Skip to content

অসম্প্রদায়িতায় বিশ্বাসী নজরুল ছিলেন মানবতাবাদী ও সাম্যের কবি

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

১১ জ্যৈষ্ঠ। আজ থেকে ১১৮ বছর আগে এই দিনে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম অবিভক্ত বাংলার পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদ এবং সৈনিক হিসেবে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম করেছেন যা বিশ্বের ইতিহাসে চির স্মরণীয় হয়ে আছে। তাঁর কবিতার মূল বিষয়বস্তু ছিল দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার এবং সামাজিক অনাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে সো”্চার প্রতিবাদ। যেমন লেখাতে বিদ্রোহী, তেমনই জীবনে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লেখার মাধ্যমে প্রতিবাদ করতে গিয়ে কারাবরণ করতে হয়েছে তাঁকে।
কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের প্রেরণা। অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠায় আজন্ম তিনি ছিলেন সোচ্চার। তাঁর আদর্শ ধারণ করতে পারলে আমাদের অনেক সমস্যাই সহজে সমাধান হয়ে যেত তাতে সন্দেহ নেই। বর্তমানে নজরুলের মত সত্যের জন্য নিবেদিত প্রাণ, অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর খুবই প্রয়োজন।
তিনি ছিলেন বিশ্ব সাহিত্যে ছিলেন এক বিস্ময়কর প্রতিভা। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে তাঁর যে চেতনা ছিল সেটা প্রকৃত ইসলামের কাছাকাছি বলা যেতে পারে। তিনি সমাজের শোষক শ্রেণি এবং হিন্দু ও মুসলিম উভয় ধর্মের ধর্ম ব্যবসায়ীদের লেখার মাধ্যমে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘তব মসজিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী, মোল্লা পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি!’ বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে কবির এই কথা কঠিন বাস্তব।

নজরুল আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেছেন, ‘সুন্দরের ধ্যান, আমার উপাসনা, আমার ধর্ম। যে কূলে, যে সমাজে, যে ধর্মে, যে দেশেই জন্মগ্রহণ করি, সে আমার দৈব। আমি তাকে ছাড়িয়ে উঠতে পেরেছি বলেই কবি।’ তিনি সাম্যবাদি কবিতায় আরও লিখেছেন :
‘গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই নহে কিছু মহিয়ান।
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,
সব দেশে,সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।
... ... ... ...
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু বৌদ্ধ মুসলিম খ্রীস্টান।’
সুনির্দিষ্ট কোন ধর্ম, দর্শন কিংবা জীবনচর্যায় তিনি দীর্ঘকাল থাকতে পারেননি; তবুও সকল ধর্মের সার্বজনীন মূল্যের প্রতি ছিল তাঁর প্রগাঢ় আস্থা। আর এই আস্থা তাঁকে হিন্দু কিংবা মুসলমানের কবি না করে, করেছে বাংলা ও বাঙালির কবি। তাইতো মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সংগ্রামে এবং পরমত সহিষ্ণুতা প্রতিষ্ঠা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি সাধনায় তাঁর কবিতা ও গান বাঙালিকে যোগায় অনিঃশেষ প্রেরণা।
নজরুল ছিলেন মূলত সকল ধরনের প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক অমর প্রতিদ্বন্দ্বী । ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করার প্রবল বাসনা তিনি সব সময় অনুভব করেছেন। ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’ শুনে তিনি তাঁর দু-যুগের কাব্য পরিক্রমায় মাঝে মাঝেই হয়তো পথ দর্শন এমনকি ধর্মাদর্শ বদলিয়েছেন। কিন্তু ভেদবুদ্ধিহীন, অসাম্প্রদায়িক, মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে কখনও নিজেকে বদলাননি। ব্যক্তিগত ও সাহিত্যিক জীবনে তিনি ছিলেন, সম্পূর্ণ সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ মানুষ। বিবাহ করেছেন মুসলমান নার্গিস আক্তার খানম ও হিন্দু প্রমীলা দেবীকে। প্রমীলাকে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করার কথা কবি কখনো চিন্তা করেন নি। এমনকি স্ত্রীর নামটিও পরিবর্তন করে মুসলিম নাম রাখেন নি। নজরুলের চারটি সন্তান ছিল। তিনি হিন্দু-মুসলমানের মিলিত ঐতিহ্য ও পুরাণের আলোকে নাম রেখেছিলেন। তাঁর প্রথম সন্তান কৃষ্ণ মোহাম্মদ। চার বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। এর পর তিন সন্তান হচ্ছে,অরিন্দম খালিদ, কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ। এর মাধ্যমে আমরা সহজে বুঝতে পারি যে, এই হিন্দু মুসলিমের মিলনই তিনি আজীবন চেয়েছিলেন।

