Skip to content

আমাদের ডিরোজিও:আফজাল রহমান

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

১৮৩১ সালের একটি রাত। একটি ঘর। এক ঝাঁক টকবগে তরুণে পূর্ণ। এরা ঘিরে আছে প্রায় ২৩ বছরের আরেক তরুণের চারপাশ। তরুণটি অক্লান্ত ভালবাসা নিয়ে চোখ বোলাচ্ছে তাঁকে ঘিরে রাখা প্রায় সব সমবয়সিদের। একমুহুর্তের জন্য যেন তাঁর চোখে তৃপ্তির ঢেউ খেলে যায়। ২২ বছর ৮ মাস ৮ দিনের এই ছোট্ট জীবনে পরম ভালবাসা ও শ্রদ্ধায় সিক্ত হওয়া তরুণটি হেনরি ডিরোজিও। কোন বিশেষণে এই মানুষটিকে বেঁধে ফেলা বোধ হয় অন্যায়ই হবে।

মুক্ত চিন্তক, মুক্তমনের শিক্ষক, সমাজ সংস্কারক, আবার অন্যদিকে কবি-সাংবাদিক, তেমনি দর্শন ও সমাজনীতি নিয়ে লিখতেন গভীর প্রবন্ধ, সর্বোপরি নানা বিষয়ে প্রচুর পড়া জানা একজন পন্ডিত মানুষ। তবে এখন ডিরোজিও নামটি শুনা মাত্রই কেবল আমাদেও চোখের সামনে ভেসে উঠে ’প্রথা ভাঙার’ কারিগরের এক বিস্ময়কর চিত্র। যিনি পুরাতনকে ভেঙে নতুনকে গড়ার, পালটে দেবার স্বপ্ন নিয়ে, সকল ধরণের অকপটতা , গোরামী ও সংকীর্ণভাবনারে লাথি মেরে দেশ ছাড়া করেন। অসম্ভব প্রতিভাবান এই মানুষটি গত হয়েছেন প্রায় দু’শত বছর। কিন্তু তাঁর আদর্শ,তাঁর দেখানো পথ ও মত আজও টিকে আছে। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও সমাজকে যাঁরা পাল্টে দেয়ার স্বপ্নে বিভোর তাঁরা সেই তরুণ ডিরোজিওর অনুকরণ করবেন এটাইতো স্বাভাবিক! আর কর্ম জীবন যাঁরা শুরু করেন শিক্ষকতার মতো একটা স্বপ্ন নিয়ে তাঁদের বেলায়তো কথায় নেই। যদিও এরকম মনমানষিকতা-চিন্তাচেতনা নিয়ে যাঁরা শিক্ষকতার মতো এমন একটা মহান কাজে নিজেদের নিয়োজিত করছেন তাঁদের সংখ্যা আজ হাতে গুণা। আমরা অতি ভাগ্যবান যে এই হাতে গুণা মানুষদের অন্তত এ্কজনকে আমরা পেয়েছি। তিনি আমাদের জুনিয়র ডিরোজিও অধ্যাপক আফজাল রহমান(১৯৬৫-এইসব মানুষদের মৃত্যু নেই, থাকে না কোন কালে)। পিতৃভূমি ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁওয়ের রসুলপুরে, তবে তিনি নিজেকে কোন একটা অঞ্চলের ভাবতে পারেন না। নিজেকে বিশ্ব নাগরিক বলে পরিচিতি দিতেই বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। জিজ্ঞাসা করেছিলাম স্যারকে যে, ’মুক্ত বাজার অর্থনীতির তীব্র আগ্রাসনে সবাই যখন নিজেকে নিলামে তুলছে তখন আপনি কেন শিক্ষকতার মতো অলাভ জনক একটা পেশাকে গ্রহণ করলেন’। স্যার যা বলেছিলেন তার সারমর্ম হচ্ছে এই, স্যারের বাবা ছিলেন স্থানীয় স্কুলের প্রধান শিক্ষক। প্রতিদিন সকালে তিনি স্কুলে যেতেন ফিরে আসতেন সেই সন্ধ্যায়।আবার রাত্রি বেলায়ও দেখা যেতো একপাল ছাত্রদের নিয়ে বসেছেন। কার কি সমস্যা তা সাধ্যমত সমাধান করার চেষ্টা করেছেন। ছাত্র-শিক্ষকের গড়ে ওঠা এই ঋদ্ধতার সম্পর্ক,পরস্পরের প্রতি এই সম্মানবোধ আমাদের জুনিয়র ডিরোজিওকে অল্প বয়স থেকেই প্রভাবিত করে আসছে।
