Skip to content

ধর্মের ইতিবৃত্ত

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

ধর্মের ইতিবৃত্ত



আকশ মালিক



You may fool all the people some of the time; you can even fool some of the people all the time; but you can not fool all of the people all the time. অর্থাৎ, সকল মানুষকে কিছু সময়ের জন্যে বোকা বানানো যায়। কিছু মানুষকে সকল সময়ের জন্যে বোকা বানানো যায়, কিন্তু সকল মানুষকে সকল সময়ের জন্যে বোকা বানানো যায় না।— মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন (১২ ফেব্রুয়ারি, ১৮০৯—১৫ এপ্রিল, ১৮৬৫)।



মানব সমাজে বিশৃঙ্খলা, মারামারি, রাহাজানি, হানাহানি, খুনোখুনি, আর্থ-সামাজিক অবনতির অনেকগুলো কারণের মধ্যে প্রধান ও অন্যতম কারণ হচ্ছে ‘ধর্ম’(Religion)| সমাজবিজ্ঞান আর নৃবিজ্ঞানের আধুনিক গবেষণা থেকে জানা যায় আদিম-অসহায় মানুষদের অজ্ঞতা, কল্পনা আর ভয়ভীতি থেকে একদা ধর্মের উৎপত্তি; এবং এর যাত্রা শুরু প্রায় চল্লিশ হাজার বছর আগের মানুষের আরেক পূর্বপ্রজাতি নিয়ান্ডার্থাল প্রজাতি থেকে। ধীরে ধীরে সময়ের পরিক্রমায় মানুষের যেমন ক্রমবিকাশ ঘটেছে, চিন্তাচেতনার নানা স্বরূপ প্রস্ফুটিত হয়েছে বিভিন্ন আঙ্গিকে, বিভিন্ন দর্শনে, তেমনি ধর্মীয় চেতনারও বিস্তৃতি ঘটেছে ভিন্ন ভিন্নরূপে। বিছিন্ন মানুষ বনে-জঙ্গলে হিংস্র পশুর আক্রমণ, বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য সংগ্রহের সুবিধার্থে আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ (বন্যা, ক্ষরা, অধিক বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, দাবানল ইত্যাদি) থেকে রক্ষা পেতে গোষ্ঠীবদ্ধ হয়েছে, গোষ্ঠীবদ্ধ থেকে সমাজবদ্ধ হয়েছে, সমাজ থেকে রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরি করেছে; এই সমাজ কাঠামো টিকিয়ে রাখার জন্য নিজেদের মতো করে কিছু নিয়ম-কানুন, রীতি-নীতি তৈরি করেছিল, পরবর্তিতে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে প্রাক-ধর্মীয় চেতনা বিস্তার লাভ করে। দীর্ঘ সময়ে প্রাক-ধর্মীয় চেতনা যেমন আত্মার ধারণা থেকে টোটেমবাদ, টোটেমবাদ থেকে সর্বপ্রাণবাদ, সর্বপ্রাণবাদ থেকে সর্বেশ্বরবাদ, সর্বেশ্বরবাদ থেকে বহুঈশ্বরবাদ-এ মোড় নিয়েছে; তবে এগুলো সবসময় সবজায়গায় কখনো একরৈখিক ছিল না। স্থান-কাল ভেদে পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে পরিবর্তিত হয়েছে, সমন্বিত হয়েছে। ধীরে ধীরে মানুষ বহুঈশ্বরবাদ থেকে আবার একেশ্বরবাদে পৌঁছেছে। মানুষের এই সাংস্কৃতিক বিকাশের ধারা নৃবিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব, মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণা দ্বারা ইতিমধ্যে প্রমাণিত। প্রতিটি প্রাকৃতিক ঘটনার পেছনে প্রাচীন মানুষ এক বা একাধিক দেবদেবী-ঈশ্বরের উপস্থিতি কেন কল্পনা করতেন, গবেষকরা আজ তার কারণ উদ্ঘাটন করেছেন। সভ্যতার প্রতিটি যুগেই কিছু মানুষ ‘ঈশ্বরে’র অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, মানুষের মনে ‘দেবদেবী-ঈশ্বর’ সৃষ্টির যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং প্রাকৃতিক ঘটনাবলীকে প্রকৃতির নিয়ম দ্বারা ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন; যেমন গ্রিক মনীষী ডেমোক্রিটাস Democritus (খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০-৩৭০) ‘দেবদেবী-ঈশ্বরের’ অস্তিত্ব সম্পর্কে বলেন : When the man of old time beheld the disasters in the heavens, such as thundering and lightning, and thunderbolts and collision between stars, and eclipses of sun and moon, they were frightened, imagining the gods to be the cause of these things. (সেক্টসটাস এমপিরিকাস Sextus Empiricus Adv. math IX.24)| তিনি এও বলেন : Man have fashioned an image of chance as an excuse for their own stupidity. For chance rarely conflicts with intelligent, and most things in life can be set in order by an intelligent sharp sightedness. (ডায়োজেনিস লেয়ারটিয়াস ৩২ Diogenes Laertius)।



বাইবেলে বলা হয়েছে, ‘ঈশ্বর তাঁর নিজের অবয়বে মানুষ সৃষ্টি করেছেন’ (God created man in his own image ―জেনেসিস, ১:২৭)। আসলে মানুষই আপন চিন্তার মাধুরী মিশিয়ে ঈশ্বরকে নির্মাণ করেছিলো। ধর্মগ্রন্থে বর্ণীত ঈশ্বর প্রকৃতপক্ষে মানুষেরই রূপের নামান্তর। ঈশ্বর মানুষের মতো হাসেন, কাঁদেন, রাগ করেন, খুশি হন, কষ্ট পান, প্রতিশোধ নেন, পিছন থেকে আক্রমণ করে শত্রুকে হত্যা করেন, গুণগ্রাহীদের প্রতিদান দেন। মানুষের দ্বারা ‘ঈশ্বর’ তৈরি করা হয়েছে বলেই ঈশ্বরের ওপর এমন ‘নরাত্বরোপ’(anthropomorphism) করা হয়েছে। আরেক গ্রিক কবি জেনোফেনস Xenophanes (৫৭০-৪৮০ খ্রিস্টপূর্ব) বলেছেন : If oxen had hands and the capacities of men, they would make gods in the shape of oxen. অর্থাৎ ষাঁড়ের যদি মানুষের মতো হাত ও ক্ষমতা থাকতো তাহলে তারা দেব-দেবীর আকার, রূপ, চরিত্র ষাঁড়ের মতো করেই তৈরি করতো।



ঈশ্বরের নরাত্বরোপ (Anthropomorphism)



