Skip to content

গ্রীক পুরানের চরিত্র "নার্সিসাস" ও আমাদের সমাজের "নার্সিসাস"

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

গ্রীক পুরানের এক আজীব চরিত্র নার্সিসাস। অসম্ভব সুন্দর। এতটাই সুন্দর যে তার চারপাশে থাকা প্রায় সকল নারী তার প্রেমে পড়ত। সে কাউকেই পাত্তা দিত না। নিজের খেয়াল খুশিমত চলত। দুর্ভাগা নারীগুলো শুধু শুধু তার প্রেমে পড়ত। একই
দুর্ভাগ্য হল জলপরী ইকোর। সেও নার্সিসাসের গভীর প্রেমে পড়ল। কিন্তু সে কথা বলতে পারত না। জিউসের পত্নী দেবী হেরার অভিশাপে সে প্রায় বাকপ্রতিবন্ধী হয়ে যায়। নার্সিসাসকে ভালবাসত অথচ কিছু বলতে না পারার কষ্টে মনের দু:খে বনে চলে যায়। সেই পথ দিয়ে একদিন নার্সিসাস আসতেছিল। ঘটনাক্রমে জলপরী ইকোর সাথে দেখা হয়ে যায়। নার্সিসাস মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়। মনের দু:খে ইকো গুহাবাসী হয়ে যায়।
ন্যায়পরায়ণ ও ক্রোধের দেবী নেমেসিস এই ঘটনায় ক্ষুদ্ধ হয়। ক্ষুদ্ধ হয়ে নার্সিসাস কে অভিশাপ দেয়। অভিশাপ টাও অদ্ভুত। নার্সিসাস যেহেতু কারো প্রেমে পড়বে না, তাহলে সে নিজের প্রেমে পড়বে। একদিন ঝিলের ধারে
এক জলাশয়ে নার্সিসাস পানি খেতে যায়। পানি খাওয়ার সময় পানির দিকে ঝুকে পড়ে। পানিতে তার প্রতিবিম্ব পড়ে। পানিতে রিফ্লেকশন হওয়া নিজের চেহারা দেখে নিজেই নিজের প্রেমে পড়ে। দিন রাত বছর পেরিয়ে যায় নার্সিসাস নড়তে পারে না। এমন একজনকে ভালবেসে ফেলেছে যাকে সে কখনই পাবে না। এভাবেই তার মৃত্যু হয়।
.
আমাদের সমাজে "নার্সিসাস কমপ্লেক্স" এ ভুগা অসংখ্য মেয়ে আছে। এরা হয় অতিশয় সুন্দরী নয়তো অতিকায় গুনবতী। এই মেয়েগুলোর পিছনে অসংখ্য ছেলে ঘুরে বেড়ায়, তোষামোদ করে চলে। ফুটফরমায়েশ খেটে দেয়ারও অভাব নেই। মধ্যযুগের মোঘল বাদশাদের মত এই গুনবতীরা যখন হেটে যায় চারপাশে সংগীত বাজে, আলোয় আলোকিত হয়। কি সিনিয়র! কি জুনিয়র!! সবাই কেমন যেন বিগলিত হয়ে যায়। কেউ কেউ তো পুরোপুরি দ্রবীভুত হয়ে যায়। গুনবতীদের নিজের উপর আস্থা আরো বেড়ে যায়।
.
আস্থা আসমানে গিয়ে ঠেকে যখন ডিপার্টমেন্টের সুদর্শন স্যারগুলো কেমন যেন লুতুপুত করে তাকায়। সারাদিন খেটে মরা ছেলেটাকে স্যার চিনেও না, অথচ ক্যামেরা ফিগার, ফ্যাশন সচেতন মেয়েটাকে নাম, ঠিকানা, বাবার ঠিকানা, মায়ের পছন্দ অপছন্দের সীমানা পর্যন্ত চিনে ফেলে। কারনে অকারনে খোজ খবর নেয়, মুচকি হাসি দেয়। গায়ে পড়ে কথা বলে। প্রশংসা করে। সিনিয়র গুন্ডা মার্কা মারামারি করা বড় ভাইটাও কেমন যেন কেচোর একেবেকে চলে।
.
আমাদের গুনবতীগুলো পৃথিবীকে নতুনভাবে দেখে ফেলে। হিটলার যে পৃথিবী দখল করতে পারে নাই, রুপ ও গুন দিয়ে তারা সেটা দখল করে ফেলেছে। সবকিছুকে জয় করার একটা মরন নেশা পেয়ে বসে। চারপাশে এমন কেউ থাকে না যে চোখটা একটু সরু করে তাকায় না। পুরুষ মানুষের বদ অভ্যাসগুলোই এই নার্সিসাসদের প্রতিদিনকার পন্য হয়ে দাড়ায়। একারনে এরা কারো প্রেমে পড়ে না। যে রুপ আর গুনের কল্যানে ডিপার্টমেন্টের প্রফেসরও কেমন যেন মায়া ধরা কথা বলে, এরা সেই রুপ, গুনেরই প্রেমে পড়ে। যেমনটা নার্সিসাস পড়েছিল।
এই মেয়েগুলো চায় সবাই তাকে নিয়ে কথা বলুক, তার দিকে চেয়ে থাকুক, কবিতা লিখুক, মারামারি করুক। অনাগত কাল ধরে এটা চলুক। হুট করে কাউকে ভালবেসে ফেললে, কাউকে বিয়ে করে ফেললে সবই তো গেল। সকল আলো নিভে যাবে, সব সুর থেমে যাবে। এ কারনেই এ সমাজে অতিশয় সুন্দরী মেয়েদের বিয়ে হয় না, প্রেম হয় না।
বিয়ে একসময় অবশ্য হয়। তবে সেটা রক্ত আমাশয়ের পরে। ততদিনে অনেক কিছুই থেমে যায়। ঘুর ঘুর করা ছেলেগুলো একদিন হাল ছেড়ে দেয়। ততদিনে রুপ, গুনে ভাটা পড়ে। মানুষ তো আর অমরত্ব নিয়ে আসে নি। এরপর আমাদের সুন্দরীদের গার্জিয়ান রা বিভিন্ন বাড়িতে ঘুর ঘুর করা শুরু করে। সিভি নিয়ে দৌড়ঝাঁপ চলে। এরপর বিয়ে হয় এমন জনের সাথে যাকে সে স্বপ্নেও দেখে নি কোনদিন। কারন সে স্বপ্নে দেখেছিল স্বয়ং বাদশা আকবর আসবে। চারপাশে হাজার হাজার উদহারন জমা পড়ে আছে।
.
কলেজে পড়ার সময় যে মেয়েগুলোর পিছনে আমাদের বোকা ছেলেগুলো উপগ্রহের মত ঘুরে বেড়াত। অনেকের ব্যাপারে আমরা এখন খোজ খবর পাই। মিথলজির সেই ন্যায়পরায়ণ দেবী নেমেসিসের আর প্রয়োজন হয় না। সময়ের স্রোত বহু নার্সিসাকে জীবন্ত অথচ মরা মানুষ বানিয়ে ফেলেছে।

glqxz9283 sfy39587p07