Skip to content

আবু হাসান শাহরিয়ার : বিচ্ছুসঙ্গলিপ্সু এক উন্নত প্রজাতির গোঁয়ার

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

আবুকে আমি চিনতাম না। চেনার কোনো কারণও ছিল না। পনেরোর প্রথমদিকে দেড় হাত লম্বা নামের এই চিজটাকে আমার ফেইসবুকের বন্ধুতালিকায় আবিষ্কার করলাম। বনজ গোটার মতো অচেনা নামটার নিচে গিয়ে আমিই টোকা দিয়েছিলাম, ভুল দরোজায় টোকা। তাঁর সময়রেখা ঘুরে দু-চারটা স্ট্যাটাস দেখে তখনই দেমাগের গন্ধ পেয়েছিলাম। কয়েকদিন গেলে তিনি আমার একটা স্ট্যাটাসে মন্তব্য করেছিলেন, কী বলেছিলেন মনে নেই, শুধু মনে আছে আমাকে তুমি ক’রে বলেছিলেন। এমনি কয়েকটা মন্তব্য পাওয়ার পর তাঁর দিকে একটু দৃষ্টি রাখতাম, দেখতাম শুধু বাহাদুরি। শামসুর রাহমানের সঙ্গে তোলা নিজের ছবিগুলি ঘনঘন প্রদর্শন করতেন, আর কোন কোন বড়লাটের সঙ্গে তাঁর দহরম-মহরম, কোথায় কয় আঁটি ছিঁড়েছেন এসব প্রচার করতেন, যেমন এখনো করেন। বুঝলাম তিনি একজন ছিঁচকে লেখক। তাঁর লেখায় দেখেছি বানানভুল কম, ভাষাদূষকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার দেখে কিছুটা ভালো লেগেছিল। একদিন দেখি বার্তা পাঠিয়েছেন, “প্রিয় অনুপম, তোমাকে নিয়ে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছি। সময় হলে পড়ো। সেখানে... শুভেচ্ছা।” কয়েকবার আমার প্রশংসা ক’রে স্ট্যাটাস লিখলেন, বেশ পিঠ চাপড়িয়ে দিলেন। আরেকদিন তাঁর উঠোনে আমার ছবি টানিয়ে নিমন্ত্রণ করলেন, যেন তাঁর আকাশবাড়িতে যাই; এও বললেন, যেন উপেক্ষা না করি। উপেক্ষাই করেছি। গেল কিছুদিন। ধীরে ধীরে মূর্ত হ’তে থাকল তাঁর আপাত-গোপন চেহারা, দেখি তিনি তরুণ লেখকদের নাক-কান কেটে ফেলছেন। ফেইসবুকে ব’সে তাঁর একমাত্র কাজ হয়ে গেল একে কটাক্ষ করা ওকে তাচ্ছিল্য করা। কাদা-ছোড়াছুড়ি তাঁর প্রিয় খেলা, তিনবেলা ভাত খাওয়ার মতো গান তাঁর জাতীয় সঙ্গীত খিস্তি। অবন্ধু করতে ইচ্ছে হয়েছিল, পরিত্যক্ত আসবাবের মতো তবু রেখে দিয়েছিলাম ভাঁড়ামি আরো কিছু দেখার জন্যে। ষোলোয় এসে কী একটা বিবৃতিতে স্রেফ দ্বিমত হয়েছিলাম, তাতেই ব্লক মেরে দিলেন।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, আবু নিজেকে প্রথম সারির কবি মনে করেন। তাঁর বেশ কয়েকটা কবিতাসদৃশ রচনা চোখে পড়েছে, শুধু আকারে কবিতার মতো, এমন কোনো অনিবার্য ভাব বা চিত্রকল্প নেই যে এগুলিকে উৎকৃষ্ট কবিতা বলা যেতে পারে। কেবল বর্ণনা ও বিষয়বস্তু ও শব্দের অপচয়, স্থানে-স্থানে আছাড় খাওয়ার দাগ স্পষ্ট, কবিতাপাড়ায় সদ্য অভিষেক ঘটা বালকের মতো। তাতে কী, শূন্যের যে আড়ম্বর বেশি। পুঁজি না থাকলেও কয়টা যেন বই বেরিয়েছে তাঁর, শামসুর রাহমানের নাম বেচে ও কলকাতার ছ্যাঁচড়াদের কলকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি ক’রে মুখে কবিতা-কবিতা ক’রে ফেনা তুলে এক পশলা স্বীকৃতি আদায় ক’রে নিয়েছেন, তাঁর অবশ্য স্বীকৃতি দরকার। শামসুর রাহমান নিজের একটা বইয়ের উৎসর্গপত্রে লিখেছেন: প্রকৃত কবি, সাহসী গদ্যকার এবং বিরল সম্পাদক আবু হাসান শাহরিয়ারকে। হাস্যকর বচন। কবি, গদ্যকার, সম্পাদক— তিনটা শব্দেরই আগে তিনটা ফোলা বিশেষণ দেখে মনে হয়, দীর্ঘদিনের সাহচর্যে শামসুর রাহমান আবেগে গদগদ করতে করতে অন্ধ হয়ে এগুলি লাগিয়েছেন। ষোলোয় বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়ে আবুর নাসিকার দৈর্ঘ্য গেল বেড়ে, বাড়ল লাফালাফি। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, অ্যাকাডেমির মহাপরিচালক আবুর বাক্যবাণে জর্জরিত হয়ে “আগে কুত্তা সামলাই” ভেবে পুরস্কার দিয়ে ঠাণ্ডা করতে চেয়েছেন। তাঁর স্বমুখে বহুল উচ্চারিত মহার্ঘ টুকরো “স্লেটে লেখা নাম আমি মুছে যেতে আসি” শুনে কেউ হয়ত মনে মনে বলে, বাতাসেই মুছে যায় স্লেটে লেখা নাম, তুলো নিয়ে আসে তবু কিছু গাধারাম! ভাবগাম্ভীর্য ও দৌরাত্ম্য দেখে মনে হয়, বাঙলার তো বটেই, পশ্চিমা আধুনিক কবিদেরও বহু উপরে তাঁর স্থান। বহু আগেই তাঁকে নোবেল দেওয়া উচিত ছিল, এবং এটা যথার্থ সময় “শাহরিয়ার পদক” প্রবর্তন করার যা হবে নোবেলের চেয়ে বেশি জৌলুসপূর্ণ, দেওয়া হবে বিশেষত ইউরোপের সমকালের অগ্রগণ্য কবিদের, এটা পেয়ে তাঁরা নিজেদের ধন্য মনে করবেন। তাঁর কবিতার ডালে-ডালে শিল্পের কলা এত সুন্দরভাবে পেকেছে যে, এখন এগুলিকে আদৌ ফল মনে না করাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, এসব সমাজ ও মানসিকতার অনুকূল হ’তে শত বছর লাগবে, তখনকার বাদুড়গুলি কবিতার বাঁক-বদল দেখে নতুন গতিপথ পেয়ে শিহরিত হয়ে তাঁর হয়ে বহুকাল জাবর কাটবে, তিনি এমনই দূরদর্শী। হায় হায়, কথিত সতীত্ব হারানোর চেয়েও কম সময়ে আমি হারিয়ে ফেলেছি কবিত্ব, কেননা তিনি ব’লে রেখেছেন: আমাকে যে অস্বীকার করে প্রথমত অকবি সে!
অসংস্কৃত ভীমরুলটার শত্রু বাড়ছে জ্যামিতিক হারে, তাঁর নিন্দুকের সংখ্যা সিন্দুকের কয়েনের চেয়ে বেশি, ভালো লোকের শত্রু অবশ্য বেশিই থাকে। এত এত মানুষ কেন যে তাঁর নামে কুৎসা রটায়, তাঁর অজস্র ভালো কাজ দেখেও না দেখে শুধু ঘৃণা করে! লোকে খোঁচায় ব’লেই তো তিনি একটু চিল্লাচিল্লি করেন, এ আর এমন কী। আবুর কাছের কয়েকজন জানিয়েছেন, তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নকালে দেওয়ালে তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ছড়া লিখে তাড়া খেয়ে পড়াশোনা ত্যাগ ক’রে বখাটেজীবন শুরু করেন। একবার তাঁর সুন্দর আচরণে মুগ্ধ হয়ে যুগান্তরের এক ফটোগ্রাফার আদর ক’রে চেয়ারপেটা করেছিলেন, এবং, দৈনিক বাংলার নাসির আহমদের ড্রয়ার থেকে টাকা চুরির দায়ে নাকি রেজওয়ান সিদ্দিকী তাঁকে পত্রিকাটি থেকে বহিষ্কার ক’রে দিয়েছিলেন। এখন দিনদিন তাঁর হম্বিতম্বি বাড়ছে, দৃষ্টি আকর্ষণ ক’রে আলোচনায় থাকতে তিনি অবচেতনে হয়ত হস্তক্ষেপ বা পদক্ষেপ নিয়ে থাকেন। এই জমিদারের রয়েছে এক পাল পোষা কুকুর, যুক্তিতে হেরে গেলে এগুলি লেলিয়ে দেন। চাটুকারবেষ্টিত এই কিংবদন্তির অকালেই ভীমরতি ঘটেছে। তাঁর মতাদর্শে দ্বৈমত্য পোষণকারী সবাইকে পাঁঠা ব’লে সম্বোধন করেন, নিজের ঢোলে বাড়ি দিতে দিতে ফাটিয়ে ফেলেছেন ঢোলটা। আবু এখন অনাবশ্যক কথার নিরন্তর পুনরাবৃত্তি করছেন উন্মাদের মতো। আবুর চাটুকারবলয়ের বাইরের কেউ কেউ তাঁর জন্যে এক ছটাক উদ্বেগ বোধ করছেন। কেউ বলছেন আবুর বিকাশ ঘটে নি, আমার তো মনে হয় তাঁর বিকাশ ভালোই ঘটেছে, এই যেমন দেখা যাচ্ছে খিস্তির ফেরিঅলা পূর্ণবিকশিত আবুকে! তাঁর মগজে সম্ভবত কিছুটা পচন ধরেছে, এ রোগ দুশ্চিকিৎস্য। তবু একবার পাবনা পাঠিয়ে দেখা যেতে পারে কিছুতে কিছু হয় কি না, না হ’লে এক বদনা করুণা! আবু কীটকবলিত বলয়ের বাইরে বেরিয়ে কয়েকজন কীর্তিমানের সান্নিধ্য পেয়েছেন অল্পস্বল্প, এসব একেকটা নিপাতনে সিদ্ধ দুর্ঘটনা। যা হোক, আবুকে নিয়ে তাঁর পরিচিতিমূলক একটা পাতলা ছড়া লিখেছিলাম যেখানে তাঁর প্রবণতা বাঁধা পড়েছে, যদিও তাঁর মতো আমি ছড়াকার নই।