ধর্মগ্রন্থগুলো পাঠ করলে ‘ঈশ্বর’ সম্বন্ধে এক প্রবল প্রতাপশালী রাজার মূর্তিই আমাদের সামনে ফুটে ওঠে। ধর্মগ্রন্থে বর্ণীত ‘ঈশ্বর’ রাগ করেন, হিংসা করেন, তোষামোদে খুশি হন, তিনি ভালোবাসেন যাদেরকে তিনি পছন্দ করেন আর যাদেরকে তিনি পছন্দ করেন না তাদের শাস্তি দেন। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সত্যজিৎ রায়ের অমর সৃষ্টি ‘হীরক রাজার দেশে’র রাজা যেমন জোর করে হলেও প্রজাদের ভক্তি-শ্রদ্ধা-আনুগত্য আদায় করতে চান, ধর্মগ্রন্থের ঈশ্বরও তেমনি তার অনুসারীদের কাছ থেকে ভক্তি-শ্রদ্ধা এবং নিরঙ্কুষ আনুগত্য চান। সম্রাট যেমন প্রজাদের আনুগত্যহীনতায় রুষ্ঠ, ব্যথিত এবং অসন্তুষ্ট হন, ঈশ্বরও তেমনি ধর্মদ্রোহিতায় এবং ঈশ্বরদ্রোহিতায় ক্ষেপে ওঠেন। সম্রাটের যেমন থাকে কারাগার কিংবা রাজদ্রোহীকে শূলে চড়ানোর ব্যবস্থা, ঈশ্বরও তেমনি নিজের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য তৈরী করে রেখেছেন নরক। সেখানে রয়েছে ধর্মদ্রোহীদের পুড়িয়ে অত্যাচার করার নানা বন্দোবস্ত। এগুলো সবই আসলে ঈশ্বরের ওপর মানুষের নরাত্বরোপের নানা প্রমাণ। George Carlin চমৎকারভাবেই বলেছেন : Religion has actually convinced people that there’s an invisible man ─ living in the sky ─ who watches everything you do, every minute of every day. And the invisible man has a special list of ten things he does not want you to do. And if you do any of these ten things, he has a special place, full of fire and smoke and burning and torture and anguish, where he will send you to live and suffer and burn and choke and scream and cry forever and ever ’till the end of time … But He loves you!



বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, ঈশ্বর আপন প্রতিমূর্তিতে মানুষ তৈরি করেছেন। কথাটা আসলে ঘুরিয়ে বলা উচিৎ, মানুষই আপন চিন্তার মাধুরী মিশিয়ে ঈশ্বরকে নির্মাণ করেছিলো। মানুষ নিজের কল্পনায় একসময় ঈশ্বরকে গড়েছিল বলেই তার প্রকাশ হয়েছে এক ক্ষমতাধারী মানুষের বৈশিষ্টসম্পন্নভাবে।



যে ধর্ম ছিল একসময় মানুষের প্রকৃতির দুর্গেয় রহস্য ব্যাখ্যা করার অন্যতম নিয়ামক, কল্পিত আশ্রয়, হতাশ মানুষের নিরাপত্তার আচ্ছাদন, যুক্তি ও কল্পনার সমন্বয় ঘটাতে না-পারা মানুষের অবলম্বন, সেই ধর্মই আজকের যুগে গোটা সমাজের জন্য ‘দানব’রূপে দেখা দিয়েছে। গোটা ধর্মটাই ‘মৌলবাদ’ আর ‘রাজনীতির মিশেলে তৈরি; এই দুটি ধারণা ব্যতীত পৃথিবীতে কোনো ধর্মের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর এবং তা কোনো ‘প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম’ থেকে কোনোকালে বিছিন্ন ছিল না। ফলে অত্যন্ত স্বাভাবিক কারণেই সৃষ্টি হয়েছে নানা মতভেদ, নানা বিভ্রান্তি, নানা বিদ্বেষ। ধর্ম মানুষে-মানুষে শুধু জিঘাংসাই বৃদ্ধি করেছে। ধর্মগুলো তাদের নিজস্ব গ্রন্থে (হিন্দুদের বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত, মনুসহিংতা, গীতা, ইহুদিদের ওল্ডটেস্টামেন্ট, খ্রিস্টানদের নিউ টেস্টামেন্ট, মুসলমানদের কোরান-হাদিস) যে সকল সদাচার-ধর্মাচারের সুনির্দিষ্ট বর্ণনা দিয়েছে, তাই আজকের যুগে ধর্মীয় বিশ্বাসের মূল উৎস।



আমরা জানি একজন মানুষের জন্মের ওপর তার নিজের কোনো হাত নেই। যৌনসঙ্গমের সময় পিতার শরীরের প্রজননতন্ত্র থেকে প্রতিবার নির্গত বীর্যের (Semen) মধ্যে গড়ে প্রায় ২০০-৫০০ মিলিয়ন শুক্রাণু (Sperm, or spermatozoa) থাকে যা যোনি পথ দিয়ে মাতৃজঠরে প্রবেশ করে কিন্তু এর মধ্যে শুধুমাত্র একটি সপ্রাণ শুক্রাণু সাতার দিয়ে মাতৃজঠরে থাকা একটি সপ্রাণ ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হতে পারে (বাকি শুক্রাণুগুলো কয়েক ঘণ্টা পর নষ্ট হয়ে যায়) এবং উপযুক্ত পরিবেশ পেলে ঐ সপ্রাণ ‘শুক্রাণু’ এবং ‘ডিম্বাণু’ একত্রে নিষিক্ত হয়ে ভ্রুণে রূপান্তরিত হয়, ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। এ গোটা ঘটনাটিতে কোনো ঐশ্বরিক পূর্বপরিকল্পনার স্থান নেই; কারণ লক্ষাধিক শুক্রাণুর মধ্যে কোন্ সপ্রাণ শুক্রাণু কোন্ সপ্রাণ ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হবে, সেটা আগে থেকে নির্ধারণের কোনো উপায় নেই। তাই মানুষ যেহেতু তার জন্মকে নির্ধারণ বা নিয়ন্ত্রণ করে না, তাই সে কোন ধর্মাবলম্বীর ঘরে জন্মগ্রহণ করে কোন ধর্মীয় পরিচয় গ্রহণ করবে, সেটাও সে নির্ধারণ করে না। কিন্তু শিশুর জন্মের পর পিতৃপ্রদত্ত আরো অনেক কিছুর সাথে শৈশবকাল থেকে তার ওপর ধর্মীয় পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া হয়, শিশুকে ধর্মীয় বিশ্বাস মেনে নিতে বাধ্য করা হয়। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির Public Understanding of Science বিভাগের অধ্যাপক বিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স ধর্মকে জোর করে শিশুর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়াকে স্পষ্টভাষায় ‘শিশু নির্যাতন’ বা Child abuse হিসেবে অভিহিত করেছেন। অধ্যাপক ডকিন্স তাঁর The God Delusion গ্রন্থের Childhood, abuse and the escape from religion অধ্যায়ে এ নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন : Even without physical abduction, isn't it always a form of child abuse to level children as possessors of belief that they are too young to thought about? (দ্রষ্টব্য ৩১৫ The God Delusion, Page 315)|



