Skip to content

শাহবাগের আন্দোলন অবৈধ না বৈধঃ একটি আইনী বিশ্লেষন

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি



“শাহবাগ” শব্দটি আপনার সামনে এলেই আপনাকে খুব সম্ভবত বলে দিতে হয়না যে শাহবাগ আসলে কি। বাংলাদেশের ইতিহাসের মেরুদন্ডে যে শক্তিশালী কয়েকটি উপাখ্যান রয়েছে সেটির সবচাইতে বড় অংশই হোলো এই শাহবাগ। বাংলাদেশের আপামর জনতা এখন শাহবাগের এই গণজাগরনকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ হিসেবেই অভিহিত করেছে। তারপরেও এই লেখাটির পূর্ণাঙ্গতার কথা বিবেচনা করে শাহবাগের আন্দোলন সম্পর্কে শুরু দু চারটি কথা না বললেই নয়।

কেন শাহবাগ আন্দোলন হোলো কিংবা হচ্ছেঃ

আপনারা জানেন বাংলাদেশে একটি বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠিত হয়েছে ২০১০ সালের ২৫ শে মার্চে এবং এর ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালের ২২ শে মার্চ ট্রাইবুনাল-২ নামে আরেকটি ট্রাইবুনাল গঠিত হয়েছে। আপনারা এও জানেন যে এই ট্রাইবুনাল দুইটি গঠিত হয়েছে মূলত আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যে সকল আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সেই অপরাধগুলোর বিচার করবার জন্য। এই বিচারের প্রথম ভাগে ৮ জনের বিচার প্রাথমিক ভাবে শুরু হলেও পরবর্তীতে আরো ৫/৬ জনের বিচার শুরু হয় জামাত এবং বি এন পি’র অকল্পনীয় সহস্রাধিক বাঁধার মধ্যে দিয়ে। অনেক চড়াই উৎরাই শেষে ট্রাইবুনাল-২ গত ২১ শে জানুয়ারী ২০১৩ আবুল কালাম আজাদ (বাচ্চু রাজাকার) নামে এক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে রায় দেয় এবং রায়ে বাচ্চু রাজাকারের মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। ঠিক তার ১১ দিন পর ৫ ই ফেব্রুয়ারী ২০১৩ ওই একই ট্রাইবুনাল আরেক অভিযুক্ত যে কিনা জামায়াতী ইসলামের একজন নেতৃত্বস্থানীয় ব্যাক্তি, তাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়ে রায় ঘোষনা করে। একাত্তর সাল থেকে আজ পর্যন্ত এই কাদের মোল্লা পুরো বাংলাদেশে পরিচিত ছিলো “মিরপুরের জল্লাদ” হিসেবেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার নৃশংসতা আর পাশবিকতা পৃথিবীর আর সকল কদর্যতাকেই হার মানিয়েছিলো। সকলেই আশা করেছিলেন এই কাদের মোল্লার নিশ্চিত ফাঁসী হবে। কেননা কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে যে ৬ টি অভিযোগ ছিলো তার মধ্যে ৫ টি অভিযোগই সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত হয়েছে এবং সেখানে কাদের মোল্লা ৩৪৪ জন মানুষের খুনের সাথে জড়িত বলে প্রমাণিত হয়েছিলো। কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্য যে এই রায়ের মাধ্যমে কাদের মোল্লাকে ফাঁসী না দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়। ঠিক এই রায় ঘোষনার ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মাথায় পুরো ফেসবুক, ব্লগ তথা পুরো অনলাইন জগৎ এবং বাংলাদেশের অন্য সাধারণ জনতা যারা যে অবস্থাতেই এই রায়ের খবর পেয়েছেন তারা সকলেই বিমূড় হয়ে যান। বাংলার সাধারণ জনতারা নেমে যায় রাস্তায়। জড়ো হতে থাকেন শাহবাগে। তারপর তাঁরা জানাতে থাকে এই রায়ের বিরুদ্ধে তাঁদের হতাশা, মতামত, ক্রোধ কিংবা বঞ্চনার আর কষ্টের উপাখ্যান। একদিনের ভেতর শাহবাগ হয়ে ওঠে মানুষের মহাসাগর। জীবন্ত জন সমুদ্র। সিশু থেকে বৃদ্ধ। সমাজের যতগুলো স্তর রয়েছে এর এক্সস্টিং কাঠামোয়, সেসব সকল স্থান থেকেই মানুষ এসে হাজির হয় প্রতিবাদে। তারপরের যা ঘটনা সেটি ইতিহাস। বাংলাদেশের বুকে শুধু না, পৃথিবীর বুকে স্থান করে নেয়া এক জ্বল জ্বলে সত্য।

শাহবাগের আন্দোলনের দাবী গুলো কি ছিলোঃ

গত ৮ ই ফেব্রুয়ারী গণ জাগরণ মঞ্চের সমাবেশ থেকে সরকারের কাছে যে দাবী গুলো তোলা হয় নীচে সেগুলো বর্ণিত হোলো (উল্লেখ্য যে, এই দাবী গুলো জনতার পক্ষ থেকে উত্থাপন করেছে ব্লগার অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক)

(১) মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী, গণহত্যাকারী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারে ‘মৃত্যুদন্ড’ নিশ্চিত করতে হবে।

(২) জামায়াতে ইসলামীসহ বাংলাদেশের বিরোধিতাকারী ও পাকিস্তানি বাহিনীকে গণহত্যায় সহায়তাকারী সকল রাজনৈতিক সংগঠনকে নিষিদ্ধ করতে হবে। এ লক্ষ্যে নবম জাতীয় সংসদে বিল পাস করতে হবে।

(৩) এ সংসদেই ট্রাইব্যুনালকে একটি স্থায়ী রূপ দিতে হবে এবং যুদ্ধাপরাধী-মানবতাবিরোধী অপরাধীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

(৪) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রীয় প্রসিকিউশনকে শক্তিশালী করার জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

(৫) জামায়াতে ইসলামী ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোকে অর্থায়ন ও সহায়তাকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদন্তে জাতীয় কমিশন গঠন করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যক্তিকে যথোপযুক্ত বিচারের মাধ্যমে শাস্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ বা রাষ্ট্রের আয়ত্তে নিয়ে আসতে হবে।

(৬) তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়তে সকল জাতি-ধর্ম নৃগোষ্ঠীর সাংবিধানিক সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এছাড়াও শাহবাগ আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন এমন একজন ব্যাক্তিত্ব ব্লগার রাজীব হায়দার কে গত ১৫-ই ফেব্রুয়ারী খুন করে মিরপুরে তার বাসার সামনে ফেলে যাওয়া হয়। সে সময়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠে গণজাগরণে আসা জনতা । সেখানে তারা দাবী তোলে আরো সুনির্দিষ্ট ৬টি পয়েন্ট তুলে। সেগুলো হোলোঃ

(১) ঘাতক জামাত শিবিরের হামলায় শহীদ রাজীব হায়দার, জাফর মুন্সী, বাহাদুর মিয়া, কিশোর রাসেল মাহমুদ হত্যাকান্ডে জড়িতদের আগামী ৭দিনের মধ্যে গ্রেফতার করতে হবে। (২) ২৬ শে মার্চের পূর্বে স্বাধীনতা বিরোধী ঘাতক সন্ত্রাসী জামাত শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যায় নেতৃত্বদানকারী জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে সুশোধনী আইনের অধীনে অভিযোগ গঠন এবং নিষিদ্ধের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। (৩) অবিলম্বে যুদ্ধাপরাধী সংগঠনগুলোর আর্থিক উৎস, যেসব উৎস থেকে সকল প্রকার জঙ্গিবাদী, এবং দেশবিরোধী তৎপরতার আর্থিক জোগান দেয়া হয়, সেগুলো চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে। (৪) যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া গতিশীল ও অব্যহত রাখতে অবিলম্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালকে স্থায়ী রূপ দিতে হবে। (৫) গণমানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে জামায়াত-শিবিরে র সন্ত্রাস ও তান্ডব বন্ধে অবিলম্বে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে সকল সন্ত্রাসী গ্রেফতার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারসহ গোপন আস্তানা সমূহ উৎখাত করতে হবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এদের ভয়ংকর রূপ প্রকাশ করে দিতে হবে। (৬) যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষক এবং হত্যা ও সাম্প্রদায়িক উসকানিদাতা গণমাধ্যমগুলির বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে।

কারা রয়েছে এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে?

