Skip to content

কিশোর রহস্য গল্প: লালবাড়ী

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

লাল বাড়ি
অর্ণব

এবার উত্তরে যাব অনেক আগে থেকেই প্লান। শীত আসার একটু আগেই যাব। শীতের একটু আবেশ থাকবে কিন্তু বরফের পরিপূর্ণ ঝাক্কি ঝামেলা সইতে হবেনা। ট্রেনেই চলছিলাম সঙ্গে ডেভিড। বাংরাদেশ থেকে আসা জাহাঙ্গীর ভাই তো আছেন।
আমাদের প্লান ছিলো আমরা সান্ডারল্যান্ড শহর এবং সান্ডারল্যান্ড ইউনিভার্সিটি এখানকার পুরাকীর্তি গুলো দেখবো এবং আমার পত্রমিতা হ্যারির বাড়িটা তার দেয়া ঠিকানা অনুসারে খুঁজে নেবো। হ্যারিকে খুঁজে পেলে ওকে সারপ্রাইজ দেব। কারণ আজ অবধি আমরা পরস্পরকে দেখিনি এমনকি ফটোগ্রাফও না। অবশ্য যদি ওরা বাড়ি বদল না করে।

আমরা শহরের কাছাকাছি চলে এসেছি আমার চোখের সামনে ভাসছে হ্যারির সেই লাল পুরনো আমলের বাড়িটা। প্লান মোতাবেক প্রথমে থাকার জন্যে হোটেল ঠিক করলাম। সান্ডারল্যান্ড ছিমছাম শহর। স্থায়ী বাসিন্দা হবে লাখ তিনেকের বেশী। লিডস এবং এডিনবার্গের মধ্যবর্তী সবচেয়ে বড় শহর। পার্শ্ববর্তী সমুদ্র তাকে আরো মোহময়ী করে তুলেছে। একানকার গ্লাস শিল্পের ঐতিহ্য হাজার বছরের পুরনো। প্রাচীন কিছু ঐতিহাসিক শিল্পে এই শহরের সুনাম বিশ্বজুড়ে।
পরদিন হ্যারির গ্রামে এসে ওর সেই লাল বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে আমি হতবাক। হ্যারির লেখা এবং আমার কল্পনার সাথে ওটা এত বেশী মিলে গেছে। বাড়ির দরজায় পুরনো কাঠের, জোড়াতালিওয়ালা গেইট, একটু শব্দ করতে একজন বেরিয়ে এল। গায়ে আধময়লা কোর্ট, অমসৃণ মুখ, একহারা গড়ন। কিছুটা আমেরিকার রেড় ইন্ডিয়ানদের মত। মেজাজও চড়া। এসেই বলল, ওহে তোমরা পেয়েছ কি? গেইটটা ভেঙ্গে ফেলবে নাকি? আমাদের দুই জনের চেহারা দেখে বলল, গ্যান গ্যান করে বলল, দেশটা আজকাল বিদেশীতে ভরে গেছে। কি চাও বল?
ডেবিড এগিয়ে গেল, এটাকি ডিউক হ্যারির বাড়ি?
ওহ সে এখানে থাকে না, বিরক্তি সহ বলল সে।
তারা কি বাড়ি বদল করেছে, জানতে চাইলাম আমি।
বললাম তো তারা এখানে থাকে না, তিনগুন বিরক্ত হয়ে সে জবাব দিলো।
জাহাঙ্গীর ভাই বললেন, তোমার নাম কি মিষ্টার? তাকে উত্তরের সুযোগ না দিয়ে বললেন, আমি বছর সাতেক আগে একটি হলিউড ছবি দেখেছি, তাতে যে নায়ক ছিলো অবিকল তোমার মতো।
লোকটা কিছুটা কাবু হলো। একটু নরম ভাবে বললো, আচ্ছা তোমরা কার কাছে এসেছো এবং কেন এসেছো বলো? এ বাড়িতে যারা থাকে তাদের কোন আত্মীয় বা বন্ধু নেই। দুই একজন যা আছে আমি তাদের চিনি।
আমি বললাম, হ্যারি মানে ডিইক হ্যারি আমার বন্ধু। বেশ কদিন ওর খোঁজ খবর পাচ্ছিনা। ভাবলাম অসুখ বিসুখ.. ...
