Skip to content

১৪ ফেব্রুয়ারী ছাত্রসমাজের রক্তে গড়া উজ্জ্বল দিন- “স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস”:

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

১৪ ফেব্রুয়ারি সামরিক স্বৈরাচার, পাকিস্তান ফেরত পাকি কোলাবরেটর, ঘাতক হু মু এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের এক অগ্নিঝরা দিন। ১৯৮৩ সালের এই দিনে সামরিক স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে সূচিত হয়েছিল প্রথম বড় ধরনের আন্দোলন। ৮০’র দশক জুড়ে এই দিনটি পালিত হয়ে আসছিল-‘‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’’ হিসেবে। অথচ ১৯৯২ সালে ছাত্র সমাজের আত্মত্যাগের গৌরবোজ্জ্বল সফল আন্দোলনের এই দিবসটিকে ভালোবাসা দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে এগিয়ে আসে কর্পোরেট পুঁজির দালাল, যায় যায় দিন পত্রিকার সম্পাদক সাংবাদিক শফিক রেহমান; এই অবিস্মরণীয় দিবস ভুলে লাল গোলাপ হাতে দেশবাসীকে আহ্বান জানায়- ভালোবাসার নামে উচ্ছৃঙ্খল নোংরামীতে মাতোয়ারা হতে। এরপর থেকেই শুরু হয়ে গেলো ইউরোপীয় ঢং-এ ভালোবাসা দিবস বা ‘Valentine’s Day’র নামে পাগলামী।
আমাদের কাছে অাজ মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে- রক্তস্নাত ইতিহাস কী গোলাপ দিয়ে মুছে ফেলা যায়? না। কর্পোরেট কালচার সমস্ত প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে ভ্যালেন্টাইনের জোয়ারে ভাসিয়ে দিলেও শহীদের নামেই রক্তের অক্ষরে লেখা থাকবে ১৪ ফেব্রুয়ারী- “স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস”।
মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানে অবস্থানরত লে. জেনারেল হু মু এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের ক্ষমতা দখল করে নিয়ে সামরিক শাসন জারী করে। ঘোষণা দেয়-
"আমি লেফটেন্যান্ট জেনারেল হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ, সর্বশক্তিমান আল্লাহর সাহায্য ও করুণায় এবং আমাদের মহান দেশপ্রেমিক জনগণের দোয়ায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসাবে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ বুধবার থেকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সকল ও পূর্ণ ক্ষমতা গ্রহণ করছি এবং ঘোষণা করছি যে গোটা বাংলাদেশ অবিলম্বে সামরিক আইনের আওতায় আসবে। প্রধাণ সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে আমি বাংলাদেশের সকল সশস্ত্র বাহিনীর পূর্ণ ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করছি।" শুরু হয় সামরিক স্বৈরশাসন। ছাত্রসমাজ সামরিক স্বৈরশাসনের বিরোধীতা করে। শুরু হয় স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম পোস্টার লাগাতে গিয়ে ২৪ শে মার্চেই গ্রেফতার ও সাত বছরের সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হন ছাত্রনেতা শিবলী কাইয়ুম, হাবিবুর রহমান ও আব্দুল আলী। এরপর ২৬ শে মার্চ স্বাধীনতা দিবসে সাভার স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিতে গিয়ে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের নেতারা সামরিক স্বৈরাচার সরকারের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠে শ্লোগান দেয়। সেনাবাহিনী স্মৃতিসৌধেই ছাত্রদের ওপর চালায় নির্মম নির্যাতন।
সামরিক সরকারের শিক্ষামন্ত্রী জ্ঞানপাপী মজিদ খান নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে। শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই বাংলার সাথে ইংরেজী ও আরবি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। ধর্মকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করাই ছিল উদ্দেশ্য। ১৯৮২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবসে এই শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে ছাত্র সংগঠনগুলো ঐক্যমত্যে পৌঁছে। ২১ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এবং তারা শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে গণস্বাক্ষরতা অভিযান ও সারাদেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জনমত তৈরির কাজ চালায়। এই আন্দোলনকে প্রতিহত করার জন্য ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি খন্দকার মোহাম্মদ ফারুককে গ্রেফতার করলে প্রতিবাদে ছাত্ররা ২৭ ও ২৮ জানুয়ারি ছাত্র ধর্মঘট পালন করে। এবার ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি হাতে নেয়। দিনটি ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩। কে জানত বসন্তের আগুনরাঙা রঙের সঙ্গে মিশে যাবে ছাত্রদের রক্ত।
