Skip to content

প্রভু

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

(প্রভু আপনি সকল ক্ষেত্রে কৌশল অবলম্বন করেছেন। কিন্তু আপনি বোধ হয় বুঝতে পারেননি যে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে যে কোন অর্জন স্থায়ী ভাবে ধরে রাখতে হলে সবচেয়ে ভাল কৌশল হলো কোন কৌশল অবলম্বন না করা।)

The Lord

কাঠুরিয়া : আপনি আমাদের প্রভু, আমরা সারাক্ষণ আপনার পূজা করি, আপনার গান করি, আপনার স্তব করি, আমাকে একমুঠো ভাত দিন প্রভু। আমার দেওয়া একমুঠো ভাত আপনার ঘরে সাত মুঠো ভাত হয়ে ফিরে আসবে। আমি সাত জনম আপনার দাস হয়ে থাকব প্রভু। আমার সাত পুরুষ আপনার দাস হয়ে থাকবে।

প্রভু : তোমার ভুখ আমার ভুখ, তোমাদের দুঃখ আমার দুঃখ, এক বস্তা চাল তোমাকে দিলাম। যাবার সময় আমার গুদাম ঘর থেকে নিয়ে যাবে। যা তুমি খাবে, তোমার মাকে খাওয়াবে, তোমার স্ত্রীকে খাওয়াবে, তোমার সন্তানকে খাওয়াবে।

কাঠুরিয়া : মঙ্গল হোক প্রভুর, মঙ্গল হোক, প্রভুর সমস্ত ধন সাতগুণ হয়ে যাক। প্রভু আপনি আমাকে যে চাল দান করেছন তাতে আমার এক মাস চলে যাবে। হে প্রভু আমি এখান থেকে অর্ধেক চাল বিক্রি করে যদি একটি কুড়াল ক্রয় করি তা দিয়ে কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করে যে উপার্জন হবে তা দিয়ে আমার সংসারের চাল সারা বছর ধরে কিনতে পারব প্রভু।

প্রভু : বৃক্ষ তোমাদের জীবন বাঁচায়, বৃক্ষ থেকে তোমার ফল পাও, ফুল পাও, জীবনের জন্য আহার পাও, আমার দেওয়া চাল বিক্রি করি তুমি কিনা সেই বৃক্ষ নিধন করবে, প্রকৃতিকে উজাড় করবে? তুমি জান কি তোমার এই ভুল পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিতে পারে, পৃথিবীর জীবকুলের জীবন বিপন্ন করতে পারে।

কাঠুরিয়া : আমাকে ক্ষমা করুন প্রভু আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি আর কখনও এরকম মরণ ঘাতি কাজ করার কথা চিন্তা করব না।

প্রভু : তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। গোমস্তা যাও ওকে এক বস্তা চাল দিয়ে দাও। আমি চাইনা আমার এলাকায় কেউ ভুখে কষ্ট করে দিন চালাক।
___________

গোমস্তা : প্রভু একজন ধীবর এসেছে আপনার সাথে দেখা করতে।
প্রভু : পাঠাও ওকে।

বহু পুরাতন সাদা রঙের গেঞ্জিটি দীর্ঘ দিনের ময়লা জমে কাদাটে রঙ ধারণ করেছে। পিঠের দিকের অংশে গেঞ্জির প্রায় অর্ধেকটা ছেড়া। লুঙ্গিতে কাদা জল মেখে আছে। মজলিশ কক্ষে প্রবেশ করতে ভয় পাও জেলেটির বুভুক্ষু’র তাগিদ তাকে সাহস জুগিয়েছে।

প্রভু : কি চাই তোমার?

ধীবর : আমার মাছ ধরার জালটি ছিড়ে গেছে প্রভু। আমি আর মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করতে পারছি না। আমার সংসারে সদস্যদের মুখে ঠিকমত অন্ন জোগাতে পারছি না। ক্ষুধার জ্বালায় আমার মেয়েটি…….।

(জেলেটি আর কথা বলতে পারছে না। হু হু করে কাঁদতে শুরু করল)

প্রভু : থামাও তোমার কান্না। আমি আমার রাজ্যে কোন কান্না দেখতে চাইনা। গোমস্তা ওকে কিছু চাল ও বাজার করার জন্য কিছু পয়সা দিয়ে……