ওহ সেতো নিরুদ্দেশ। আজ দুই মাস। তোমরা বসো তার ফুফু মিস জেসিকে ডেকে দিচ্ছি তার সাথে কথা বলো।
প্রায় দশ মিনিট পরে মোটা একটা মহিলা বের হয়ে এলেন। চুল খুব বড় নয় তবুও মাথায় ব্যান্ড দিয়ে বাঁধা পরনে গোপলাপী একটা স্কার্ট। গট গট করে এস দাড়ালেন আমাদের সামনে। কোনো ভূমিকা ছাড়াই বললেন, বলি তোমরা কি হ্যারির সন্ধান দিতে পার ছেলেটার দুইমাস কোন খবর নেই। আর দশদিন পর আমার ভাই আসবে। আমি কি বলব তাকে?
আমার কাছেও বিষয়টা খটকা লাগল। বললাম, সত্যি আমি দু:খিত। সে আমার ফ্রেন্ড ছিলো। তাঁর নিরুদ্দেশে আমি বিচলিত। তোমাকে সাহায্য করতে পারলে সত্যি সুখী হতাম।
তুমি কি তার গোপন কোন অভিপ্রায় অথবা তার আর কোন বন্ধুকে চেনো? যাদের কাছে গিয়ে থাকতে পারে? এবার স্বাভাবিক স্বরে আমাকে জিজ্ঞেস করলে মহিলা।
সত্যি এ ব্যাপারে আমি খুব কম জানি, বিনয়ের সহিত বললাম। মহিলা কথা না বাড়িয়ে ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। রহস্যের গন্ধ পেয়ে জাহাঙ্গীর বাই উৎসুক হলেন।
শহরে ফিরলাম বিকেলে গেলাম সান্ডারল্যান্ড ইউনিভার্সিটি এলাকায়। বিশ্ববিদ্যালয়টিকে বেশ বড়ই মনে হলো। সুন্দর ও পরিপাটি। অনেকগুলো সবাজেক্ট ও ডিপার্টমেন্ট বিশাল এলাকাজুড়ে। কুইন আলেকজান্দ্র্রা ব্রিজ দেখলাম। হেসটিন হল ঘুরে দেখলাম। গত সপ্তাহে ইন্ডিয়ান নাইট অনুষ্ঠান হয়েছে। ভারতীয়দের উদ্যোগে। আগামী মাসেই নাকি মিশরের ব্যালে ডান্স হবে।
জাহাঙ্গীর ভাই ইউনিভার্সিটিতে বাংলাদেশী ছাত্রের খোজঁ করলেন। পেলেন না। পেলেন ভারতীয় বাঙ্গালী এক মেয়েকে। নাম মিনতি রায়। অবশ্য ঐ মেয়ের পূর্ব পুরুষের দেশ নাকি বাংলাদেশের বরিশাল জেলায়। মেয়েটি খুবই বন্ধু বৎসল। আমাদের ঘুরিয়ে দেখাল মিউজিয়াম লাগোয়া উইন্টার গার্ডেন। সন্ধ্যায় একটা ইন্ডিয়ান রেস্তোরায় খেয়ে রুমে ফিরলাম।
গতকাল রুমে বিশ্রামের সময় বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবি জসীম উদ্দিনের একটি গ্রামীন গল্প শুনিয়েছিলেন জাহাঙ্গীর ভাই। কবি জসীম উদ্দিন এবং ইংরেজ কবি হেনরি ওয়ার্ডস ওয়ার্থ লংফেলো একই ক্যাটাগরির সাহিত্যিক সেকথা বলতেও ভুলেননি। আজ যে গল্প হবে না বুঝতে পারছি। জাহাঙ্গীর ভাইর কপালে চিন্তার ভাঁজ। আমার অন্তরে বন্ধুর বিয়োগ ব্যাথা।
পরিবেশ গম্ভীর। জাহাঙ্গীর ভাই সিরিয়াস। গোল হয়ে বসেছি সবাই। জাহাঙ্গীর ভাই বললেন, শোন আমরা একটা মিশনে নামব। ও বাড়ীতে ভূত আছে। আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। ডেভিড বলল, হোয়াট ডু য়্যূ মিন। হ্যারি নিখোঁজ হয়েছে দু:মাস। তারপর থেকে শুরু হয়েছে ভুতের উৎপাত। গভীর রাতে হাঁসে, কাঁদে, আর ন্যাঁকা গলায় ভাল ভাল খাবার চায়। ওই নিরস মহিলা ভুতের ভয়ে নিয়মিত ভাল ভাল খাবার যোগান দিচ্ছে। তার ধারনা তাঁর ভাতিজাকে ওই ভূত লুকিয়ে রেখেছে। সে ভূতকে হ্যারিকে ফেরত দেয়ার জন্যে অনেক অনুনয় বিনুনয় করেছে। লাভ হয়নি।
তবুও ওকে যে কিছু করছেনা এই জন্যে সে ভুতকে প্রতিদিন অজস্র ধন্যবাদ জানিয়ে চলেছে। একটানা বলে গেলেন জাহাঙ্গীর ভাই। তিনি আমাদের কফি হাউসে রেখে গিয়ে এসব তথ্য সংগ্রহ করেছেন।
ডেভিড বলল, রহস্যের গন্ধ আছে।
আমি বললাম, চল রহস্যটা বের করে ফেলি ডেভিড বলল, কিন্তু কিভাবে?