প্রত্যেক ধর্মই স্বগর্বে বলে : “শ্রেয়ান স্বধর্মো বিগুণঃ পরধর্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ/স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্মো ভয়াবহঃ॥” অর্থাৎ স্বধর্ম যদি গুণহীনও হয় তথাপি তা উত্তমরূপে অনুষ্ঠিত পরধর্মের চেয়ে শ্রেয়; স্বধর্মে মৃত্যুও ভাল, কিন্তু পরধর্ম ভয়াবহ। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, কর্মযোগ, তৃতীয় অধ্যায়, ৩৫নং শ্লোক)। আসলে প্রতিটি ধর্ম একক কর্তৃত্ববাদ-প্রভুত্ববাদ এর পরিচায়ক; এখানে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি চর্চার কোনো সুযোগ নেই, বহুত্ববাদের কোনো মূল্য নেই, বিশ্বাসের কোনো স্বাধীনতা নেই। কিন্তু ব্যবহারিক দিক থেকে এক ধর্মের সাথে আরেক ধর্মের রয়েছে প্রচণ্ড মতভেদ-বিভেদ-বিদ্বেষ; এগুলোকে মনীষী রাহুল সাংকৃত্যায়ণ চিহ্নিত করেছেন এভাবে : “একজন যদি পুবমুখো হয়ে পূজার বিধান দেয় তো অন্যজন পশ্চিমে। একজন মাথার চুল বড়ো রাখতে বলে তো আর-একজন দাড়ি। একজন গোঁফ রাখার পক্ষে তো অন্যজন বিপক্ষে। একজন পশুর কণ্ঠনালী কাটার নিয়মের কথা বলে তো অন্যজন মুণ্ডচ্ছেদ করতে বলে। একজন জামার গলা ডানদিকে রাখে তো অন্যজন বাঁ-দিকে। একজনের যদি এঁটোকাঁটার বাছ বিচার না থাকে তো অন্য জনের নিজের জাতের মধ্যেও তেরো হাড়ি। একজন পৃথিবীতে শুধু খোদার নাম ছাড়া আর কিছু থাকতে দিতে রাজি নয় তো আর-একজনের দেবতার সংখ্যা অগণিত। একজন গো-রক্ষার জন্য জান দিতে রাজি তো অন্য জনের কাছে গো কোরবানি অত্যন্ত পুণ্যের কাজ।”



‘বাংলার সক্রেটিস’ অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ তাঁর প্রবচনগুচ্ছে বলেছিলেন :



“হিন্দুরা মূর্তিপূজারী; মুসলমানরা ভাবমূর্তিপূজারী। মূর্তিপূজা নির্বুদ্ধিতা; আর ভাবমূর্তিপূজা ভয়াবহ।”



অধ্যাপক আজাদ মুসলমানদের ভাবমূর্তিপূজারী হিসেবে অভিহিত করেন, আর আরবের (উত্তর সিরিয়া) অন্ধকবি আবু-আল-আলা আল মারি (৯৭৩-১০৫৭) মুসলমানদের হজের সময় কাবা শরিফকে বাঁ দিকে রেখে ডাইনে থেকে বাঁয়ে সাতবার প্রদক্ষিণ করা, কালো পাথরে চুম্বন বা মাথা নোয়ানো, মিনাতে ‘শয়তান’ লক্ষ্য করে পাথর মারা ইত্যাদি কর্মকাণ্ডকে মুসলমানদের ‘পৌত্তলিক ভ্রমণ’ হিসেবে উল্লেখ করেন :

People come from far corners of the land

to throw pebbles (at the Satan) and to kiss the (black) stone.

How strange are the things they say!

Is all mankind becoming blind to truth?

* * *

O Fools, awake! The rites ye sacred hold

Are but a cheat contrived by men of old

Who lusted after wealth and gained their lust

And died in baseness―and their law is dust



ইরানি সুফিবাদী কবি জালালউদ্দিন রুমি (১২০৭-১২৭৩) ‘ইসলামের প্যাগান বৈশিষ্ট্য’কে চিহ্নিত করে রসাত্মক ভঙ্গিতে বলেছিলেন : I search for the way, but not the way to the Ka'ba and the temple. For I see in the former a troop of idolaters and in the latter a band of self-worshippers. (দ্রষ্টব্য : Twenty Three Years: A Study of the Prophetic Career of Mohammad, Page 1)|



ধর্ম ও ধর্মবাদীদের কাছে একজন ব্যক্তির চিন্তার স্বাধীনতা, কর্মের স্বাধীনতার মূল্য অত্যন্ত গৌণ; গুরুতর গর্হিত কাজ! গণতান্ত্রিক রীতিনীতির চর্চা ধর্মবাদীদের কাছে ঈশ্বর-দ্রোহের সমতুল্য। ধর্মবাদীরা একজন সাধারণ ব্যক্তির নিজস্ব বোধ-অনুভূতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ইত্যাদিতে হস্তক্ষেপ করেন প্রতিনিয়ত। কোনো ব্যক্তির জন্মের পর থেকে কি নাম হবে, নামের শেষে পদবী কি হবে, কি কাপড় পড়বে, কাপড় কতটুকু লম্বা হবে, মাথায় তকি না টিকি দিবে, গরু না শূকরের মাংস খাবে, কাকে বিয়ে করবে, কিভাবে করবে, কোন্ জাত-গোত্র-বর্ণের সাথে আত্মীয়তা হবে, সন্তানকে মসজিদ না মন্দিরে পাঠাবে, কবর না আগুনে পোড়ানো হবে ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়ে ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত নির্দেশই ধর্মবাদীদের কাছে একমাত্র অনুসরণ ও অনুকরণের বিষয়; এর বাইরে কোনো ভিন্নমত গ্রহণযোগ্য নয়।



আজ থেকে দু’হাজার বছর আগে রোমান দার্শনিক-রাজনীতিবিদ লুসিয়াস আনায়েউস সেনেকা (৪ খ্রিস্টপূর্ব-৬৫ খ্রিস্টাব্দ) ধর্মের স্বরূপ উন্মোচন করেছিলেন এভাবে : “সাধারণ মানুষের কাছে ধর্ম সত্য বলে বিবেচিত, জ্ঞানীর কাছে মিথ্যে আর শাসকগোষ্ঠীর কাছে তা শোষণের হাতিয়ার।” একইভাবে প্রাচীন ভারতে বৈদিক যুগের লোকায়ত দার্শনিক চার্বাকবাদীরা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের ঈশ্বর-স্বর্গ-নরক-আত্মা-পাপ-পূন্য-যজ্ঞ ইত্যাদি রীতি-নীতির বিরোধিতা করে বলতেন : “ন স্বর্গো নাপবর্গো বা নৈবাত্মা পারলৌকিকঃ/নৈব বর্ণাশ্রমাদীনাং ক্রিয়াশ্চ ফলদায়িকাঃ॥” অর্থ হচ্ছে, “স্বর্গ বলে কিছু নেই; অপবর্গ বা মুক্তি বলেও নয়, পরলোকগামী আত্মা বলেও নয়। বর্ণাশ্রম-বিহিত ক্রিয়াকর্মও নেহাতই নিষ্ফল।”