স্থানীয় স্কুলের পাঠ চুকিয়ে ভর্তি হন ঢাকা আদমজি কলেজে, তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঙলা বিভাগে। মূলত এখান থেকেই তিনি চরম উৎকর্ষতার চূড়ায় পৌঁছে যেতে সক্ষম হন। আহমদ শরীফদেরকে শিক্ষক হিসেবে না পেলেও আবু হেনা মোস্তফাদেরকে পেয়েছিলেন।
সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে তাঁর বিভিন্ন দেশে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। জার্মান,আমেরিকাতে ছিলেন কিছুদিন। কিন্তু রক্তে যাঁর লুকিয়ে আছে শিক্ষকতার ছাপ তাঁর কি অন্য কিছুতে মন থাকে! তাই সব ছেড়ে শিক্ষকতাকেই বেছে নিলেন। স্থান হলো শত বছরের ঐতিহ্যবহন করা ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজের বাঙলা বিভাগে। সেখানে এসে অভিভাবক হিসেবে পেয়েছিলেন সুমিতা নাহা দেবী, সরদার আবদুস সাত্তার স্যারের মতো কিছু সৃজনশীল মানুষদের। তার অভিনব চিন্তা-চেতনার স্ফুরণ প্রথম এই আনন্দমোহন থেকেই ঘটে। ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কের মধ্যে এতোদিন ধরে যে প্রাচীর আকাশের দিকে বেড়ে উঠছিল তিনি এসেই প্রথমে তা ভেঙ্গে ফেলেন। শিক্ষক ও ছাত্রের মধ্যে দূরত্ব বিরাজমান থাকলে "আউটপুট" শূণ্য আসবে বলে তিনি মনে করেন। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা,পাঠদান পদ্ধতি তিনি কিছু মূর্খ মানুষের সামনে বিবিসির খবর উপস্থাপনার মতো মনে করতেন, এবং এখনো করেন। গাইড বই পড়ে পড়ে ক্লাশ ডিঙিয়ে যাওয়া, ছক বাঁধা কয়টা প্রশ্নের উত্তর মুখস্ত করে পাশ করে যাওয়ার যে চর্চা এতোদিন হচ্ছিল তিনি এসে তা বন্ধ করতে উদ্ধত হন এবং এসব বিষয়ে ছাত্রদের সচেতন হতে আহবান জানান। শিক্ষক-ছাত্রদের মধ্যে যে ভাবগম্ভীর একটা সম্পর্ক ছিল তিনি এসে যখন তা ভাববন্ধনে রুপায়িত করলেন তখন ছাত্ররাও তাঁর কথা শুনতে লাগলো। অল্প কিছুদিনেই এই মানুষটি ছাত্রদের কাছে অধিক জনপ্রিয় হয়ে উঠলো। মহান ডিরোজিওর মতো ছাত্ররাই হয়ে উঠলো আমাদের জুনিয়র ডিরোজিওর প্রধান ও অন্যতম অস্র। এইসকল অস্র কাজে লাগিয়েই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা দৈন্যতাকে তুলে ধরলেন। ছাত্রদের বাসায় পড়িয়ে আলগা অর্থ আদায় শিক্ষকদের জন্য অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক ও গর্হিত কাজ বলে তিনি মনে করেন এবং এর বিরুদ্ধে তিনি ময়মনসিংহে আন্দোলন শুরু করে দিয়েছিলেন। আমাদের ডিরোজিওর আন্দোলন ফলপ্রসু হয়েছিল, প্রতিক্রিয়াশীলদের ভীত কেঁপে উঠার আওয়াজ সেদিন আমরাও শুনেছিলাম। সত্য,বাস্তব প্রতিষ্ঠার পথ বরাবরই কন্টকাকীর্ণ। তাই স্যারকে ছাড়তে হয়েছিল আনন্দমোহন কলেজ।যেইভাবে প্রায় দুইশত বছর আগে হিন্দু কলেজ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল হেনরী ডিরোজিও। প্রতিক্রিয়াশীলদের বাড়া ভাতে ছাই দেয়ার অপরাধে আমাদের জুনিয়র ডিরোজিওকে ময়মনসিংহ থেকে হবিগঞ্জ স্থানান্তর করা হয়। তাই বলে তিনি দমে যাননি, আশাহতও হননি, শুধু একটু ব্যথিত হয়েছিলেন এই ভেবে যে, শিক্ষা ক্ষেত্রেও দুর্নীতিবাজদের দৌরাত্ব আছে এবং তা সক্রিয়। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কালে ’প্রথম আলো’ পত্রিকা স্যারকে নিয়ে একটি নিউজ করলে দূর্নীতি দমন কমিশনের চোখে তা পড়ে, এবং তাঁর সৎ সাহসের প্রতিদান স্বরুপ তাদের সাথে কাজ করার প্রস্তাব দেয়। প্রায় দু বছর হাসান মশহুদ চৌধুরীর অধীনে স্যার কাজ করেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসলে আবার তিনি শিক্ষকতায় ফিরে আসেন সেই প্রত্যাখ্যাত হওয়া আনন্দমোহন কলেজের বাঙলা বিভাগেই।
অভিনব চিন্তা-চেতনা, তথ্য প্রযুক্তির প্রতি ব্যাপক আগ্রহমানতা নিয়ে যেন এবারের ফিরে আসা। পুরোদস্তর বিগ্ঙান মনস্ক একজন ব্যতিক্রমী মানুষ, বাস্তবতার সম্মুখে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে সত্য ও ন্যায়ের কথা বলেন। স্বচ্ছ চিন্তা ও ভাবনার মধ্য দিয়ে তিনি হাঁটেন, লক্ষ্য সুদূরপ্রসারী। দুর্নীতি ও মাদক বিরোধী কর্মকান্ডের সাথে ওতোপ্রোতভাবে সংশ্লিষ্ট। পড়াশুনার পাশাপাশি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রিদের মধ্যে যে দেশাত্ববোধ জাগ্রত হওয়া দরকার, এবং তা উৎপাদনে শিক্ষকদের যে অসাধারণ একটা ভূমিকা আছে জুনিয়র ডিরোজিও আনন্দমোহন আসার পূর্ব পর্যন্ত এই বিষয়টি ছিল এখানে একেবারেই অনুপস্থিত। আনন্দমোহন কলেজ কর্তৃপক্ষ যেখানে প্রযুক্তির উপর নির্ভর করতে সাহস পাচ্ছেনা সেখানে তিনি বাঙলা বিভাগে ’ওয়াইফাই’ সংযোগ সহ তথ্য ও প্রযুক্তির নানা কসরত ইতিমধ্যে দেখিয়ে ফেলেছেন। পাঠ্যাভাসে গুণগত মান পরিবর্তনে ছাত্রদের প্রতিনিয়ত উৎসাহিত করে যাচ্ছেন। বই পড়া কর্মসূচি আরম্ভ করেছেন, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারকে নিয়ে এসে ’বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে’র বই পড়ার যে কর্মসূচী আছে তারও অন্তর্ভূক্তি করেছেন আনন্দমোহন কলেজে। নিপুণ কারিগরের মতো আড়ালে আবডালে থেকে একটার পর একটা কাজ করে যাচ্ছেন নিরলস এই মানুষটি।
তাঁর কাজের প্রবাহমানতা দেখে হয়তো প্রতিক্রিয়াশীলরা আবার একজোট হচ্ছে, অস্বচ্ছ অবস্থান টিকিয়ে রাখতে আবার হয়তো কোন এক হবিগঞ্জে আমাদের জুনিয়র ডিরোজিওকে ছুড়ে ফেলবে। কিন্তু এদের জানা নেই যে সর্বদা আলো ছড়িয়ে যাওয়া এইসব মানুষদের যত গভীর কূপেই ফেলা হোক না কেন সেখানে গিয়েও তাঁরা আলোক শিখা প্রজ্জ্বলন করে অন্ধকারকে গোচায়। তাঁদের কোন দেশ নেই, কাল নেই জীবনের সব অন্ধকারকে আলোতে পরিণত করতেই এঁদের জন্ম।
এই মানুষটি যুদ্ধ করে যাচ্ছেন সমাজের নানা অসঙ্গতি, অকপটতা ও সব ধরণের গোরামীর বিরুদ্ধে। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে জন্ম নেয়া প্রথা ভাঙ্গার এই যুদ্ধার প্রতি রইলো শ্রদ্ধা।
-মিতুল আহমেদ

মন্তব্য


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

আফজাল রহমান স্যারের কথা জেনে আনন্দ পেলাম। ওনাকে সালাম। আপনাকে ধন্যবাদ।

************************************
নিজের অস্তিত্বকে জাহির করার কোনো অধিকারই
নেই আমার: আমি হলাম চাঁদের ছেলে।

glqxz9283 sfy39587p07