প্রভু শেষ করার আগেই

ধীবর : প্রভু আমি কোন খাবার ভিক্ষা চাইনা। আপনি যদি আমাকে কিছু টাকা ধার দিতেন তাহলে সেটা দিয়ে জাল কিনতে পারতাম, তা দিয়ে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে আমার পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারতাম, আস্তে আস্তে আপনার টাকাটাও পরিশোধ করে দিতাম।

প্রভু : আমি চাইনা তোমরা জাল দিয়ে ছোট ছোট মাছ ধরে বাজারে বিক্রি কর। আর এই ভাবে নদীর সমস্ত মাছ উজাড় করে দাও। আমি চাই আমার রাজ্যে প্রতিটি গাছ, প্রতি মাছ নিরাপদে থাকুক। এই বিশ্বকে আমি সমস্ত প্রাণী ও উদ্ভিদকুলের অভয়ারণ্য হিসেবে দেখতে চাই। বরং তুমি আপাতত আমার দেওয়া টাকা, চাল দিয়ে তোমার পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দাও। কাল থেকে আমার রাজ প্রসাদের পাশে যে পুকুর গুলো আছে সেগুলো দেখা-শুনা কর। মাস শেষে তোমাকে যে টাকা দেব তাদিয়ে তোমার চলতে খুব একটা কষ্ট হবে না।

ধীবর : হে ভগবান আমাদের প্রভূকে তুমি আরও ক্ষমতা দাও, আরও সম্পদ দাও। এই রকম একজন মহান মানুষের হাতে সম্পদ গেলে সেই সম্পদতো জনগণই পাবে। মঙ্গল হোক প্রভুর, আমাদের প্রভুর মঙ্গল হোক।
___________

দুই

প্রভুর মেয়ের আজকে জন্ম দিন। রাজ্যের সকল রাস্তা-ঘাট আজ ফুলে ফুলে শোভিত করা হয়েছে। এই দিনে ও বিশেষ বিশেষ দিনগুলো রাস্তা-ঘাটের শোভা বর্ধনের জন্য কৃষকদের দিয়ে বহুমুখী ফুলের চাষ করানো হয়েছে। অবশ্যই কৃষকদেরকে ধান বা অন্যান্য ফসলে যে পরিমাণ লাভ হতো তার চেয়ে ফুল চাষে বেশি মুনাফা করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রভুর মেয়ের জন্ম দিন উপলক্ষে যেমন রাজ্যের বিশিষ্ট্য ব্যক্তিদের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে তেমনি ভাবে রাজ্যের সকল শ্রেণীর মানুষের খাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাজ্য জুড়ে আজকে চারিদিকে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। মেঘগুলো আজকে হাসা-হাসি করছে। নীল পবনের সাথে আকাশ সীমানা জুড়ে আজ মেঘ ও রোদ্দুরের খেলা চলছে। সূর্যের উদ্ধত হাসি পৃথিবী নামক গ্রহের প্রশান্তিতে কিছু বাগড়া দিতে চাইছে কিন্তু প্রভুর কন্যার জন্ম দিনের সমস্ত আনন্দ সূর্যের সেই উদ্ধতকে টিপ্পনী দিচ্ছে।

বিশাল আকৃতির পুরো মাঠ জুড়ে সবাইকে খেতে দেওয়া হয়েছে। সারি সারি মানুষগুলো বসে বসে খানা খাচ্ছে এবং প্রভুর নানান ধরনের স্তব করছে।

তিন

সন্ধ্যা প্রায় শেষ। পশ্চিম কোণের লাল আভার সমাপ্তি ঘটেছে। প্রতিদিনের মত আজকেও মজলিস শুরু হয়ে গেছে। প্রভু নিয়মিত ভাবে এই সময়টাতে রাজ্যবাসীর সমস্যাসমূহ শুনে থাকেন এবং তাদের সমস্যাসমূহ নিরসনে নানান সহযোগিতা করে থাকেন। সাদা পাঞ্জাবি পরা একজন শিক্ষক এসেছেন।

প্রভু : আপনার কি সমস্যা মাস্টার মশায়?