চার্বাকরা আরো বলতেন : “যাদের না-আছে বুদ্ধি, না খেটে খাবার ইচেছ, তাদের জীবিকা হিসাবেই বিধাতা যেন সৃষ্টি করেছেন অগ্নিহোত্র যজ্ঞ, তিন বেদ, সন্নাসীদের ত্রিদণ্ড, গায়ে ভষ্মলেপন প্রভৃতি ব্যবস্থা; মাংসলোভীরাই মাংস খাবার মতলবে যজ্ঞে পশুবলির বিধান দিয়েছেন; ব্রাহ্মণদের জীবিকা হিসেবেই মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে (শ্রাদ্ধাদি) প্রেতকার্য বিহিত হয়েছে। তাছাড়া এসবের আর কোনো উপযোগিতা নেই। যারা তিনবেদ রচনা করছেন তাঁরা নেহাতই ভণ্ড, ধূর্ত ও প্রতারক। অর্থহীন বেদমন্ত্র ধূর্ত পণ্ডিতদের বাক্যমাত্র।” বৈদিক ধর্ম ও ব্রাহ্মণ সম্পর্কে চার্বাকবাদীদের এরকম যৌক্তিক প্রকাশ্য সমালোচনার কারণে রামায়ণ-মহাভারতে দেখা যায়, চার্বাকদের ‘রাক্ষস’, ‘দুর্বৃত্ত’, ‘কূটকৌশলী’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদেরকে নানাভাবে হেনস্থা করার কথা। তাদের বইপত্র পুড়িয়ে ফেলা হয়, তাদেরকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হয়, তাদেরকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। প্রতিটি ধর্মের ইতিহাসে প্রমাণ আছে, তাদের স্ব-স্ব ধর্মীয়-সমালোচনাকে কী নির্দয়ভাবে দলন, দমন পেষণ করা হয়েছে। মহাভারতের কুরু-পাণ্ডবের গুরু ভীষ্ম,স্পষ্টভাবে বলেন : “রাজাদের পক্ষে ধর্মকর্মের অনুষ্ঠানই লোকসাধারণকে বশীভূত রাখবার শ্রেষ্ঠ উপায়। রাজদণ্ডের প্রভাবেই পৃথিবীতে ধর্মের প্রচার সম্ভব হয়েছে। রাজার দণ্ডনীতি না থাকলে বেদ ও সমুদয় ধর্ম এক কালে বিনষ্ট হয়ে যায়। রাজধর্মের প্রাদুর্ভাব না থাকলে কোনো মানুষই নিজ ধর্মের প্রতি আস্থা রাখে না।” (দ্রষ্টব্য: মহাভারতের শান্তিপর্ব, ১২/৫৮-৫৯, ১২/৬৩)। রাজদণ্ডের সাথে ধর্মপ্রচারের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। যে সকল ধর্ম কখনো রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পেরেছে অর্থাৎ ধর্মবাদীদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়ণ ঘটেছে, কিংবা রাষ্ট্র বা শাসক গোষ্ঠী কর্তৃক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, তারাই আজ প্রবল বিক্রমে বেঁচে রয়েছে; আর যারা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে পারেনি, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারেনি তারা পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলীন হয়ে গেছে। আলোচনার পরিসর সীমিত রাখার স্বার্থে এখানে সংক্ষিপ্তাকারে হিন্দু ধর্মবাদীদের ক্ষমতায়ণের ধারাটি উল্লেখ করা হলো:



হিন্দু ধর্মের প্রবর্তক আর্যরা খ্রিস্টপূর্ব পনেরশো শতাব্দীতে ইরান-আফগানিস্তান অঞ্চল থেকে ভারতীয় অঞ্চলে আসেন এবং ধীরে ধীরে এ অঞ্চলের আদি অধিবাসী ভূমিপূত্র অনার্যদের (শূদ্র) বিতাড়িত করে ক্ষমতা দখল করতে শুরু করেন, এবং একসময় তারা সফলও হন। বেদভিত্তিক বৈদিক ধর্ম তারা প্রচার করতে শুরু করেন। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে সম্রাট অশোক (২৬৪-২৩৮ খ্রিস্টপূর্ব) রাষ্ট্রশক্তির দ্বারা বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তৃতি ঘটালে বৈদিক ধর্মের সাথে তীব্র দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। মৌর্য বংশের পতন, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে সুঙ্গ বংশের অভ্যুত্থান এবং খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দী সাতবাহন, গুপ্ত রাজাদের রাষ্ট্রীয় সমর্থন-পৃষ্ঠপোষকতা আর ব্রাহ্মণ শ্রেণীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বৈদিক বা ব্রাহ্মণ্য বা হিন্দু ধর্মের পুনরুত্থান ত্বরান্বিত হয়। এরপর নানা সময়ে সেনরাজারা হিন্দুধর্ম প্রচারে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছিলেন। কিন্তু যখন রাষ্ট্রশক্তি পুনরায় ইসলাম ধর্মাবলম্বী আফগান-তুর্কিদের হাতে চলে যায় তখন আবার হিন্দু ধর্মটি অস্তিত্বের সংকটে পড়ে। পরে ব্রিটিশরা এ অঞ্চলে মুসলমানদের সরিয়ে ক্ষমতা দখল করলে হিন্দু ধর্ম আবার প্রাণশক্তি ফিরে পায়। বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচিত ভারতে প্রকাশ্যে এবং পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় সুবিধা পেয়ে চলছে হিন্দু ধর্মটি।



