Skip to content

আদিবাসী-উপজাতি-পাহাড়ি-ক্ষুদ্র ণৃগোষ্ঠী

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

কোন একটা অঞ্চলে বহিরাগত আসার আগ পর্যন্ত যারা বাস করে আসছেন, তাঁরা .যেমন, রেড ইন্ডিয়ানরা আদিবাসী। নি:সন্দেহে। আমাজনের ধার ধরে কমবেশি দুইশত গোত্র আছেন, যারা আরব এবং ইউরোপীয়ানদের আগমনের আগ থেকেই একা বসবাস করছেন।

উপজাতি- শব্দটাই মানবজাতির জন্য ভয়ানক লজ্জার। অ্যাবঅরিজিনি। মানে অরিজিনের দিক দিয়ে যারা অ্যাবনর্মাল। তেমনি উপজাতি- মানে, পৃথিবীর সব জাতি হল জাতি, আর কিছু মানুষের সংখ্যা কম বলে তারা জাতিরও উপ। এবং অবশ্যই, সেই সেন্সে, সেই জাতিরও উপ থেকে যারা মানব আসেন, তারা হবেন, উপমানব?

পাহাড়ি- শব্দটা খারাপ কিছু নয়। সমতল ওয়ালা, পাহাড়ি। একটা সুন্দর মাদকতাও আছে শব্দটার মধ্যে।

ক্ষুদ্র ণৃগোষ্ঠী- সেই একই কথা। একজন মানব কীভাবে ক্ষুদ্র মানব হন? আর একটা মানবগোষ্ঠীই বা কীভাবে ক্ষুদ্র ণৃগোষ্ঠী হয়? সংখ্যা দিয়ে ক্ষুদ্র-বৃহৎ কি গণনা করা যায়? ভারতে একশ কোটি লোকের বাস বলে কি আমরা পনের কোটি বাঙালি সবাই দুই ফুট করে খাটো? জাতিগোষ্ঠী কি চালের বস্তা- যে ক্ষুদ্র-বৃহতে বিভাজ্য? নাকি মানুষ চাল? আমাদের কথিত ক্ষুদ্র ণৃগোষ্ঠীর মানুষটা যখন আকাশের দিকে তাকান, তার চোখের তারা কি আকাশের দুটা কম তারার সাথে যুক্ত হয়, যে তিনি ক্ষুদ্র হবেন?

একটা বিষয় আমরা ভুলে যাচ্ছি। আমরা যারা বাঙালি, তারা পরম সৌভাগ্যক্রমে মোটামুটি একটা বৃহৎ জাতি দিয়ে গঠিত একটা অখন্ড দেশ পেয়েছি। এই রাজকপাল কিন্তু পৃথিবীর হাতেগোনা কয়েকটা দেশের আছে। পূর্ব এশিয়ায় বেশিরভাগ দেশ, মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ দেশ। ব্যস। আর কোথাও নেই।