আসলে এই বৈধ কিংবা অবৈধ-এর প্রশ্ন মূলত তুলেছে দেশের ভেতররেরই একটা অংশ এবং দেশের বাইরের একটা অংশ। দেশের ভেতরে যারা এই দাবী তুলেছে এদের ৪ টি ভাগে ভাগ করে নেয়া যেতে পারে।

(ক) এই অংশটি শুরু থেকেই এই ট্রাইবুনালের গঠনের বিরুদ্ধে। এরা মূলত স্বাধীনতার বিরোধী পক্ষ। এরা কোনোভাবেই চায়না এই বিচারটি ভালো ভাবে সম্পন্ন হোক। তাই এরা ক্রমাগত ভাবে এই বিচারের ফেয়ারনেস, স্বচ্ছতা, মান ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন তুলে যাচ্ছে তাদের নিজেদের অস্ত্বিত রক্ষার জন্য। মোট কথা, এই বিচার হলে সরাসরি যে পক্ষটি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, এরাই এই বিচার কিংবা এই বিচারের পক্ষে গড়ে ওঠা যে কোনো জনমতের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান জানিয়ে দেয়। এই অংশ থেকেই মূলত ধর্মীয় বিদ্বেষ বা সাম্প্রদায়িকভাবে চিহ্নিত করণের ক্ষেত্রে একটা হার্ড টেন্ডেন্সি লক্ষ করা যায়। এরা যে কোন মূল্যে এই ট্রাইবনালকে বন্ধ করতে চায়। হোক সেটি ধর্ম দিয়ে কিংবা অস্ত্রের বা নৈরাজ্য দিয়ে।

(খ) এই অংশটি এই বিচারের কারনে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ না হলেও, যারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তাদের সাথে রাজনৈতিক ভাবে বিভিন্ন অঙ্গীকারে আবদ্ধ। এছাড়াও এই অংশটি মনে করে এই বিচারটি যদি হয়ে যায় তবে সরকারী দল ব্যাপক জনসমর্থন পাবে পরবর্তী নির্বাচনে। সুতরাং এই বিচার হয়ে গিয়ে যেন সরকার কোনোভাবেই প্লাস পয়েন্ট না পেয়ে যায়। এই অংশটি অতিমাত্রায় আওয়ামীলীগ বিরোধী। আওয়ামীলীগ কোনো ভালো কাজ করলেও তারা সেটির কৃতিত্ব সরকারকে দিতে নারাজ থাকে। এই দলে রাজনৈতিক নেতাদের বা দলের আধিক্য বেশী কিন্তু এখানে কিছু বুদ্ধিজীবি, পত্রিকার সম্পাদক রয়েছে যারা কোনো না কোনো ভাবে আওয়ামী রাজনীতির যে সুবিধার বলয় সেটি থেকে চ্যুত।

(গ) এই অংশটি উপরের দুইটি অংশের একটিও নয় কিন্তু এই দলটি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আস্থা রাখে না এবং বিভিন্ন ভাবেই এদের নানান বৈষয়িক, আর্থিক ইত্যাদি ব্যাপারে কোনো না কোনো ভাবে এরা আওয়ামীলীগ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন কিংবা এক সময় আওয়ামীলীগ সমর্থিত ছিলেন কিন্তু এখন সে দল ছেড়ে এসেছেন এমন একটি অংশ এই আন্দোলনের বিরোধী। এটি মূলত শাহবাগের আন্দোলনের বিরোধীতার চাইতেও আসলে সরকার বিরোধীতার রেশ এই শাহবাগে টেনে আনছেন। এই দলটির ভেতর কিছু সেমি এলিট, পুরো এলিট, নতুন বুর্জোয়া কিংবা উচ্চবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্তের একটা মিশ্রণ আছে। যারা আইন দিয়ে, যুক্তি দিয়ে এই শাহবাগকে একটা অবৈধ আন্দোলন হিসেবে দেখে কিংবা আইনের উপর একটা হস্তক্ষেপ হচ্ছে বলে মনে করে। এই অংশে কিছু বামপন্থীদের ভীড় রয়েছে যাদের বাংলাদেশী শব্দ চয়নে “চায়না বাম” বলে অভিহিত করা যায়।

(ঘ) এই অংশটি বেশ ধর্মপ্রবণ একটি ভাব ধরে থাকতে ও বলতে পছন্দ করে। এরা শুধু এই আন্দোলন নয়, যে কোনো আন্দলোনেই যদি ধর্মের ব্যাপারে কোন প্রশ্ন উঠে যেটিকে ধরে নেয়া হয় ধর্মের বিরুদ্ধে অবমাননা তখন এই অংশটি কোনো কিছু না বুঝেই হিংস্র হয়ে ওঠে। এরা মনে করে ধর্মের সমালোচনা করা মানে অন্যায় এবং এটার প্রতিবাদ না করাটা মহা পাপ। এই অংশটি মূলত প্রচন্ড অশিক্ষিত ও কুশিক্ষিত শ্রেণী। এরা একমাত্র বেহেশতে যাবার জন্য দুনিয়ায় বেঁচে থাকে এবং এই বেহেশতে যাবার ও অন্যকেও বেহেশতে নিতেই হবে এটা দায়িত্ব মনে করে। এরা প্রবলভাবে সাম্প্রদায়িক হয়ে থাকে।

শাহবাগের আন্দোলন কি বৈধ না অবৈধঃ আইনী বিশ্লেষনঃ

(ক) প্রাথমিক আলোচনাঃ

আমি এখন আমার লেখার মূল বিষয় নিয়ে আলোচনায় যাচ্ছি। এই আলোচনায় যাবার আগে উপরের ইনফরমেশন কিংবা পর্যালোচনা গুলো পাঠকের তথ্য জানবার কিংবা আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি জানবার জন্য প্রয়োজন ছিলো বলে মনে করি। উপরে যে চারটি অংশের কথা বলেছি সেই চারটি অংশের মধ্যে (ক), (খ) এবং (ঘ) অংশটি নিয়ে আমি চিন্তিত নই কোনোভাবেই। তিন নাম্বার মানে (গ) অংশটি নিয়েই আমার চিন্তা ছিলো না, তারপরেও আমি মনে করছি এই অংশ থেকে যে প্রশ্নটি এসেছে সেটিই আমার এই লেখাটি লিখতে উৎসাহ দিয়েছে। কেননা এখান থেকেই একটি প্রশ উত্থাপিত হয়েছে যে এই শাহবাগের আন্দোলনটি আসলে মাননীয় আদালতের রায়ের উপর হস্তক্ষেপ, এটি একটি অনৈতিক আন্দোলন। যেহেতু বৈধ, অবৈধ কিংবা আইনের কিছু কথা এখানে এসেই গেছে, সেহেতু এই অংশটির এই সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দেয়াটা আমি সমীচিন মনে করছি।