শিক্ষক : প্রভু একজন শিক্ষক হিসাবে আমি যা মাইনে পাই তা দিয়ে আমার চলতে তেমন কোন কষ্ট হয় না। আর তাছাড়া আপনি যে ভাবে রাজ্যের সাধারণ মানুষকে সহযোগিতা করছেন তাতে কারওর তেমন কোন সমস্যা থাকারও কথা নয়। আমারও তেমন কোন সমস্যা হচ্ছে না। তবে প্রভু অতি সহযোগিতার ফলে মানুষ কিছুটা কর্ম বিমুখ হচ্ছে।

প্রভু : আপনি আপনার কথা বলুন মাষ্টার মশায়।

শিক্ষক : প্রভু আমি একটু পাঠশালা ও শিক্ষার বিষয় বস্তু নিয়ে কথা বলতে এসেছি। দিন দিন পাঠশালায় ছাত্র-ছাত্রী বেড়েই চলেছে সেই তুলনায় পাঠশালা ও শিক্ষকের সংখ্যা তেমন বৃদ্ধি পায়নি। আর তাছাড়া আমরা শিক্ষা ব্যবস্থারও তেমন উন্নতি সাধন করতে পারিনি।

প্রভু : বলুন কতটি পাঠশাল আপনার চাই। সকলের শিক্ষার সুব্যবস্থা করার জন্য যতগুলো পাঠশালা দরকার ততগুলো পাঠশালা পর্যায়ক্রমে তৈরী করা হবে। সেই মোতাবেক শিক্ষক নিয়োগেরও ব্যবস্থা করা হবে।

শিক্ষক : কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থা…

প্রভু : শিক্ষা ব্যবস্থার আবার কি হলো?

শিক্ষক : প্রভু আমরা বহু মানুষকে লেখা-পড়া শেখাচ্ছি কিন্তু কাউকে শিক্ষিত করতে পারছি না। আমাদের লেখা-পড়া অতিত ভিত্তিক হয়ে যাচ্ছে। আমরা ইতিহাস মুখস্ত করাচ্ছি। আমাদের ছেলে মেয়েরা জানে না তারা যে অংকগুলো করছে কেন সেগুলি করছে। ভাষা শিখতে গিয়ে এত করে ব্যাকরণ শিখতে হচ্ছে যে মুল ভাষা শেখার কথা তারা ভুলেই যাচ্ছে। পরীক্ষার জন্য একই পড়া তাদের বার বার পড়তে হচ্ছে ফলে পড়ার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের পথ সঙ্কুচিত হচ্ছে। আমরা প্রতিবাদের ভাষা শেখাচ্ছি, আমরা জিহাদি পথ দেখাচ্ছি কিন্তু আমরা শান্তির পথ সুখের পথ, ভালবাসার পথ দেখাচ্ছি না। জাতীয়তাবাদে উদ্ভুদ্ধু করতে গিয়ে আমরা বিভেদ তৈরীর পথ শেখাচ্ছি। ধর্ম শিক্ষার নামে আমরা অধর্ম শেখাচ্ছি। ধর্ম শিক্ষা দিতে গিয়ে আমরা, আমার পথ, আমার মতই সত্য এবং অন্যের পথ, অন্যে মত ভুল; এহেন ভুল শিক্ষা দিচ্ছি। শিক্ষার মাধ্যমে আমরা ভবিষ্যৎ গড়তে চাইছি কিন্তু আমাদের পুস্তকাদি অতিত ভিত্তিক। শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে আমরা আবার কখনও কখনও যুদ্ধের পথও বাতলে দিচ্ছি।

প্রভু : মাষ্টার মশায় আপনি আপনার স্কুল ও ছাত্রদের নিয়ে ভাবুন; শিক্ষার বিষয় বস্তু, পদ্ধতি মান এসব নিয়ে ভাববার জন্য উচ্চ ডিগ্রিধারী বিশেষজ্ঞ গুণীজনদেরকে রাজ্যের কোষাগার থেকে উচ্চ বেতন দিয়ে পোষা হচ্ছে। তাছাড়া ইতিহাস অংক ধর্ম এসব যেভাবে শেখানো হচ্ছে তাতো ঠিকই আছে। মানুষ ইতিহাসের মাধ্যমে আমাদের অতীত ইতিহাস জানতে পারছে. দেশকে কিভাবে ভালবাসতে হয় তা তারা শিখতে পারছেন। মানুষ শিক্ষার মাধ্যমে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা শিখছে; আমি তো কোথাও ভুল দেখছি না। মাষ্টার মশায় আপনি আপনি ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াতে থাকেন। আগামী মাস থেকে আপনি আর ভার প্রাপ্ত প্রধান হিসাবে থাকবেন না প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন। আপনার বেতন পঁচিশ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়া হলো।

