Skip to content

অভিজিৎ হত্যার ঠিক ৬ মাস পর - ব্লগওয়াচ

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

গত ২৬ সে ফেব্রুয়ারী অভিজিৎ রায় কে জঙ্গিরা কুপিয়ে হত্যা করেছে এই সংবাদটি যেমন বাঙালি মুক্ত চিন্তার মানুষকে ভীষণ ভাবে নাড়া দিয়েছে তেমনি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও খবরটি নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ বলেই প্রমানিত হলো। আর বাঙালিদের দুর্ভাগ্য যে একজন বড় মাপের বিজ্ঞান ভিত্তিক দার্শনিককে হারাতে হলো। অভিজিতের জীবদ্দশায় মাঝে মধ্যেই তাঁর লেখা পড়েছি বটে কিন্তু ইদানিং তার বিজ্ঞান ভিত্তিক দার্শনিক লেখার বিশ্লেসন গুলো পড়ে, ব্যাক্তি অভিজিৎকে একজন অস্তিত্ববাদী দার্শনিক হিসেবেই দেখতে হবে।


অভিজিৎ রায় এর শেষ ব্লগ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫
- কেন কোনো কিছু না থাকার বদলে কিছু আছে? (Why there is something rather than nothing?) এই শিরোনামে লিখছেন:
"প্রথম কবে এ প্রশ্নটির মুখোমুখি হয়েছিলাম তা আজ মনে নেই। সম্ভবত: জঁ-পল সাত্রের (১৯০৫- ১৯৮০) অস্তিত্ববাদী দর্শন ‘বিয়িং এণ্ড নাথিংনেস’ কিংবা জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগারের (১৮৮৯ -১৯৭৬) অধিপদার্থবিদ্যা বিষয়ক বই ‘ইন্ট্রোডাকশন টু মেটাফিজিক্স’ পড়তে গিয়ে। শেষোক্ত বইটির প্রথম লাইনটিই ছিল – ‘হোয়াই দেয়ার ইজ সামথিং র্যা দার দেন নাথিং?’। তারপর থেকে বহু বইয়ে, অসংখ্য জায়গাতেই এর উপস্থিতি টের পেয়েছি। দার্শনিক উইলিয়াম জেমস (১৮৪২ – ১৯১০) তার ‘সাম প্রবলেমস অব ফিলসফি’ গ্রন্থে এ প্রশ্নটিকে চিহ্নিত করেছিলেন ‘অন্ধকারতম দর্শন’ হিসেবে। জ্যোতির্পদার্থবিদ স্যার আর্থার বার্নার্ড লোভেল (১৯১৩ – ২০১২) একে দেখেছেন ‘ব্যক্তির মনকে ছিন্ন ভিন্ন করা’ প্রশ্ন হিসেবে। সত্যিই তো – এই যে বিশাল মহাবিশ্ব আর এই বস্তুজগৎ, এতো সবকিছুর বদলে যদি কিছুই না থাকতো – কীই বা ক্ষতি হতো? আর কেনই বা কোনো কিছু না থাকার বদলে এতো কিছু আছে? বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ।"
এই আলোচনা থেকে অভিজিৎকে কোনভাবেই ধর্ম বিদ্দেশী তো নই বরং বিশ্লেষণ ভিত্তিক মহাবিশ্বের সূচনা অন্বেষণ এর পথিকৃত হিসেবেই দেখতে হবে। অন্য এক ব্লগার অভিজিতের লেখার নিচে খুব ছোট্ট একটা মন্তব্য করেছে - "কার জন্য লিখলেন অভিজিৎ দা, কাদের জন্য লিখতেন? এই দেশ, এই বইমেলা সব শেষ করে দিলো। আপনার লেখায় অমর আর অজেয় থাকুন দাদা। বাঙলাদেশের মানুষ আরো ১০০ বছর পর বুঝবে আমরা কাকে হারিয়েছি।"

