Skip to content

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ: মুক্তিযুদ্ধের আগে-পরে

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

যুদ্ধকালীন ক্লাস নাইনের ছাত্র। অস্থির ছিলেন যুদ্ধে যাবার জন্য। কিন্তু বাবাকে পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে গেলে প্রথম সন্তান শহিদুল্লাহকে কিছুতেই মা যুদ্ধে যেতে দেন নি। হত্যা আর অত্যাচারের সিম্ফনি অব ডেসট্রাকশন তাঁর চিন্তাজগতকে তুমুলভাবে আলোড়িত করে। উল্লেখ্য, মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মিটিং, মিছিল আর হরতালে যোগ দিয়েছিলেন।
.
১৯৭৩ সালে এস,এস,সি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশনের দিন নিজের নামের আগে ‘রুদ্র’ বসিয়ে দেন। বিজ্ঞানের ছাত্র ৪ বিষয়ে লেটার মার্ক্স নিয়ে ভর্তি হয় ঢাকা কলেজের মানবিক বিভাগে। দুই বছরে মাত্র ১৮ দিন ক্লাসে উপস্থিতি, ২য় বিভাগে এইচ,এস,সি পাস।
.
আর্টিস্টরা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী। ঘটনার সাথে সাথেই তাঁদের মনে প্রবল আলোড়নের সৃষ্টি হয়। রচিত হয় শিল্প, সাহিত্য, উপন্যাস, প্রবন্ধ।
.
তবে কিছু আর্টিস্ট একই সাথে অ্যাক্টিভিস্টের দায়িত্বও পালন করে থাকেন। সাবেক নাজি গুন্টার গ্রাস জীবনের সায়াহ্নে ইহুদিদের বিরুদ্ধে প্যালেস্টাইনিদের পক্ষে লিখেছিলেন, মানুষের দুর্দশা উপলব্ধি করতে ছুটে এসেছিলেন কলকাতায়। রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহও ছিলেন তেমনি একজন শক্তিশালী আর্টিস্ট এবং অ্যাক্টিভিস্ট।
.
১৯৭৬ সাল। নামীদামী শিল্পীরা যখন স্বাধীনতা-বিরোধী সরকারের পদলেহনে ব্যস্ত। তিনি তখন রচনা করলেন অনলবর্ষী কবিতাঃ বাতাসে লাশের গন্ধ, মাটিতে লেগে আছে রক্তের দাগ। জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরনো শকুন।
.
১৯৮১-তে তসলিমা নাসরিনের সাথে বিয়ে, ’৮৭-তে বিচ্ছেদ। এর মাঝেই তিনি শুরু করেছিলেন স্বৈরাচারবিরোধী কাব্য-আন্দোলন: জাতীয় কবিতা উৎসব। ফেব্রুয়ারির প্রথম দিবসে শৃঙ্খল মুক্তির কসম কেটে শুরু হতো সেই উৎসব। আজ এই দিনটি জাতীয় ব্লগ দিবস হিসেবে পালিত হয়।
.
একই সাথে দ্রোহ আর প্রেম ছিল তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্য। বাংলা বানানরীতিতেও তিনি এনেছিলেন আমূল পরিবর্তনঃ
.
“...কিছুটা তো চাই-হোক ভুল, হোক মিথ্যে প্রবোধ,
অভিলাষী মন চন্দ্রে না-পাক, জোছনায় পাক সামান্য ঠাই
কিছুটা তো চাই...”
.
’৮৩ সালের গল্প বলি। ক্ষমতায় তখন স্বৈরাচার। রুদ্র কবিতার ছন্দে ছন্দে বলে উঠলেনঃ
.
“...অস্ত্র চাই
শিকড়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে আছে ঘাতক লবন
ওই যে হাজার হাত জুলুমের বিরুদ্ধে উঁচানো
তা-ও আজ বিক্রি হয়
বিক্রি হয় অন্ধকারে মধ্যবিত্ত নেতৃত্বের ঘিলু...”
.
আজ রুদ্রের জন্মদিন নয়, নহে মৃত্যুদিবস। তবু রুদ্রেরা এভাবেই ঘুমিয়ে থাকে শতকোটি তরুণ হৃদয়ে অমাবশ্যার কালো রাত্রির শেষে ভোরের আলোয় পাখির ডাকে চুপচাপ।
.
আবার হঠাৎ হঠাৎ জেগে ওঠে। কখনো প্রেমে, কখনো দ্রোহে। চেতনার ‘পরে ধুলোর আস্তরণ ধুয়ে মুছে যায় বাস্তব বৃষ্টিতে। সভ্যতা টানে দিন যাপনের দিকে। নাগরিক চাকা রোখে জীবনের গতি। আমাদের হাত নিসর্গে প্রসারিত। আমাদের হাত দুজনায় উদ্যত।
.
এসো ফিরে যাই ফিরে যাই ১৯৯০ সালে। স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। রুদ্রের লেখনিতে উঠে এলো মিছিলে নোতুন মুখের জয়গানঃ
.
“...তোমাদের পাঠ্যক্রমে ছিলো না মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস,
তোমাদের হয়নি দেখতে দেয়া বাঙালির শ্রেষ্ঠ মানুষটিকেই।
তবু তুমি নিজেই এসেছো নেমে আজ মিছিলে সবার আগে,
কাঁধে তুলে নিয়েছো বন্ধুর লাশ, অচেনা সাথির দেহ।
প্লাবনের মতো ফিরে দাঁড়িয়েছো বুলেটের বিরুদ্ধে সবাই-
মনে রেখো ফেরার সকল পথ বন্ধ হয়ে গেছে...”
.
মাত্র ৩৫ বছর বয়সে হৃদক্রিয়া বন্ধের মাধ্যমে মৃত্যু। রয়ে যায় ৭টি কাব্যগ্রন্থ, কিছু গান, অনন্ত নক্ষত্র বীথি আর কিছু স্মৃতি...
.
.
থাকুক তোমার একটু স্মৃতি থাকুক,
একলা থাকার খুব দুপুরে
একটি ঘুঘু ডাকুক

glqxz9283 sfy39587p07