শিক্ষক : মঙ্গল হোক প্রভুর, মঙ্গল হোক।
___________

তিন

গোমস্তা : প্রভু আপনি শুনে থাকবেন যে, আমাদের পাশের রাজ্যে খরার কারণে ঠিকমত ফসল ফলাতে পারেনি। সাধারণ মানুষজন তাদের জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার পাচ্ছে না। ঐ রাজ্যে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে।

প্রভু : গোমস্তা প্রয়োজনীয় সকলকে বলে দাও তারা জন্য সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো পাহারা দিয়ে রাখে। কোনভাবে যেন এই রাজ্যের চাল, ডাল, গম চোরাই পথে ঐ রাজ্যে যেতে না পারে। আমি কোন ভাবেই চাইনা যে, এই রাজ্যের খাবার ঐ রাজ্যে চোরাই পথে চলে যাক আর আমার রাজ্যের মানুষ খাদ্য অভাবে পড়ুক।

গোমস্তা : হুজুর এবার আমাদের রাজ্যে অনেক খাবার উৎপাদন হয়েছে। যে পরিমাণ খাবার উৎপাদন হয়েছে তা দিয়ে সারা বছরের খাবার হয়ে অনেক বেশি খাবার মজুদ থাকতে পারত। কিন্তু অতিরিক্ত খাবার মজুদের ফলে কৃষকরা তাদের ফসলের উৎপাদিত মূল্যের চেয়ে বিক্রয় করে কম মূল্য পেতে পারে এই আশঙ্কায় অতিরিক্ত সম্ভাব্য খাবার আপনার নির্দেশে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। যে খাবার গুলো থাকলে এই দুর্ভিক্ষের সময় আমরা সেই খাবারগুলো তাদেরকে দিতে পারতাম। যৌক্তিক কারণে তাদের সাথে আমাদের এত দিনের তিক্ত সম্পর্ক ভাল হতে পারতো।

প্রভু : আর যদি ঐ রাজ্যে দুর্ভিক্ষ না হতো তাহলে আমার কৃষকরা সেই উৎপাদিত পণ্যের উপযুক্ত মূল্য না পেয়ে তারাই দুর্ভিক্ষে পড়তো। এই রাজ্যের মানুষের আমিই ভাগ্য নিয়ন্তা। এরা কি ভাবে ভাল থাকবে না থাকবে সেটা নিয়ে আমাকে অনেক ভাবতে হয়। যদি ঐ রাজ্যের মানুষের খুব বেশি অভাব হয় তাহলে তারা আমার রাজ্যে এসে কামলা খাটুক। তাহলে আমাদেরও উৎপাদন বাড়বে ওদের সমস্যার কিছুটা সমস্যার সমাধান হবে। দীর্ঘ দিন যাবৎ ঐ রাজ্যের দাসত্ব থেকে আমার রাজ্যের মানুষ মুক্তি পেয়েছে। এখন আমার মাথা উচু করে চলতে শিখেছি। এই রাজ্যের মাটি, মানুষ আমার প্রাণতুল্য। এদের মাথা উঁচু করে রাখার জন্য আমি……….। থাক এসব বিষয় নিয়ে আমি আপনার সাথে কথা বলতে চাইনা।
___________

গোমস্তা : প্রভু আপনার কাছে কয়েকজন মানুষ দেখা করতে এসেছে।

প্রভু: তাদেরকে বলে দাও আমি এই সময় কারওর সাথে দেখি করিনা।

গোমস্তা : প্রভু ওনারা অনেক দূর থেকে এসেছেন। সংখ্যায় দশ পনের জনের মত হবেন।

প্রভু: আমি এখন বিশ্রাম করব।

গোমস্তা : প্রভু ওনারা একটি মধ্যম শ্রেণীর সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসাবে আপনার সাথে দেখা করতে এসেছেন। তাদের অনেক সমর্থক আছেন।

প্রভু : ঠিক আছে, পাঠিয়ে দাও।

সাদা ধুতি ও পাঞ্জাবী পরা কয়েক প্রৌঢ় বয়সের মানুষ। কারও কারও গলায় পৈতা পরা আছে। দু’হাত উচূ করে মাথা কুর্ণিশ করে কয়েকবার নমস্কার করলেন।