তাহলে সত্যিই কি বাঙালিরা এক নয়া সক্রেটিস অভিজিৎ রায় কে হারালো? গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস আর তার হেমলক পানের কথা কে না জানে। এথেনীয় সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ ক্ষমতার যুগ থেকে পেলোনেশিয় যুদ্ধে স্পার্টা ও তার মিত্রবাহিনীর কাছে হেরে যাওয়া পর্যন্ত পুরো সময়টাই সক্রেটিস বেঁচে ছিলেন। পরাজয়ের গ্লানি ভুলে এথেন্স যখন পুনরায় স্থিত হওয়ার চেষ্টা করছিল তখনই সেখানকার জনগণ সেখানকার গণতন্ত্রের সঠিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু করেছিল। সক্রেটিসও সেই তথাকথিত গণতন্ত্রের একজন সমালোচক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এথেনীয় সরকার সক্রেটিসকে এমন দোষে দোষী বলে সাব্যস্ত করেছিল যাতে তার মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হতে পারে। কিন্তু তার গুণাবলী ও সত্যের প্রতি অটল মনোভাব সত্যিকার অর্থেই তৎকালীন সরকারী নীতি ও সমাজের সাথে সংঘর্ষ সৃষ্টিতে সমর্থ হয়েছিল। ঐতিহাসিকভাবে তৎকালীন ক্ষমতাসীন সমাজের চোখে তার সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল সামাজিক ও নৈতিক ক্ষেত্রসমূহ নিয়ে তার তীব্র সমালোচনা। প্লেটোর মতে সক্রেটিস সরকারের জন্য একটি বিষফোঁড়ার কাজ করেছিলেন যার মূলে ছিল বিচার ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা ও ভাল কিছুর উদ্দেশ্য নিয়ে সমালোচনা। এথেনীয়দের সুবিচারের প্রতি নিষ্ঠা বাড়ানোর চেষ্টাকেই তার শাস্তির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। তৎকালীন শাসকদের সাজানো বিচারে খ্রীষ্টপূর্ব ৩৯৯ সালে তাঁকে হেমলক বিষ খেতে বাধ্য করে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।
ত্রিপুরা থেকে সুদীপ নাথ লিখেছেন -
"১৬০০ শতাব্দির ১৭ই ফেব্রুয়ারি, একজন ইতালিয় দার্শনিক, ধর্মযাজক ও বিশ্বতত্ত্ব বিশারদ জিয়োনার্দো ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। ব্রুনোর দোষ ছিল তিনি কোপার্নিকাসের তত্ব সমর্থন করেছিলেন। পৃথিবী যে সূর্যের চারদিকে ঘোরছে সেই বক্তব্য সমর্থন করে প্রবন্ধ লিখেছিলেন। ধর্মীয় যাজকেরা তার এই কাজ মেনে নিতে পারেনি। প্রচলিত ধর্মমতের বিরোধিতার অপরাধে তাকে পুড়িয়ে মারা হয়। সে সময় রাজার সাথে গীর্জার বিরোধ খুব একটা জমে উঠেনি এবং পার্লামেন্টের সাথে রাজার বিরোধের সূচনাই হয়নি। প্রোটেষ্টান্ট ধর্মের উত্থান ঘটছিল এবং ক্যাথলিক চার্চ সমাজে নিজেদের প্রভাব রক্ষার করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। ব্রুনো বিজ্ঞান, দর্শন এবং যুক্তিবাদ নিয়ে এমন সব চিন্তা করেছিলেন যা বিংশ শতাব্দীতে এসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।"
আর বাঙালিরা হারালো অভিজিৎকে। ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৫ তে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দুর্বৃত্তের হামলার শিকার হন ব্লগার অভিজিৎ রায় এবং তাঁর স্ত্রী রাফিদা বন্যা আহমেদ৷
বাংলাদেশে একের পর এক ব্লগার হত্যাকাণ্ডের বিচারের ক্ষেত্রে ‘প্রধানমন্ত্রীর আচরণ’ প্রশ্নবিদ্ধ বলে মন্তব্য করেছেন প্রবাসী ব্লগার ওমর ফারুক লুক্স।
খোদ জার্মানিতে বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের প্রাণনাশের হুমকির মুখে থাকা এই স্যাকুলার ব্লগার নিউজনেক্সটবিডি ডটকম’কে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। মুক্তমনা ব্লগার দম্পতি ওমর ফারুক লুক্স ও ফারজানা কবির স্নিগ্ধা এখন রয়েছেন সার্বক্ষণিক জার্মান পুলিশের পাহারায়।
ওমর ফারুক লুক্স বলেন, ‘বাংলাদেশে একের পর এক ব্লগার খুনের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর আচরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং প্রশ্নবোধক। অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর বাবু এবং অনন্ত বিজয় দাশ খুন হবার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কিংবা তার সরকারের পক্ষ থেকে কোন বিবৃতি দেয়া হয়নি, নিহত ব্লগারদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো হয়নি, এমনকি খুনীদের গ্রেফতারের ব্যাপারেও সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে কোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা বা তৎপরতা দেখা যায়নি। উপরন্তু, অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী পুত্রের বক্তব্যে একের পর এক ব্লগার হত্যায় সরকারের সমর্থন এবং মৌলবাদীদেরকে উৎসাহ প্রদানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।’
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেন, ‘একের পর এক ব্লগার হত্যা, এবং খুনীদেরকে গ্রেফতারে সরকারের ব্যর্থতা বা বিচারহীনতার সংস্কৃতি অবশ্যই দেশের মানুষের মুক্তচিন্তা এবং জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে ভয়ঙ্কর হুমকিতে ফেলেছে। তার ওপরে আইসিটির ৫৭ ধারার মতো একটি ব্লাসফেমি আইন জারি করে সরকার একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষের চিন্তার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করে দিয়েছে। অথচ আমরা জানি, জনগণের মুক্তচিন্তা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকারই গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পূর্ব শর্ত।
আজ ৬ মাস পার হয়ে গেল অভিজিত হত্যার পরে, সরকার আজ পর্যন্ত খুনি দেরকে চিন্হিত করতে পারলনা।
সুদীপ নাথ লিখেছেন -"আমাদের প্রিয় সহযোদ্ধা, বন্ধু, বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ডঃ অভিজিৎ রায়ের প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে আমরাও মরণোত্তর দেহদানের অঙ্গীকারে শামিল হই। এতে ধর্মীয় জঙ্গিদের হাতে অকাল প্রয়াত সহযোদ্ধার প্রতি কিঞ্চিত প্রকৃত শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা যাবে”।

