Skip to content

হতাশার ফানুস

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

আই সি ইউ রুমে পেশেন্ট মনিটরটা সমানে বিপ বিপ করেই যাচ্ছে। প্রত্যেক আই সি ইউ রুমে রোগীর পাশে একটা করে পেশেন্ট মনিটর থাকে। এটা রোগীর ই সি জি, ওয়েভ ফরম, পালস রেট, হার্ট রেট, টেম্পারেচার, রেস্পিরেশন মনিটর করতে থাকে। সোহাগের চোখ বন্ধ। সে শুধু ওই যন্ত্রটার শব্দ শুনতে পাচ্ছে, কিন্তু এটা কিসের শব্দ তা বুঝতে পারছে না। তার মনে হচ্ছে, কোন একটা বাচ্চা ছেলে তার কানের কাছে কোন একটা খেলনা নিয়ে বসে আছে এবং আপন মনে খেলেই চলেছে। তাদের বাড়িতে তো কোন ছোট ছেলে-পেলে নেই! এটা কি কোন প্রতিবেশীর? শব্দটা বেশ বিরক্তিকর। বাচ্চাটাকে আচ্ছামতো ধমক দিয়ে বাড়ি থেকে বিদায় করা দরকার। বেশ কিছুক্ষণপর সে বুঝলো এখানে কোন বাচ্চা নেই। এটা অন্য কিছু একটার শব্দ। সে কোথায় আছে ঠিক করে বুঝে উঠতে পারছে না। এ ঘরটা বেশ ঠান্ডা। বিপ বিপ শব্দের সাথে সে এখন আরও একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছে। মাথার একটু ওপর থেকে আসছে টিপ টিপ আওয়াজ, কিছুটা পানি পড়া শব্দের মতন এবং সেটা বেশ ধীরে ও খানিকটা করে বিরতি দিয়ে। সে কি কোন স্বপ্ন দেখছে? না, সে কোন স্বপ্ন দেখছে না। কারন, স্বপ্ন দেখলে কি ঘটে চলেছে তা দেখতে পেতো। তার সাব-কনশাস মাইন্ড কি ঘটছে তার মনের মতো একটা ছবি তৈরি করে তাকে দেখাতো। কিন্তু সে কোন কিছুই দেখছে না, কিন্তু স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে শব্দগুলো। তার এ অর্ধচেতন ভাব ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে। একটু একটু করে বুঝতে পারছে। তার সারা দেহ অসাড় হয়ে পড়ে আছে। সারা গায়ে প্রচন্ড ব্যথা, নড়বার মতো এতটুকু শক্তিও তার অবশিষ্ট নেই। খুব ক্লান্ত লাগছে তার। জ্ঞান ফিরছে ধীরে ধীরে। বেশ ঠান্ডা ও আরামদায়ক কোন একটা ঘরে শুয়ে আছে সে। শব্দগুলিকে তার চেনা মনে হচ্ছে এবার। পানি পড়ার ওই টিপ টিপ শব্দটা মনে হয় স্যালাইনের শব্দ। চোখ মেলে দেখতে না পারলেও এখন সে জানে, সে শুয়ে আছে দামী কোন একটা হাসপাতাল বা ক্লিনিকে।
আজ সকালে চাকরির একটা ইন্টারভিউ ছিলো তার। একটা প্রাইভেট ব্যাংকের প্রবেশনারি অফিসার। বেতন মোটামুটি। চাকরিটা হয়ে গেলে এ টানা পোড়েনের সংসারের পালে একটু অর্থনৈতিক হাওয়া হয়তো লাগতো, কিন্তু শান্তি ফিরবে কিনা সে জানে না। রিটায়ার্ড বাবার অসুস্থতা, সাবালিকা বোনের পড়ার ও বিয়ের খরচ গোছানো, শয্যাশায়ী মায়ের বিলাপ এবং বয়স শেষ হতে চলা সোহাগের বেকারত্ব এ সংসারকে পুরোপুরি দোজখ বানিয়ে রেখেছে। গা সওয়া হয়ে যাওয়া এসব থেকে মুক্তিপেতে সোহাগ প্রাণপণে চেস্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একটার পর একটা পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু প্রতিবারই রিজেক্টটেড। তাই আজও যে খুব একটা আশা নিয়ে সে বের হচ্ছে তা নয়, তবে অন্য দিনের চেয়ে আজ একটু বেশী হতাশা নিয়েই সার্টিফিকেটগুলো গোছাচ্ছে। কি হবে এত কাগজ দিয়ে? আজকের পর এগুলোর হয়তো আর কোন মূল্যই থাকবে না। কারন সার্টিফিকেট অনুযায়ী আজ তার বয়স ত্রিশ বছর পূর্ণ হলো।
