Skip to content

ভালবাসার বিশ্বাস

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি


নিশি এক মগ কফি নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসল। আজকে দিনটি বিশেষ। যদিও এমন কোন বিশেষ দিন না, যেটা সবাই ভাবে। আজকের বিশেষ দিনটার জন্য একটা দৈনিক পত্রিকা আবশ্যক। কিন্তু আজকে পত্রিকা এখনো দেয়নি। আজকেই দেরি করে দিচ্ছে নাকি অপেক্ষার সময় কাটতেই চাচ্ছে না।
পত্রিকায় একটি কবিতা প্রকাশ হওয়ার কথা। এটা নিশির প্রথম প্রকাশিত কবিতা তা নয়, কিন্তু প্রথম প্রকাশিত কবিতার মতই আবেগ এবং ভালোলাগা কাজ করছে।
প্রকাশক নিশির বিশেষ পরিচিত। তাই তিনি রাতেই নিশিকে ফোন করে জানিয়েছে, যে আজকে তার কবিতাটা আসছে সাহিত্য সম্পাদকীয়তে। সেই থেকেই অপেক্ষা শুরু।
হঠাৎ সাইকেলের বেলে নিশির ঘোর কাটলো। হ্যা! পেপারওয়ালা এসেছে। সে নিচে নামল। পেপার হাতে নিয়ে সরাসরি বারান্দায় চলে গেল।
কবিতা প্রকাশ হয়েছে, এ যে এক নতুন শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার আনন্দ। সে প্রায় কেঁদে ফেলছে। এই সময় নিশির মা বারান্দায় আসল। নিশি নিজেকে সামলে নিল। মা কে তার কবিতা পরে শোনাল। তার মা কবিতা শুনে কেঁদে ফেললো। যেটা নিশি লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল সেটা আর লুকাতে পারল না, সেও কেঁদে ফেললো।
আজকের কবিতাটি সে মাকে নিয়ে লিখেছে। খুবি যত্ন করে লিখেছে। প্রতিটি শব্দ তার মা এর জন্য। এখানে অন্য কারো জন্য একটা শব্দও ব্যয় করেনি। এমন কি বাবার জন্যও নয়।
নিশি তার মা কে খুব ভালবাসে। কোন ভাবেই সে মাকে কষ্টে দেখতে চায়না। তাই সে প্রতিনিয়ত মাকে সঙ্গ দেয়।
নিশি নাস্তা করে বেরিয়ে পরল। আজ নিশির অনেক কাজ। বাবাকে সে কখনোই দেখেনি। তবুও সে বাবাকে অনুভব করছে। মনে করছে বাবা থাকলে আজকের কাজ খুব সহজ হতো। কিন্তু তাকে সব কাজ একাই করতে হবে। গত একুশ বছর থেকে সে সব একাই করে যাচ্ছে। আজও করতে পারবে।
আজ নিশির মায়ের জন্মদিন। তাই নিশি চেয়েছিল কবিতাটি আজি প্রকাশ হোক। তাই হয়েছে। বিশেষ দিন আরো বিশেষ হয়ে উঠেছে।
নিশি একটি ব্লাকফরেষ্ট কেক এর অর্ডার গতকাল দিয়েছিল তাই নিতে এসেছে। নিশির মার ব্লাকফরেষ্ট কেক খুব পছন্দ। সে তাই প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ব্লাকফরেষ্ট কেকই নিয়ে যাবে। নিশির মায়ের আরো একটি পছন্দের জিনিস হল গোলাপ। গোলাপ এর আবার একটা বিশেষ নাম আছ "প্রিন্ট গোলাপ"। বিশেষ গোলাপটি তাকে প্রথম নিশির বাবা দিয়েছিল। আর সব চেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে গোলাপটা সাদা ও গোলাপি। সাদা ও গোলাপি কেন? কারণ, সাদা নিশির বাবার পছন্দ আর গোলাপি নিশির মার। তাই তাকে আঠারোটি গোলাপ নিতে হবে। আঠারোটি? কারণ, নিশির বাবা তাকে আঠারোটি গোলাপ দিয়ে তার যখন আঠারো বছর তখন প্রপোজ করেছিল।
নিশি ব্লাকফরেষ্ট কেক আর আঠারোটি গোলাপ নিয়ে বাসায় ফিরলো। কিন্তু আগে থেকেই ব্লাকফরেষ্ট কেক আর আঠারোটি গোলাপ বসার ঘরে মজুত ছিল। ওগুলোর সামনে বসে নিশির মা কাঁদছে। নিশি শুধু ভাবছে কে নিয়ে এসেছিল?

