Skip to content

কওমী মাদ্রাসা শিক্ষাঃ অন্য আলোয়-১

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

এই পোষ্টটি আমরা যারা সাধারন শিক্ষায় শিক্ষিত, কওমী মাদ্রাসা ও এর শিক্ষা ব্যাবস্থা সম্পর্কে তাদের ধারনা মতামত এবং কওমী মাদ্রাসায় শিক্ষিত মানুষদের মতামত আদান-প্রদানের প্রয়াসে ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করা হবে।

আমরা জানি সরকার এই বছরের মধ্য এপ্রিলে বাংলাদেশ কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা কমিশন গঠন করেছে। কওমী মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, শিক্ষাদানের বিষয় এবং শিক্ষা সনদের সরকারি স্বীকৃতিতে সুপারিশমালা প্রণয়ন করবে এই কমিশন। আশা করি দুই একজন কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী বা শিক্ষক এই আলোচনায় যোগ দিবেন। (যদিও কওমী মাদ্রাসার একটি ক্ষুদ্র অংশ ইন্টারনেট বা বাংলা ব্লগ ব্যাবহার করেন বলে আমার ব্যাক্তিগত মত)।

ভূমিকাঃ
একটি শিশুর মাদ্রাসায় শিক্ষা গ্রহনের সিদ্ধান্ত মোটামুটি তিনটি কারনে নেওয়া হয়ে থাকে।
১) যেহেতু মাদ্রাসা শিক্ষা বিনামূল্যে (অধিকাংশ ক্ষেত্রে) এবং এটি ধর্মীয় শিক্ষা, সেহেতু গ্রামাঞ্চলের অনেক পরিবার তাদের সন্তানকে শিক্ষা গ্রহনের জন্য মাদ্রাসায় পাঠান।
২) এতিম ও অসহায় শিশুদের জন্য অধিকাংশ মাদ্রাসায় আবাসিক ব্যাবস্থ্যা ও খাওয়া-পড়ার ব্যবস্থ্যা থাকে সেহেতু বাংলাদেশের অধিকাংশ এতিম ও অসহায় শিশু মাদ্রাসায় তাদের শিক্ষা গ্রহন করে।
৩) অনেক মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত পরিবারে পিতা-মাতার ইচ্ছে বা মানতের কারনে শিশুকে মাদ্রাসায় পাঠানো হয়।