সোহাগ বাসা থেকে বেরিয়ে গলির মুখে একটা রিক্সা পেয়ে তাতেই উঠে গেলো। সাধারনত গলিটা হেঁটে গিয়ে মোড়ের মাথা থেকে বাস ধরে সে। কিন্তু আজ তার চাকরি খোঁজার শেষ দিন, হাতে অনেকটা সময়ও আছে, তাই হোক না একটু বিলাসিতা। কি আশ্চর্য! মধ্যবিত্ত বাঙ্গালীদের রিক্সা ভাড়া করাটাও এখন বিলাসিতার পর্যায়ে পড়ে! সামান্যকটা টিউশনীর টাকা, এটাই তার খোরাকি যোগায়। নভেম্বর প্রায় এসে গেলো। ভার্সিটি ভর্তি কোচিং প্রায় শেষ পর্যায়ে। অনেক ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষাও শেষ। তার ছাত্রী সাবরিনা, যাকে সে বাসায় গিয়ে পড়ায়, সে দু'টো ভার্সিটিতে চান্স পেয়েছে। সাবজেক্ট পছন্দ হয়নি তাই আরও যে দু-চারটা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা বাকি আছে, সেগুলোতে চেস্টা করছে। তার মানে আর কিছু দিন; তারপর এ টিউশনটাও শেষ। আবার কিছু দিন বসে থাকা, তারপর আবার নতুন করে একটা স্টুডেন্ট জোটা।
সাবরিনাকে সোহাগ মনে মনে পছন্দ করে। এ কথাটা তাকে কখনও বলা হয়ে ওঠেনি। বাড়ির টিউশন মাস্টার তার ছাত্রীর সাথে প্রেম করছে এ ব্যাপারটা কেউই ভালো চোখে দেখে না। আর তা ছাড়া তার এখনও এমন কোন আর্থিক স্বচ্ছলতা আসেনি যে, সে কোন বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। সে ভেবে রেখেছে, এ চাকরিটা পেলে এবং টিউশনীটা ছেড়ে দেবার পর কথাটা তাকে বলবে। এর আগে কোনভাবেই নয়। পড়া না পারলে সোহাগ যখন তাকে মৃদু কন্ঠে বকা দেয়, তখন সাবরিনার মুখখানি হয় দেখার মতন। মাথাটা নীচু করে বসে থাকে। চোখ থাকে টেবিলের তলায় পায়ের দিকে। আর সেই সাথে ফুপিয়ে ফুপিয়ে নাক ফোলায়। সরু নাকখানিতে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে। নাক ফুলিয়ে ফুলিয়ে সে তার কান্নাটাকে আড়াল করে। এ অদ্ভুত আচরন তার সামনে অন্য কেউ করেছে কিনা সে খেয়াল করেনি। এ দৃশ্যটি তার খুব অদ্ভুত লাগে। মায়াবী চোখের প্রচন্ড ছিঁচ-কাদুনী মেয়ে একটা। সাবরিনার বাবা আবার খুব দাম্ভিক প্রকৃতির লোক। রিটায়ার্ড করার পর তিনি প্রায়শঃই এখন বাসায় থাকেন। টিউশনীর ফাঁকে মাঝে-মধ্যে তিনি সোহাগের সাথে টুকটাক গল্প করেন। আসলে গল্প করেন বললে কিছুটা ভুল বলা হবে। বেশির ভাগই উপদেশ মূলক কথাবার্তা। ভদ্রলোকের মনে হয় ফ্রিতে উপদেশ দেওয়ার বাতিক আছে। সব সময় তিনি সোহাগকে বলেন, ‌কিছু একটা করো। এভাবে আর কত দিন? বেকার থাকলে পৃথিবীর কেউ তোমাকে এতটুকু দাম দেবেনা। তোমার প্রতিভারও কোন দাম দেবেনা। বেকার ছেলের দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না; এমনকি মেয়েরাও নয়।' সোহাগ ঠিক করে রেখেছে, চাকরিটা হয়ে গেলে সে সাবরিনার বাবার কাছেই বিয়ের প্রস্তাবটা নিজে সরাসরি দিবে এবং সেটাও বেশ ঘটা করেই। তখন ভদ্রলোকের মুখের অবস্থা কি হয় সেটাই দেখার বিষয়। সোহাগের কেনো জানি মনে হয়, এ লোকটা তাকে হয়তো পছন্দ করে না। আচ্ছা, সাবরিনা তাকে পছন্দ করে তো?