একটা মজার ব্যাপার হলো এই অংশটি যদিও শাহবাগের আন্দোলনকে একটি অবৈধ কিংবা নীতিবিরুদ্ধ বলে মনে করে, অথচ এই অংশটি এই “ক” অংশের জ্বালাও-পোড়াও, রায় মানিনা, মানুষ খুন কর, নৈরাজ্য কর এসব বিষয়ে মুখে তালা দিয়ে বসে থাকে। এটি বেশ অদ্ভুত একটা ব্যাপার এবং ক্ষেত্র বিশেষে উপভোগ্যও বটে। সে যাই হোক, আলোচনা শুরু করা যেতে পারে।

(খ) সংবিধান এবং শাহবাগঃ

আলোচনার শুরুতেই আমি মনে করিয়ে দিতে চাই যে এই ট্রাইবুনালের বিচার কোনো ফৌজদারী আদালতে অপরাধীদের বিচার নয় কিংবা এই বিচারের প্রেক্ষাপট সাধারণ কোনো বিষয় না। এই বিচারের প্রেক্ষাপট হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধকালীন সংঘঠিত অপরাধ এবং যার সাথে একটি জাতির সৃষ্টির সরাসরি সম্পর্ক। আজকে যারা যারা এই শাহবাগের আন্দোলন অবৈধ বলে এদিক সেদিক দিয়ে চাউর করছেন তাদের জন্ম, তাদের অস্ত্বিত্বের সাথেও মুলত এই মুক্তিযুদ্ধের ফলাফলের একটা সম্পর্ক রয়েছে। আর এই মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধের বিচারের জন্যই যেহেতু এই ট্রাইবুনাল সেহেতু রাষ্ট্রের সংবিধান, জুডিশিয়ারী, আইনসভা, এক্সিকিউটিভ তথা সকল অর্গান-ই এক ধরনের অস্ত্বিতের হুমকির মুখে পড়ে গিয়েছিলো।

বাংলাদেশ সংবিধানের একেবারে প্রস্তাবনা অংশ থেকেই শুরু করা যাক। শুরুতেই প্রস্তাবনায় বলা হচ্ছে

“১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষনা করে জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি”


একটি জাতির জন্মের কারন এই প্রস্তাবনার শুরুতেই বলা রয়েছে। ঠিক আবার প্রস্তাবনার তৃতীয় প্যারার দ্বিতীয় লাইনেই বলা রয়েছে আইনের শাষনের কথা, মৌলিক মানবাধিকার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক আর সামাজিক সাম্যের কথা। এবার প্রস্তাবনার চতুর্থ প্যারার ২য় লাইন থেকে শুরু করেই মূলত বলা রয়েছে যে এই সংবিধান জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যাক্তিস্বরূপ এই সংবিধানের প্রাধান্য অক্ষুন্ন রাখা পবিত্র দায়িত্ব।

এবার প্রস্তাবনা ছেড়ে সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদের দিকে নজর দেয়া যাক। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭(১) এ বলা রয়েছে “প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে এই ক্ষমতার প্রয়োগ শুধু এই সংবিধানের অধীনে কর্তৃত্বে প্রয়োগ করা যাবে” আবার সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭(২)-এ বলা রয়েছে জনগনের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন”

সংবিধানের এই কয়েকটি ধারা যদি এখন পর্যালোচনা করি তবে দেখা যায় যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ফলাফল হিসেবেই মূলত এই সংবিধানের জন্ম এবং এই সংবিধান অবশ্যই সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আইনের শাষনের উপর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এখন কথা দাঁড়ায় এই যে- কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনীত ৬ টি অভিযোগের মধ্যে ৫ টি অভিযোগ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত হয়ে যাবার পরেও (এই প্রমাণের ভেতর প্রত্যক্ষ সাক্ষী রয়েছে যারা সরাসরি কাদের মোল্লার অপকর্মের সাক্ষী) যখন কাদের মোল্লার ফাঁসীর হুকুম হয়না তখন সেটি সংবিধান অনুযায়ী কতটা ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে সেটি পাঠকের বিচারের উপরেই ছেড়ে দেই। এই সংবিধানকে যদি আমি পাশে রেখে শুধু এই ট্রাইবুনাল যেই আইনে পরিচালিত হচ্ছে সেই আইনটিকে নিয়েও সুনির্দিষ্ট করে বলি তাহলেও দেখা যাচ্ছে যে এই আইনের ২০(২) ধারাতে যে “proportionate to the gravity of crime” এর কথা বলা হয়েছে সেটার আলোকেই বিচারপতিদের নিজেদের ব্যখ্যা সম্পূর্ণভাবে কন্ট্রাডিক্টরী।

যখন এই জাতীয় একটা রায়ের ক্ষেত্রে একজন নাগরিকের মনে হয় যে সে ন্যায়বিচার পায়নি কিংবা আইনের শাষন প্রতিষ্ঠিত হয়নি আমাদের সংবিধান অনুযায়ী-ই সে প্রতিবাদ করবার ক্ষমতালাভ করে। শুধু এই ক্ষমতাই না, বরং এই যে অপরাধের সাথে শাস্তির এই বিরাট তফাৎ এটি তার বিবেবকেও নাড়া দেয়। ব্যাক্তির এই চিন্তা আর বিবেকের স্বাধীনতাটুকু নিশ্চিত করা হয়েছে সংবিধানের ৩৯(১)-এ। আবার সংবিধানের ৩৯(২)(ক)-তে বলা রয়েছে “প্রত্যেক নাগরিকের বলার ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হোলো”

কিন্তু আবার ৩৯(২) (ক) তে যে বলবার কিংবা ভাব প্রকাশের স্বাধীনতাটুকু রয়েছে সেটা বেশ কিছু কারনে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রন করতে পারবে যার মধ্যে রয়েছে আদালত অবমাননা, মানহানির সম্ভাবনা, জনশৃংখলা, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, নৈতিকতা ইত্যাদি। যেহেতু এই আন্দোলনের দাবী গুলো জনগন শান্তিপূর্ন উপায়ে সরকারের কাছে তুলেছে এবং যেখানে আদালত মনে করেনি যে আদালতকে কোনোভাবেই অবমাননা করা হয়েছে (যেহেতু আদালত এই বিষয়ে কোনো রুল ইস্যু করেনি বা মন্তব্য করেনি) সেহেতু অনুচ্ছেদ ৩৯(২) (ক) এর অধিকারের পুরোটুকুই জনতা আইনগতভাবে পালন করেছে তার অধিকার হিসেবে।

এখানে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে এই রায় হবার পর স্বাধীনতার বিপক্ষের যে শক্তিরা যে তাদের মনোভাব ব্যাক্ত করেছে সহিংস ভাবে এবং এই রায় প্রহসন কিংবা যেভাবে ট্রাইবুনাল দখল করবার হুমকি দিয়েছে, বিচারকদের প্রহত করবার হুমকি দিয়েছে, পুরো দেশকে অচল করবার হুমকি দিয়েছে সেটি বরংচ এই সংবিধানের উল্লেখিত অনুচ্ছেদ্গুলোর বরখেলাপ। এমনকি এদের পক্ষের সংবাদপত্রগুলো দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধাবার জন্য যেভাবে পত্রিকায় লেখা প্রকাশ করেছে ভুয়া নাম, ভুয়া ছবি, মিথ্যে সংবাদের মাধ্যমে সেটি বরংচ এই অনুচ্ছেদের ৩৯(২)(খ) কে সম্পূর্ণ ভাবে ভঙ্গ করেছে এবং দেশকে অস্থিতিশীল একটা পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।

একটি প্রদত্ত রায়কে চ্যালেঞ্জ করা কিংবা পাল্টাতে বলা কি বৈধ?

