যায়। তার সারাদিন চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করে। খাওয়া দাওয়া হয়ে যায় চোখের বিষ। ছোটবিন আইরিন তাকে খেতে ডাকলে সে চিৎকার করে বলে,’ আমার খাবার ফেলে দে, যা!’
সুমি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করে যে শুকিয়ে যাচ্ছে। ভালই শুকিয়ে যাচ্ছে। আয়নায় নিজেকে দেখে মাঝে মাঝে চমকে উঠে। শুকিয়ে প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। কিন্তু এই শুকিয়ে যাওয়া তার মনে কোন সুখ এনে দিতে পারে না। তার বার বার মনে শুধু মনে হয়, রাহাত এমন করছে কেন?

একদিন ক্লাশ শেষে সুমি জোড় করে রাহাতের হাত ধরে বলে, ‘কি হয়েছে তোমার? আমাকে এড়িয়ে চলছ কেন?’
রহাত শান্ত গলায় বলে, ‘সুমি আমাদের মাঝে যা কিছু হয়ছে সব ভুলে যাও।‘
সুমি জল ভরা চোখ নিয়ে বলে,’ কেন ভুলে যাব? তোমার ভালবাসা কি শেষ হয়ে গেছে?’
রাহাত আস্তে করে বলে,’হ্যা শেষ।‘
সুমি রাহাতকে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলে, ‘কি ! কি বললে? তাহলে এতদিন আমাকে স্বপ্ন দেখালে কেন? কেন আমার সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়ালে? আমার জীবন তছ নছ করে দিলে কেন?’
রাহাতে সুমিকে ছাড়িয়ে চিৎকার করে উঠল,’ সত্যি কথা শুনতে চাও? তাহলে শোন, আমি শুধু তোমার দেহটাকে ভোগ করতে চেয়েছিলাম। না হলে তোমার মত মোটা আর কাল মেয়েকে কে ভালবাসে?’
-রাহাত তুমি...তুমি...
-কি আমি? একটা জঘন্য জানোয়ার? হ্যা ঠিক ধরেছ। এবার যাও!
সুমি পাথরের মূর্তির মত কতক্ষন দাঁরিয়ে থাকল। তারপর কান্নায় ভেঙে পড়ল। সারাটা দিন সে কান্নাকে আর থামাতে পারল না।

সুমি এখন অনেক শুকিয়ে গেছে। শুকিয়ে প্রায় আইরিনের কাছাকাছি চলে এসেছে। বাসার সবাই শঙ্কিত চোখে তার দিকে তাকায় আর বলে, কি হয়েছে? সুমি কিছুই বলে না। শুধু মলিন একটা হাসি দেয়। সুমির দিনকাল কাটতে থাকে রাহাতের প্রতারণার দগদগে ঘা নিয়ে। কষ্টটা সে কিছুতেই ভুলতে পারে না। প্রতিদিন তাকে নিঃশেষ করে দিতে যায়। বার বার মনে হয় এক গাদা ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করে ফেলি। কিন্তু সাহস হয় না কেন জানি। তার বুক থেকে সমানে রাহাতের প্রতি অভিশাপ বের হতে থাকে। বার বার মনে হয়, অভিশাপ দেয়া ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু বুক ফেটে অভিশাপ বের হতে থাকে। আল্লহ এই ছেলেটাকে কঠিন এক শাস্তি দাও। একটা শিক্ষা দাও। অবশ্য তার মত এক নগন্য অভাগার কথা আল্লহই বা শুনবে কেন?

অনেকদিন পরের এক সন্ধ্যা। সুমির মোবাইলে ফোন এলে সুমি অবাক হয়ে দেখে, রাহাত ফোন করেছে! সুমি ফোন ধরে শান্ত গলায় বলে,’ হ্যা রাহাত বল, কি বলবে।‘
ওপাশ থেকে পাঁপা কাঁপা গলা শোনা যায়,’ সুমি আসলে আমি ক্ষমা চাওয়ার জন্য ফোন করেছি।‘
সুমি অপ্রকৃতস্থএর মত হেসে উঠে বলে,’ হা হা হা। ক্ষমা? আমার কাছে? হটাত ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন কেন পড়ল?’
-সুমি আমার প্যরালাইসিস হয়েছে। হুইল চেয়ার ছাড়া নড়তে পারি না। আমি খারাপ এক ছেলে। মাঝখানে বিভিন্ন মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছিলাম। একবার অতিরিক্ত মাদক সেবনের ফলে প্যারালাইসিস হয়ে যায়। এখন আমি জীবনকে অন্য চোখে দেখি। ভাবলাম, তোমার সাথে যে অন্যায় করেছি তার জন্য ক্ষমা চেয়ে নেই।
সুমি অনেকক্ষণ কোন কথা বলে না।
রাহাত বলে,’ সুমি তুমি কি শুনতে পাচ্ছ? আমাকে ক্ষমা করবে না?’
সুমি আরো কিছুক্ষণ পর বলে,’ হ্যা ক্ষমা করতে পারি। তবে একটা শর্তে!’
-কি শর্ত সুমি?
-আমাকে তোমার বিয়ে করতে হবে।
-কি বলছ সুমি! আমি একজন প্যারালাইজড মানুষ। আমাকে বিয়ে করে তুমি নিজের জীবন নষ্ট করবে?
-হ্যা করব। তুমি রাজি আছ নাকি বল।
-আমি রাজি সুমি, আমি রাজি। যদি এতেই তুমি আমাকে ক্ষমা কর, আমি অবশ্যই রাজি।
-ঠিক আছে, তাহলে তৈরি হও।
ফোন রেখে সুমি নিজের ভেতরে এক আশ্চর্য শান্তি অনুভব করে। যে মানুষটা তার জীবনকে ছার খার করে দিয়েছিল, এখন সে মানুষটা পুরোপুরি তার উপর নির্ভরশিল হয়ে থাকবে। তার সাহায্য ছাড়া চলতে ফিরতেও পারবে না। এমনকি বাথরুমে যেতেও তার সাহায্য লাগবে। আর সে বার বার করুণার চোখে এই মানুষটাকে দেখতে থাকবে। এটাই কি সবচেয়ে ভাল প্রতিশোধ নয়?
আর তাছাড়া, মানুষটাকে যে ভীষণ ভালবেসেছিল, তা কি আর অস্বীকার করা যায়?


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

লাইক না দিয়ে পারলাম না। ১০০ লাইক

glqxz9283 sfy39587p07