সাবরিনার কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে সে পৌঁছে গেছে টেরই পেলো না। ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম কি উঠে গেছে নাকি? হাতে বাধা কালো বেল্টের সস্তা ক্যাসিও ডিজিটাল ঘড়িটা দেখে তার হুশ ফিরলো। পাক্কা এক ঘন্টা পচিঁশ মিনিট লেগেছে তার এইটুকু পথ আসতে। তার মানে জ্যামের কোন হেরফের হয়নি। মনটা বিক্ষিপ্ত, তাই সময় কি করে চলে গেলো বোঝা গেলো না। রিক্সা ভাড়া মিটিয়ে, দোয়া ইউনুস পড়ে বুকে ফুঁ দিয়ে গেটের দিকে পা বাড়ালো। সুরা ইউনুস কঠিন সুরা। এ সুরা পড়ে নবী ইউনুস মাছের পেট থেকে মুক্ত হতে পেরেছিলেন। তার বিশ্বাস, নবী ইউনুসের মতো সেও সফলভাবে ভাইভা বোর্ড থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। অজকাল আনেক কঠিন ও অদ্ভুত ধরনের প্রশ্ন করে ভাইভা বোর্ডে। তার মনে হয় কোন প্রশ্নকর্তা যে প্রশ্নটি করেন, তিনি ছাড়া ওই প্রশ্নের উত্তর বাকি বোর্ড মেম্বাররাও জানেনা। এক এক জন বিদ্বান তার শানিত বিদ্যার বহর দেখাতে থাকে অন্য বোর্ড মেম্বারদের ওপর। এইতো শেষবার, একটা বায়িং হাউজের ভাইভাতে তাকে জিঞ্জাসা করা হল,
‘আচ্ছা বলুনতো, প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইলেকট্রনিক কম্পিউটারের নাম কি?'
সোহাগ উত্তর করলো, 'স্যার মার্ক-১।’
প্রশ্নকর্তা তার মোটা গোফেঁর তলে লুকিয়ে থাকা সরু ঠোঁট প্রশস্ত করলেন। একটি ব্যাঙ্গাত্নক হাসি, যার অর্থ তুমি কিছুই জানো না। প্রশ্নকর্তা আড়চোখে অন্য বোর্ড মেম্বারদের দিকে তাকালেন। তারাও উত্তরটি সঠিক না ভুল তা জানে বলে হনে হলো না।প্রশ্নকর্তার মুখে হাসি। তিনি বেশ আয়েশ করেই বোঝাতে শুরু করলেন।
‘মার্ক - ১ হলো পৃথিবীর প্রথম বৈদ্যুতিক কম্পিউটার। তবে তা মোটেও পূর্ণাঙ্গ নয়। কারন এটিতে কোন ভ্যাকুয়াম ভালব ব্যবহার করা হয়নি। এটি শুধুমাত্র তড়িৎ যান্ত্রিক রিলের ওপর নির্ভর করে তৈরি করা হয়েছিলো। প্রথম পূর্ণাঙ্গ কম্পিউটার হলো ENIAC-১। এখন বলোতো ENIAC এ কি হয়?’
উত্তরটা সোহাগের জানা আছে। ENIAC হলো Electronic Numerical Integrator and Calculator । কিন্তু তার বলতে ইচ্ছে করছে না। সে বলে বসলো,‌‌‘ জানিনা স্যার।’এবার প্রশ্নকর্তা একটু শান্তি পেলেন। বাকিরাও বোধহয় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। বায়িং হাউজের সাথে ENIAC -১ এর কি সম্পর্ক আছে কে জানে?