কবির সখ্য ও বন্ধুত্ব ছিল হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল ধর্মের মানুষের সাথে। শৈলজানন্দ মজুমদার, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, মুজাফ্ফর আহমদ, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, শরৎচন্দ্র চট্ট্যোপাধ্যায়, কাজী মোতাহার হোসেন, দিলীপ কুমার রায় প্রমুখ ছিলেন তাঁর অকৃত্তিম বন্ধু ।
হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সূত্রপাত হলে যে অসহনীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয় তখন নজরুল রচনা করেন উদ্দীপ্ত সংগীত। ১৯২৬-এর ২২ মে কৃষ্ণনগরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির বার্ষিক সম্মেলনে কবি সবাইকে চমকে দিয়ে ‘কা-ারী হুশিয়ার’ উদ্বোধনী সংগীত গেয়ে শোনান। তিনি যখন উচ্চারণ করেন, হিন্দু না ঐ মুসলিম জিজ্ঞাসে কোন জন/ কা-ারী বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র- তখন হিন্দু-মুসলিম প্রত্যেকে একতাবদ্ধ হয়ে ওঠেন। এর পর তিনি ‘হিন্দু মুসলিম যুদ্ধ’, ‘পথের দিশা’ প্রভৃতি কবিতা এবং ‘মন্দির-মসজিদ’ প্রবন্ধ লিখে দেশবাসীকে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেন।