জাহাঙ্গীর ভাই বললেন, মাষ্টার প্লান আছে। ডেন্ট অরি।
হ্যারি সম্পর্কে আমি খুব বেশী কিছু জানিনা। আমি জানি ওর মা নেই। বাবা কাজ করে ডোবারে ওখানে তার স্ত্রী কাছে। হ্যারি থাকে ফুফুর সাথে। বাবা মাঝে মধ্যে দেখতে আসে। ফুফু জেসি এক জার্মানকে বিয়ে করেছেন। পরে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। তাই এখানে থাকে।
রাতে প্লান হলো। প্লান মোতাবেক পরদিন হাজির হলাম সেবাড়িতে। রেড ইন্ডিয়ানটা উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, হ্যারির কোন সংবাদ?
প্লান মোতাবেক ডেভিড ওকে বলল যে, তোমাদের বাড়িতে ভুত আছে। এটা আমরা কালরাতে গোষ্টচ্যাট এর মাধ্যমে জেনেছি। হ্যারির সম্পর্কে ভূত সন্ধান দিতে পারে।
জাহাঙ্গীর ভাই নিরব। তাকে দেখিয়ে আমি বললাম ইনি একজন ভারতীয় ভূত বিশেষজ্ঞ। ভারত এবং ইউ,কে মিলে এযাবত অর্ধ শতাধিক ভূতুড়ে সমস্যার সমাধান করেছেন।
লোকটা কিছুক্ষণ দেখলো তারপর মনে হলো সে বিশ্বাস করেছে, বলল, তোমরা দাড়াও আমি এক্ষুনি আসছি। বলে সে ভেতরে চলে গেলো। এবং দুই মিনিট পর আমাদের ডেকে নিয়ে গেলো। মহিলার সামনা সামনি তিনজনেই বসলাম। মহিলা একটু খাটো। ইংরেজদের মধ্যে যে রকম খাটো সচরাচর কম হয়। বলতে শুরু করলেন সব।
সারাংশ হলো এই। ভুত অদ্ভুত স্বরে গোঙায়। ডাকে হাঁসে, কাঁদে আর খাবার চায়। থাকে দোতলায় পরিত্যক্ত ঘরে। যেখানে ভাঙ্গা চেয়ার ইট কাঠ ঠিন পড়ে আছে। ভাল ভাল খাবার প্রতিদিন ওপরে তুলে দিতে হয় জানালার কার্ণিশ বেয়ে। জাহাঙ্গীর ভাই নিরবে শুনে এমন ভাব করলেন। যেন ওটা কোন বিষয় না। ৭২ ন্টার মধ্যে সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিলেন। এবং সাথে কিছু শর্ত জুড়ে দিলেন। প্রথম রাতে আমরা ভূতের গতিবিধি লক্ষ্য করবো। দ্বিতীয় রাতে ভূতের সাথে টেলিচ্যাট করবো। এবং তৃতীয় রাতে বিষয়টি সুরাহা হয়ে যাবে। আমরা কাজে লেগে গেলাম। বুঝরুকি প্রকাশ করতে মোমবাতির আলো জ্বালিয়ে একটি মঞ্চ তৈরী করলাম। তার মাঝখানে বসে জাহাঙ্গীর ভাই ধ্যান করলেন আমরা দুরে বসে থাকি। একেক সময় ডেভিড প্রায় হেসে ফেলতে চায়।
রাত ১২ টার পর মূল অপারেশন। ভূতের খাবরা রেখে দেয়ার পর ভূত খাবার খাবে। আমরা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবো। কিন্তু আমি এটা কাছ থেকে দেখার জন্যে কিছুতেই রাজি হলাম না। পুরো পক্রিয়া জাহাঙ্গীর ভাই পর্যবেক্ষন করলেন। ডেভিড ভয় একটু পেলেও ওর প্রচন্ড কৌতুহল থাকায় ও দূর থেকে দেখার চেষ্টা করেছে।