একটি শিশু যখন ধর্মীয় প্রথম পাঠ নেয়, তখন সে যায় পাড়ার মসজিদের সাথে লাগোয়া মক্তবে, যে মক্তবের উস্তাদ হচ্ছেন সেই মসজিদের ইমাম বা মুয়াজ্জিন। শিশুর প্রথম শিক্ষা গ্রহন হচ্ছে এমন একজন মানুষের হাতে যিনি শিশুর মনস্তত্ব সম্পর্কে বিন্দুমাত্রে জ্ঞান রাখেন না, যিনি ঐ শিশু বয়েসেই তার মনে বেহেস্তের লোভ ও দোযখের শাস্তির ভয় অতি দক্ষতায় ঢুকিয়ে দেন এবং প্রশ্ন করার সহজাত প্রবৃত্তিকে ছেঁটে একটি আদর্শ ইসলামী মনন তৈরী করে দেন। অবশ্যই প্রাকস্কুল বা স্কুলের পাশাপাশি এই সহশিক্ষা শিশুর পরবর্তী জীবনে প্রভাব বিস্তার করে। মক্তবের পরবর্তী ধাপ হচ্ছে মাদ্রাসা। ‘মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিবৃত্ত শিরোনামে’ একটি চমৎকার পোষ্ট আগে আমারব্লগে প্রকাশিত হয়েছিলো।
বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা বহুধা বিভক্ত এর মধ্যে প্রধান দুই ধারা হচ্ছে আলিয়া ও কওমী। আলিয়া মাদ্রাসা মাধ্যমিক থেকে শুরু করে স্নাতোকোত্তর সমমানের সরকার স্বীকৃত সনদ প্রদান করে অন্যদিকে কওমী মাদ্রাসাও স্নাতোকোত্তর সমমানের সনদ প্রদান করে, যদিও তা সরকার স্বীকৃত নয়। আমরা এই পোষ্টে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার ব্যাপারে আলোচনার ইচ্ছে পোষন করছি। যদিও কওমী মদ্রাসার একটি বেসরকারী বোর্ড এবং কিছু বিচ্ছিন্ন বোর্ড রয়েছে, তবুও কওমী মাদ্রাসার শিক্ষা কোন একক সিলেবাসের অন্তর্গত নয়, বরং একেক মাদ্রাসায় ভিন্ন ভিন্ন সিলেবাস। কওমী মদ্রাসার প্রধান পৃষ্ঠপোষক আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া দারুল উলুম দেওবন্দ (ভারত) এবং কওমী মাদ্রাসা ও এর শিক্ষার দর্শন হচ্ছে আহ্‌লে সুন্নাত ওয়াল জামাত। ২০০৬ সালের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে রেজিষ্টার্ড কওমী মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় ১৫০০০ যেখানে প্রায় দুই লাখ শিক্ষক ও প্রায় চল্লিশ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছেন, রেজিষ্টার্ড বাদে এই সংখ্যা আরো অনেক বেশী। দেশের জনসংখ্যার একটা বিরাট অংশ একটি সতন্ত্র, নিয়ন্ত্রনহীন শিক্ষা ব্যাবস্থা গ্রহন করছেন। এই শিক্ষা ব্যাবস্থার গুরুত্ব ও ব্যাপ্তি অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। এই শিক্ষা ব্যাবস্থার অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম নয়, কওমী শিক্ষা ব্যাবস্থা আমাদেরকে উপহার দিচ্ছে কিছু ইসলামী জ্ঞান সম্পন্ন আলেম (যারা উচ্চ শিক্ষিত) এবং একটি বিশাল পরনির্ভরশীল, উৎপাদন বিমুখী জনগোষ্ঠী(মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক সমমান)।, যেহেতু এই শিক্ষা ব্যাবস্থা সরকার নিয়ন্ত্রিত নয়, সেহেতু এর অর্থনৈতিক কার্যক্রমের উপরেও সরকারের নিয়ন্ত্রন নেই, নেই অডিট বা জবাবদিহিতা (অধিকাংশ ক্ষেত্রে) এই শিক্ষা ব্যাবস্থার অন্তর্গত অধিকাংশ মাদ্রাসার আয়ের উৎস মানুষের দান ও বৈদেশিক সাহায্য।
কওমী মাদ্রাসার সিলেবাস বিভিন্ন রকমের হলেও একটি নির্দিষ্ট ছক সবাই অনুসরন করেন দেওবন্দের অনুসরনে। আর তা মোটামুটি এই রকম,

আল মারহালাতুল ইবতেদাইয়্যাহ (পঞ্চম শ্রেনী)- কুরআন শরীফ, ফিকহ, উর্দূ ও কাওয়ায়েদ, ফারসী অথবা ইংরেজী গ্রামার, বাংলা সাহিত্য ও ব্যাকরন, গনিত, সমাজ (ইতিহাস ও ভূগোল)
আল মারহালাতুল মুতাওয়াসিতাহ (নিন্ম মাধ্যমিক)- নাহব, ছরফ, আরবী সাহিত্য, ফিকহ, সীরাত, ফারসী সাহিত্য অথবা বাংলা সাহিত্য ও ব্যাকরণ
আল মারহালাতুল সানাবিয়াতুল উলইয়া (উচ্চ মাধ্যমিক)- বালাগাত, ফিকহ, উসূলুল ফিকহ, আরবী আদব, তাফসীর, ইনশা, ইলমুল ফারাইয
মারহালাতুল ফযীলাত (স্নাতক ডিগ্রী)- মিশকাত শরীফ, হাদীস, তাফসিরুল বায়যাবী, ফিকহ, আকাঈদ, উসূলুল হাদিস, ইতিহাস
মারহালাতু তাকমীল (দাওরায়ে হাদিস-স্নাতোকোত্তর ডিগ্রী)- হাদীস (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, উলুমূল হাদিস, তিরমিযী, আবু দাউদ শরীফ, নাসায়ী ও ইবনু মাজাহ শরীফ, মুওয়াত্তা ইমাম মালিক ও মুওয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ, তাহাবী শরীফ), কুরআন শরীফ (তিলাওয়াত)