তাই বলে দেশটা কিন্তু বাঙালির হয়ে যায়নি।
ভূমি কখনো কোন ণৃগোষ্ঠীর হয় না- এতটা উন্মোচিত চোখ আমাদের হয়ে না থাকলে অপেক্ষায় থাকুন, হবে একদিন।
এই সাদা-কালো-হলুদ-তামাটে মানুষগুলো সব উঠে এসেছিল আফ্রিকার তখনকার ঘনসবুজ পাতার আড়াল থেকে।
ওই আফ্রিকার ঘনসবুজ পাতার আড়াল ছাড়া, সারা পৃথিবীর আর কোন ভূমিকে 'নিজের' বলে দাবি করার অধিকার নীতিগতভাবে সুনির্দিষ্ট কোন জাতি কিন্তু রাখতে পারে না।
যখন একটা ভূমিতে আরো অন্য জাতির একজনও নাগরিক আছেন, ওই ভূমিকে কোন নির্দিষ্ট জাতির বলে বিবেচনা করাটা ইহুদিবাদী ধারণারই নামান্তর। হিন্দুত্বের নামে আর্যবাদিতা, বহিরাগত আর্যের সামনে আর সব অনার্যের অস্পৃশ্যতা, সেই হিটলারের বেটার রেসের ধারণা...একই কথা। বাংলা নামে দেশ হতে পারে, এই দেশ কখনো শুধু বাঙালির হতে পারে না, কোন দিনই শুধু মুসলমানের হতে পারে না।
যতদিন এই ভাবটা বজায় থাকবে, ততদিন আমি আর হিটলার-সার্ব এর মধ্যে কোন পার্থক্য থাকবে না। কোন জাতি নিজেকে হিটলার আকারে সুস্থ মস্তিষ্কে থাকা অবস্থায় দেখতে চায়?
আমার দেশটার নাম বাংলাদেশ। এদেশের ৯৯.৯৯৯% মানুষও যদি বাঙালি হয়, যদি মুসলমান হয়, তা কোনদিনই শুধু বাঙালির দেশ হতে পারে না। শুধু মুসলমানের দেশ হতে পারে না।
বস্তুত পুরো পৃথিবী মানবের, আর পুরো পৃথিবীতেই মানুষ অভিবাসী।
রূঢ় বাস্তব বড়ই কঠিন।

কথা সত্যি, চাকমা-মারমা সহ ১৭-১৯ জাতিগোষ্ঠী কেউই এখানকার আদিবাসী নন। তাঁদের আদিবাসী বলাটা হবে আরেক সীমালংঘন।
আদিবাসী তারাই, যারা বহিরাগত আসার আগ পর্যন্ত কোন অঞ্চলে একা বসবাস করেন। বাংলাদেশে যদি আমাদের এই প্রায় বিশ জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী বলা হয়, তাহলে অতু্ক্তি হবে।
বাঙালিও আদিবাসী নয়। বাঙালিও মিশ্রজাতি।
সাড়ে তিন হাজার বছর আগে যখন উয়ারী-বটেশ্বরে বসবাস, তখন আমাদের এই সিনো-মঙ্গোলয়েড-তিবেতান জাতিগোষ্ঠী পদার্পণ করেননি পার্বত্যে।
দু হাজারেরও বেশি বছর আগে, শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর যখন চৈনিক অঞ্চলে বোধের আলো জ্বালতে জ্বালতে সামনে এগুচ্ছিলেন, তখনো জাতিগোষ্ঠীগুলো পদার্পণ করেননি বলেই ধরা হয়।
তাহলে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে যদি আমাদের এই জাতিগোষ্ঠীগুলোকে আদিবাসী বলা হয়, তা নিতান্তই সত্যের সরাসরি প্রত্যাখ্যান ও মিথ্যার লালন। কিন্তু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে না ধরে যদি পার্বত্যের পরিপ্রেক্ষিতে ধরা হয়, তাহলে বিপদ আরো বাড়ে।

তখন কিন্তু তাদেরকে আর আদিবাসী বলা যায় না, বলতে হয়, পার্বত্যের আদিবাসী। এবং বাংলাদেশটা এতই আকৃতিতে ক্ষুদ্র যে, এখানে পার্বত্যের আদিবাসী ও সমতলের তার থেকেও আগে থাকা বাঙালি 'আদিবাসী' দের মধ্যে এভাবে পার্থক্য টানা হবে একদিক দিয়ে হাস্যকর। এটা অ্যামাজন বেসিন নয়, নয় হিমালয় পর্বতমালা- যদিও আমাদের পার্বত্য হিমালয়েরই ভগ্নাংশ। এ দেশের ভিতরে এমন কোন দুর্গম এলাকা নেই, যেখানে পায়ে হেঁটে সপ্তাহখানেকে যাওয়া যায় না। তাহলে আমরা কীভাবে নিশ্চিত হব সেখানে অভিবাসী প্রথম কারা? এখানে তো এমন কোন জায়গা নেই, যেখানে অভিবাসী হতে হলে তিন মাস, পাঁচ মাস পায়ে হেঁটে যেতে হয়, এবং পথে আরো এত বেশি সংখ্যক জনগোষ্ঠী আছে, যে তারা ওই পথেই বিনাশ করে দিবে!