একটি প্রদত্ত রায়কে চ্যালেঞ্জ করা যেতেই পারে। এবং চ্যালেঞ্জ করা যায় বলেই এক কোর্টের রায়ের পর আপীলের প্রভিশন রাখা হয়েছে। অনেকেই এই ট্রাইবুনালের প্রদত্ত রায়কে সাব জুডিস ম্যাটার বলে এটিকে নিয়ে কোনো ভাবে কথা না বলবার পরামর্শ দেন। ব্যাপারটা আসলে নিতান্তই হাস্যকর। এই ট্রাইবুনালের ক্ষেত্রে যখন একটা রায় হয় তখন এটা একটা অধ্যায়ের ফলাফল কিংবা সমাপ্তি। আইনগত ভাবে তখন দোষীকে দোষী বলা যায়। এই অধ্যায়ের সমাপ্তির সাথে সাথে সেটিকে নিয়ে সংক্ষুব্ধ ব্যাক্তি তার মতামত জানাতে পারেন, তার চাওয়া কি ছিলো এবং কেনই বা ছিলো সেটি জানাতে পারেন। এতে করে পুরো ব্যাপারটিকে সাব জুডিস ম্যাটার বলে যদি মন্তব্য করার রেস্ট্রিকশনই থাকত তবে রায়ের পরে ডিফেন্সের আইনজীবি এই রায় নিয়ে সব চ্যানেলে বড় বড় সাক্ষাৎকার দিয়ে বেড়াতে পারতেন না। আলোচ্য রায় যখন আবার পরবর্তী কোর্টে আপীল শুনানীর জন্য উপস্থাপিত হবে তখন হয়ত এই মামলাকে প্রভাবিত করতে পারে এমন বক্তব্য থেকে বিরত থাকাই আইন অনুযায়ী কর্তব্য কিন্তু সাধারণ জনতা তার মত প্রকাশ করবেই। তবে শিরোনামে যে চ্যালেঞ্জের কথা বলা রয়েছে সেটি হয়ত প্রকাশ করা হবে ব্যাক্তির এই রায়কে ঘিরে ভাবনা, তার যুক্তি, তার চিন্তার আলোকে। কেননা এই পুরো আদালত অবমাননা কিংবা সাব জুডিস ম্যাটার বুঝবার আগে আমাদের আগে আইন প্রক্রিয়ার যে অন্যতম মূল তত্ব, সেটি বুঝতে হবে।

আমরা যখন আইন পড়ি তখন একটি বিষয় খুব ভালো করে আমাদের পড়তে হয়েছিলো। সেটির নাম “লিগাল এথিক্স”, এছাড়াও যখন “জুরিস্প্রুডেন্স” পড়েছিলাম তখন পড়তে হয়েছিলো আইন ও মোরালিটির নানান তত্ত্ব আর দর্শন। আমি আমার ব্যক্তিগত চিন্তায় সব সময় মনে করি সবার আগে সত্য মানুষ। এই মানুষ তার সহজাত প্রবৃত্তি অনুযায়ী অন্যায় করে, অপরাধ করে। সে কারণেই এই মানুষই সমাজ, সভ্যতাকে নিয়ন্ত্রণ করবার জন্য তৈরি করেছে নিয়ম ও বিধি, আইন-কানুন কত কিছু। আইন আছে এবং তাকে রক্ষা করতে হবে বলেই মানুষ এই পৃথিবীতে বাঁচে না। বরং মানুষ যাতে সঠিকভাবে ও সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে এই সমাজে, সে কারণেই আইন তৈরি হয়েছে। সমাজতত্ত্ব, মানুষ, সামাজিকতা, দর্শন, আদর্শ, সব কিছুরই একটি ফাইন লাইন আছে শেষ পর্যন্ত। সভ্য সমাজের নিয়ম অনুযায়ী একটা প্রতিষ্ঠিত আদালতের রায় বা বক্তব্যকে জনতা সম্মান করবে ঠিকি কিন্তু সেটি যদি ওই আদালতের নিজের বক্তব্যের সাথেই সরাসরি কন্ট্রাডিক্টরী করে তোলে তবে জনতা সেটি নিয়েই কথা বলবার ও তার চিন্তা প্রকাশের অধিকার রাখে সর্বোচ্চ আইন সংবিধান অনুযায়ী-ই।

আমরা যদি শাহবাগের থেকে উঠে আসা দাবী, ইচ্ছা, মতামত গুলোর দিকে তাকাই তাহলে কিন্তু খুব সহজেই একটি বিষয় চোখে পড়ে যেটি হোলো শাহবাগ এই ট্রাইবুনালকে আক্রমণও করেনি, বিচারকের প্রতি আক্রোশও দেখায় নি, স্বাধীনতাবিরোধীদের মত ট্রাইবুনাল ঘেরাও কিংবা এই ট্রাইবুনালকে বিতর্কিত করবার মত কোনো কাজও করেনি। বরং জনতা নির্বাচিত সরকারের কাছেই তাদের বক্তব্য খুব স্পস্ট ভাষায় তুলে ধরেছে।

আন্দোলনের ফলে আইনের পরিবর্তন কি বিচার ব্যাবস্থার জন্য হুমকি?

অনেকেই বলে থাকেন যে এই যে শাহবাগ আন্দোলনের ফলে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনালস) আইন-১৯৭৩ পরিবর্তিত হোলো এটি অন্যায়। সাজা হয়ে যাবার পর নতুন করে প্রভিশন তৈরী করা অন্যায়। আমি খুবি বিনীত ভাবে এই জাতীয় প্রশ্নকরা সম্প্রদায়কে কয়েকটা কথা মনে করিয়ে দিতে চাই।

প্রথমত, আমাদের এই আইনটি কিন্তু রেট্রোস্পেকটিভ। ১৯৭১ সালের কৃত অপরাধের জন্য আইন করা হয়েছে ১৯৭৩ সালে এবং যেটিতে রেট্রোস্পেক্টিভ ইফেক্ট দেয়া হয়েছে ।

দ্বিতীয়ত, এই আইনটিকে সুরক্ষা দেয়া হয়েছে সংবিধানের ৪৭(৩) দিয়ে।

তৃতীয়ত, এই আইনটিকে বিচারের আগে একবার সংশোধন করা হয়েছিলো এবং বিচার চলাকালীন সময় ডিফেন্সের নানাবিধ চাপ এবং তাদের পাঠানো লবিস্টদের অনুরোধ ও পরামর্শক্রমে দুইবার বিভিন্ন ধারার সংশোধনী আনা হয়েছিলো। যখন ডিফেন্সের অনুরোধক্রমে সংশোধনী আনা হয় তখন এই কাজ খুব ভালো, আর যখন ন্যায় সঙ্গত ভাবে রায়ের পরে একটি অত্যন্ত জরুরী স্থানে পরিবির্তন ফেয়ার ট্রায়ালের জন্যই প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায় তখন আর সেটি ভালো থাকে না। সেটি মন্দ হয়ে যায় এক চক্ষু সমালোচকদের কাছে। এই পরিবর্তনের দুইটি দিক আমি আলোচনা করব। এর একটি দিক হচ্ছে, এই আইনের যে আপীলের প্রভিশনটুকু ছিলো সেটিতে কিন্তু এক তরফা ভাবে অভিযুক্তকে তুলনামূলক ভাবে অধিক সুবিধাই দেয়া হয়েছে। ফেয়ার ট্রায়ালের ক্ষেত্রে যে “ইকুয়ালিটি অফ আর্মস” প্রিন্সিপালটি রয়েছে সেটির চর্চা কিন্তু এক কথায় এই ক্ষেত্রে উহ্য-ই থেকে গেছে। কেননা এই আলোচ্য আইনের ২১ (২) ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপক্ষ কেবল আসামীকে খালাস দেয়া হলে তার বিরুদ্ধে আপীল করবার ক্ষমতা লাভ করত, কিন্তু খালাশ দেয়া ছাড়া অন্য কোনো শাস্তি দেয়া হলে (সেটি যদি কম শাস্তি হয়) রাষ্ট্রপক্ষ কিন্তু সেই শাস্তি বাড়াবার জন্য আপীল করতে পারত না। আমাদের প্রচলিত ফৌজদারী আদালতে কিন্তু এই ব্যাপারে বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষের সমান সুযোগ রেখেছে। যেখানে বলা হচ্ছে-

THE CODE OF CRIMINAL PROCEDURE, 1898 [Appeal against inadequacy of sentence]

417A.(1) The Government may, in any case of conviction on a trial held by any court, direct the Public Prosecutor to present an appeal to the High Court Division against the sentence on the ground of its inadequacy.

