Skip to content

গাঁজা টু বার্গার

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

সন্ধায় পান্থপথের ফুটপাথ দিয়ে ভীষণ আনমনে হেঁটে যাচ্ছিল সুন্দরী মেয়ে রিমা। সে হটাত খেয়াল করল, সে কিছু একটাতে পাড়া দিয়েছে। চমকে তাকিয়ে সে দেখল রুগ্ন দরিদ্র এক শিশু নিচে শুয়ে শুয়ে কাঁদছে। বয়স ৮-৯ বছর হবে হয়ত।
রিমা তাড়াতাড়ি নিচে ঝুঁকে বলে,’ওহ বাবু, সরি সরি। তোমার অনেক লেগেছে? আমি খেয়াল করি নাই, সরি।‘
ছেলেটা কেঁদে উঠ বলে, ‘নাহ আপা কিছুই লাগে নাই।‘
-সত্যি? তাহলে এত কাঁদছ কেন? না, তোমার আসলে লেগেছে। কোথায় লেগেছে দেখি...’
-না আপা। লাগে নাই। এটা তো কিসুই না। বাসায় আম্মা ভীষণ মারে। তাই কোন ব্যথাই আর ব্যথা লাগে না। আম্মার মেজাজ খুব খারাপ থাকে তো। আব্বা মদ খাইয়া এসে আম্মারে পিটায়। আর আম্মা আমারে পিটায়ে ঝাল মেটায়।
-‘ইশ তাই বলে তোমাকে এত মারবে! শিশু একটা। বাবু তুমি এখন কাঁদছ কেন?’ বলে রিমার নিজের চোখেই পানি চলে আসে।
ছেলেটা কেঁদে উঠে বলে, ‘গাঁজা নাই। গাঁজা খাইতে পারতেছি না। ট্যাকা নাই।‘
-কি! তুমি গাঁজা খাও?
-গাঁজা ছাড়া থাকতেই পারি না। এই বেলা গাঁজা না খাইলে মইরাই যামু।
-তুমি কেন গাঁজা খাও?
-দুঃখে আপা। বড়ই কষ্ট। বাড়িত থাকতেই পারি না। আম্মা খালি মারে আর আব্বা বকে। তাই বাইরে বাইরে থাকি। বড় পোলাপাইনদের লগে গাঁজা খাই। আমারে কিছু টাকা দেন। আল্লাহর দোহাই।
-না তোমাকে গাঁজা খাওয়ার জন্য কোন টাকা দিব না। চল তোমাকে অন্যকিছু খাওয়াই। চল বসুন্ধরায় বার্গার খাওয়াই।
-বার্গার কি রুটির মাঝে কাবাব দেয় ওগুলান?
-হুম তুমি খেয়েছ?
-না শুধু রুটি খাইসি। ৬ টাকা দাম।
-চল তো। বার্গার খাওয়াব তোমাকে। নাম কি তোমার?
-রুমি।
বসুন্ধরা শপিং মলে গিয়ে রিমা রুমি ছেলেটাকে একটা দামি বার্গার খাওয়াল। খেয়ে রুমি কিছুক্ষন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে বলল, ‘আপা কি জিনিস খাওয়াইলেন! এটা তো জীবনেও ভুলুম না। এটা তো বার বার খাইতে ইচ্ছা করবো।‘
রিমার আত্মাটা যেন শান্তিতে ভরে গেল। সে খুশি হয়ে বলল,’ তোমার যখন ইচ্ছা আমি তোমাকে বার্গার খাওয়াব।‘
-আপনারে পামু কই?
-উমম , আচ্ছা এক কাজ করি। একটা কাগজে আমার ফোন নম্বর লিখে দিচ্ছি। তুমি কষ্ট করে দোকান থেকে ২ তাকা দিয়ে ফোন করবা। পরে বসুন্ধরার সামনে এসে দাঁড়াবা। ওখানে আমিও চলে আসব।
-আপা আপনে এত ভালা!
-আরে ওসব কিছু না। তাহলে এই কথাই থাকল। ঠিক আছে?
-জে।
এরপর থেকে কিছুদিন পর পরই রুমি রিমাকে ফোন করে আর বসুন্ধরায় গিয়ে বার্গার খায়। বার্গার রুমির এতই পছন্দ হয় যে একসময় সে প্রতিদিনই রিমাকে ফোন করতে থাকে। বাসা অত দূরে না বলে রিমাও প্রতিদিন চলে আসে। কিন্তু একটা সময় রুমি দিনে তিনবার কল করা শুরু করে। রিমা কিছুদিন কষ্ট করে সেটাও করে। তবে একদিন বার্গার খাওয়ার সময় রিমা বলে, ‘দেখ রুমি, এভাবে তো আর তোমাকে সময় দিতে পারব না। তুমি কিছুদিন পর পরই আস। তাহলে আমি পারব।‘
-না আপা। তিনবেলা বার্গার না খাইলে চলে না। এখন তো, চারবেলা খাইতে ইচ্ছা করে।‘
--ও। তুমি গাঁজা ছেড়েছ?’-
-হ আপা। গাঁজা আর ভাল লাগে না। বার্গার ছাড়া কিছুই ভাল লাগে না।
-তাহলে তো খুব ভাল। এক কাজ করি। এখন থেকে তোমাকে কিছুদিনের বার্গারের টাকা দিয়ে দেব। টাকা শেষ হলেই আমাকে ফোন করবে, ওকে?
-আইচ্ছা। আপা আপনে বড়ই ভালা।
-ঠিক আছে যাই আজকে।