বাংলাদেশ সরকার এই জাতিগোষ্ঠীগুলোকে আদিবাসী বলছে না, কারণ তাদের মাইগ্রেশন ছিল নিকট অতীতে। ভাল। কিন্তু ণৃগোষ্ঠীসত্বায় ক্ষুদ্রত্ব আরোপ বাংলাদেশের একত্রিত জাতিসত্বায় কালি লেপে দেয়। ঠিক ওই উপজাতি যেমন অবমাননার, অ্যাবোরিজিনির বাংলা অর্থ- ব্রিটিশরা যে কোন অঞ্চলের জনসংখ্যায় কম এবং নিজ সংস্কৃতিতে আবদ্ধ জাতিকে নাম দিত অ্যাবোরিজিনি, যাদের উৎপত্তি অস্বাভাবিক, যেন মানুষ আর পশুর মধ্যে মিসিঙ লিঙ্ক! ছি:!

মানুষের মধ্যে আবার জাতি নিয়ে ভাগাভাগি কেন? মানুষের সবচে বড় পরিচয় নয়, একমাত্র পরিচয় হল, সে মানব!
সে একা, এই ছোট্ট শরীরটার ভিতরে পুরো গ্যালাক্সির সমস্ত রহস্যের সমান রহস্য, সমস্ত হিসাবের সমান নিকাশ, সমস্ত কম্পিউটারের যোগফলের কাছাকাছি ক্ষমতাবান মস্তিষ্ক নিয়ে মুগ্ধচোখে চাইতে শিখেছে।

এতই যদি জাতিগতভাবে বলতে ইচ্ছা হয়,
বাঙালিকে যেমন বাঙালি বলেন, আরো ভাললাগলে একেবারে ভেঙে ভেঙে সিলটি, চাঁটগায়া বলেন, সেভাবে চাকমা-মারমা কে তাদের নিজ নিজ নামে ডাকুন না কেন? তাতেও যদি ভাল না লাগে, যদি শখ করে ওই তাদেরকে এক নামে ডাকতে ইচ্ছা হয়, ডাকুন না পাহাড়ি নামে, নয়ত সতের জাতিগোষ্ঠী নামে, কিন্তু মানবতার অপমান আর ভাল লাগে না।

মন্তব্য


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

ভালো লেখা লিখেছেন, চিন্তার খোরাক আছে অনেক। কিন্তু অ্যাব অরিজিন শব্দটি সম্ভবত অ্যাবনরমাল অরিজিন থেকে আসেনি। এটা ল্যাটিন ab origine থেকে এসেছে, ল্যাটিন ab origine মানে Latin . from the very beginning; from the source or origin.


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

ধন্যবাদ ভাই।

আর ওই যে, বিগিনিঙ, সোর্স, এটা তো মিসিঙ লিঙ্কের মতই হয়ে গেল। অর্থ ভিন্নও হতে পারে... কিন্তু শব্দটার ব্যবহার খুবই বাজে লাগে আমার কাছে।

-- -- --


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

তাদের সম্মিলিতভাবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নামকরনের প্রস্তাব স্বয়ং সন্তু লারমার। পাহাড়ী টার্মটা এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে না, কারন সমতলেও আছে সাঁওতাল, ওঁরাও ইত্যাদি জনগোষ্ঠী। আপনি পৃখক পৃথক ভাবে তাদের নিজস্ব নৃ-সত্বার ভিত্তিতে তাদের ডাকতে বলেছেন, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু সম্মিলিতভাবে তাদের কি নামে ডাকবেন?

