একত্রবাস দুঃসহবাস | amarblog.com: Bangla Blog ( আমারব্লগ ) with no Moderation.

Skip to content

একত্রবাস দুঃসহবাস

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

কখনও কখনও একত্রবাস ‘দুঃসহবাস’ও হতে পারে। একজন নারী এবং একজন পুরুষ, এক ছাদের তলে, এক ঘরে, এক বাড়িতে থাকার নাম দিয়েছি সংসার। প্রায় সব লোকের ধারণা, যে একা থাকে তার সংসার নেই। সংসার মানেই কাউকে কারও না কারো সঙ্গে থাকতে হবে, শুতে হবে, দিন বা রাত কিছু একটা যাপন করতে হবে। মেরিটাল সোসাইটি তাই মানুষের সিঙ্গেল লাইফকে খুব একটা অনুমোদন করে না। ফলে একা থাকার, নিজের মতো বাঁচার, সংসার করবার যুক্তির চেয়ে ‘স্বামী-স্ত্রী’ ধারণার হাজারটা যুক্তি। কোন মেয়ে একা থাকবে? কোন ছেলে একা বসবাস করবে এ শহরে? এ প্রায় অসম্ভব। হাজারো অশালীন, অশোভন প্রশ্ন তার সামনে অথচ ‘একত্রবাস’ এর ভয়ংকর, বীভৎস, গা শিউরে ওঠা সব ঘটনা- এ সমাজেরই।

যদি প্রশ্ন করা হয় কোনটি ভালো, ডিভোর্স নাকি হত্যাকাণ্ড, আমি বলব নিশ্চিতভাবে প্রথমটি; কেননা ডিভোর্সে মুক্তি আছে, মৃত্যু নেই। প্রথমটি স্বাভাবিক, দ্বিতীয়টি অস্বাভাবিক। প্রথমটিতে অন্যায় নেই, নেই কোনো অপরাধ, দ্বিতীয়টি নৈতিকতার বিচারে অপরাধ তো বটেই, একই সঙ্গে পাপ।

সমাজ স্বাভাবিকতাকে অনুমোদন করে না সব সময়। করে অস্বাভাবিকতাকে, অসভ্যতাকে, বর্বরতাকে। সে কারণেই এমন সব ঘটনা ঘটে সমাজে। ডিভোর্সকে ভালো চোখে দেখে না, দেখতেও দেয় না সমাজ। ফলে হত্যাকাণ্ড যত সহজে হয়, ডিভোর্স তত সহজে হয় না। ঘটে না। হত্যাকাণ্ডকে যত সহজে মেনে নেয় তত সহজে ডিভোর্সকে মানে না, মেনে নেয় না সমাজ। ফলে এ্যান্টি ডিভোর্স সোসাইটিতে ডিভোর্স হয় না বরং রক্তপাত ঘটে, প্রাণ যায়। যদিও সমাজের তাতে কী-ই বা এসে যায়!
আমরা মুখে প্রগতিশীলতার কথা বলি, উদারতার কথা বলি, ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা বলি। কিন্তু আধুনিকতার ‘আ’ কিংবা প্রগতিশীলতা‘প্র’টির লেশমাত্রও ধারণ করি না। আর উদারতা, সে তো নেই-ই। এসব ধার করা শব্দ আমরা বলতে ভালোবাসি। কিন্তু ধারণ করার ন্যূনতম যোগ্যতা ও ক্ষমতা রাখি না। আমরা কিছু ভুল ধারণার মধ্যে বসবাস করি। সভ্যতা-অসভ্যতার সীমারেখা আমরা জানি না,জানলেও তা মানি না। অনধিকার চর্চা আমাদের অশ্লীল আনন্দ দেয়। অন্যের দাম্পত্যে, বৈবাহিক জীবনে অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশ আমাদের পুলকিত করে। এই আনন্দ বিকৃত আনন্দ। অন্যের অন্তর্বাসের মাপ জানতে চাওয়া যেমন অশ্লীল, অন্যের বেডরুমে ঢুকে যাওয়াটা যেমন অসভ্য রকমের অন্যায়, তেমনি অন্যের দাম্পত্য জীবন নিয়ে মন্তব্য, কৌতূহলও যারপরনাই কুরুচিপূর্ণ। যার যার জীবন তার তার। সেই জীবনের সিদ্ধান্তও তারই। কে, কেন কী কারণে, কোন পরিস্থিতিতে তার জীবনের কোনও সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, নিয়েছেন, সেটা শুধু তিনিই জানেন। বাইরে থেকে দেখা যায়,ভেতরটা বোঝা যায় না। মানুষের জীবন বড় বিচিত্র ও অসহায়। ফলে অন্যের জীবন নিয়ে মন্তব্য না করাই ভালো। কারও জীবন, জীবনচর্চা যদি আমার জীবনকে বাধাগ্রস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত করে, যদি অপরাধ সংঘটিত হয়, যা অন্যের ক্ষতিসাধন করে কেবল তখনই তা নিয়ে আমি আপনি মন্তব্য করতে পারি, তার আগে নয়।