নজরুলের কবিতায় একদিকে যেমন ঠাঁই পেয়েছে মুসলিম আদর্শ অন্যদিকে হিন্দু আদর্শ। সর্বোপরি এ সব কিছুর মূল সুতো হচ্ছে তাঁর সাম্যবাদী মনোভাব, তাঁর মানবতাবোধ। তিনি বলেছেন,- ‘নদীর পাশ দিয়ে চলতে চলতে যখন দেখি একটা লোক ডুবে মরছে, মনের চিরন্তন মানুষটি তখন এ প্রশ্ন ভাবার অবসর দেয় না যে, লোকটা হিন্দু না মুসলমান, একজন মানুষ ডুবছে এইটেই...সবচেয়ে বড়, সে ঝাঁপিয়ে পড়ে নদীতে...মন বলে আমি একজনকে বাঁচিয়েছি।’ তিনি তাঁর লেখনীতে যে সাম্যের ইঙ্গিত দিয়েছেন তা স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবতা এবং সুবিচারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর কল্পনা কখনো ধর্মীয় উদারতা, কখনো সাম্যবাদ, স্বাধীনতা, কখনো মানবতা আবার কখনো নৈরাজ্যকে স্পর্শ করেছে। সমাজ-বিধানের অসঙ্গতি, স্ববিরোধিতা, জাতি-বৈষমম্য, শ্রেণি-বৈষম্যের প্রতি তাঁর কণ্ঠ সর্বদাই সোচ্চার ছিল। আর এ সকল কিছুর মূল ছিল মানবমুক্তি ও মানবকল্যাণ। ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় তাঁর মানবতার পরিচয় ফুটে উঠেছে এভাবে- দেখিনু সেদিন রেলে/কুলি বলে এক বাবুসাব তারে টেনে দিল নিচে ফেলে/চোখ ফেটে এল জল/ এমনি করে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল।’ তিনি মানুষকে সেরা জীব হিসেবে স্থান দিয়েছেন। তিনি জাতির স্বাধীনতার সাথে একাত্ম করে নির্যাতিত ও ক্ষমতাবঞ্চিত মানুষের মুক্তির কথা ভেবেছেন।
মানবতার আবেগেই তিনি সাম্যের গান গেয়েছেন। তিনি চেয়েছেন সাম্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়তে। তাই তাঁর কাব্য, গানে-গল্পে মানবতাবোধ থেকেই এসেছে বিদ্রোহ, অসম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদের চেতনা। তিনি মনে করতেন যা কিছু মানুষের জন্য সুন্দর ও কল্যাণকর তাই ধর্ম। সমাজে যারা নির্যাতিত, অপমানিত, অবহেলিত তারাই কবিচিত্ততে আকৃষ্ট করেছে। এ সকল মানুষের দুঃখ-দুর্দশাকে লাঘব করতে তাঁর লেখনী কাজ করেছে। তিনি লিখেছেন,
‘মহা বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়গ-কৃপাণ ভীম রণÑভূমে রণিবে না।’
তাঁর জীবনসাধনাকে কোনভাবেই শিল্পসাধনা থেকে আলাদা করা যায় না। প্রেম ও দ্রোহের এই সাধক মানবতার সুউচ্চ মিনারে বসে সারাজীবন সাম্য-সম্প্রীতি ও মিলনের গান শুনিয়েছেন। কবিতা ও গানে তিনি ব্যবহার করেছেন হিন্দু ও মুসলিম ধর্মের ঐতিহ্য থেকে শব্দ ও ভাষা। কিন্তু মননে-মগজে ছিলেন সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক। হিন্দু-মুসলমানের মিলিত ঐতিহ্য স্পর্শ করে তিনি চলে গেছেন অসাম্প্রদায়িকতা ও উদার মানবিকতার দিকে।
তার সৃষ্টিশীল সময় ছিল মাত্র ২৫ বছর। এই সময়ে তিনি সাহিত্য ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। সবকিছুই ছিল নজরুলের মধ্যে। নজরুলের দৃষ্টিতে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কোনো ধরনের পার্থক্য মানুষ হিসেবে পরিলক্ষিত হয়নি । দেখাননি জাতিবিদ্বেষও। তিনি লিখেছেন- ‘আমাদের মধ্যে ধর্মবিদ্বেষ নাই, জাতিবিদ্বেষ নাই, বর্ণবিদ্বেষ নাই, আভিজাত্যের অভিমান নাই। পরস্পরকে ভাই বলিয়া একই অবিচ্ছিন্ন মহাত্মার অংশ বলিয়া অন্তরের দিক হইতে চিনিয়াছি।’ জাতি-গোত্রকেন্দ্রিক হানাহানি ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা থেকে মুক্ত হয়ে ভালোবাসার সাগরে ভাসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। কবির ভাষায়,
‘সাম্যবাদী-স্থান-
নাই কো এখানে কালা ও ধলার আলাদা গোরস্থান।
নাই কো এখানে কালা ও ধলার আলাদা গীর্জা-ঘর,
নাই কো পাইক-বরকন্দাজ নাই পুলিশের ডর।
এই সে স্বর্গ, এই সে বেহেশত, এখানে বিভেদ নাই,
যত হাতাহাতি হাতে হাত রেখে মিলিয়াছে ভাই ভাই।’
(সাম্য)
আজকে বিশ্বব্যাপী নারী অধিকার নিয়ে প্রতিটি দেশেই আন্দোলন হচ্ছে। যা নজরুল অনেক আগেই বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছে। চিন্তা করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কবির ভাষায়,
‘বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’
পচনধরা প্রথাগত সমাজকে ভেঙেচুরে নতুন এক সমাজ গঠন করা করাই ছিল তাঁর স্বপ্ন। তাই তিনি বিদ্রোহ করেছিলেন অন্যায়, অত্যাচার, অসত্য, শোষণ-নির্যাতন আর দুঃখ-দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে। ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ ও পরাধীনতার গ্লানি থেকে জাতিকে মুক্ত তথা স্বাধীন করার জন্য তিনি কলম ধরেছিলেন। কবিতা লেখার অপরাধে তাকে জেলে যেতে হয়েছে। তবুও থামানো যায় নি তাঁর লেখা। দুঃখ-দারিদ্র্য এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কেটেছে তাঁর পুরো জীবন। কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন নি। তিনি ছিলেন অসম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী, মানবতাবাদী ও সাম্যের কবি।

লেখক-
সহকারী শিক্ষক
হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

নজরুলের উপর আপনার যথেষ্ট জ্ঞান আছে

ier

glqxz9283 sfy39587p07