১ম অতিথি : প্রভু আমাদের এই ভুখণ্ডে আমাদের ধর্ম বিশ্বাসী সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ এবং মোহাম্মদীয় ধর্মাবলম্বী লোকের সংখ্যা প্রায় ৭৮ ভাগ। প্রভু এখানে যদি ৪টি মসজিদ থাকে তাহলে অবশ্যই একটি মন্দির থাকা সমীচীন কিন্তু এই রাজ্যে এমনটি পাবেন না যেখানে রাজ্যের সহযোগিতায় তৈরী করা মন্দির আছে।

২য় অতিথি : প্রভু আপনার প্রতি আমাদেরও সমর্থন আছে। এই রাজ্যের প্রভু হিসাবে আপনাকে রাখার ব্যাপারের আমাদেরও আনুপাতিক হারে অংশীদারিত্ব আছে। প্রভু আমাদের ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য আপনার সহযোগিতা কাম্য। প্রভু আপনি সকল বর্ণের, সকল ধর্মের প্রভু।

প্রভু : তোমরা চলে যাও আগামী একবছরের মধ্যে এই রাজ্যে যতগুলো মসজিদ তৈরী করা হয়েছে চার ভাগের এক ভাগ মন্দির করে দেওয়ার ঘোষণা দিলাম।

সকলে সমস্বরে বলতে লাগল-জয় হোক প্রভুর, জয় হোক।
___________

চার

গোমস্তা : প্রভুর শত শত মানুষ রাস্তায় নেমেছে, আপনার বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে।

প্রভু : কেন শত শত মানুষ রাস্তায় নেমেছে? আমার বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ কি? তার স্লোগান কেন দিচ্ছে?

গোমস্তা : আপনি নাকি এই রাজ্যের মন্দির নির্মাণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাই তারা স্লোগান দিচ্ছে স্বধর্মভ্রষ্ট প্রভুর পতন চাই। আর এ কাজে উস্কানি ও নেতৃত্ব দিচ্ছে যারা আপনাকে হটিয়ে আপনার সিংহাসনে বসতে চায়। আর তারাই সাধারণ জনতাকে ধর্মীয় আবেগ কাজে লাগিয়ে জনতাকে ভ্রষ্ট পথে পরিচালিত করছে।

প্রভু : আমি মন্দির নির্মাণে সহযোগিতা করতে চাইছি ঠিক, তাতে আমি স্বধর্মভ্রষ্ট হলাম কিভাবে?

গোমস্তা : এই রাজ্যে একদিকে মসজিদে আযান পড়বে আবার একই সময়ে অন্য দিকে মন্দিরে ঘন্টা পড়বে। মুমিনগণ যখন নামায পড়তে মসজিদে যাবে তখন চলার পথে তাদের চোখে মন্দিরের মূর্তি পড়বে। মুমিনদের নামায হবে না। তা ছাড়া এই পবিত্র ভূমিতে ভগবানের তুষ্টি সাধনের নামে বলিদানের পাঠার রক্তে এই পবিত্র ভূমি অপবিত্র হবে তা নাকি কেউ মেনে নেবে না।

প্রভু : কিন্তু আমরাও তো গরু কোরবানী দেই। এই পবিত্র ভূমির অধিকারী তো হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনও। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনও তো বলতে পারে আমাদের এই পবিত্র ভূমি গরুর রক্তে অপবিত্র হতে দেবো না।

গোমস্তা : যে রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকজনকে পাঠার রক্তকে অপবিত্র মনে করে সেই রাজ্যের প্রভু কেউ তাই মনে করা উচিৎ। প্রভু আমি জানি যে আপনি কোন ধর্ম বিশ্বাস করেন না কিন্তু তবু আপনি পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করেন, কোরবানীর সময় শত শত গরু কোরবানী দিয়ে তার মাংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিলিয়ে দেন। এই রাজ্যের প্রভু হিসাবে রাজ্যকে শাসন করতে হলে আপনার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সর্বাঙ্গীন সহযোগিতা প্রয়োজন। অতএব, আপনার ভেবে দেখা উচিৎ হবে এই রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কি চায় এবং আপনাকে সেই ভাবেই সামনের দিনগুলোর জন্য সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া।

প্রভু : আমি অনেক সংঘাতের পর এই রাজ্যের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলাম। আমি নতুন করে আর কোন সংঘাতে জড়াতে চাইনা। আন্দোলনরত মুসলিম বিদ্রোহীদের সাথে আমি আলোচনায় বসতে চাই। আমি তাদের কথা শুনতে চাই।

পরের দিন পূর্বাহ্ন…….