তার কাছে ভাই পাঁঠা সবাই
ব্যাঘ্র কেবল সে যে
সকাল-বিকাল তেল না দিলে
মুতে ভাসায় মেঝে।

আমনধানে বামন পেলে
বিঘতে তা মাপে
কাঁটালপাতায় ছাগল তাড়ায়
বঙ্গ তাতে কাঁপে।

কথায় কথায় কেশর ফোলায়
নাচায় ফের তর্জনী
গাঁয় মানে না আপনি মোড়ল
কয় ছটাক অর্জনই?

চিপায়-চাপায় বৃক্ষ লাগায়
ছিদ্র খোঁজে পরে
দ্বিমত হ’লে সেসব চারা
পাছায় এনে ভরে!

কলম দিয়ে খামচি মারে
আরো মারে চাপা
আর বোলো না, কেঁদে দেবে
অথই সোনার বাবা।

সবই ছালে কোন সে কসাই
বলতে পারো, বাবু?
সেই সে হল বাঁধাকপি
ঊনষাটের আবু।

আনন্দ বোধ করছি এই ভেবে যে, আমি একজন দুঃসাহসী মূর্খ, যখন তিনি বলছেন: যে সমালোচকের হাতে ঝুলছে আমার ফাঁসির রশি, তারে দেখে বুঝতে পারি মূর্খ কেন দুঃসাহসী। আবুকে নিয়ে আমি লিখতাম না; নিউরনের ভেতর লিখতে, কাগজে লিখে গোছাতে ও টাইপ করতে যতক্ষণ লাগে, যাঁকে নিয়ে লেখা হয় অন্তত ততক্ষণ তিনি মাথায় থাকেন— আবু কি এতক্ষণ আমার মাথায় বাস করার যোগ্য? তবু লিখে ফেললাম, যেন সাধুবেশী এই বিষাক্ত বিচ্ছুকে কিছু ছেলেমেয়ে আগে থেকে চিনতে পারে এবং আত্মরক্ষা করতে পারে।

***

অনুপম হক

glqxz9283 sfy39587p07