ধর্ম আর ধর্মবাদীদের ওপর ‘মানবজাতির বিবেক’ ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের (১৬৯৪-১৭৭৮) উক্তি প্রণিধানযোগ্য। ভলতেয়ার বলেন : The first clergyman was the first sly rogue that met the first fool... অর্থাৎ “পৃথিবীর প্রথম পুরোহিত বা মোল্লা ব্যক্তিটি হচ্ছে পৃথিবীর প্রথম ধূর্ত বাটপাড়, যার মোলাকাত হয়েছিল প্রথম বোকা-নির্বোধ ব্যক্তিটির সঙ্গে; বাটপাড় ব্যক্তিটি নির্বোধ ব্যক্তিকে বুঝিয়ে-পড়িয়ে নিজের অনুগত প্রথম ভক্ত বানিয়ে ফেলে। ক্রমে পুরোহিত তথা ধর্মযাজকেরা মানুষকে বোকা বানাবার নতুন নতুন কৌশল আবিষ্কার করলেন, সৃষ্টি হল পুরোহিততন্ত্র (Priestcraft); তারা সহজ সরল মানুষের অন্ধবিশ্বাসের সুযোগে সাধারণ মানুষ অপেক্ষা উৎকৃষ্টতা ও ডিভিনিটি দাবি করলেন। দুর্বল, সরলচিত্তের মানুষেরা তাদের দাবি মেনে নিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তারা উৎপাদনশ্রম থেকে রেহাই পেলেন। পুরুষ মৌমাছি (Drone) মধুমক্ষিকার মতো তারা সাধারণের কষ্টার্জিত সম্পদ বসে বসে ভোগ করতে লাগলেন। মানুষের ধর্ম-বিশ্বাস, দুর্বলতা, বিশ্বাসপ্রবণতা, সরলতা ইত্যাদিকে হাতিয়ার করে নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে যুগে যুগে অনাচার, রক্তপাত, ডাইনি শিকার, শোষণ, নিপীড়ণ প্রভৃতির মহড়া চালিয়ে আসছেন তথাকথিত ডিভিনিটির দাবিদার ডিভিন পুরোহিতেরা।” খ্রিস্টধর্ম, পুরোহিত শ্রেণী ও রোমান ক্যাথলিক চার্চকে লক্ষ্য করে ভলতেয়ারের একটি বিখ্যাত স্লোগান: “এই কুখ্যাত বস্তুটাকে গুড়িয়ে দাও!” (Crush the Infamy!)| শুধু ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার নন, পৃথিবীর বহু দার্শনিক, চিন্তাবিদ, মনীষী, জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি যুক্তিসঙ্গত কারণে ‘ধর্ম’কে কঠিন ভাষায় আক্রমণ করেছেন। ইউরোপের অষ্টাদশ শতকের জ্ঞানবাদী আন্দোলনের (Enlightenment) তাত্ত্বিক নেতা Baran D. Holbach (১৭২৩-১৭৮৯) বলেছিলেন : We find in all the religions of the earth, ‘a God of armies’, ‘a jealous God’, ‘an avenging God’, ‘a destroying God’, ‘a God who is pleased with Carnage’...



জ্ঞানবাদী আন্দোলনের অসীম সাহসী নেতা ও পণ্ডিত ডেনিস দিদেরো (১৭১৩-১৭৮৪) পোপ তৃতীয় ক্লেমেন্ট এবং রাষ্ট্রের প্রবল বাধা অতিক্রম করে ষোল খণ্ডে পৃথিবীর প্রথম বিশ্বকোষ বা এনসাইক্লোপেডিয়ার সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। দিদেরো মনে করতেন: “ধর্মের প্রতি যে কোনো ধরনের সহানুভূতি প্রকৃতপক্ষে অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের সঙ্গে আপোষেরই নামান্তর।” (দ্রষ্টব্য: ধর্মের ভবিষ্যৎ, পৃষ্ঠা ১৬১)। শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির দিশারী-বস্তুবাদী দার্শনিক মনীষী কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩) ইউরোপের ভাববাদী দার্শনিক হেগেলের (১৭৭০-১৮৩১) আইনের দর্শনের পর্যালোচনার ভূমিকাতে বলেন “ধর্ম হল নিপীড়িত জীবের দীর্ঘশ্বাস, হৃদয়হীন জগতের হৃদয় ঠিক যেমন সেটা হল আত্মবিহীন পরিবেশের আত্মা। ধর্ম হল জনগণের জন্য আফিম। মানুষের মায়াময় সুখ হিসেবে ধর্মকে লোপ করাটা হল মানষের প্রকৃত সুখের দাবি করা। বিদ্যমান হালচাল সম্বন্ধে মোহ পরিত্যাগ করার দাবিটা হল যে-হালচালে মোহ আবশ্যক, সেটাকে পরিত্যাগ করার দাবি। তাই ধর্মের সমালোচনা হল ধর্ম যার জ্যোতির্মণ্ডল সেই অশ্রু উপত্যকার (এই পার্থিব জীবনের) সমালোচনার সূত্রপাত।”



‘ঈশ্বর মৃত’(God is dead) ঘোষণাকারী হিসেবে খ্যাত জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিক উইলিয়াম নীট্শে (১৮৪৪-১৯০০) বলেছিলেন: “যারই ধমনীতে ধর্মতাত্ত্বিকের রক্ত আছে তিনি একেবারে প্রথম থেকেই সবকিছুর প্রতি ভ্রান্ত ও অসৎ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। ... ধর্মতাত্ত্বিক যাকে সত্য বলে মনে করেন তা অবশ্যই মিথ্যা; এটিই সত্যতা নির্ণয়ের একটি মাপকাঠি।” এলবার্ট হিউবার্ট (১৮৫৯-১৯১৫) বলেন: “ধর্মতত্ত্ব হলো কিছু লোকের একটি বিষয়ের ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রচেষ্টা, যে বিষয়টি তাঁরা বোঝেন না। সত্য কথা বলা ধর্মতাত্ত্বিকদের উদ্দেশ্য নয়, ধর্মানুসারীদের খুশী করাই তাঁদের উদ্দেশ্য।” (দ্রষ্টব্য: পার্থিব জগৎ, পৃষ্ঠা ১৭)। আলবেয়ার কাম্যু (১৯১৩-১৯৬০) তাঁর The Rebel গ্রন্থে বলেন: One must learn to live and to die and in order to be a man, to refuse to be a God. অর্থাৎ একজনকে বাঁচা এবং মরার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে এবং মানুষের মতো বাঁচতে হলে ঈশ্বরকে অস্বীকার করতেই হবে। ভারতীয় বস্তুবাদী পণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ণ (১৮৯৩-১৯৬৩) ‘ঈশ্বরের অস্তিত্ব’ সম্পর্কে বলেন :

“অজ্ঞানতার অপর নাম ঈশ্বর। আমরা আমাদের অজ্ঞানতাকে স্বীকার করতে লজ্জা পাই এবং তার জন্য বেশ ভারী গোছের একটা নামের আড়ালে আত্মগোপন করি। সেই ভারী গোছের আড়ালটির নামই ঈশ্বর। ঈশ্বর বিশ্বাসের আরও একটি কারণ হল বিভিন্ন বিষয়ে মানুষের অপারগতা ও অসহায়ত্ব। ...অজ্ঞানতা আর অসহায়ত্ব ছাড়া আর কোনো কারণ যদি ঈশ্বর বিশ্বাসের পিছনে থেকে থাকে তা হল ধনী ও ধূর্ত লোকদের নিজ স্বার্থ রক্ষার প্রয়াস। সমাজে চলতে থাকা সহস্র অন্যায় অবিচারকে বৈধতা দেয়ার জন্যে তারা ঈশ্বরের অজুহাতকে সামনে এনে রেখেছেন। ...ঈশ্বর বিশ্বাস এবং একটি সহজ সরল ছোটো শিশুর নিজস্ব বিশ্বাস, বস্তুত একই। পার্থক্য শুধু এইটুকুই ছোটো শিশুটির যুক্তি ভাঙার, উদাহরণ ইত্যাদির পরিমাণ খুবই সামান্য, আর বড়োদের ওগুলো খানিকটা বিকশিত।” (দ্রষ্টব্য: তোমার ক্ষয়, পৃষ্ঠা ৩৫)।