আমাদের সমাজে একধরনের ডিভোর্স ভীতি ও আপত্তি রয়েছে। এখানে অনেক সময়ই মানুষের মধ্যে মুক্ত স্বাধীনসত্তা ও আত্মসম্মানবোধ কাজ করে না। সামাজিক, আর্থিক ফ্যাক্টর এ জন্য দায়ী। ‘মেনে নেওয়া, মানিয়ে নেওয়া’-দাম্পত্য টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় মন্ত্র বলে শেখানো হয়। আরেকটি বিষয়, কারও জীবনে একবার বিয়ে হওয়া মানে তিনি সারাজীবনের জন্য বিবাহিত নন। দাম্পত্য থাকলে, বৈবাহিক জীবনের মধ্যে থাকলে, তবেই তাকে বিবাহিত বলা যায়।

মনে রাখতে হবে, বিয়ে কেবল প্রেম ভালোবাসার সম্পর্ক নয়, আইনি সম্পর্কও বটে। আইনি জটিলতা মিটে গেলে কেউই কারও স্বামী বা স্ত্রী নন। বিয়ে অনেকটা অফিশিয়াল সম্পর্ক, সে কারণেই বিয়েতে কাগজপত্র প্রয়োজন হয়। সই, সাক্ষী লাগে। ভেঙে যেতে পারে এমন আশঙ্কা আছে বলেই প্রয়োজন হয় কাগজপত্রের। ফলে বিয়ের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া অন্যায় নয়, অস্বাভাবিক নয়। বরং বিয়ের পর সম্পর্কের নানান টানাপোড়েন দেখা গেলে তা ভেঙে যাওয়া ভালো ও স্বাভাবিক।

যে সমাজে আমরা বাস করি তা অসম্ভব রকমের ভান ও ভণিতায় ঠাসা। ভালো আছি, ভালোবাসি এমন কৃত্রিম আচরণে ভরা। এই কৃত্রিমতা আর যাই দিক সুখ দেয় না, দেয় না স্বস্তি, শান্তি। ঘরে ঘরে প্রেমহীন, ভালোবাসাহীন, আবেগহীন, শ্রদ্ধাহীন সম্পর্ক। লোক দেখানো ‘ভালো আছি’ ধরনের দাম্পত্যে। ভেতরে কদর্যতা, নৃশংসতা। দাম্পত্য তো আরো পরের কথা। নেই বিশ্বস্ততা। তবু সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হবে, স্রেফ লোক দেখাতে। স্বেচ্ছাচারী স্বামীর ঘরকে নিজের ঘর বলে থাকতে হবে। সমাজের চোখে ‘ভদ্রলোক’ হতে। যে ঘরকে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় বলে মনে করে মেয়েরা, সেটাই সবচেয়ে অনিরাপদ তাদের জন্য। ভারতে ১.১ ডিভোর্সের হার। এ দেশে এই হার আরো কম।

আমাদের সমাজ যে কোনো মূল্যে একজন নারী ও পুরুষের একত্রবাসকে ভালো থাকা মনে করে। ফলে সমাজের দেয়া এই ধারণার বশবর্তী হয়ে ‘একত্রবাস’-কে অনিবার্য মনে করে কেবল নারী নয়, অনেক পুরুষও। কিন্তু একবার কী কেউ ভেবেছে, যদি ডিভোর্স হতো তাহলে কী এই সব হত্যাকাণ্ড ঘটে। নাকি অশ্রদ্ধা, ভালোবাসাহীনতার ধারা এত দূর পর্যন্ত যায়!


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

ভালোবাটা–টালোবাসা মিথ্যে কথা, পুরোটাই ট্রানজেকশনাল রিলেশনশীপ।


=====================

-------------------------------------------------
প্রতিটি দগ্ধ গ্রন্থ সভ্যতাকে নতুন আলো দেয়
- হুমায়ূন আজাদ


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

সহমত।

glqxz9283 sfy39587p07