মুক্তচিন্তার কবি অরূপ বাউল লিখেছেনঃ-
“শক্ত হাতে কাঁপিয়ে দেবো মৌলবাদের ভিত
ঘরে ঘরে জন্মেছে আজ হাজার অভিজিৎ”।

অভিজিৎ রায় এর লেখা এপর্যন্ত ১০ খানা বই প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলোর নাম নীচে দেয়া গেলঃ-

১। আলো হাতে চলছে আঁধারের যাত্রী
২। মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে
৩। সতন্ত্র ভাবনা : মুক্তচিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি
৪। অবিশ্বাসের দর্শন
৫ বিশ্বাসের ভাইরাস
৬। ভালোবাসা কারে কয়
৭। সমকামিতা: বৈজ্ঞানিক সমাজ-মনস্তাত্তিক অনুসন্ধান
৮। শুন্য থেকে মহাবিশ্ব
৯। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো : এক রবি বিদেশিনীর খোঁজে
১০। বিশ্বাস ও বিজ্ঞান
(সূত্রঃ ইন্টারনেটের বিভিন্ন ব্লগ, সাইট এবং ফেইসবুক)


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

লেখাটি খুব ভাল লাগলো।

একটি সম্পূরক সংবাদ-


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

অভিজিৎ রায় এর শেষ ব্লগ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ - পড়ুন এখানে> http://ajkerbangla.com/details.php?id=2443&pageName=9

===
"আমার সেই গল্পটা এখনো শেষ হয়নি, শোনো।পাহাড়টা, আগেই বলেছি ভালোবেসেছিল মেঘকে - আর মেঘ, কী ভাবে শুকনো খটখটে পাহাড়টাকে বানিয়ে তুলেছিল ছাব্বিশ বছরের ছোকরা সে তো আগেই শুনেছো। সেদিন ছিল পাহাড়টার জন্মদিন, পাহাড় মেঘেকে বললে; আজ তুমি লাল.শাড়ি পরে আসবে"

glqxz9283 sfy39587p07