রাত ৩ টার দিকে জাহাঙ্গীর ভাই শুয়ে পড়লেন। উঠলেন সকাল সাড়ে এগারটায় তার ভূত দর্শনের বিবরণ শুনলাম। অদ্ভূৎ পোশাক পরা ভূত তিনি দেখেছেন। মহিলাকে আশার বাণী শোনালেন জাহাঙ্গীর ভাই। ভুতকে বসে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন। একবার মনে হয় জাহাঙ্গীর ভাইর সাথেই ভূত জ্বীন নেইতো। ডেভিড অবশ্য এটাকে একটা এ্যাডভেঞ্চার মিশন হিসেবে নিচ্ছে।
পরদিন চ্যাটিং এর পালা। ঘটনা সত্যি হোক আর মিথ্যে হোক আমি কিছুতেই আমার ভয় কাটাতে পারলাম না। আগেই বিছানায় গিয়ে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম। রাত আস্তে আস্তে বাড়ছে। জাহাঙ্গীর ভাই প্রস্তুতি নিচ্ছেন চ্যাটিং এর। অদ্ভুৎ এক বেশ ধারণ করলেন। হাতে নিলেন ১ গ্লাস পানি। তার মধ্যে ১টা পাতা পূর্বপার্শ্বের জানালা দিয়ে গিয়ে বসলেন। রাত ১টার দিকে তিনি ভূতকে ছন্দে ছন্দে ডাকলেন।

তিন চার বার ডাকার পর হঠাৎ লম্বা টানে ন্যাকা সুরে একটা শব্দ হলো উঁÑউঁÑউঁÑউঁÑউঁÑউঁ,
আমি বিছানা থেকেই শুনলাম। ভয়ে আমার শরীর একেবারে কাঠ। ডেভিডের মুখটাও দেখি শুকনো। মহিলা রীতিমত ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করছে।
জাহাঙ্গীর ভাই কণ্ঠ গম্ভীর করে ইংরেজীতে কথা বলতে শুরু করলেন।
‘‘কথা বল দূরাত্মা, পাপিষ্ঠ।

আমি হাজির। আমি হাজির। হাজির ভারতীয় অশরিরীদের গুরু। কিন্তু আজ আমার খাবার কোথায়। আমি যে ক্ষুধার্ত।
চুপ শয়তান। পেটুক। বল তোর কি নাম?। কোথায় ছিলি এখানে কেন আস্তানা করেছিস?।
আমি প্যাক্সটন। আগে ছিলাম ডসনে। ন্যাকা গলায় ভূতের জবাব।
গুরু আমি ভাল ভাল খেতে চাই। গুরু আমি ক্ষুধার্ত। এগুলো সব চন্দ্রন্দিু দিয়ে পড়ে নিতে হবে কিন্তু।
কথা বেশী বলবিনা। বল এখানে কেন এসেছিস?
গুরু আমার অনেক অনেক দু:খ।
তোর দু:খের কথা আমি শুনতে আসিনি। আসল কথা বল নইলে তোর লেজে আমি আগুন ধরিয়ে দেব। তোকে বোতলে বন্দী করবো।
না গুরু আমাকে এতবড় সাজা দিওনা। আমি বলছি। ছোটবেলায় আমার মা মারা যায়। আমি ছিলাম বড় অসহায়। আর এ বাড়ীতেও ছিলো একটি ছেলে হ্যারি। তাকে আমি খুব ভালবাসতাম। সে ছিল আমার বন্ধু কিন্তু সে আজ নাই বলেই কেঁদে ফেলল। সেও ছিলো আমার মত অসহায়।
ভুত যে কাঁদতে পারে এই আমি প্রথম শুনলাম। জাহাঙ্গীর ভাই নির্বিকারভাবে ধমক দিলেন রাখো তোমার মায়াকান্না, কোথায় লকিয়ে রেখেছো হ্যারিকে? জবাব দাও?