প্রভুর বাড়ীর সামনে হাজার হাজার আন্দোলনরত মুসলমান সমবেত হয়েছে। তাদের দাবী একটাই মন্দির নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হবে অথবা রাজ্যের শাসনভারের দায়িত্ব থেকে সরে আসতে হবে। এমন সময়। ভীত রাজা সকলের সামনে উপস্থিত হন।

১ম বিদ্রোহী : আমরা আমাদের এই পবিত্র ভূমিতে মন্দির নির্মাণ করতে দেব না।

(না বলার সাথে সাথে উপস্থিত জনসমুদ্র না না করে উঠল।)

প্রভু : ঠিক তোমরা যা চাইছো তাই হবে।

সমস্বরে সকলে : এই পবিত্র ভূমিতে কোন মন্দির নির্মাণে আমরা সরাসরি কোন ভূমিকা রাখব না।

প্রভু : কিন্তু তোমাদের কাছে আমারও এ বিষয়ে কিছু বলার আছে।

জনতা সমস্বরে : বলুন বলুন

প্রভু : আমি তাদের মন্দির বানিয়ে দেবনা ঠিক আছে কিন্তু তাদেরকে তাদের মত করে ধর্ম পালন করতে দিতে হবে বা তারা চাইলে তারা নিজেরা মন্দির নির্মাণ করতে পারবে।

(জয়োউল্লাসে সকলে রাজ প্রাসাদ এলাকা ছেড়ে যে যার কাজে চলে গেলেন।)

পরের দিন……………

গোমস্তা : প্রভু খারাপ খবর আছে।

প্রভু : কি খারাপ খবর?

গোমস্তা : সনাতন ধর্মাবালম্বীগণ সমবেত জনগণের বিরাট অংশ রাজ প্রসাদের দিকে আসছে।

প্রভু : কিন্তু কেন?

গোমস্তা : তাদের অভিযোগ এই রাজ্যের প্রভু সাম্প্রদায়িক, তিনি মন্দির নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা ভঙ্গ করেছেন। রাজ্যের প্রভু হিসাবে আপনি যেটা করতে পারেন না। আপনি যা করবেন সকলের জন্য, সকল ধর্মের জন্য করবেন সেটাই হতে হবে কিন্তু তা হয়নি। আপনি এক সম্প্রদায়ের চাপে অন্য সম্প্রদায়কে বঞ্চিত করেছেন। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলো হিন্দু সম্প্রদায়ের এই দাবিকে নৈতিক মনে করছে। অন্যদিকে হিন্দু প্রধান রাষ্ট্র যেখানে মুসলীমগণ সংখ্যালঘু সেখানে এমনটি হতে পারে যে মসজিদ নির্মাণ করতে দেওয়া হচ্ছে না। একদিকে দেশের মধ্যে আপনার বিরুদ্ধে হিন্দু সম্প্রদায়ের আন্দোলন, অন্যদিকে বিরোধীদের ষড়যন্ত্র ও বহির্বিশ্বের কূটনৈতিক চাপ আপনাকে সিংহাসনহীন করে দিতে পারে।

প্রভু : না, সেটা হতে পারেনা, আমি সব সময় আমার দেশের জনগণের সকল কথা শুনে এসছি, তাদের সকল চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করে এসছি। এই সিংহাসন আমি কোন ভাবেই ছাড়তে পারব না। এই সিংহাসন না থাকলে আমি আমার এই জনগণকে সেবা করতে পারব না। তাদের আমি সকল সমস্যার সমাধানের জন্য তাদের সাথে কথা বলতে চাই।

গোমস্তা : প্রভু আন্দোলনরত সম্প্রদায় প্রসাদের কাছে পৌঁছে গেছে। চলুন আপনি তাদের সাথে কথা বলুন।

প্রভু: (বিদ্রোহী জনতার উদ্দেশ্যে) আপনারা কেন আন্দোলন করছেন?