(2) A complainant may, in any case of conviction on a trial held by any Court, present an appeal to the Appellate Court against the sentence on the ground of its inadequacy:

Provided that no appeal under this sub-section shall be entertained by the Appellate Court after the expiry of sixty days from the date of conviction.

(3) When an appeal has been filed against the sentence on the ground of its inadequacy, the Appellate Court shall not enhance the sentence except after giving to the accused a reasonable opportunity of showing cause against such enhancement and while showing cause, the accused may plead for his acquittal or for the reduction of the sentence.

কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে এসে অবস্থা যা দাঁড়িয়েছিলো তাতে করে ৬ টি অপরাধের ভেতর ১ টিতে যদি খালাস না পেত তবে তো আর আপীলই করতে পারতা না রাষ্ট্রপক্ষ। একদিকে বিচারকদের নিজেদের রায়ে, নিজেদের বলা বক্তব্যের ভেতর কন্ট্রাডিকশন, আবার অন্যদিকে আপীলের সুযোগ না থাকা, সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপক্ষকেই আসলে দূর্ভাগ্যজনক ভাবে ব্যাকফুটে ফেলা দেয়া হয়েছিলো এ আইনের মাধ্যমে। অথচ এত এত বিদেশী পন্ডিতরা এলেন, আইন নিয়ে কথা বললেন, বার বার বললেন তারা নিরপেক্ষ, আমাদের ভালোর জন্য বলছেন, কিন্তু দূর্ভাগ্যের ব্যাপার হলো প্রসিকিউশনের আপীল রাইটের এই গোলমেলে ব্যাপারটা নিয়ে এরা কোনোদিন কথা বলেনি। অথচ অভিযুক্তের আপীল রাইট নিয়ে তারা ফেনা তুলে ফেলেছিলো।

এখন এই শাহবাগের আন্দোলনের ফলে যেহেতু সরকারের দৃষ্টি আকর্ষন করা হয়েছিলো এবং যেহেতু সরকার জনতারই প্রতিনিধি সেহেতু জনতার এই সম অধিকারের এই যৌক্তিক চাওয়া পূরণ করবে। এটা যেমন সংবিধানের উপরে আলোচিত অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দায়িত্ব তেমনি গন্তান্ত্রিক সরকারের যে শেইপ রয়েছে সেটিকে বাঁচিয়ে রাখবার দায়ের নিমিত্তেও কিন্তু এই দাবী প্রতিষ্ঠা করা অতীব প্রয়োজনীয় ছিলো। তা না হলে সংবিধানে যে আইনের শাষনের কথা রয়েছে সেটি লংঘিত হোতো, সম অধিকারের ধারনা নিস্প্রেষিত হোতো, গণতন্ত্র পরাজিত হোতো। কেননা বিচার চলাকালীন সময়ে যদি অভিযুক্তদের অধিকার রক্ষায় আইন পরিবর্তিত হতে পারে সেখানে ভিকটিমদের অধিকার রক্ষায়ও বিচার চলাকালীন সময়ে আইন পরিবর্তিত হতে পারে।

আরেকটি কথা এখানে উল্লেখ করা খুবই প্রয়োজনীয় বলেই মনে করি। সেটি হোলো শাহবাগের এই আন্দলোন থেকে কিন্তু পরবর্তী সময়ে আইন পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারকে আরো দক্ষ জনবল, আইনজীবি নিয়োগেরও কথা উঠেছে। মামলার একটা অংশ যেহেতু রাষ্ট্র নিজেই, সুতরাং জনতা তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে এই দাবী করতেই পারে কেননা এই জনতাই কিন্তু শুধুমাত্র এই বিচার করবে বলেই লক্ষ কোটি জনতার ম্যান্ডেট পেয়েছিলো। সুতরাং সরকার আইনের মধ্য থেকে যতটুকু তার করণীয় সেটি করবে, এমন দাবী জনতা করতেই পারে।

এই বিচারের ক্ষেত্রে বার বার দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবিদের কাছে মতামত চাওয়া হয়েছিলো, বলা হয়েছিলো এই আইনকে আরো সময়োপযোগী কিংবা আরো বেশী আধুনিক যদি করবার যায়গা থাকে তবে সেটির জন্য মতামত দেবার জন্য। দুঃখ জনক হলেও সত্য যে আজকে যারা এই আইন নিয়ে সমালোচনা করেন তারা কেউই তখন এই মতামত দেন নি। এই ব্যাপারটি আমরা জানতে পারি বাংলাদেশ আইন কমিশনের ২০০৯ সালের ২৪ শে জুন প্রকাশিত একটি রিপোর্ট দেখে।

অনেকেই আবার বলেন যে শাহবাগ থেকে দাবী উঠেছে যে তারা সকল অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চান। এটাকে অনেকেই বলছেন “বিচার মানি তালগাছ আমার” ধরনের বক্তব্যে। এখানেও জনতার বক্তব্যকে নেতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। জনতার এই দাবী রাষ্ট্রের প্রতি। জনতা মনে করেছে প্রসিকিউশন দল কিংবা তদন্ত দলে আরো জনবল বাড়াতে হবে, আরো দক্ষভাবে প্রতিটি অভিযোগের চুলচেরা বিশ্লেষন করতে হবে যাতে করে অপরাধী কোনোভাবেই তার অপরাধ এড়াতে না পারে। চুড়ান্ত রায় তো শেষ পর্যন্ত ট্রাইবুনালই দিবে সেটা বলা বাহুল্য মাত্র। কিন্তু সেই রায়ের বা সে সিদ্ধান্তের উপর শাহবাগ কখনোই কোনো প্রভাব তৈরী করেনি। বরংচ তাদের প্রতিনিধির আরো যা যা করণীয় রয়েছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সেটি-ই তারা বার বার নিশ্চিত করতে চেয়েছে।

সরকার শাহবাগকে সমর্থন করে কি বিচারে হস্তক্ষেপ করেছে?