উল্লেখ্য যে, বাংলা সাহিত্য ও ব্যাকরন ব্যাতীত অন্য বই (কিতাব) উর্দূ, আরবী ও ফারসি ভাষায় পাঠ্য। প্রশ্ন হচ্ছে, মাতৃভাষা থাকতে কেনো উর্দূ বা ফারসিতে শিক্ষা দিতে হবে? বাংলা ভাষাতেই কি স্নাতোকোত্তর পর্যন্ত শিক্ষা প্রদান সম্ভব নয়। দ্বিতীয় ভাষা হিয়াবে আরবী আবশ্যিক হতে পারে।

(চলবে)

মন্তব্য


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

বুঝার বিষয়


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

জন গুরুত্ব পুর্ন পোষ্ট।
কওমী মাদ্রাসার পাঠদান পদ্বতি এক ভয়াবহ চিত্র। আমার বাড়ীর পাশেই ব্রাক্ষনবাড়ীয়া জামেয়াতুল ওলোম (বড় মাদ্রাসা’র) অধীনে প্রায় ৩৬০ ছাত্র নিয়ে একটি মাদ্রাসা পরিচালিত হচ্ছে। বাড়ীতে অবস্থান কালে দুপুর - স্নধ্যা বেলায় এক অদ্ভুত চিত্র দেখা যায়। কোমলমতি শিশুরা সর্বোচ্চ ৫-৬ বছরের শিশু প্রত্যেকের হাতে ২ টা টিফিন ক্যারিয়ার থাকে, তার মানে তারা ২ বেলায় লজিং বাড়ী থেকে নিজের খাবার ও একজন সিনিয়র ছাত্র কিংবা মাদ্রাসার হুজুরের খাবার সংগ্রহে নেমে পড়ে। ঝড় বৃষ্টী যাই থাকুক ক্ষমা নেই । কারো কারো বাড়ীতে খাবার তৈরিতে সন্ধে হলে রাতের আধারে ঐ শিশুটি মাদ্রাসায় খাবার নিয়ে আসে (ছাতা নেই , টর্চ নেই)। দেরি হলে কৈফিয়ত সহ বেত্রাঘাত নির্ধারিত। মাদ্রাসায় কোন রান্না বান্না হয় না। প্রায় ৪০০ জনের খাবার চলে এলাকার মানুষের উপর জোর করে চাপিয়ে দেয়া লজিং এর নামে। আমার বাসা থেকে নিয়মিত ২ জনের খাবার দিতে হয়। অনেকটা সামাজিক ও ছোট্র শিশুর গুলির মুখে তাকিয়ে কখনো মুখে না আসেনি। গত ফেব্রয়ারী মাসে বিপিএলের সময়ে। ময়ম্নসিংহ থেকে আসা আল আমিন নামের ৫-৬ বছরের শিশুটি সন্ধ্যায় রাতের খাবার নিতে এসে সাধারন উঠুনে কিংবা বারান্দার চেয়ারে বসে থাকে কিন্তু টিভি’র রুমে খুব একটা ডুকেনা। হুজুর নাকি নিষেধ করেছে। কিন্তু ঐদিন খেলা দেখছি ওকে দেখেই ইশারায় ডাক দিলাম, ভয়ে ভয়ে সোফার পাশে গিয়ে দাড়াল। খেলা দেখাবা জিজ্ঞাসা করতেই হুজুর মারবে বলে জানাল। আমি তাকে বল্লাম নাচ গান এইসব দেখা তোমার জন্য নিষেধ খেলাতে কোন সমস্যা নেই তাছারা আজকের আমাদের দাওয়াত ছিল অন্য কোথাও তাই আজ লেট, তোমাদের জন্য রান্না হচ্ছে তুমি খেলা দেখ। সে নিশ্চিন্তে টিভি দেখছে। রান্না শেষে রাত ৮ টার দিকে আমি তাকে মাদ্রাসার মেইন গেটে পৌছে দিয়ে আসলাম। কিন্তু পর পর ২ দিন তাকে না দেখে তার স্থলে আসা অন্য শিশুটিকে জিজ্ঞেস করলাম। জবাব, হুজুর টিভি দেখার অপরাধে শিশুটিকে অমানবিক বত্রাঘাত করেছে এবং পালিয়ে যেতে যেন না পাড়ে তাকে পায়ে শিকল দিয়ে বেধে রেখেছে। মাথায় আমার বজ্রপাত!!! সত্যতা জানতে ছুটে গেলাম, হ্যাআআ মাদ্রাসার এক রুমের ভেতর লম্বা শেকল দিয়ে পায়ে তালা মেরে রাখা হয়েছে। আমাকে দেখে স্থব্ধ হয়ে রইল। কিছু না বলে র্যাব ৯ কে ফোন দিলাম র্যাব জানালো থানার ওসিকে অবহিত করতে। ওসি কে কল দিয়ে জানাতে ওসি আস্বস্ত করল এক্ষুনি ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে। এই ফাকে ওসি আমাদের ইউপি চেয়ারম্যান কে জানালেন চেয়ারম্যান স্থানীয় মেম্বার কে জানালেন ঐ মেম্বার শালায় হুজুর কে ফোন দিয়ে সব কিছু খুলে বলতেই আল আমিনকে তালা খুলে দিয়ে শাসানো হল সে যেন শিকল দিয়ে বেধে রাখার কথা অস্বীকার করে। আমি অপেক্ষায় থাকলাম ওসি’র কিন্তু এল স্থানীয় ইউপি মেম্বার। নয় ছয় ইনিয়ে বিনিয়ে বলল মাদ্রাসায় রকই হয়, "মায় বাফ ঝাঊরা (দুষ্টু) পুলাপাইনরেই মাদ্রাসসায় দেই" একটু আধটু শাসন ছাড়া মানুষ হবেনা। মেম্বারকে নিয়ে আবার মাদ্রাসায় গিয়ে দেখি আল আমিন কে জামাই আদরে রেখেছে। আর যে হুজুর এই কাজ করেছিল সে সামনে আসেনি। বড় হুজুর (প্রিন্সিপাল) আমিনি ষ্টাইলে হেসে কিল কিলিয়ে বলল, এরা আমাদেরই সন্তান শাসন করি আবার আদরও করি ইত্যাদি ইত্যাদি। মনে মনে মাদ্রাসার চৌদ্দ গোষ্টীর পুন্দে আগুন দিয়ে চলে আসলাম।