_____________
কবে কোন প্রদোষকালে
এসেছিলে হেথা হে প্রাকৃতজন
এ বিলের জেলেদের জালে
পেয়েছিলে কবে সে রুপকাঞ্চন


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

বিশ্লেষণে সহমত।

কিন্তু সন্তু লারমা প্রস্তাব করলেই যে তা গ্রহণীয় হবে, এমন তো না! আমি তাঁদের কারো কারো মুখেই শুনেছি, নিজেদের উপজাতি বলতে, তাতে তো তাঁরা উপজাতি হয়ে গেলেন না।

সাঁওতাল-ওঁরাও জাতি কিন্তু পুরোপুরি সমতলের নয়।
পাহাড়-পাদদেশ অথবা বরেন্দ্র-উচ্চভূমির।

আমিও তাই ভাবি, কী নামে ডাকা যায়।
হয়ত ণৃতাত্বিক জাতিসত্বা নামে ডাকা যায়, হয়ত আইসোলেটেড অর্থে সংরক্ষিত জাতিগোষ্ঠী, এসব নামে। গড়পড়তা পাহাড়ি নামটাই আমার সবচে সচল আর নির্ভার লাগে। জটিলতা নেই, নেই অসম্মানের গন্ধ।

-- -- --


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

সমতলেও আছে সাঁওতাল, ওঁরাও ইত্যাদি জনগোষ্ঠী। আপনি পৃখক পৃথক ভাবে তাদের নিজস্ব নৃ-সত্বার ভিত্তিতে তাদের ডাকতে বলেছেন, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু সম্মিলিতভাবে তাদের কি নামে ডাকবেন?
চলনামৃত'র পাশাপাশি আমারও জানতে ইচ্ছে হচ্ছে;সম্মিলিতভাবে তাদের কি নামে ডাকা যায়।

.
.
__________________
অপণা মাংশেঁ হরিণা বৈরী।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

আসুন না,
সারা দুনিয়া যেভাবে ডাকুক,
আমরা মানবের একটা সম্মানজনক বচন প্রচলন করি। সেটাই বলে যাই। কী হতে পারে সেটা?

-- -- --


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

সাঁওতাল-ওঁরাও জাতি কিন্তু পুরোপুরি সমতলের নয়।
পাহাড়-পাদদেশ অথবা বরেন্দ্র-উচ্চভূমির।

আমিও তাই ভাবি, কী নামে ডাকা যায়।
হয়ত ণৃতাত্বিক জাতিসত্বা নামে ডাকা যায়, হয়ত আইসোলেটেড অর্থে সংরক্ষিত জাতিগোষ্ঠী, এসব নামে। গড়পড়তা পাহাড়ি নামটাই আমার সবচে সচল আর নির্ভার লাগে। জটিলতা নেই, নেই অসম্মানের গন্ধ।
সাঁওতাল, ওঁরাও পুরোপুরি সমতলের, তারা চাঁপাই নবাবগঞ্জ, নওগাঁ, দিনাজপুর, বগুরা, নাটোর সিরাজগঞ্জ ইত্যাদি জেলায় বসবাস করে, যা পুরোপুরি সমতল ভূমি, সেখানে কোন পাহাড় কিংবা উচ্চভূমি নেই।

তারা নৃ-তাত্বিক জাতিসত্বা নয়, নৃ-তাত্বিক জাতিগোষ্ঠী(কারন এটি বিশেষ্য) হতে পারতো, কিন্তু সমস্যা হলো বাঙালীরাও তো একটি নৃ-তাত্বিক জাতিগোষ্ঠী।

_____________
কবে কোন প্রদোষকালে
এসেছিলে হেথা হে প্রাকৃতজন
এ বিলের জেলেদের জালে
পেয়েছিলে কবে সে রুপকাঞ্চন


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

সহমত।

-- -- --

glqxz9283 sfy39587p07