ধর্ম নামক ব্যবস্থাটিই অমানবিক, অবৈজ্ঞানিক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন; উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়: খ্রিস্টানরা চতুর্থ শতাব্দীতে প্রাচীন প্যাগান (Pagan) জার্মানদের ‘সভ্য’ করার নামে গণহত্যা চালিয়েছিলেন বিভৎস পন্থায়। ঐ সময় কোনো কোনো প্যাগান জার্মান গোষ্ঠী ওক গাছের (Oak Tree) পূজা করতেন। যদি ওক গাছ ‘সভ্য হওয়া’ জার্মানদের পুরানো দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়, আবার তাদের পথভ্রষ্ট করে ফেলে, সে জন্য খ্রিস্টধর্মাবলম্বী রোমান সৈন্যরা জার্মানিতে প্যাগানদের হত্যা করার পাশাপাশি দেশের সব ওক গাছ কেটে দিয়েছিলেন। ধর্ম নামক ব্যবস্থা বলবৎ থাকার কারণে কিংবা ধর্মে বিশ্বাস থাকার কারণেই হিন্দুরা মনসা দেবীরূপে সাপের পূজা করেন, নদীর পূজা করেন (গঙ্গা), গরুর পূজা করেন, গরুকে নিজের মায়ের সঙ্গে তুলনা করেন, গরুর মলমূত্র দিয়ে ঘরবাড়িসহ নিজেদের পবিত্র করেন, বাঁদরের (হনুমান) পূজা করেন। মুসলমানগণ অন্য ধর্মের উপাসনার রীতিনীতিকে সমালোচনা করলেও কোরান অনুসরণ করে (সুরা ২, বাকারা, আয়াত ১৫৮, ১৮৯, ১৯৬-২০৩; সুরা ৩, আল ইমরান, আয়াত ৯৭; সুরা ২২, হজ, আয়াত ২৭) ‘হজ’-এর সময় কাবা ঘরকে কেন্দ্র করে সাতবার প্রদক্ষিণ (তাওয়াফ) করেন। বহু শতাব্দী প্রাচীন ‘হজরে-আসওয়াদ’ বা কালো পাথরে চুমু খান। ঐতিহাসিকগণ ধারণা করেন, ঐ কালো পাথরটি একটি উল্কাপিণ্ড। হাজিদের কাছে এতো শুধু পাথরে চুমু খাওয়া নয়, নবী মুহাম্মদের হস্ত মুবারকেই চুমু দেওয়া। যদিও খলিফা ওমর (রাঃ) একদা কাবা ঘরের ঐ কালো পাথরকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন :

“আমি জানি তুমি একটা পাথর ছাড়া কিছুই নও, মানুষকে সাহায্য করা বা ক্ষতি করার তোমার কোনো ক্ষমতা নেই। যদি আমি আল্লাহর রসুলকে তোমায় চুম্বন করতে না দেখতাম, আমি তোমাকে কখনো চুম্বন করতাম না; বরং কাবাঘর হতে বহিষ্কৃত করে তোমাকে দূরে নিক্ষেপ করতাম।” (দ্রষ্টব্য: বোখারি শরিফ, ভলিউম ২, বুক ২৬, নম্বর ৬৬৭)।



ধর্মের ইতিহাস বলে, একশ্বেরবাদী ধর্মগুলো সংগঠিত এবং বিকশিত হওয়ার পূর্বে মানুষ বিভিন্নভাবে প্রাক-ধর্মীয় ‘টোটেম-প্রথা’(Totemism) অনুসরণ করতো। টোটেম মানে সাধারণভাবে বিশেষ প্রজাতির প্রাণী; তবে বিশেষ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং জড়বস্তুকেও টোটেম হিসেবে পূজা করা হয়; যেমন হিন্দুরা নির্দিষ্ট ধরনের কালো রঙের পাথরকে ‘শিবলিঙ্গ’ মনে করে পূজা করেন। ইসলামপূর্ব আরবে সার্বিয়েনরা ছিলেন নক্ষত্র পূজারী, হিমিয়ারবাসীরা সূর্যের উপাসক, আসাদ ও কিয়ানা গোত্রের লোকেরা ‘আল্লাত’ দেবী হিসেবে চন্দ্রের, ‘মানাত’ দেবী হিসেবে ভেনাসের (শুক্র গ্রহ) ও ‘উজ্জা’ দেবী হিসেবে সাইরিয়াসের (লুব্ধক নক্ষত্র) পূজা করতেন। কোরানের সুরা নজমে স্পষ্টভাষায় বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ সাইরিয়াসের প্রভু’ (সুরা ৫৩, নজ্ম, আয়াত ৪৯)। আবার কোরানে অনেকগুলি সুরার নামকরণ হয়েছে প্যাগান দেব-দেবীর নামে, যেমন: সুরা ৮৬ ‘তারিকা’ নক্ষত্র দেবতার নাম, সুরা ১১০ ‘নসর’ প্রাচীন আরব্যগোষ্ঠী হিমিয়ারদের দেবতার নাম, সুরা ৯১ ‘শামস্’ মধ্যপ্রাচ্যে এক সময় ব্যাপকভাবে পূজিত সৌরদেবীর নাম। ইসলামপূর্ব আরবেও কাবা ঘরের এই পাথরকে পবিত্র মনে করে পূজা করা হতো। বর্তমানে হাজিদের কাবা শরিফে তাওয়াফের সময় পাথরে চুম্বন করা টোটেম-প্রথারই রূপান্তর মাত্র। আরবের বিখ্যাত কবি আবু-আল-আলা আল মারি ‘হজ’কে সেজন্য ‘পৌত্তলিক ভ্রমণ’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। হজের সময় হাজিরা মাথার চুল কামিয়ে ফেলেন, সাদা কাপড় (ইহরাম) পরিধান করেন, সাফা-মারওয়া পাহাড়ের মধ্যবর্তী উপত্যকা অঞ্চলে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করেন, মিনাতে কংক্রিটের তিনটি স্তম্ভকে ‘শয়তান’ বানিয়ে সাতবার করে মোট একুশটি ঢিল ছোঁড়েন। সেই ঢিলে আহত হয়ে এতোদিনে শয়তান মারা গিয়েছে কি-না জানা যায়নি, তবে শয়তানকে মারতে গিয়ে নিজেদের প্রচণ্ড অন্ধবিশ্বাস আর আবেগের আতিশয্যে পদপিষ্ট হয়ে নিরীহ হাজিরা প্রায়শই মারা যান। ২০০৫ সালে ‘শয়তান’কে পাথর মারতে গিয়ে অর্ধশতাধিক বাংলাদেশিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তিনশতাধিক হাজি মারা গেছেন। হজ ছাড়াও পশু কোরবানি প্রথার মূলে রয়েছে মানুষের টোটেম-প্রথার অনুসরণ। আরবের প্যাগান বা বহুঈশ্বরবাদীরা চন্দ্র-সূর্য গ্রহণকে পূজা করতেন তাদের ঈশ্বরের প্রকাশ বলে, কোনো কোনো উপজাতীয়রা একে পৃথিবী ধ্বংসের আলামত হিসেবে বিবেচনা করতেন। কেউ কেউ একে মানুষের জীবন-মৃত্যুর কারণ হিসেবে প্রচার করতেন। বহু ধর্মেই চন্দ্র-সূর্য গ্রহণকে কেন্দ্র করে প্রচুর পৌরাণিক কাহিনী বা মিথ (Myth) প্রচলিত রয়েছে।