হ্যারিকে আমি কখনো এ বাড়িতে আসতে দেবনা। ওকে আমি আমার ডসনে আমার ডেরায় লুকিয়ে রেখেছি। আর আমি ওকে ভাল ভাল খাবার দিয়ে আসছি।
কিন্তু হ্যারিকে অবশ্যই তোমাকে ফেরত দিতে হবে। তা না হলে তোমার উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করবো আমি।
না না তা হবে না। দয়া কর গুরু। আমার বন্ধুর প্রতি সদয় হও। আমার প্রতি নির্দয় হয়ো না।
দয়া নির্দয়ার প্রশ্ন নয়। তুমি তোমার আস্তানায় ফিরে যাও! আর হ্যারিকে ফিরিয়ে দাও।
না তা হতে দেবনা। ওই মহিলা আমার বন্ধুকে খেতে দেয়না। মারধর করে। আমার বন্ধু কখনো এই বাড়িতে আসবেনা।
তোমার কোন অযুহাত আমি শোনবোনা। আমি তোমার উপর কামরুপ কামাক্ষার মন্ত্র প্রয়োগ করবো।
দোহাই তোমার, তা করোনা।
-তাহলে ফিরিয়ে দাও হ্যারিকে। এখান থেকে চলে যাও তুমি -কিন্তু ওই মহিলা আমার বন্ধুকে মেরে ফেলবে। আমার বন্ধুকে খেতে দেবে না। আমি এই কাজ কিছুতেই করতে পারিনা।
কথোপকথন চলছিলো। আমি ভয় পেলেও কৌতুহল ছাপিয়ে রাখতে না পেরে উঠে এলাম। ওই মহিলা ভয়ে একবারে জুবুথুবু। জাহাঙ্গীর ভাই গম্ভীর কণ্ঠে কথা বলে যাচ্ছিলেন। ডেভিডও কলাপাতার মত কাঁপছিলো। গিয়ে ওকে ধরলাম। ভয়ে আমরা একেবারে জমে যাচ্ছিলাম আরকি। রেড ইন্ডিয়ানটা তো একেবারে ফিট দাঁতে দাঁতে বাড়ি খাওয়ার শব্দ শোনা। জাহাঙ্গীর ভাই ক্ষুব্দ চোখে মহিলার দিকে তাকাচ্ছেন।
মহিলার হাত পা কাঁপছে। এখন বেশী শীত নেই। তবুও শীতে একেবারে কম্বল মুড়ি দিয়ে বসেছে। তোতলাতে তোতলাতে বলল। না না বিশ্বাস কর আমি আর ওসব করবো না। সত্যি বলছি। আমি একদম ভালো হয়ে যাব।
না না না, চিৎকার করে ওঠে দোতলার ভুত। সেই নাকি সুরে। আমি ওই রাক্ষসীকে বিশ্বাস করিনা। ওটা সব নিজে খায়। ওটার শুধু খাই খাই স্বভাব। দুনিয়া দিলে তার পেট ভরে না। ওর বর এজন্যেই পালিয়েছে। তুমি ওর কথা বিশ্বাস করো না গুরু।
-ঠিক আছে, যদি আমি তার দায়িত্ব নেই।
- তবে আমি ভেবে দেখবো।
তাই হবে। তোমাকে ১২ ঘন্টা সময় দিলাম। হ্যারিকে হাজির কর তোমার খাবার পাঠাচ্ছি। খেয়ে বিদায়ের প্রস্তুতি নাও।
আমি আর ডেভিড চোখ বড় বড় করে জাহাঙ্গীর ভাইকে দেখছি। আর মনে মনে ভাবছি। আমি কি বোকা? কাছাকাছি থেকেও কখনো বুঝতে পারিনি এই লোকটার আশ্চার্য কোন ক্ষমতা আছে।
সংলাপ শেষ হওয়ার পরই। মহিলা হুমড়ি খেয়ে পড়লো জাহাঙ্গীর ভাইর পায়ের কাছে।
