Skip to content

মাদ্রাসা-বোর্ডের দাখিল-পরীক্ষার ফলাফল বিপর্যয়-রোধে এবার লাগামহীন গ্রেস-নাম্বার দেওয়া হয়েছে

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি



মাদ্রাসা-বোর্ডের দাখিল-পরীক্ষার ফলাফল বিপর্যয়-রোধে এবার লাগামহীন গ্রেস-নাম্বার দেওয়া হয়েছে
সাইয়িদ রফিকুল হক

২০১৭ সালে মাদ্রাসা-বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এসএসসি-সমমান ‘দাখিল-পরীক্ষায়’ ভয়াবহ ফলাফল বিপর্যয় ঘটতো। পরীক্ষার শুরুতেই তা বোঝা গিয়েছিলো। বিশেষতঃ গণিত-পরীক্ষার পরে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা একেবারে ভেঙ্গে পড়েছিলো। চলতি-বছর থেকে তাদের গণিত-পরীক্ষা সৃজনশীলপদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। আর এতেই অধিকাংশ শিক্ষার্থী হয়েছিলো ধরাশায়ী। এছাড়াও অন্যান্য বিষয়েও শিক্ষার্থীরা ব্যাপকভাবে ফলাফল বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতো।

পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময় থেকেই দেখা যায়, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা কয়েকটি বিষয়ে ব্যাপকভাবে অকৃতকার্য হচ্ছে—ফেল করছে। এইসব বিষয় হলো: সাধারণ গণিত, উচ্চতর গণিত, বিজ্ঞান (পদার্থ ও রসায়ন), ইংরেজি, আরবি (প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র) ও কুরআন। সবচেয়ে বেশি অকৃতকার্য হয়েছিলো সাধারণ গণিতে (এটি সকল বিভাগের জন্য আবশ্যিক বিষয়)।



ঢাকার মোহাম্মদপুরের একটি ফাযিল-মাদ্রাসার গণিতের শিক্ষক (এম.এসসি., বি.এড.; নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক) জানালেন, এবার তিনি সাধারণ গণিতের ২০০টি উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেছিলেন—আর এতে কৃতকার্য হয়েছিলো মাত্র ৬২জন। তাও প্রায় সকলেরই নম্বর ছিল চার-এর ঘরে। বাকী ১৩৮জন শিক্ষার্থী খুব কম নম্বর পেয়ে ফেল করেছিলো।

আরেকজন শিক্ষক মাদ্রাসা-বোর্ডের ‘কুরআন-বিষয়ে’র নিয়মিত পরীক্ষক (নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক) মাওলানাসাহেব জানালেন, তিনি চলতি-বছর দাখিল-পরীক্ষার ‘কুরআন-বিষয়ে’র ২০০টি খাতা (উত্তরপত্র) মূল্যায়ন করেছিলেন—আর এতে কৃতকার্য হয়েছিলো মাত্র ৮৪জন! বাদবাকী ১১৬জন শিক্ষার্থী খুব কম নম্বর পেয়ে ফেল করেছে। আরও একটি মজার-অবিশ্বাস্য ঘটনা হলো—এই বৎসর দাখিল-পরীক্ষার সময় মোহাম্মদপুর-কেন্দ্রে (‘কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদ্রাসা’য়) পাশ্ববর্তী মাদ্রাসার সুলাইমান নামক এক পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছিলো—আর সে আরবি প্রথম পত্রের দিন নকল করে হাতেনাতে ধরা পড়েছিলো—তবুও তার পরীক্ষা বাতিল করেনি কেন্দ্র-কর্তৃপক্ষ। এক্ষেত্রে, শুধু তার খাতাটি তাকে আর দেওয়া হয়নি। প্রায় একঘণ্টা সে আর-কিছু লিখতে পারেনি। আর এই শিক্ষার্থীও এবছর দাখিলে এ+ পেয়েছে!

মাদ্রাসার একজন ইংরেজি-বিষয়ের শিক্ষিকা জানালেন, মাদ্রাসার ছেলে-মেয়েদের খাতা দেখতে হয় চোখ বন্ধ করে। কারণ, চোখ খুললে এদের বেশিরভাগই অকৃতকার্য হবে—আর এক্ষেত্রে, কমপক্ষে ৮০ভাগ ছেলে-মেয়ে ফেল করবে! তিনি আরও জানালেন, মাদ্রাসা-বোর্ডের খাতা তিনি আর দেখবেন না। এগুলো মূল্যায়ন করা খুব ঝামেলা। সাধারণ পরীক্ষক হলে—প্রধান পরীক্ষকগণ বেশিরভাগ ছেলে-মেয়েদের পাস করিয়ে দিতে বলেন—কখনও-কখনও এব্যাপারে চাপসৃষ্টি করেন! আবার প্রধান পরীক্ষক হলেও বোর্ডের চাপে নাভিঃশ্বাস! এরচেয়ে মাদ্রাসা-বোর্ডের খাতা না দেখাই ভালো। এবারও মাদ্রাসা-বোর্ড প্রধান পরীক্ষকদের উপর চাপসৃষ্টি করে ৪০ভাগ পাসের হারকে ৭৬ভাগ করতে সক্ষম হয়েছে।

চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশ করে (প্রমাণসাপেক্ষে) দেখা গেছে, এবছর টেনেটুনে মাদ্রাসা-বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত দাখিল-পরীক্ষায় সর্বসাকুল্যে পাসের হার হয়েছিলো মাত্র ৪০ভাগ! আর এটিকে বর্তমানে গায়ের জোরে ঢালাওভাবে ‘গ্রেস-নাম্বার’প্রদান করে তা করা হয়েছে ৭৬ভাগ!

মাদ্রাসা-বোর্ডে এবছর গায়ের জোরেই ৭৬ভাগ পাস দেখানো হয়েছে। এর যথেষ্ট প্রমাণ মিলবে চলতি-বছরের দাখিল-পরীক্ষার—সাধারণ গণিত, বিজ্ঞান (পদার্থ ও রসায়ন), ইংরেজি, আরবি ও কুরআন বিষয়ের উত্তরপত্রগুলোতে। এখানে, অধিকাংশ সাধারণ পরীক্ষকগণ যথাযথভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেছিলেন। আর এগুলো মূল্যায়ন-শেষে তারা জমা দিয়েছিলেন স্ব-স্ব ‘প্রধান পরীক্ষকে’র নিকট। কিন্তু প্রধান পরীক্ষকের কাছে এসে এগুলো (খাতাগুলো) ভয়াবহ কাঁটাছেঁড়ার সম্মুখীন হয়। আর প্রধান পরীক্ষক সাহেবরা মাদ্রাসা-বোর্ডের পরীক্ষানিয়ন্ত্রকদের পরামর্শ মোতাবেক গণিত, বিজ্ঞান ও ইংরেজিসহ অন্যান্য বিষয়ে ব্যাপকহারে গণনাম্বার প্রদান করতে থাকে। এর ফলে তারা কিছুটা ফলাফল-বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠে। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো অনেক প্রধান পরীক্ষকও গণহারে নাম্বার প্রদান করতে অসম্মতি জানিয়েছিলেন। মাদ্রাসা-বোর্ড ৪০ভাগ পাসকে ৭৬ভাগে উন্নীত করেছে কীসের বলে?

জোর করে কাউকে ‘আলেম’ বানানো যায় না। তাই, আগাছা-পরগাছাদের পাসের হার ঠেকাতে না পারলে জাতির মেরুদণ্ড ভেঙ্গে পড়তে বাধ্য।

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
০৬/০৫/২০১৭

glqxz9283 sfy39587p07