ধর্মের নামে পশু হত্যা (কোরবানি) স্বার্থান্বেষী ধর্মবাদীদের সৃষ্ট আরো একটি জঘন্য ব্যবস্থা। হিন্দুরা প্রতি বছর দুর্গা পূজা-কালী পূজাতে মহাধূমধামের সাথে পাঠা বলি দিয়ে থাকেন। ইংরেজ আমলেও এই অঞ্চলের কিছু হিন্দু রাজা-জমিদার দুই পূজাতে আয়োজন করে নরবলি দিতেন। প্রাচীন আরবেও এই রীতির প্রচলন ছিল। বর্তমানে নরবলি দেওয়ার প্রথা রহিত হয়ে গেলেও পূজা উপলক্ষে পাঠা বলি দেওয়া বেশ প্রচলিত। ইহুদি-খ্রিস্টান-মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ অনুসারে: ‘নবী ইব্রাহিম একটি স্বপ্ন দেখে নিজের সন্তানকে কোরবানি দিতে নিয়ে যান, কোরবানির আগ মুহূর্তে আল্লাহর ঐশীবাণী পেয়ে সন্তানকে কোরবানি না দিয়ে একটি দুম্বাকে কোরবানি দেন।’ ইব্রাহিমের এই কর্মকে বিশ্বাস করে সারা বিশ্বের মুসলমানরা প্রতি বছর কোরবানির ঈদে লক্ষ লক্ষ পশু কোরবানি দিয়ে থাকেন। এতে তাদের বিন্দুমাত্র চিত্তবিচলিত হয় না, মনে কোনো সংশয় জাগে না; এ অপচয়-বাহুল্য ধর্তব্যের মধ্যে আনা হয় না। বাংলাদেশের অন্যতম লোকায়ত দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন : “কোরবানি প্রথার ভিত্তিমূল সুদৃঢ় নয়। একটি স্বপ্নের উপর ভিত্তি করিয়া প্রতি বৎসর লক্ষ লক্ষ পশুর জীবন নষ্ট হইতেছে। উপন্যাসকে ইতিহাস বলিয়া গ্রহণ করিলে যেরূপ ভুল করা হয়, স্বপ্নের রূপককে বাস্তব বলিয়া গ্রহণ করিলে সেইরূপ ভুল হইতে পারে না কি?... বর্তমান কোরবানি প্রথায় পশুর কোনো সম্মতি থাকে কি? একাধিক লোকে যখন একটি পশুকে চাপিয়া ধরিয়া জবেহ করেন, তখন সে দৃশ্যটি বীভৎস বা জঘন্য নয় কি? মনে করা যাক, মানুষের চেয়ে বেশি শক্তিশালী এক অসুর জাতি পৃথিবীতে আবির্ভূত হইয়া, তাহারা পুণ্যার্থে মহেশ্বর নামক এক দেবতার নামে জোরপূর্বক মানুষ বলি দিতে আরম্ভ করিল। তখন অসুরের খাঁড়ার (ছুরির) নীচে থাকিয়া মানুষ কি কামনা করিবে? ‘মহেশ্বরবাদ ধ্বংস হউক, অসুর জাতি ধ্বংস হউক, অন্ধ বিশ্বাস দূর হউক’―ইহাই বলিবে না কি?... কোরবানি প্রথায় দেখা যায় যে, কোরবানি পশুর হয় ‘আত্মত্যাগ’ এবং কোরবানিদাতার হয় ‘সামান্য স্বার্থত্যাগ”। দাতা যে মূল্যে পশু খরিদ করেন, তাহাও সম্পূর্ণ ত্যাগ নহে। কেননা মাংসাকারে তাহার অধিকাংশই গৃহে প্রত্যাবর্তন করে, সামান্যই হয় দান।... বলির পশুর আত্মোৎসর্গ না মাংসোৎর্গ? মাংস তো আহার করি এবং আত্মা তো ঐশ্বরিক দান। উৎসর্গ করা হইল কি?”



নৃতত্ত্ববিদ Robertson Smith তাঁর Religion of The Semites গ্রন্থে দেখিয়েছেন, পশু কোরবানি প্রথার মূলে রয়েছে মানুষের টোটেম-প্রথার অনুসরণ। বিশেষ অনুষ্ঠানে বা উৎসবে টোটেম প্রাণীকে হত্যা করে তাকে খাবার হিসেবে গ্রহণ করার রীতি বিভিন্ন ধর্মে বেশ প্রচলন রয়েছে। প্রাক ইসলামি আরব-সমাজে পশু ও মানুষ কোরবানি প্রথার ব্যাপক প্রচলন ছিল; কিন্তু সমাজ বিকাশের সাথে সাথে এবং সামাজিক প্রয়োজনে ‘মানুষ’ কোরবানির রীতি ধীরে ধীরে রহিত হয়ে গেছে তবে আদিম সংস্কৃতির কিছু কিছু অবশেষ যেমন পশু কোরবানির প্রথা এখনো টিকে রয়েছে।



মুসলিমদের রোজা কিংবা হিন্দুদের উপবাস নিয়ে উভয় ধর্মাবলম্বীরা প্রায়ই সমার্থক ‘বৈজ্ঞানিক যুক্তি’ প্রদান করে থাকেন। মুসলিমরা দাবি করেন বছরে একমাস দিনের বেলায় উপবাসী (রোজা) থাকা স্বাস্থ্যপ্রদ এবং সে কারণে ইসলাম ধর্মের এই বিধান ‘বিজ্ঞানসম্মত’। এমনও প্রচার আছে রোজা রাখলে পেটের আলসার (পেপটিক আলসার, যা মূলত খাদ্যগ্রহণের অনিয়ম থেকে হয়) সেরে যায়। এ ধরনের বৈজ্ঞানিক ‘গুজব’ সম্পর্কে ডা. মনিরুল ইসলাম বলেন : “রোজাকে মোটা দাগে স্বাস্থ্যপ্রদ বলা মোটেও সঠিক নয়। মানুষের যে জৈবিক ঘড়ি (Biological Clock) থাকে, রোজার সময় তার হেরফের হয় এবং শরীরে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, অবশ্য অধিকাংশ মানুষের শরীর এই অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়। দিনের বেলায় মানুষ যখন জেগে থাকে এবং কাজ করে তখন শরীরে ক্ষয়মূলক অপচিতির (Catabolism) মাধ্যমে প্রচুর ক্যালরি (শক্তি) নির্গত হয়। এ সময় বিশেষত যারা কায়িক পরিশ্রম করেন তাদের পক্ষে খাদ্য গ্রহণ না করা মোটেও স্বাস্থ্যপ্রদ নয় বরং স্বাস্থ্যহানিকর। বলা হয়, রোজার সময় খাদ্যনালী বিশ্রাম লাভ করে এবং সবল হয়ে ওঠে। এটি কোনো পরীক্ষিত ব্যাপার নয়। দীর্ঘ উপবাস (৮ ঘণ্টার উপরে) অন্ত্রের আলসার বা ঘা বাড়িয়ে তোলে। কিছু কিছু পেটের রোগে সাময়িক উপবাস চিকিৎসার একটি অঙ্গ, কিন্তু সে সব রোগগ্রস্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক মানুষের সাথে তুল্য নয়। এবং এদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় খাদ্যপুষ্টি ও ঔষধ শিরার মাধ্যমে প্রদান করা হয়ে থাকে।”



রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানুষের ‘ধর্মীয়মূঢ়তা’কে উদ্দেশ্য করে রাশিয়ার চিঠিতে বলেছিলেন : “যে ধর্ম মূঢ়তাকে বাহন করে মানুষের চিত্তের স্বাধীনতা নষ্ট করে, কোনো রাজাও তার চেয়ে আমাদের বড় শত্র“ হতে পারে না―সে রাজা বাইরে থেকে প্রজাদের স্বাধীনতাকে যতই নিগড়বদ্ধ করুক-না। এ পর্যন্ত দেখা গেছে, যে রাজা প্রজাকে দাস করে রাখতে চেয়েছে সে রাজার সর্বপ্রধান সহায় সেই ধর্ম যা মানুষকে অন্ধ করে রাখে। সে ধর্ম বিষকন্যার মতো; আলিঙ্গন করে সে মুগ্ধ করে, মুগ্ধ করে সে মারে। শক্তিশেলের চেয়ে ভক্তিশেল গভীরতর মর্মে গিয়ে প্রবেশ করে, কেননা তার মার আরামের মার।... ধর্মমোহের চেয়ে নাস্তিকতা অনেক ভালো।”



একটি সমাজের জনসাধারণের পক্ষে অর্থ-সম্পদজনিত সমস্যার সমাধান মোটেই অসম্ভব নয়। বর্তমানে পশ্চিমের অনেক দেশ বিভিন্ন ধরনের সমাজকল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করে সেই সমস্যার সমাধান করতে পেরেছে; কিন্তু সমাজে ধর্ম কর্তৃক সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা, মারামারি ও সংঘাতের সমাধান আদৌ লক্ষণীয় নয়। ধর্মবিশ্বাস মানেই পরমত অসহিষ্ণুতা, এবং তা না থাকলে নিজের ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তি থাকে না। ধর্ম মনুষ্যত্বের নয়, কতিপয় গোষ্ঠী-গোত্রবাসীর স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার মাত্র। ধর্ম মানুষের মাঝে একতা গড়ে তোলে না, আনে বিদ্বেষ; যা প্রকারান্তরে রূপ নেয় উগ্র, হিংস্র, জংলী আচরণে। কোনো ধর্মই গণমানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং মানবিক মুক্তির পথ দেখায় নি; করেছে কেবল শাসকগোষ্ঠীর ক্লান্তিকর তাবেদারি। ‘মানব মুক্তি’র যে ধর্মীয় শিক্ষা বা নির্দেশনা দেয়া হয়ে থাকে তা কল্পিত এবং পারলৌকিক, ইহজাগতিক নয়। তাই গরীব মানুষ আরো গরীব হয় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, নিয়ম-নীতি কঠোরভাবে পালন ও অনুসরণ করে; আর ধনী আরো ধনী হয়—ভণ্ডামির মধ্যে লালিত হয়ে। জগতে ধর্মে বিশ্বাসীরা অন্য ধর্মের ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব-কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে, মানব সভ্যতার গোড়া থেকে অগণিত মানুষ খুন করেছেন এবং আজও সে ধারা অব্যাহত আছে। ধর্ম আজ ‘মানব-সভ্যতার কলঙ্ক’ হয়ে দেখা দিয়েছে। এক ধর্ম অন্য ধর্মকে শুধু ঘৃণা করে না, নিজেদের মধ্যেও প্রচণ্ড ঝগড়া, ফ্যাসাদ, আগ্রাসন, হত্যা, হুমকি, উন্মাদনা সৃষ্টি করে। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান কেউই দাবি করতে পারবেন না, তাদের মধ্যে ধর্মীয় মতানৈক্য, দলাদলি, মারামারি নেই। যারা এই সত্যকে অস্বীকার করেন তারা অবশ্যই প্রতারক-মিথ্যেবাদী বা জ্ঞান-পাপী।





চলবে-

২য় পর্ব-

মন্তব্য


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

“হিন্দুরা মূর্তিপূজারী; মুসলমানরা ভাবমূর্তিপূজারী। মূর্তিপূজা নির্বুদ্ধিতা; আর ভাবমূর্তিপূজা ভয়াবহ।”

(Y) (Y) =D>


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

ব্লগে কম আসা হয় তাই অনেক ভালো পোস্টই চোখের আড়াল হয়ে যায়! আপনার ই বুকটা ডাউনলোড করলাম মুক্তমনা থেকে। যাই হোক ভালো থাকবেন আর লেখাতে অনেক অনেক তারা দাগাইলাম!


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

পরে সময় নিয়ে পড়বো।

----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
ন্যায় আর অন্যায়ের মাঝখানে নিরপেক্ষ অবস্থান মানে অন্যায়কে সমর্থন করা।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

(Y) (Y)


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

(Y) (Y) (Y) (Y) (Y)


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

টেকনিক্যালি হয়তো ভুল বলা যায় না তবুও একটু দেখেন-

"জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সত্যজিৎ রায়ের..." কথাসাহিত্যিক বিশেষণটি সত্যজিতের বেলায় ঠিক খাটে বলে মনে হয় না। চলচ্চিত্রকার বেশী মানায়।



"মহাভারতের কুরু-পাণ্ডবের গুরু ভীষ্ম..."

যতদূর মনে পড়ে ভীষ্ম ঠিক গুরু ছিলেন না। তিনি তাদের প্রপিতামহ। এই বিশেষণটিই বেশী ব্যবহার করা হয়।

আর গুরু হিসাবে দ্রোণাচার্য ছিলেন অস্ত্রগুরু, আর কৃপাচার্য খুব সম্ভবত দীক্ষাগুরু বা ধর্মগুরু।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

ভাই বুদ্ধু ,মুসলমানরা ভাব পুজারি কিনা তা অক্কা পাওয়ার পর বুঝতে পারবেন। বাংলার সক্রেটিস হয়তো ইতিমধ্যে বুঝে ফেলেছেন।সবুর করেন সব জানতে পারবেন।

glqxz9283 sfy39587p07