সমবেত জনতা : (সমস্বরে) আপনি মন্দির তৈরীর প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেই প্রতিশ্রুতি পালন করছেন না। আপনি প্রভু হয়ে এই রকম সাম্প্রদায়িক হতে পারেন না।

প্রভু : ঠিক আছে, আমি খুব দুঃখিত যে আপনাদের পুরো দাবী মানছি না বা মানতে পারছি না। তবে মসজিদ থেকে আপনারা একটু দূরত্ব্বে মন্দির নির্মাণ করুন। মন্দির নির্মাণ ব্যয়ের আংশিক অর্থ আমি নগদ অনুদান হিসাবে আপনাদেরকে দেব।

(প্রভুর এই সিদ্ধান্তে তারা পুরোপুরি খুশি হতে পারল না। তারপর তারা চলে গেলো।)

রাজ্য আজ স্পষ্টতো দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। প্রভু আজ উভয় পক্ষ থেকে চরম সমালোচিত হচ্ছে। একপক্ষ বলছে প্রভু সাম্প্রদায়িক, অন্য পক্ষ বলছে প্রভু স্বধর্মভ্রষ্টা। এই বিষয়কে কেন্দ্র করে সারা রাজ্য জুড়ে উভয় পক্ষই সভা সেমিনার, মিছিল মিটিং করছে। প্রভু চেষ্টা করছে উভয় পক্ষের সাথে সুসম্পর্ক রেখে সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান করতে। কিন্তু কোন কৌশলই কাজ করছে না। যে যার মত করে ইস্যুটি ব্যাখা করছে। জনপ্রিয়তা টিকিয়ে রাখতে মসজিদ মন্দির ইস্যুতে যে কৌশল গ্রহণ করেছিলেন তা পুরোপুরি ব্যর্থ হতে চলেছে। বিরোধী সংগঠনগুলো এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে ইস্যু করে রাজনীতিতে খুবই সুবিধাজনক জায়গায় অবস্থান করছে।

চার :

এই বছর প্রভুর রাজ্যে প্রচুর খরা হচ্ছে, বৃষ্টির অভাবে মাঠের ধানগুলো লাল হতে শুরু করেছে। একই সাথে প্রকৃতি ও রাজনৈতিক তাপে প্রভুর একেবারে টালমাটাল অবস্থা। সকলে খুবই চিন্তিত। এক পক্ষ বলছে মন্দির নির্মাণে সহযোগিতা করায় এই রকম দশা। অন্য পক্ষ বলছে প্রভু তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করায় ভগবান ক্ষুব্ধ হওয়া এই রকম করছে। রাজনৈতিক, ধর্মীয় আন্দোলনের সাথে খুবই শিঘ্রই অর্থনৈতিক আন্দোলন শুরু হতে যাচ্ছে।

প্রভু : গোমস্তা, গোমস্তা তুমি কোথায়?

গোমস্তা : প্রভু আমি তো সব সময় আপনার সাথেই থাকি। আমি আপনার চৈতন্য। আপনার যখন প্রয়োজন হয়েছে আপনি আমাকে শারিরীক অবয়ব দান করেছেন। আপনি আমাকে দাস বানিয়ে রেখেছেন। অর্থ্যাৎ আপনি আপনার নিজের বিবেককে দাস বানিয়ে রেখেছেন। যে মানুষ নিজের বিবেককে দাস বানিয়ে রেখেছে সে মানুষ কোন ভাবেই অন্যর স্বাধীনতা এনে দিতে পারে না। প্রভু অপেক্ষা করুন দেখুন কি ভয়াবহ পরিস্থিতি আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। প্রভু দেখুন একদল কৃষক এদিকে আসছে। ঐযে ঐদিকে তাকিয়ে দেখুন সনাতন ধর্মাবলম্বীগণ এদিকে থেকে আসছে। দেখুন আর এক দিক থেকে মুসলীম সম্প্রদায় এদিকে আসছে। একদল কৃষক সহ সেই কাঠুরিয়া, ধীবর, সেই শিক্ষক প্রত্যেকেই আছে। আজকে তাদের সময়, আজকে তাদের সুযোগ এসেছে। আপনার স্ব-স্ব দিনে তাদের দ্বিমতকে আপনি সহমত বানিয়েছিলেন, আজকে তাদের দিনের তারা তাদের দিনকে কাজে লাগাবে।