**************************************************************************
কি জানি কি মঞ্চায়.........


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

তাদের এইসব কার্যক্রম প্রায় প্রতিটি কওমী মাদ্রাসায় কমন। অনেক ধন্যবাদ আপনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করার জন্য।

----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
ন্যায় আর অন্যায়ের মাঝখানে নিরপেক্ষ অবস্থান মানে অন্যায়কে সমর্থন করা।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

নাসিম ভাই এই ব্যাপারে স্পেষালিস্ট smile :) :-) অলরেডি কমেন্ট দেয়া শুরু হইছে।

___________
জয় বাংলা,জয় বঙ্গবন্ধু


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

হ্যা, উনার অভিজ্ঞতার ঘটনা প্রায় সব কওমী মাদ্রাসায় কমন,

----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
ন্যায় আর অন্যায়ের মাঝখানে নিরপেক্ষ অবস্থান মানে অন্যায়কে সমর্থন করা।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

যদিও কওমী মাদ্রাসার একটি ক্ষুদ্র অংশ ইন্টারনেট বা বাংলা ব্লগ ব্যাবহার করেন বলে আমার ব্যাক্তিগত মত)।




কোন অংশটি---জানিয়ে বাধিত করবেন

------------------------------------------------------------
মানুষ যখন নিজের ইতিহাস ভুলতে শুরু করে তখন তার ক্ষয়ে যাওয়া শুরু হয় ------ প্রীতম


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

পুরা পোষ্ট থেকে আপনার এই অংশে জিজ্ঞাসার কারনটা বুঝলাম না। কোন অংশ তা বলতে পারবোনা, আমি দুইজনকে অনলাইনে চিনি যাদের শিক্ষা গ্রহন কওমী মাদ্রাসা থেকে।

----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
ন্যায় আর অন্যায়ের মাঝখানে নিরপেক্ষ অবস্থান মানে অন্যায়কে সমর্থন করা।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

একটা দেশের কর্মক্ষম অংশকে এভাবে অশিক্ষিত করে রাখার প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারন হবে-তা যাদের ভাবার-তারা কি ভাবছেন? মনে হয়না। সমাধান আমাদের হাতে নেই। আমাদেরকে লিখতেই হবে। বলতেই হবে।

_____________________

ক্ষুদ্র স্বার্থ ভুলে মুক্তির দাঁড় টান।

glqxz9283 sfy39587p07