১৪ ফেব্রুয়ারী’ ১৯৮৩। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচীতে সকাল থেকেই হাজার হাজার ছাত্র ছাত্রী সমবেত হতে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করে অংশ নেয় জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও। শিক্ষানীতি বাতিল এবং সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মুহুর্মুহু শ্লোগানে কম্পিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় ও আসে পাশের এলাকা। এক পর্যায়ে কয়েক হাজার ছাত্র ছাত্রীর একটি মিছিল স্মারকলিপি প্রদান করতে ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে সচিবালয়ের দিকে এগিয়ে যায়। মিছিলটি হাইকোর্টের গেট থেকে বাংলা একাডেমী পর্যন্ত দীর্ঘ হয়েছিল। মিছিলটি যখন হাইকোর্ট এলাকায় পৌঁছে ঠিক তখনই আগে থেকেই অবস্থান নিয়ে থাকা পুলিশ বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য মিছিলে হামলা করে। নিরস্ত্র ছাত্রছাত্রীদের ওপর পুলিশ লাঠি, টিয়ারগ্যাস, জল কামান ব্যবহার করেই ক্ষান্ত হয়নি, গুলিও চালায়। গোটা এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। গুলিবিদ্ধ হয় জয়নাল। এরপর গুলিবিদ্ধ জয়নালকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গেলে জয়নালকে মৃত ঘোষণা করার পর আরো ফুসে উঠে ছাত্ররা। এক পর্যায়ে ছাত্ররা আশ্রয় নেয় শিশু একাডেমীতে সেখানে তখন শিশুদের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছিলো। অস্ত্র হাতে পুলিশ সেখানেও ঢুকে যায়। কোমল মতি শিশুরাও সেদিন রক্ষা পায়নি স্বৈরাচার এরশাদের পেটোয়া বাহিনীর হাত থেকে। শিশু একাডেমীর এক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আসা শিশু দিপালীও গুলিবিদ্ধ হয় এবং পুলিশ তার লাশ গুম করে ফেলে। সেখানে ছাত্র, শিশু ও অভিভাবকদের ওপর চলে নির্মম নির্যাতন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ নিহত ও আহত মানুষদের এম্বুলেন্স পাঠিয়ে নিয়ে আসতে চাইলে ঢুকতে দেয়নি খুনী বাহিনী। প্রায় সারা দিনব্যাপী সংঘর্ষে জাফর, জয়নাল, দীপালী সাহা, আইয়ুব, ফারুক, কাঞ্চনসহ শহীদ হন দশজন, আহত হন কয়েকশত ছাত্র। কিন্তু সরকারি প্রেসনোটে মাত্র ১ জনের মৃত্যুর কথা দাবী করা হয়।
এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে পরদিন, অর্থাৎ ১৫ ফেব্রুয়ারি ছাত্রজনতা রাস্তায় নেমে আসে। সংঘর্ষ হয় মিরপুর, আমতলী, তেজগাঁ, বাহাদুর শাহ পার্ক, ইংলিশ রোড, মতিঝিল এবং অবশ্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। শুধু ঢাকাতেই না, আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। পুলিশ গুলি চালায়। চট্টগ্রামে নিহত হন মোজাম্মেলসহ আরো কয়েকজন। যদিও এদিনও সরকারী প্রেসনোটে নিহতের সংখ্যা ১জন দাবী করা হয়। ভীত সন্ত্রস্ত জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকার কর্তৃক অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় জাহাঙ্গীরনগর ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় । ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা ও চট্টগ্রামের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে। এদিন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে গত দুই দিনে শহীদদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয় দেশব্যাপী।
সামরিক স্বৈরাচার কর্তৃক সংবাদপত্রের ওপর এতই কড়াকড়ি ভাবে সেন্সরশিপ আরোপ করা হয় যে, এই বিক্ষোভ এবং ছাত্র হত্যার ঘটনার বিষয়ে পরদিন কোনো পত্রিকা সরকারের প্রেসনোটের বাইরে অন্য কোনো খবর প্রকাশ করতে পারেনি। ১৪ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সারাদেশে প্রচুর গ্রেফতার অভিযান চলে। আন্দোলনকে দমাতে ড. কামাল, শেখ হাসিনা, মতিয়া চৌধুরী, রাশেদ খান মেনন, আব্দুল জলিল, কর্নেল অলি, তোফায়েল আহমেদ, আব্দুল মান্নান, আব্দুস সামাদ আজাদসহ অসংখ্য রাজনৈতিক নেতা ও শীর্ষস্থানীয় প্রায় সকল ছাত্রনেতাকে গ্রেফতার করা হয়। তারপরও স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের সকল দমন নীতি উপেক্ষা করে অব্যাহত থাকে আন্দোলন। ছাত্র আন্দোলন রূপান্তরিত হয় গণআন্দোলনে। শেষপর্যন্ত আন্দোলনের তীব্রতার কাছেই নতি স্বীকার করতে হয় সামরিক স্বৈরাচারকে।
অবশেষে ১৭ ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচারী এরশাদ বলতে বাধ্য হয় - ‘‘জনগণের রায় ছাড়া শিক্ষা সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।’’ গ্রেফতারকৃত ১২২১ জনকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয় এক সরকারি প্রেসনোটে। সফল পরিসমাপ্তি ঘটে জেনারেল এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র সমাজের প্রথম আন্দোলনের। এর থেকে অনুপ্রাণিত হয় রাজনৈতিক দলগুলো। এরশাদ বিরোধী গণআন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে মূলত '৮৩ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারীর আন্দোলন থেকেই। এদেশে সেদিন সামরিক শাসনের ভীত কাঁপিয়ে দেয় সাধারণ নিরস্ত্র ছাত্র সমাজ। ধীরে ধীরে যা গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং সবশেষে ১৯৯০ সালে স্বৈরশাসক এরশাদের পতন ঘটে। বস্তুতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের পর মধ্য ফেব্রুয়ারীর এই আন্দোলনই ছিল বাংলাদেশের প্রথম গণ আন্দোলন যা থামেনি বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত।
এই গৌরবগাঁথা ইতিহাসকে ভুলে অপসংস্কৃতির জোয়ারে গা না ভাসিয়ে, আসুন আমরা প্রকৃত ইতিহাস জানি।
“স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসে” জাফর, জয়নাল, দীপালী, কাঞ্চন, আইয়ুব, মোজাম্মেল, ফারুক সহ সেইসব শহীদদের প্রতি অফুরান ভালোবাসা যাঁরা নিজেদের জীবন দিয়ে ভালবেসে ছিল ভবিষ্যত সুন্দরকে।।

glqxz9283 sfy39587p07