জনৈক কৃষক : প্রভু এ বছর আমাদের খরায় সমস্ত ফসল মারা গেছে, গত বছর আমরা দাম পাবনা বলে আমাদের ফসল আমাদের নিকট থেকে বাজার মূল্যে ক্রয় করে কিছু গুদামজাত করেছিলেন এবং কিছু নদীতে ফেলেছিলেন। আমরা ভেবেছিলাম প্রভু কত মহান আমাদের ফসলের ন্যায্য মুল্য নিশ্চিত করার জন্য ন্যায্য মূলে ক্রয় করে সেই ফসল নদীতে ফেলে দিচ্ছেন। আমাদের ঘামে উৎপাদিত ফসল, আমাদের খাজনার টাকায় ক্রয় করা সেই ফসল এবার আমাদের নিকটেই চড়া দামে বিক্রয় করবেন। এবং আমাদেরকে তা চড়ামূল্যে ক্রয় করতেও হবে তা-না-হলে এদেশের কৃষকরা অনাহারে মরবে। পাশের রাজ্যের মজুদকৃত খাদ্য থাকলেও আমাদের প্রভুর দেশপ্রেমের জন্য আমরা তা কিনেও খেতে পারব না। বা আমাদের প্রভু কত মহান। সমস্বরে (সকলে কটাক্ষ করে) বা বা আমাদের প্রভু কত মহান।

সনাতন ধর্মাবলম্বী : প্রভু কতিপয় স্বার্থন্বেষী মানুষ তাদের স্বার্থে ধর্মের বিরুদ্ধে ধর্মকে ব্যবহার করেছে আপনি তাদেরকে অনুগত রাখার জন্য নিজেই উপরন্তু তাদের আনুগত্য মেনে নিয়েছেন। ধর্মের বিরুদ্ধে ধর্ম ব্যবহারকারীদের আপনি নিজের কায়েমী স্বার্থ প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাদেরকে দমন করেননি।(সকলে সমস্বরে) হ্যাঁ আপনি দমন করেননি।

মুসলিম ধর্মাবলম্বী : (সকলে সমস্বরে) আমরা স্বধর্ম ভ্রষ্টা প্রভুকে আর দেখতে চাইনা।

শিক্ষক : প্রভু আপনি এমন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করার ঝুঁকি নেননি যে শিক্ষা ব্যবস্থা সমাজ ব্যবস্থাকে একটি পজেটিভ স্থায়ী পরিবর্তন আনবে। আপনি সকল ক্ষেত্রের মত শিক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও ধর্মীয় অন্ধত্ব, জাতীয়তাবাদের বন্ধ্যাত্ব, মনস্তত্ত্ব পরিবর্তনের জন্য কোন ব্যবস্থা চালু করেননি বা করতে দেননি। আজকে আপনি আনুগত্যের লোভে যে আনুগত্য দেখিয়েছেন তার সেই আনুগত্যের লোভই আপনাকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

গোমস্তা : প্রভু আপনি সকল ক্ষেত্রে কৌশল অবলম্বন করেছেন। কিন্তু আপনি বোধ হয় বুঝতে পারেননি যে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে যে কোন অর্জন স্থায়ী ভাবে ধরে রাখতে হলে সবচেয়ে ভাল কৌশল হলো কোন কৌশল অবলম্বন না করা।

প্রভু সম্পূর্ণ স্তব্ধ, সমবেত সকল জনতাও স্তব্ধ। প্রভুর চোখ দিয়ে টপ-টপ করে পানি পড়ছে। প্রভু কিছু বলতে যাচ্ছে এমন সময়, আকাশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘন কাল মেঘ গুলো দ্রুত গতিতে এদিক ওদিক ছুটোছুটি করতে শুরু করল। শাঁ শাঁ শব্দে একটু দূরের বাতাসের শব্দ কানে ভেসে আসছে। শব্দ ও বাতাসের গতি দ্রুতগতিতে বেড়ে চলেছে। বাতাসে ধুলো-বালি আর রোদে পুড়ে মরা ফসলের টুকরো টুকরো পাতা একাকার হয়ে গেছে, ধুলোবালিতে চোখ খুলে রাখার অবস্থা নেই। নগ্ন বাতাসে মেঘেদের দিগ্বিদিক ছুটোছুটি। চারিদিকে মেঘেদের কান ফাটানো গর্জন শোনা যাচ্ছে কিন্তু কোথাও এক ফোটা বৃষ্টির পানি দেখা যাচ্ছে না তবে প্রভুর চোখ থেকে টপ টপ করে পানি পড়ছে…….

glqxz9283 sfy39587p07