নিশি সে দিন জানতে পারেনি কিছুই। কিন্তু নিশির মা বেশি দিন লুকিয়ে রাখতে পারেনি।
নিশির মা একটি সরকারী চাকুরী করে সংসার চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। নিশি ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকে টিউশনি করে নিজের খরচ চালায়। তারা খুব সুখি। তারা যে বাড়িতে থাকে সেটা নিশির নানার। নিশির মা একমাত্র মেয়ে ছিলেন। বিয়ে করেছিলেন ভালবেসে। কিন্তু.........!
নিশি খুব ভাল ছাত্রী। এবং খুব বিনয়ী। ক্লাসের সকলে তাকে পছন্দ করে। বলা যায় ভার্সিটির সকলে। ভার্সিটির সকলে তার ভাল বন্ধু কিন্তু বিশেষ কোন বন্ধু নেই। নেই! কারণ নিশির মা চাননা। যেহেতু নিশি মা কে খুব ভালবাসে তাই সেও মেনে নিয়েছে। কিন্তু নিশি কখনো জানতে চায়নি, কেন? সে শুধু জানে মা চাননা।
নিশি বাসায় ফিরল। নিশির মা আগের মত আর হাসি খুশি নেই, নিশি বুঝতে পারে। শেষ জন্মদিনের পর তার মা এমন হয়ে পরেছে। যা আগে কখনো ছিলেন না। নিশির মনে দাগ কাটে বিষয়টি। কিন্তু সে মা কে জিগ্যেস করে না। কারণ সে জানে, সময় হলে মা নিজেই তাকে বলবে। তাই সে অপেক্ষা করে। তবুও তার মাথায় অনেক কিছু ঘুরপাক খায়। অনেক কিছু সে চিন্তাও করতে চায়না, ভাবে মা কবে বলবে। তবেই এর থেকে নিস্তার তার।
নিশির মা নিশির ব্যাপারটাও বুঝতে পেরেছে। সে কি বলবে, কিভাবে বলবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছেনা। কিন্তু নিশি কে বলা প্রয়োজন। সে আর ছোট নেই। অনেক কিছু বুঝতে পারে। নিশ্চয় সে মায়ের সম্পর্কে খারাপ কিছু আমলে নিবেনা, তবে বেশি সময় নিলে হিতেবিপরীত হতে পারে। তাই তিনি খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চান।

আজ সেই বিশেষ দিন।
নিশির মা আবিরকে ডেকে নিয়ে এসেছেন। আবির একটি প্রাইভেট ব্যাংকে চাকুরী করে। দেখতে সুন্দর। নিশির মার প্রথম দেখাতেই পছন্দ হয়েছে। খুব পরিমিত কথা বলে। তার আচরণ মনে দাগ কাটে। সে নিশিকে খুব ভালবাসে।
নিশিকে সে চেনে তার বাসা থেকেই। নিশি তার বোনকে পড়াতো। আবির কখনোই নিশিকে তার ভালবাসার কথা বলেনি। কারণ সে নিশির সম্পর্কে সব আগে জানতে চেয়েছিল। নিশিকে জানতে গিয়েই ব্লাকফরেষ্ট কেক এর আঠারো গোলাপ সম্পর্কে জেনেছে। সে যতই জেনেছে ততই নিশিকে ভালবেসেছে। কিন্তু বলার সাহস পায়নি। কারণ নিশি তা কখনোই মেনে নেবেনা। মায়ের সে বাধ্য মেয়ে।
তাই সে নিশির মায়ের শেষ জন্মদিনে ঐ গোলাপ আর কেক নিয়ে এসেছিল। আর নিশির মাকে তার সব কথা বলে গিয়েছিল। নিশির মা তার সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে জানাতে চেয়েছিল। আজ তিনি জানাবেন।
নিশির মা আবির এর সম্পর্কে সব খোঁজ খবর নিয়েছেন। আবির তার বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে। আর তার একটি মাত্র ছোট বোন। ভাল পড়াশুনা, চাকুরী। তার বাবা মা দুজনেই চাকুরিজীবী। তবে সন্তানদের আদর্শ রূপে মানুষ করেছেন। আবির এর বাবা মা এর সাথে নিশির মা কথা বলেছেন যেটা আবিরও জানে না। সব মিলিয়ে খুবি ভাল। তার মেয়ের জন্য উপযুক্ত।
নিশি বাসায় আছে কিনা আবির জানে না। কিন্তু সে নিশি কে পাশে চাচ্ছিল। কারণ নিশি থাকলে ভরসা পেত। কেন জানি আবির এর মনে হয় নিশিও তাকে পছন্দ করে। কিন্তু বলতে পারেনা, কিংবা কখনোই বলবেনা। নিশির মা এখনো আসছেনা কেন। কি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি কিছুই জানে না। তবে মনে প্রানে বিশ্বাস করে ভাল কিছুই হবে।
নিশির মা ভিতরে নিশির সামনে বসে আছে। আজ নিশিকে সব বলবে। যদিও নিশি জানেনা আবির নিচে ড্রয়িংরুমে বসে আছে। নিশিও খুব চিন্তিত, মা আজকে এমন আচরন কেন করছে? নিশির মা বলা শুরু করল.........।
আবির আসছে একঘন্টা হলো। নিশির মা জানে আবির আরো একদিন বসে থাকতে পারবে বিনা দ্বিধায়।
নিশি কাঁদছে। নিশির মা নিজেকে সামলে রেখেছে। আজ উনি কাঁদতে পারেননা।
নিশি ভাবতেও পারেনি তার জীবনে এমন সুখের দিন আসবে। নিশির মা তাকে প্রস্তুতি নিতে বললো। আজো তাকে একাই প্রস্তুতি নিতে হবে।
নিশির মা আবির এর সামনে গিয়ে বসলেন। আবির সোজা হয়ে বসল। কোন কথা বলতে পারছেনা। এতক্ষন বসে থাকার পর সে খারাপ কিছুই ভেবে নিয়েছে। নিশির মা তাকে ফ্রেশ হওয়ার জন্য একটি রুমে পাঠিয়ে দিলেন। বললেন সব ব্যবস্থা করা আছে তুমি ফ্রেশ হয়ে এসো।

আবিরের মা বাবা নিশির বাসায় এসে পৌঁছেছেন। নিশির মা তাদের বসতে দিয়েছেন। বাসায় আর তো কেউ নেই তাই তিনি নিজেই গিয়ে নাস্তা চা একেবারেই নিয়ে এসে বসলেন। গম্ভীর পরিবেশ ভেংগে দুজন দু দিক থেকে প্রবেশ করল। একজন বউ বেশে আর একজন বর বেশে।
তবে কি আজ আবির আর নিশির বিয়ে?

glqxz9283 sfy39587p07