সমালোচকেরা বলে থাকেন যে এই শাহবাগকে নিয়ে নাকি আইনমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন এই বলে যে, “এই আন্দলোন আগের থেকে হলে রায় অন্য রকম হতে পারত” কিংবা প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন যে, “জনতার দাবীর দিকে হয়ত আদালত লক্ষ্য করবেন”।

এইসব বিষয়ে আমার অবজার্ভেশন হচ্ছে আইনমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন এটি তার নিজের বক্তব্য। তাঁর কথার ব্যাখ্যা নেতিবাচক কিংবা ইতিবাচক দুই ভাবেই দেখা যায়। নেতিবাচকটি তো সমালোচকরা বলেই দিয়েছেন। আমি না হয় ইতিবাচক দিকটি নিয়েই বলি। আইনমন্ত্রীর এই কথাটিতে যে আন্দোলনের কথা বলা আছে সেটি আসলে আমার নিজেরো কথা। আমরা যখন এই ট্রাইবুনালকে নিয়ে বলা শুরু করলাম, ভাবা শুরু করলাম কিংবা লেখা শুরু করলাম তখন থেকেই মনে হচ্ছিলো যে সামগ্রিক ভাবেই এটি নিয়ে একটা সম্মিলিত জনমত গঠনের প্রয়োজন রয়েছে। এতে করে সকলকে এই বিচার নিয়ে, এর প্রক্রিয়া নিয়ে কিংবা এর বিরুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধীদের চালানো প্রোপাগান্ডা নিয়ে সচেতন করে দেয়া যাবে। আর যখনই জনতা সচেতন হবে তখনই বিচারবিরোধীদের নানান ষড়যন্ত্র রুখে দেয়া সম্ভব হবে। এতে করে বিচারবিরোধীরা যে সাক্ষীদের হুমকি দিয়েছে, সাক্ষী গুম করে ফেলেছে, নথি লুকিয়ে ফেলবার পাঁয়তারা করেছে সেটি রুখে দেয়া যেতো সম্মিলিত ভাবেই এবং এতে করে আরো বেশী প্রমাণ সাপেক্ষে যে মামলাগুলোতে সাঈদী খালাশ পেয়েছে সেগুলোতে খালাশ নাও পেতে পারতো। আইনমন্ত্রী হয়ত এই দিক বিবেচনা করেই কথাগুলো বলেছেন। আমি বার বার বলি এই বিচারের গুরুত্ব ও স্তরগুলো এত গভীর যে শুধু সরকার, সরকারের আইন শৃংখলাবাহিনীর উপর নির্ভর করে থাকার চেয়ে সরকারের প্রতি আমাদের যে দায়িত্ব রয়েছে সেটিও আমাদের পালন করতে হবে। এবং সেই পালনের অংশ হিসেবে বিচারের ব্যাপারে সচেতন ও সচেষ্ট থাকার কোন বিকল্প নেই। কেননা বাঙালী কোনো না কোনো ভাবেই এই বিচার প্রক্রিয়ার সাথে একাত্ন হয়ে মিশে গেছে দেশের অস্তিত্ব রক্ষার স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবেই।

আবার প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকেও খুবই পজিটিভলি বিবেচনা করা যায়। এই যে বিচারপতিরা আইনের ২০(২) ধারার ক্ষেত্রে একটা কন্ট্রাডিক্টরী (আমার মতে) ব্যাখ্যা সাপেক্ষে রায় দিলেন, একটা প্রবল জনমত থাকলে ব্যাপারটি বিচারপতিরা হয়ত আরো বেশী গভীর ভাবে ভাবতেন কিংবা ভাবতে পারতেন, এমনটাই হয়ত প্রধানমন্ত্রী ধারনা করেছিলেন। এটা উনার মতামত মাত্র। মতামত তিনি দিতেই পারেন। সুতরাং এমন মতামতকে নেতিবাচক ভাবে দেখার চেষ্টা করাটা কতটুকু যৌক্তিক এটার বিবেচনার ভার সমালোচকদের হাতেই ছেড়ে দিলাম।

আগেই বলেছি একটা কথা যে সরকার জনতার ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করেছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকার জনতার বলবার সুরে কথা বলবে এটাই স্বাভাবিক এবং এটাই গণতন্ত্রের রীতি। যেখানে আইনের 6(2)(A) তে স্পস্ট করে বলা আছে “1) Trial to be held in a fair, impartial and independent tribunal” সেখানে সরকার জনতার সাথে সুর মিলিয়ে তার নিজের অবস্থান শক্ত করাতে ট্রাইবুনালের উপর আদতে কোন প্রভাব পড়তে পারে বলে আমার মনে হয় না। ব্রংচ নির্বাচিত সরকার জনতার বক্তব্যের দিকে কর্ণপাত না করলেই বরং সেটি হয়ে উঠত ডেমোক্রেসির বরখেলাপ, হয়ে উঠত একনায়কতন্ত্রের অনাকাংখী এক নিকষ কালো ছায়া।

এই ট্রাইবুনাল আইন অনুযায়ী-ই সম্পূর্ণ স্বাধীন। একটা কথা অনুধাবন করতে হবে যে এই স্বাধীনতার মানে কিন্তু ব্যাপক। এই স্বাধীনতার মানে হচ্ছে অপরাধীর অপরাধকে এবং তার বিরুদ্ধে আসা নানান অভিযোগকে বিচারপতিরা তাদের নিজস্ব প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা ও বিশ্লেষনী ক্ষমতার মাধ্যমে দেখবেন। সরকারী হস্তক্ষেপে এই ট্রাইবুনাল কোনো রায় কিংবা মতামত দেবে না। কিংবা কোনো আবেগের কাছে বা কোনো ব্যাক্তি বা ব্যাক্তি সমষ্ঠির আবেগের কাছেঈ ট্রাইবুনাল মাথা নত করবে না এবং করেও নি। এখানে উল্লেখ্য যে এই ট্রাইবুনাল নিয়ে সরকার দলীয় সাংসদ সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত বিরূপ বক্তব্য দেবার কারনে আদালতে গিয়ে সুরঞ্জিত সাহেবকে ক্ষমা চাইতে হয়েছে। [সূত্রঃhttp://bit.ly/YBgAWM] একই ব্যাপার হয়েছে প্রভাবশালী মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর বেলাতেও। [সূত্রঃhttp://bit.ly/YBgVca], এই ঘটনায় মতিয়া চৌধুরীকে লিখিত বক্তব্য দেবার জন্য বলা হয়েছে [সূত্রঃhttp://bit.ly/15NHJWH]। আওয়ামীলীগের আরেক প্রভাবশালী সাংসদ ও মন্ত্রী সাজেদা চৌধুরীকেও কারন দর্শাতে বলেছে আদালত, মুখোমুখি করেছে জবাবদিহিতার জন্য, [সূত্রঃ] এই ব্যাপারগুলো তো হয়েছে সকলের চোখের সামনেই। এখানে এসব খবরের রেফারেন্সও দিয়ে দেয়া হয়েছে। সুতরাং এর পরেও কি বলা যায় যে এই ট্রাইবুনাল কোনোভাবেই পরাধীন কিংবা সরকারের কোনো প্রভাবে প্রভাবিত, নাকি সরকারকে বিন্দু মাত্র এই বিচারের ক্ষেত্রে পরোয়া করে চলে? ট্রাইবুনাল যে শুধু মাত্র সরকারী দলীয় ব্যাক্তিদেরই জবাবদিহিতা কিংবা কারন দর্শাবার জন্য রুল জারি করেছে তা নয়। বরং বিরোধী দলীয় নেতা এম কে আনোয়ার[সূত্রঃhttp://bit.ly/ZrlHIL], সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান, নুরুল কবীর [সূত্রঃhttp://bit.ly/14sVb6y] ট্রাইবুনাল অবমাননার দায়ে জবাবদিহিতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

এই আন্দোলনের ফলে কি বিচারপতিদের উপর আলাদা কোনো চাপ তৈরী হয়েছে?