স্যার স্যার বলতে বলতে একেবারে কাহিল। আর খালি ক্ষমা চাইতেছে। আমাকে মাপ করে দাও গুরু। ওই ভুতকে বলো আমাকে মাপ করে দিতে। আমি হ্যারির কছেও মাপ চাইবো। আমার ভাই জানতে পারেল আমাকে এক মুহুর্ত এই বাড়িতে থাকতে দেবেনা। আমার ভাতিজা বেঁচে আছে। এটাই শান্তনা আমি ওকে জীবিত ফেরত চাই। ওকে আমি নিজের সন্তানের মত মানুষ করবো। আমি এই তোমাকে ছুঁয়ে শপথ করলাম।
জাহাঙ্গীর ভাই মোমবাতির আসর থেকে নেমে এলেন। তার মুখ আরো কঠিন ও রহস্যময় লাগছে। আমার মনে হলো এবার জাহাঙ্গীর ভাইকে দেখেই ভয় পাচ্ছি।
জাহাঙ্গীর ভাই মহিলাকে জেরা শুরু করলেন। যেন কঠিন হাশরের মাঠ। মহিলা কেঁদে কেটে এক সার। মহিলাকে দিয়ে কঠিন শপথ করালেন যে মহিলা তার ভাতিজাকে কখনো মারবেনা। সঠিকভাবে খাবার দাবার দেবে। আর তা না হলে যে কোন মুহুর্তে ভুত ফিরে আসবে।
ভালো খাওয়া দাওয়া হলো। আজ ভুত নাটকের শেষ পর্ব। সারাদিন বিভিন্নভাবে জাহাঙ্গীর ভাইয়ের কাছে ভুত রহস্য জানতে চেয়েছি। কিন্তু যতবারই জানতে চেয়েছি ততবারই লোকটাকে আরো রহস্যময় বলে মনে হয়েছে। সবচেয়ে বেশী রহস্যময় মনে হলো তার হাসিটি। আজ দুই দিন ভুত নিয়ে থেকে তার হাসিটিও কেমন যেন ভুতুড়ে হয়ে গেছে। দুপুরে খেয়ে শহরে গেলাম। জাহাঙ্গীর ভাই দারুন ফুরফুরে মেজাজে থাকলেও কিছুই দেখা হয়নি। সন্ধ্যার সাথে সাথে ফেরার প্রস্তুতি নিলাম জামা কাপড় গোছালাম। বাসায় আগেই ফোন করে দেযা হয়েছিলো। তবুও বাবা মায়েরা তো একটু উদ্ভিগ্ন থাকেন। রাতে অপারেশন শেষ হবে। ভোরেই পথ ধরবো। আমার ভয়তো কিছুতেই কাটছেনা। না জানি শেষ পর্যন্ত কোন অঘটন ঘটে কিনা।
অপারেশন শুরু। জাহাঙ্গীর ভাই উঠেন বাড়ীর দোতলায় সেখানে ভুত হ্যারিকে নিয়ে অপেক্ষা করছে। জাহাঙ্গীর ভাই হ্যারির জন্যে এক সেট নতুন জামা কিনে আনলেন। সেগুলো পরেই হ্যারি অবতরন করবে। আর ভুতের জন্যে আনলেন একটা লাল গোলাপ ওটা দিয়ে বিদায় করবেন ওকে। আমি ওসব বাদ দিতে বলেছিলাম ওকে। শোনেননি। বললেন আমার উপর ভরসা রাখ।
জাহাঙ্গীর ভাই এক সয় উঠে গেলেন লাল বাড়িটির পরিত্যক্ত দোতলায়। সেখানে কিছু ছোট গাছ গাছালি আছে। আচে পরিত্যাক্ত কাঠ, টিন, কাচ, ইট, বালি এইসব। জায়গাটা সত্যিই অদ্ভুত এবং ভুতুড়ে। ভয়ে আতংকে আমার দম বন্ধ হবার জোগাড়। ডেভিড ঘন ঘন ঢোক গিলছে। মনে হয় ওর গলা শুকিয়ে আসছে। মহিলা তার চাকরটাকে নিয়ে চোখ বড় বড় করে বসে আছে।
