Skip to content

বাঙলা 'পয়ার' শব্দের বাড়ির খোজে....

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি



কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ছন্দ বিষয়ক একখানা বই আছে। নাম 'ছন্দসরস্বতী'। বইটিতে একটি রূপক গল্প-

"নবজলধর কান্তি একজন পুরুষ ঘরের ভিতর প্রবেশ ক'রে আমায় মধুর গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন- 'কি জানতে চাও?' আমি আমার প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলুম।

তিনি বিজ্ঞভাবে ঘাড় নেড়ে বললেন, 'অলবড়ি।....অলবড়ি কাকে বলে জানো? যে সমস্ত পদ্যপংক্তিতে চারটি করে পংক্তি-পর্ব থাকে, তাকে বলে অলবড়ি। তোমাদের পয়ারেও তাই, লাচারিতেও তাই; ছড়ার ছন্দেও তাই, পুঁথির ছন্দেও তাই; কাজেই মূলে দুই-ই এক। অলবড়ি শব্দের অপভ্রংশ হচ্ছে লাচাড়ি।'

হঠাৎ অমৃত-সাগরণের কথায় বাধা দিয়ে কে একজন বলে উঠলেন- 'কিহে? ভুল শেখাচ্ছ কেন!'

অমৃত-সাগরণ বললেন- 'কে হে। সৈফি মিঞা যে। তুমি এসে জুটেছ? তুমি কি বলতে চাও?'

কপালে রেশমী রুমাল বুলিয়ে মুসলমান ভদ্রলোকটি বললেন- 'বলতে চাই যে লাচাড়ি শব্দ ফার্সী লাচার শব্দ থেকে এসেছে। লাচারেরা যে ছন্দে গান গেয়ে বা ছড়া বলে ভিক্ষে ক'রে বেড়ায়, সেই হচ্ছে লাচাড়ি ছন্দ, যেমন লাচাড়ি তোড়ি মানে লাচার বা ভিখিরীদের মুখে মুখে তোড়ি রাগিণীর যে নতুন চেহারা দাঁড়িয়েছে, সেইটি। আর পয়ার হ'ল আরবী বয়েৎ শব্দের অপভ্রংশ।'

অমৃত-সাগরণ অদ্ভুতভাবে ঘাড় নাড়লেন। সৈফী মিঞা বিরক্তির স্বরে বললেন- 'কি? 'হাঁ' বলছ, না 'না' বলছ? তোমার ও মাদ্রাজী ঘাড়-নাড়ার কোনো হদিস পাইনে ব্রাদার।'

'না বলছি, - নিশ্চয়ই 'না', বয়েৎ থেকে পয়ার। তুমি হাসালে দেখছি। পয়ার এসেছে তামিল ছন্দ 'পরাণী' থেকে।'

'হুঃ। তাহলে আসামীরাও বলতে পারে যে লাচারড়ি হয়েছে তাদের লেচার শব্দ থেকে- যার মানে চলার ঝোঁকে হাতের ঝাঁকি।'

'কি রকম?'

'রকম আবার কি?'

'বাংলায় তামিল আগে? না তুর্কী আগে?'

'বাংলায় ফার্সী কথা বেশী? না দ্রবিড় কথা বেশী?'

'দ্রবিড়।'

'কি রকম?'

'যেমন বহুবচনের 'গুল্যে' শব্দ, আমাদের 'মরম-গল, বাংলায় হয়েছে 'গাছগুলো'।

'বেশ; কিন্তু অপর দিকটাও দেখছ না কেন? বাংলায় ক্রিয়ার ভিতরেও যে মুসলমানী ঢুকেছে- আমাদের 'কম' থেকে যে 'কমানো' হয়েছে তা' জানো? তোমাদের বেশী প্রভাব, না আমাদের।'



পয়ার ছন্দ কি? তা পড়তে গিয়ে মনে হল, শব্দটি কোথা থেকে এল?

পুথির বিশেষ করে বঙালদের লেখা পুথিতে পয়ার ছন্দের একচ্ছত্র আধিপত্য দেখে মনে কৌতুহল জেকে বসায় এ খোজাখুজির কসরত।

প্রথমে ভারতীয় বাঙালা থেকে প্রকাশিত "সংসদ/বাঙালা অভিধান"-এ 'পয়ার' শব্দটি পাওয়া যায়। অভিধানটি সংকলন ক'রেছেন শৈলেন্দ্র বিশ্বাস। আর সংশোধন/অনুমোদন ক'রেছেন- ড. শশিভূষণ দাশগুপ্ত ও দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য। অভিধানে এ ব্যাপারে লেখা হয়েছে- 'পয়ার' বি-চতুর্দ্দশাক্ষর ছন্দ। বাংলা পদ্যে সর্বাধিক প্রচলিত (যেমন- 'মহাভারতের কথা অমৃত সমান;- কাশী)। [সং-পদকার]।" অর্থাৎ শৈলেন্দ বিশ্বাসের মতে, বিশেষ বাচক এ শব্দটি সংস্কৃতজ। এসেছে সংস্কৃত পদকার থেকে।

কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, যারা শব্দ নিয়ে নাড়াচাড়া করেন, তারা জানেন 'পদকার' একটা শব্দ নয়। সংস্কৃতও নয়।
'পদ' ও 'কার' দুটি শব্দ। আর তা ফারছীমূলক।
ফারছী ভাষার অভিধানে দেখা যায়- 'পদ' শব্দের মূল 'পা' অর্থ 'চরণ'। সেটা মানুষ বা জীব-জানোয়ারের চরণ(পা-পদ), অফিসিয়াল 'পদ' কিংবা কবিতার পংক্তি(পদ/চরণ) যে কোন অর্থ হতে পারে। আর 'কার' অর্থ-কাজ,শ্রম,চাকরি ইত্যাদি। কবিতা রচনা করাও একটা কাজ। তাই পদকার কোনমতেই সংস্কৃত শব্দ নয়। বাঙলায় প্রচুর 'কার' ফারছী প্রত্যয় ব্যবহারের নজির আছে। তাই 'পদকার' অর্থ 'পয়ার' নয়। পদকার অর্থ- কবি। অর্থাৎ যিনি কবিতার 'চরণ' বা 'পদ' রচনা করেন।

অনুরূপ ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হকের বাংলা একাডেমী(হওয়া উচিত ছিল 'বাঙলা একাডেমি' তাদের নীতিমালা অনুযায়ী) ব্যবহারিক বাংলা অভিধান-এ 'পয়ার' অর্থ-বি চতুর্দশাক্ষর ছন্দবিশেষ। {স. পদ+চার>} ।

এখানেও শব্দমূল সংস্কৃত বলা হয়েছে। কিন্তু আসলে তা নয়, পদ+চার শব্দদ্বয়ও ফারছী থেকে এসেছে। পদ সম্পর্কে উপরে বলা হয়েছে। আর ফারছী চাহার>চার এসেছে।

পয়ার সম্পর্কে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন, 'সংস্কৃত বাংলা এবং প্রাকৃত বাংলা'র মধ্যে পয়ার প্রাকৃত বাংলার ছন্দ।' কিন্তু তিনি উৎস নিয়ে কোন কথা বলেননি।

তেমনিভাবে অনেক বিখ্যাত লেখক ও শাস্ত্রবিদের গ্রন্থে পয়ার নিয়ে আলোচনা থাকলেও এটার উৎসমূল নিয়ে আশাব্যাঞ্জক তথ্য মেলেনা। কিন্তু শব্দটি ভূঁইফোড় ত হতে পারে না।

এবার প্রথম রূপক গল্পটির শব্দ 'আলবড়ি' নিয়ে একটু চিন্তা করা যাক। তামিল 'আলবড়ি' শব্দটি আরবি 'আলবহরি' থেকে এসেছে। আরবি ছন্দশাস্ত্রে আলবহরি একটি বিশেষ ছন্দ। ইলমুল আরূদ বা আরবি ছন্দবিদ্যায় এটা পাওয়া যায়। যার চারিত্র আলবড়ি'র মত।

অনুরূপ ফারছীতে প আরবিতে ব উচ্চারণ হয়। বহার>পহার>পয়ার।

মজার বিষয় হল, প্রাচীন পুথিতে ১০ম শতাব্দির আগে পয়ার ছন্দের প্রয়োগ লক্ষ করা যায় না।

আপনাদের কারো কাছে যদি কোন তথ্য থাকে, তাইলে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।

ছবি- নেট থেকে মারিং

মন্তব্য


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

খাইছে,এইগুলি বাংলা Sad

___________
জয় বাংলা,জয় বঙ্গবন্ধু


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

আমারও পড়তে যাইয়া দাত নইড়া গেছে Sad

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
ন্যায়ের কথা বলতে আমায় কহ যে
যায় না বলা এমন কথা সহজে


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

দত্তবাবু দেখছি মানুষকে চিন্তিত করে তুলেছে; দেখা যাক, কি হয়!


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
ন্যায়ের কথা বলতে আমায় কহ যে
যায় না বলা এমন কথা সহজে


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

জানতো তেজপাতা অইয়া গেলো.... চমৎকার লিখেছেন..... ধন্যবাদ কিছু জ্ঞান ধার দেবার জন্যে।

-----------------------------------------------------------------
অমৃতের পুত্র আমি পঞ্চম, ক্ষয়ের আনন্দে চাইনা অমরত্ব।
দেহধাম ছেড়ে পাবো হয়তো স্বর্গ বা নরক; হাহ হাহ হাহ:
দেখো! মহাকাশ ডেকেছে লং-মার্চ, কেনা-বেচার ধরাধামে আমি আজন্ম এক ফুটপাথ।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

smile :) :-) মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ।

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
ন্যায়ের কথা বলতে আমায় কহ যে
যায় না বলা এমন কথা সহজে


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

ছালাম। কিছুদিন আগে লেবানীজ একজনের গবেষনামূলক লেখায় পড়েছিলাম , আরবি ভাষা মানবজাতির আঁদি ভাষা। আরবি ভাষা থেকেই সকল ভাষার উদ্ভব। আপনার এ লেখা পড়ে সে ধারনাটাকে আরো মজবুত করল। ধন্যবাদ আপনার তথ্যবহুল এই পোস্টের জন্য।

-------------------------------------------------------------------------------------------------------
৫৪:১৭ আমি কোরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্যে। অতএব, কোন চিন্তাশীল আছে কি?


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

ধন্যবাদ

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
ন্যায়ের কথা বলতে আমায় কহ যে
যায় না বলা এমন কথা সহজে


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

কিরে ভাই, হঠাৎ পয়ার নিয়ে এত পেয়ারের কি হল?

______________________________________
নিজেকে কখনও একা ভাবতে নেই......


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

পয়ার আর পেয়ার!! ধন্দ লাগাইয়া দিলেন..

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
ন্যায়ের কথা বলতে আমায় কহ যে
যায় না বলা এমন কথা সহজে


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

আপনে তো দেখি অভিজাত বিশ্লেষক।।।।
-------
অনেক ধন্যবাদ।

________________________
বিজ্ঞান হলো প্রকৃত সত্য উদঘাটনের চলমান প্রক্রিয়া।

glqxz9283 sfy39587p07