অনেকেই মনে করে থাকেন যে শাহবাগের আন্দোলনের ফলে ট্রাইবুনালের বিচারকদের উপর একটি আলাদা চাপ তৈরী করা হয়েছে যা স্বাধীন বিচারের ক্ষেত্রে অন্তরায় হতে পারে। এই পারসেপশনের ভেতরেই একটা বড় ভুল রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস ভুলিন্ঠিত হয়ে যেতে পারে এই অপরাধের বিচার না হলে, এটাই অনেক বড় একটি চাপের মত মনে হয় আমার কাছে। এই বিচার সঠিক ও সুষ্ঠু না হলে হয়ত বিচারপতি, ট্রাইবুনাল, দেশ, দেশের সব অর্গান, মোট কথা রাষ্ট্র ব্যাবস্থার প্রতিটি নিয়ামক-ই ভুলুন্ঠিত হতে পারে। এই বিচারপতিরা কি আগের থেকেই জানতেন না যে ১৬ কোটি বাঙালী এই বিচারের দিকে তাকিয়ে আছে? সেখানে আলাদা করে শহরের কোথাও কিংবা সারা দেশে যদি এই জনতা এই বিচার নিয়ে আন্দোলন করে দিন রাত তবে সেটি কি আর বিচারপতিদের জন্য নতুন কোনো উপমা কিংবা প্রেশার তৈরী করবার জন্য আলাদা অবস্থা তৈরী করতে পারে? কখনোই পারে না। শাহবাগের আন্দোলন এই দেশের মানুষের ভেতরের কথা যা রাস্তায় উচ্চারিত হচ্ছে। কিন্তু এই উচ্চারণ কি বিচারপতিরা এই বিচারে বসবার আগেই পাঠ করে নেন নি? এটি যে তারা নিয়েছেন সেটি বিচারের রায় গুলোর শুরুর দিকে তাকালেই আমরা দেখতে পারি। কি লেখা রয়েছে কিংবা কি বলেছেন বিচারপতিরা?

“The road to freedom for the people of Bangladesh was arduous and torturous, smeared with blood, toil and sacrifices. In the contemporary world history, perhaps no nation paid as dearly as the Bangladesh did for their Emancipation”


এত কষ্টে অর্জিত স্বাধীনতা এবং সেই স্বাধীনতার বাঁধা দানকারী বলে অভিযুক্ত ব্যাক্তির বিরুদ্ধে এত বছর পরের বিচার কি এমনিতেই চাপের নয় যেখানে এই ব্যাক্তিরাই ক্ষমতায় গিয়েছে, বাংলাদেশের মানুষদের আঘাতে আঘাতে বিপর্যস্ত করেছে?


রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কি পৃথিবীর আর কোথাও হয়েছে?

একটি আদালতের রায়ের ক্ষেত্রে জনতার অভিমত থাকতেই পারে। এই অভিমত কখনো আবেগী অভিমত হতে পারে, কখনো বা সেটি হতে পারে আইনকে চুল চেরা বিশ্লেষন করে ব্যাক্তির একান্ত নিজের বক্তব্য। এই যে রায়ের ব্যাপারে বক্তব্য কিংবা সেটি নিয়ে ব্যাক্তি বা ব্যাক্তিবর্গ তুষ্ট না হলে প্রতিবাদ সেটি কিন্তু আজ পর্যন্ত পৃথিবীর অনেক দেশেই হয়েছে, হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। রায়ের বিরুদ্ধে পালটা অভিমত হিসেবে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ থেকে শুরু করে মৌন প্রতিবাদ, বক্তব্য পশ্চিমা দেশগুলোতে অহরহ হচ্ছে। নিম্নে উল্লেখিত আদালতের রায়ের যেসব প্রতিবাদ হয়েছে তার বিরুদ্ধে কোনো আইনী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে আজ পর্যন্ত আমরা শুনিনি। তাহলে এসব সভ্য দেশে কি করে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে এসব প্রতিবাদ মেনে নেয়া হোলো? কেউ কি সে জবাব দিতে পারবেন? নীচে সেসব প্রতিবাদের-ই কিছু প্রামাণ্য চিত্রই তুলে ধরছিঃ

(১) মিশরে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদঃ

(২) আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে জনতার প্রতিবাদঃ

(৩) আমেরিকার নিউইয়র্কে রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদঃ

(৪) নামিবিয়ায় আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদঃ

(৫) ইংল্যান্ডে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদঃ

(৬) আলবেনিয়ায় আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

(৭) তুরষ্কের ইস্তানবুলে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে জনতার প্রতিবাদঃ

(৮) রুয়ান্ডায় যুদ্ধাপরাধের রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদঃ

(৯) আমেরিকায় বসবাসরত ক্রোয়েশিনরা ICTY কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেঃ

(১০) কাশ্মীরে আদালতের রায় নিয়ে বিক্ষোভঃ

(১১) কানাডায় আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে জনতার বিক্ষোভঃ

উপরের এই উদাহরণগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই উদাহরণগুলোর মাধ্যমে একটি ব্যাপার অত্যন্ত স্পষ্ট যে পৃথিবীর প্রতিটি সভ্য দেশেই আসলে মতামত প্রকাশকে কিংবা বাক স্বাধীনতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথেই বিবেচনা করা হয়। আদালত আইন অনুযায়ী তার রায় দিবে, তার কথা বলবে। জনতার সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে এই রায় নিয়ে তার নিজের পারসেপশান, নিজের দৃষ্টিভঙ্গি, নিজের বক্তব্য কিংবা নিজের মতামতকে তুলে ধরবার। এই প্র্যাকটিস সর্বজনীন। উপরের এই উদাহরণ গুলোই আসলে বলে দেয় সেই অধিকারের কথা ও ধারার কথা।

শেষ কথাঃ

আইন অবশ্যই তাঁর নিজের কেন্দ্রে নিজের মত কথা বলে। সে কথা বলায় আইন-ই হয়তবা একমাত্র মূল টুলস হিসেবে উপস্থিত হয়। এইক্ষেত্রে বিচারকেরা আইনের পাশাপাশি বিচার করেন কিংবা করতে পারেন অপরাধের ব্যাপ্তি, তৎকালীন সমাজ ব্যাবস্থা, সারকমাস্টেন্স, ব্যাক্তির মানসিক অবস্থান অনেক কিছুই। আইন তার নিজের গতিতে চলবে, নিজের মত চলবে এতে বলবার কিছুই নেই। কিন্তু শাহবাগের এই আন্দোলনও কিন্তু আইনের বাইরের কোনো ধারনা নয়। আমাদের সংবিধানের আলোচ্য সবগুলো অনুচ্ছেদ সমর্থন করেই এই শাহবাগের আন্দোলনকর যেটি উপরে বিস্তারিত আলোচিত করেছি। বাক স্বাধীনতা, মত প্রকাশের সর্বোচ্চ সুযোগ আমাদের সংবিধান রক্ষা করেছে তার জনতার জন্য, তার নাগরিকের জন্য। যেই ৩০ লক্ষ কিংবা তারো অধিক স্বজন হারাবার ইতিহাস কিংবা ৪ লক্ষ বা তারো বেশী মা, বোন আর শিশুদের নির্যাতনের কালো অধ্যায় সেটি কখনোই কোনো কন্ট্রাডিকশান কিংবা ভুল সিদ্ধান্তের কাছে পরাজিত হয়ে বাঙালীর বলবার স্বাধীনতাকে কেবলমাত্র বৈধ বা অবৈধ দুইটি আপেক্ষিক ধারনা দিয়ে বিলীন করে দিতে পারে না। আগেই বলেছি আইনের জন্য মানুষ বাঁচে না, বাঁচেনি কখনো। মানুষের জন্যই মূলত আইনের সৃষ্টি। সংবিধানে উল্লেখ্য যে আইনের শাষন, সামাজিক ন্যায়বিচার, সুশাষনের ধারনা রয়েছে এটি নিশ্চিত করাই আসলে শাহবাগের মূল মোটো এবং লক্ষ্য। শাহবাগের আন্দোলন আসলে বিচারকে কিংবা বিচারপতিকে প্রভাবিত করেনি, আদালতকেও অবমাননাও করেনি বরং আদালতের সার্বিক মান এবং সংবিধান ভিত্তিক সর্বোচ্চ অধিকার রক্ষার এক অভূতপূর্ব আন্দোলন যা আদালতকে বরং আরো বেশী সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে, এর মানকে উচ্চ শিখরে ধরে নিয়ে যেতেই সাহায্য করেছে।