নানা রকম ফরমালিটিজ শেষ করে সোহাগ এখন ভাইবা দেবার জন্য বসে আছে। প্রায় তিন ঘন্টা ধরে এক রুমে বসা সে। না, সে একা নয়, প্রায় দশ থেকে পনেরো জন এক রুমে বসে আছে। তারা সবাই বেশ নিশ্চুপ। রুমে তেমন কোন শব্দ নেই শুধু দেড়টনি এসিটা ছাড়া। ওটার মনেহয় কিছু একটা হয়েছে। বুড়ো মানুষের মতো ঘড় ঘড় করছে থেকে থেকে। সোহাগ চারিদিকে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে। মোটা মতো একটা ছেলে, আটোসাটো একটা জামা পরে এসে বেশ অস্বস্তিবোধ করছে। পেটের ঠিক ওপরের বোতামটা প্রাণপণে টিকে আছে; মনেহয় এক্ষুনি ওটা ফটাং করে উড়ে যাবে। সোহাগ অপেক্ষা করছে, কখন ঘটনাটা ঘটে। এঘরে তিনটি মেয়ে প্রার্থীও আছে। এদের মধ্যে একজন বোতলে করে একটু পর পর পানি খাচ্ছে, আর অন্যজন তার পানি খাওয়া দেখছে। মনেহয় টেনশনে তার তৃষ্ণা পেয়েছে, কিন্তু সাথে পানি আনা হয়নি বলে খেতে পারছেনা। তৃতীয়জনকে দেখে সাবরিনার কথা মনে পড়ে গেলো তার। চেহারার কারনে নয়; তার কান্ড দেখে। মেয়েটা একটা মোটা খাতা নিয়ে পৃষ্ঠা উল্টে পড়ছে, আর ওর্ণা দিয়ে নিজেকে বাতাস করছে। এ ঠান্ডা ঘরে সে বিন্দু বিন্দু ঘামছে। পরীক্ষার আগ মুহূর্তে সাবরিনাও এমন উথাল-পাথাল পড়া দেয় আর এমনি করেই নিজেকে বাতাস করে। আচ্ছা, মেয়েদের পড়ার সাথে ওর্ণা দিয়ে নিজেকে বাতাস করার কি কোন সম্পর্ক আছে?
সোহাগের চিন্তায় ছেদ পড়লো, কারন ভাইবা বোর্ডে তার ডাক পড়েছে। সে উঠে দাড়ালো এবং সবার দিকে একনজর তাকালো। একজন শুভেচ্ছা স্বরুপ হাসি দিয়ে বললো, ‘যান, বেস্ট অব লাক।’ আবারো একবার দোয়া ইউনুস পড়ে সে পা বাড়ালো ভাইবা রুমের দিকে।
দুপুর তিনটা দশ। সোহাগ খাঁ-খাঁ রোদে হেটে চলেছে। এ ভাইবাটাও ভালো হয়নি। দুটি প্রশ্নের উত্তর পারেনি সে। আচ্ছা, একটা মানুষের পক্ষে দুনিয়ার সব কিছু কি মনে রাখা সম্ভব? বোর্ডে তাকে একজন প্রশ্ন করেছিলো,‘ বাশেঁর কেল্লা কে নির্মান করেন?’ উত্তরটা সহজ - ‘তিতুমীর।’ সাথে সাথেই আর একজন প্রশ্ন করলেন, ‘ বাশেঁর কেল্লা ধ্বংস হলো কার নেতৃত্ত্বে?’ উত্তরটা তার জানা, কিন্তু কিছুতেই তার সেই সময় মনে পড়লো না। এখন তার মস্তিস্ক উত্তর দিচ্ছে, ‘কর্ণেল অ্যালেক স্টুয়ার্ট এর নেতৃত্ত্বে বাশেঁর কেল্লায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।’ গনিতের এক শিক্ষার্থীর কাছে ইতিহাসের বাশেঁর কেল্লার প্রশ্ন না করে সরাসরি পেছনে বাঁশ দিয়ে দিলেই হয়। ল্যাঠা চুকে যায়। এই যেমন আজ তার বয়সের হিসাব চুকে গেলো, আর চাকুরী নামক সোনার হরিণও অধরা থেকে গেলো। বাড়িতে গেলে সবাই জিঞ্জাসা করবে, পরীক্ষা কেমন হলো? মায়ের চোখে থাকবে হতাশার দৃস্টি আর বাবার থাকবে অবহেলার। মাঝে কিছু দিন এগুলো বেশ গা সওয়া হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু আজ, তার এই শেষ দিনে হঠাৎ করেই আবার সেই হতাশাগুলো ফিরে আসতে শুরু করেছে। এ হতাশাকে খুব ভয় পায় সে। এ আত্নগ্লানিই তাকে বন্ধু -বান্ধব, আত্নীয় স্বজন, সমাজ থেকে দুরে নিয়ে এককেন্দ্রিক করে রেখে দিয়েছে। এ হতাশার কাছ থেকে পালিয়ে বাচাঁর কি কোন পথ নেই? মাঝে মাঝে মনে হয় আত্নহত্যা করে নিজেকে শেষ করে দিবে। সেটাও সে পারে না। আসলে তার এ যোগ্যতাটাও নেই।
হঠাৎ তার মনে কি খেলে গেলো কে জানে! তার কি কোন যোগ্যতা নেই? একটা যোগ্যতার প্রমান তার দেওয়া উচিৎ, অন্ততঃ নিজের কাছে নিজেকে প্রমান করা উচিৎ যে সে কিছু একটা করতে পারে। বাবার চিকিৎসার খরচ বহন করার যোগ্যতা তার নেই, বোনের বিয়ে দেবার মতো কোন যোগ্যতা নেই, সংসারের দু’মুঠো ডাল-ভাত যোগাবার যোগ্যতা নেই, বন্ধু মহলে এক প্যাকেট সিগারেট কেনার যোগ্যতা নেই, সাবরিনাকে মনের কথা খুলে বলার যোগ্যতা নেই, সাবরিনার বাবার উপদেশ দেওয়া বন্ধকরতে বলার যোগ্যতা নেই; তাহলে তার আছে কি? সিগন্যাল বাতি সবুজ হয়ে গেছে। দাড়িয়ে থাকা গাড়ী গুলো আবার ছুটতে শুরু করেছে। এর একটার সামনে ছুটে গিয়ে দাড়িয়ে পড়ার যোগ্যতা কি তার আছে? তার মনে হয় সেই সাহসটুকুও নেই। সামান্য এতটুকু সাহস, তাও নেই! এক সমুদ্র হতাশা কোথা থেকে এসে ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়লো তার বুকে। এ ঢেউ তাকে কোথায় নিয়ে যাবে সে জানে না। তার পা ফুটপাথ থেকে নেমে এসেছে রাস্তায়, এগিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে রাস্তার মাঝখান বরাবর। সে এখন আর তার নিজের মধ্যে নেই। তার দিকে এগিয়ে আসছে দ্রুতগামী একটি বাস। কয়েকটি সেকেন্ড, আর তারপর!
তার চোখে এখন রোদ পড়ছে। শরতের আকাশে ভাসছে তুলোর মতোন মেঘ। তার হাতের সার্টিফিকেটগুলো আকাশে ভাসছে ফানুসের মতো। আজ ভাইবা বোর্ডে কে যেনো জিঞ্জাসা করেছিলো ‘ফানুস’ ইংরেজী কি? ফানুসের ইংরেজী তার জানা নেই। তার চোখ ক্রমশঃ ঝাপসা হয়ে আসছে। তার মনে হলো, ভর দুপুরেই যেনো হঠাৎ করে সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। সেই সন্ধ্যার আকাশে হাজার হাজার ফানুস উড়ছে। হাত বাড়িয়ে ধরার চেস্টা করেও সে পারলো না। তার খুব শখ ছিলো, কোন এক সন্ধ্যায় সে ও সাবরিনা খোলা আকাশে বাহারী রংয়ের অনেক অনেক ফানুস ওড়াবে। সেই ফানুসগুলো সে নিজের হাতে বানাবে। প্রতিটি ফানুসের গায়ে সে লিখে দিবে, তার মনে জমে থাকা সাবরিনার প্রতি তার ভালোবাসার কথা। ফানুসের মাধ্যমে তার না বলা কথা গুলি ছড়িয়ে দিবে সারা আকাশে। সেই একটা দিন কি সে আর পাবেনা? সোহাগের চোখ বন্ধ হয়ে গেছে। সে মনে মনে আবৃত্ত্বি করলো,

“দিতে পারো একশো ফানুস এনে?
আজন্ম সলজ্জ সাধ, একদিন আকাশে কিছু ফানুস ওড়াই।”

glqxz9283 sfy39587p07