জাহাঙ্গীর ভাই ওখানে অন্ধকারে কি করছে। অথবা তার কি পরিণতি হচ্ছে নানাধরনের ভাবনা আমার মনে আসছে। জাহাঙ্গীর ভাইর কিছু হয়ে গেলে বাংলাদেশে তার মা বাবা ভাই বোনের কি অনুভূতি হবে এসব ভাবছি। বিশ পঁিচিশ মিনিট পর। জাহাঙ্গীর ভাই আমাকে ডাকলেন বাইরে। তিনি নামবেন। গিয়ে দেখি সাথে হ্যারিও আছে। উত্তেজনায় অমার হৃদস্পন্ধন বন্ধ হবার জোগাড়। ডেভিড বলল, ওহ গড, হোয়াট হ্যাভ য়্যু ডান? রেড ইন্ডিয়ান টা বলল, আমি নিশ্চিত যে এটা একটা স্বপ্ন।
আর জেসি একেবারে বাকরুদ্ধ। জাহাঙ্গীর ভাই স্বাভাবিক। তিনি হ্যারিকে নিয়ে নামবেন। হ্যারি ঝুলে নামতে পারবেনা ওকে আমি আর ডেভিড ধরে নামাবো। সিড়িটা বন্ধ এবং চলাচলের অনুপযোগী হওয়ায় এ ব্যবস্থা।
তিনজনে ধরে হ্যারিকে নামালাম। জাহাঙ্গীর ভাই একাই নামলেন। ফুফু এসে ভাতিজাকে জড়িয়ে ধরলো। হ্যারি ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদছে। ওর চেহারা অনেকটা মলিন। যেন এই মাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। ও আমাদের কাউকে চিনেনি। আমি নিজের পরিচয় দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। ডেভিড ওকে উইশ করলো।
অনেকক্ষণ সময় লাগিয়ে হ্যারির গোসল হল। তারপর খাওয়া খেয়ে জাহাঙ্গীর ভাই দিলেন ঘুম। কোন প্রশ্নই করতে পারলামনা। কৌতুহল রাতে ঘুম হলো না।
হ্যারির ফুফু জেসিকে কঠিন শপথ করালেন জাহাঙ্গীর ভাই মহিলা একেবারে নাকে খত দিতে প্রস্তুত। ভাতিজাকে আদর করবে। ঠিকভাবে খেতে দেবে ইত্যাদি ওয়াদা করলো। নিজে তেকেই বলল। আমার তো আর কেউ নেই। ওকে নিয়েই আমি আমার বাকী জীবন কাটিয়ে দেব। আমি এবং ডেভিড অনেক গল্প করলাম ওর অন্তবর্তীকালীন অবস্থার কতা জিজ্ঞেস করলাম না। প্রচন্ড আগ্রহ সত্বেও কারণ জাহাঙ্গীর ভাইয়ের নিষেধ। ও কথা দিলো আবার চিঠি লিখবে।
ফেরার পথে জাহাঙ্গীর ভাইকে আমি না ধরে পারলামনা। ডেভিড ও নাছোড় বান্ধা। কিন্তু জাহাঙ্গীর ভাইর মুখে যা শুনলাম আমি বিশ্বাস করবো না অবিশ্বাস করবো বুঝতে পারছিনা। ডেভিড হাঁসতে হাঁসতে একেবারে সারা বিষ্ময়ে অমার অনুভূতি লোপ পেয়ে গেল। ডেভিডই নাকি ভুতের অভিনয় করেছে। খারাপ ব্যবহারে অতীষ্ট হয়ে এটা করেছে। জাহাঙ্গীর ভাই এটা বুঝতে পেরে দ্বিতীয় দিনে ভোরে গিয়ে হ্যারিকে ধরে ফেলেছে। জাহাঙ্গীর ভাই হ্যারিকে সম্মানজনক পূর্ণবাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার সাথে এই নাটক সাজালেন।
এমন নিখূঁতভাবে সবকরা হলো ওই মহিলা বিন্দুমাত্র সন্দেহ করতে পারেনি। অবসান হলো আমাদের নির্ধারিত লাল বাড়ি নাটকের।

glqxz9283 sfy39587p07