উপরে আমার বলা সকল বক্তব্য, প্রদত্ত যুক্তি আর উদাহরণ এই কথাকেই সমর্থন করে বলে আমার বিশ্বাস। শাহবাগ আন্দোলন অবৈধ বলা সঙ্গায়িত করা মানে দেশের সংবিধানের প্রদত্ত ক্ষমতাকে অবৈধ বলে অভিহিত করা আর জনতার বলবার অধিকারকে অন্যায়ভাবে কটাক্ষ করবার এক কদর্য প্রচেষ্টা মাত্র।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

পরে পড়ব প্রিয়তে নিলাম ।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

এই সময়ে এই পোষ্টটার খুব দরকার ছিল।

______________________________________________________________________
স্বাক্ষরঃ দিশাহারা লালে লাল।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

এক্কেরে বরাবর। অনেকদিন ধরে এইরকম একটা লেখার অপেক্ষায় ছিলাম। বিশাল কইরা থ্যাঙ্কু


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

পোষ্ট স্টিকি করা হোক!

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>
Only constant is change


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

আইনের ছাত্র না হলেও অন্তত একথা সবাই জানে যে, যে কোন বিচারাধীন মামলা এককভাবে আদালতের একান্ত নিজস্ব বিষয়। বিচারের রায় নিয়ে কোন আপত্তি থাকলে এর বিরুদ্ধে আপিল করা যেতে পারে কিন্তু এর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেয়া ,বিচারকে প্রভাবিত করতে চাওয়া বা ইচ্ছামাফিক রায় চাওয়াটা আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়ে।আপনি বিভিন্ন দেশের আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে জনতার বিক্ষোভের কথা তুলে ধরেছেন। আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে যেয়ে আদালত অবমাননায় যখন জনতা রাস্তায় নেমে আসে, সেটা কিন্তু তখন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন বলা যায়। অর্থাৎ জনগনের সরকার পরিচালিত বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা নেই।বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এই ধরনের আন্দোলনকে হয় দমানো হয় নতুবা সরকারের পতন ঘটে।

শাহবাগ আন্দোলন শুরু হয়েছিল অনেকটা এই প্রক্রিয়ায়।অর্থাৎ সরকার পরিচালিত আদালতের অনায্য রায়ের বিরুদ্ধে তরুন প্রজন্ম রাস্তায় নেমেছিল।কিন্তু পরবর্তীতে এই আন্দোলন যে তামাশায় পরিনত হয়, পৃথীবির কোন আইন বা কোন দৃষ্টান্ত দিয়েই তা বৈধ করা যাবে না। কেন সে ব্যখ্যা মনে হয় নিস্প্রয়োজন ।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

@দাড়কাক, তুই আসলেই একটা ফালতু, প্রথমে আন্দোলনের অসারতা নিয়া ইতং বিতং কইলি, শেষে আইস্যা চিরাচরিত ল্যাদানী দিলি। দূরে গিয়া মর।

----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
ন্যায় আর অন্যায়ের মাঝখানে নিরপেক্ষ অবস্থান মানে অন্যায়কে সমর্থন করা।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

দাঁড়কাক, আপ্নি যে ব্যাপারটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সেটির উত্তর আমি এক্টা আলাদা হেডিং "এক্টি প্রদত্ত রায়কে চ্যালেঞ্জ করা বা পাল্টাতে বলা কি অবৈধ?" এ খুব ক্লিয়ারলি লিখেছি বিশদ। ভালো করে লেখাটি পড়লেই দেখতে পাবেন।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

অত্যন্ত সময়োপযোগি এবং প্রাসঙ্গিক আলোচনা। পোস্ট স্টিকি করার দাবি থাকল।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

মানবতাই শেষ মাপকাঠি।

মোহাম্মদ নাসের


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

Star Star Star Star

--

রীতু
"আমার মুক্তি আলোয় আলোয়, এই আকাশে। আমার মুক্তি ধুলায় ধুলায়, ঘাসে ঘাসে.."


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

আইনের মারপ্যচের ব্যাপারগুলো সরল -সাবলীল ভাবে তুলে ধরার জন্য ধন্যবাদ ,খুবই সময় উপযোগী পোষ্ট ।
ধন্যবাদ দাদা

---------------------------------------------------------------------------------------------
রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি বাংলাদেশের নাম ,মুক্তি ছাড়া তুচ্ছ মোদের এই জীবনের দাম।।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

সম্পূর্ণ একমত, ধন্যবাদ। তারপরেও, বাড়তি কিছু ব্যখ্যা জানার জন্য আমার পর্যবেক্ষনটা লিখছি।

আদালতে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলি (১টি বাদে) প্রমানিত হয়েছে। অর্থাৎ, অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী। এখন প্রশ্ন হলো, এই দোষী ব্যক্তি কি পরিমান সাজা পাবে। আমার দৃষ্টিতে, this is a question of calibration. আইন প্রণয়নের সময়ই আইন প্রণেতা প্রমানিত দোষের উপর ভিত্তি করে একটা শাস্তি নির্ধারণ করে দেন। পাশাপাশি আইনে বোধহয় এমনও বলা হয় যে, এই অভিযোগ প্রমানিত হলে দোষী ব্যক্তির সর্বোচ্চ ‘xyz’ এবং সর্বনিন্ম ‘pqr’ পরিমান সাজা হতে পারে। এর মাধ্যমে, আইন প্রণেতা সর্বোচ্চ ও সর্বনিন্ম শাস্তির এক পরিধি’র মধ্যে বিচারককে তার বিবেচনা কাজে লাগানোর স্বাধীনতা ছেড়ে দিলেন।

সহজেই অনুমেয়, সাজার পরিমান জনগনের আশানুরূপ না হলে জনগন তো তার দাবী জানবেই। এটা যৌক্তিক, তার ব্যখ্যা মূল লেখায় এসেছ। বাড়তি ব্যখ্যা দরকার দুইটি:
১) বিচারক কিসের ভিত্তিতে এই সর্বোচ্চ ও সর্বনিন্ম সাজার মধ্যে একটি বেছে নেন?
২) আইন প্রণেতা এতবড় অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ও সর্বনিন্ম সাজার যে পরিধি এঁকে দিলেন, তাতে সর্বনিন্ম শাস্তি কি জনগনের আশানুরূপ? এই প্রশ্নের উত্তর আমরা জানি। তাহলে, সর্বিনিন্ম সাজার মাত্রা re-calibrate করতে আমরা দাবী করছি না কেন? মূল আইনটিই তো retrospective. তাহলে re-calibration এ বাধা কোথায়?


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

লেখাটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি লেখা। যেখানে আইন ও যুক্তির জোরগুলো জানতে পারা যায়, সেখানে অপপ্রচার ঠেকানোর কাজটা সহজ হয়ে পড়ে। এমন কাজগুলি অবশ্যই ইংরাজি ভাসায় ভাষান্তরিত করা উচিৎ এবং আরও বেশি টুইট করা উচিৎ।

নিঝুম দা, কি বলেন?

পশু তখনই রাজত্ব করে, যখন মানুষ ঘুমায়।

glqxz9283 sfy39587p07