এরপর, তিনদিন যেতে না যেতেই রুমি আবার ফোন দেয়। রিমা ফোনে তাকে বলে,’ কি ব্যাপার! এত তাড়াতাড়ি টাকা শেষ?’
-জে । এখন তো আপা ৮ বেলা করে বার্গার খাই।
-কি বল! আচ্ছা, আমি আসছি।
রুমির সাথে দেখা হলে রিমা বলল, ‘ এত বার্গার খেলে তো চলবে না। ভাত খাও না তুমি?’
-নাহ। বার্গার ছাড়া কিছুই খাইতে মন চায় না।
-ওহহো, ঝামেলায় ফেলে দিলে। এভাবে তো চলবে না। তোমাকে কিছুদিন পর পরই এটা খেতে হবে। এত বার্গার খাওয়ার টাকা দিতে পারব না আমি। তুমি ভাত খাওয়া শুরু কর। কিছুদিন পর পর একটা বার্গার খাবে।
-না আপা। এটা কইরেন না। বার্গার ছাড়া বাঁচুম না। এখন তো দিনে আরো খাইতে ইচ্ছা হয়।
রিমা বুঝতে পেরেছে ব্যাপারটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। বার্গারের নেশায় পড়ে যাচ্ছে ও। আর এত টাকা তো ওর পিছনে খরচ করতে পারবে না। তাই রিমা কড়া গলায় বলল, ‘আমি যা বলেছি তাই। কয়েকদিন পর একটা করে বার্গার খাবে।‘
রুমি হটাত ঝাপ দিয়ে রিমার পায়ে পড়ে পা জড়িয়ে ধরে বলল,’এমন কইরেন না। বার্গার ছাড়া বাঁচুম না।‘
-পা ছাড়। উঠ!
-না। বলেন আপনে ট্যাকা দিবেন।
-আচ্ছা যাও দিব দিব।
বাসায় ফিরে ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেল রিমা। ছেলেটার ব্যাপারে একটা সমাধান করতেই হবে। তার হটাত নুহ জিকির সাহেবের কথা মনে পড়ল। তার পরিচিত একজন বিখ্যাত সাইক্রিয়াটিস্ট। উনার কাছে কি রুমিকে নিয়ে যাবে? হ্যা তাই করতে হবে। সে তাড়াতাড়ি নুহ জিকিরকে ফোন করে। আর সব কথা খুলে বলে। সব শুনে নুহ জিকির ফোনে বলেন, ‘আগামীকাল ছেলেটাকে আমার চেম্বারে নিয়ে এসো।‘
পরদিন চেম্বারে নুহ জিকির রুমির দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে বললেন, ‘তো, তুমি বার্গার খুব পছন্দ কর?’
-জে।
-কেন?
-জানি না ওইটা এতই ভাল লাগে, সারাদিনই খাইতে ইচ্ছা করে।
-রুমি আমার চোখের দিকে তাকাও।
-‘জে বলেন। ‘ ডাক্তারের চোখে তাকিয়ে রুমির কেমন একটা ঘোর লেগে গেল।
নুহ বললেন,’ রুমি! তুমি বার্গার পছন্দ কর না। না, না! তুমি শুধু আনন্দ পছন্দ কর। তোমার জীবনে কোন আনন্দ নেই। তাই তুমি প্রথমে গাঁজায় আনন্দ খুঁজে পাও, এরপর বার্গারে আনন্দ শুরু করেছ। কিন্তু এসব তোমার দরকার নেই। তুমি শুধু আনন্দ চাও, আনন্দ। কি চাও তুমি, বল তো রুমি?
-জে, আনন্দ চাই।
-হ্যা রুমি। তুমি এই আনন্দ যেকোন কিছু থেকে পেতে পার। যেমন রঙ্গিন ছবি দেখে। আমি তোমাকে মজার মজার ছবির বই দিব। এরপর থেকে তুমি শুধু সুন্দর সুন্দর ছবি দেখে আনন্দ পাবে। এখন বল, কিভাবে আনন্দ পাবে তুমি?
-জে, ছবি দেইখা।
নুহ জিকির একটা বই এগিয়ে দিয়ে বললেন, এই নাও, তোমাকে আজকে দারুন একটা বই দিলাম। বইয়ের নাম ‘ডাইনোসোরের কথা’। ডাইনোসর গুলোর ছবি দেখে তুমি অনেক আনন্দ পাবে। বুঝেছ?
-জে।
-যাও রুমি। কালকে আবার দেখা হবে।
রুমি কেমন যেন এক ঘোরের মাঝে বইটা নিয়ে চলে গেল।
কিছুদিন পরের কথা। রুমি এখন ছবির বইয়ের পাগল। প্রতিদিন ভাল দুইটা বই দেখলেই তার হয়ে যায়। বার্গার আর তেমন খেতে ইচ্ছা হয় না। কারণ বার্গার খেয়ে সে আনন্দ পায় না। শুধু ক্ষুধাটা মিটে। তাই মাঝে মাঝে বার্গার খায় সে। আর তিনবেলা খায় ডাল-ভাত।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

ভাল লাগলো


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

থ্যাঙ্কস

glqxz9283 sfy39587p07