Skip to content

আমি? আপনি? বা ভিড়ের কেউ! ধর্ষক ও ধর্ষিতার সাতকাহন।

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

কোনও এক ধর্ষণের খবরের নীচে ধর্ষকই লিখে গেছে - “শালাকে ক্ষতবিক্ষত করে লবনের স্তূপে শুয়ে রাখা হোক”, অথবা “শুয়োরের বাচ্চার ধোন কেটে নেওয়া উচিত”।
হয়তো আমিই সেই ধর্ষক। আমি নই? তাহলে নিশ্চয় আপনি! বা এই ভিড়ের কেউ। আমাদের মধ্যেই মিশে আছে। তারাও খায় দায় ঘুমায়, আড়াল পেলে বিচি চুলকায়। রবিবারে বাড়িতে মাংস হয়, বাসে-ট্রেনে বাড়ি ফেরে...।
হয়তো আমি ধর্ষক হয়ে বসে আছি, পাশের সিটের উনিও হয়তো ধর্ষক। কিন্তু কি আশ্চর্যজনক, খবরে না এলে ধর্ষক চেনা যায় না।
শুধু চিনলে হয় না। প্রমাণ করতে লাগে।
“কতটা ঢুকিয়েছিলো? নাকি উপর উপর”, “ভেতরে ফেলেছিলো?” বা “টাকা কম দিয়েছে বলে অভিযোগ করছেন?” এইসকল ভদ্র প্রশ্ন, গাদাগুচ্ছের টেস্ট, প্রমাণ লোপাট ইত্যাদি পেরিয়ে যদিওবা প্রমান হয় মেয়েটি ধর্ষিতা হয়েছেন।
কি হবে তাতে? মাসকয়েকের জেল! আরেকটা পুলিশ ফাইল?
ও হ্যাঁ বলা হয়নি। ধর্ষনের পরীক্ষা করতে করতে গিয়ে ডাক্তারবাবুও বাসি জিনিস ভেবে মজা নিয়ে নিয়েছেন। নিজের বউ তো আছেই, কিন্তু ধর্ষিতাকে চেখে দেখায় অন্য এক মজা।
আমারই ক্লাসে পড়তো গোপাল হাজরা। কাকদ্বীপের স্কুলে এক বেঞ্চে বসেছি। সেক্সের কথা আলোচনা করেছি, মেয়েদের শরীর নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছি। তারপর স্কুল ছাড়লো গোপাল।
একদিন শুনলাম সে এবং তার দলবল এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ করে গলায় তার জড়িয়ে মেরে ফেলেছে।
আমি স্কুলজীবনে এমন ভাবিনি যে আমার পাশে বসা ছেলেটিই ধর্ষক হবে। কারন সেও একদিন প্রেমে পড়েছিলো কারো। সেই ঘটনায় নাকি মূল অভিযুক্তরা নাকি ফাঁকফোকর পেয়েছে...।
ধর্ষকরা আসলে আমাদের মতোই দুপেয়ে। বাইরে থেকে চেনার উপায় নেই। ক্লান্ত বউয়ের অসম্মতির পরোয়া না করে চুলের মুঠি ধরে - “দিবি না মাগী…” বলে লেগে পড়া পাশবিকতার বিচার হতে শুনিনি। অথচ এমন ধর্ষক হয়তো আমার সাথেই সিগারেট খায়।
বাসে, ট্রামে, অফিসে, পার্কে, গলিতে। আমারই মতো কেউ অপেক্ষা করে। টিউশন থেকে ফেরা আমার প্রেমিকার পোশাক ছিঁড়ে তাকে জোর করে ভোগ করবে। অথচ সেই আমির সাথে নিজেকে মেলাতে পারি না। কেমন যেন ধর্ষকামী চিন্তাভাবনা ছড়িয়ে যাচ্ছে। যে অনেকসময় জিনিস চাইলেই পাবো, সেখানেও তাকে কেড়ে নেওয়ার অদম্য ইচ্ছে।
ধর্ষণটা আজকাল যেন দলবেঁধে শিকার করার মতো। কেমন লোমখাড়া রোমাঞ্চকর। শিকার করা পশুকে আয়ত্বে এনে ক্ষতবিক্ষত করে রক্ত দেখার সুখ যে বুঝেছে, তার অনুতপ্ত হওয়ারও কোনও সুযোগ থাকে না।
লোকাল ট্রেনে যাতায়াত করার সুবাদে একটা অন্য দুনিয়া দেখি। জনসমক্ষে চালিয়ে দেওয়া নীলছবি। বাবার বয়সী লোক, ছেলের বয়সীদের সাথে বসে হাসতে হাসতে দেখছেন, টিপ্পনি করছেন। ইয়ার্কি মেরে কারো যৌনাঙ্গ চেপে ধরা। অশ্লীল সব কথায় ভরে যাচ্ছে কামরা। “তাপস ওর বৌকে না এমন কুত্তার মতো…”, “তুই শালা জাপানি লাগাবি, তোর তো *** ক্ষমতাও নেই…”। পাশে দাঁড়িয়ে আমার সদ্য গোঁফ গজানো ভাই। এই সভ্য সমাজের হয়ে আমি ওর কাছে ক্ষমা চাইতে গিয়েও ওর দিকে তাকাতে পারি না!
ভিড় ট্রেনে উঠেছেন অল্পবয়সী বউ, সাথে আগলে রাখার কেউ নেই। ভিড়ের সুযোগ নিয়ে যে মাঝবয়সী লোকটি বউটির পেছোনে যৌনাঙ্গ বুলিয়ে কিঞ্চিত সুখ খুঁজে নিচ্ছেন। তা আমার চোখে পড়ে। বৌটি কিছু বলতে পারছেন না লজ্জায়। আমি থাকতে না পেরে বলে উঠি, - “দিদি, জানলার দিকে কিছুটা ফাঁকা আছে। এদিকে চলে আসুন”। আমি জানি একচুল নড়বার জায়গা নেই, কিন্তু তবুও এক কথায় যদি কিছুটা প্রভাব পড়ে!
রেলপুলিশকে বলবো? সে কথা বহুবার মনে হয়েছে। কিন্তু লাভের লাভ কিছু হবে না। বরং আমার দেহ পড়ে থাকবে গোচরণের কোনও জমির ধারে!
এই যে কামরায় কামরায় গ্রুপবাজি, এর নোংরামির কাছে কোনও যুক্তিই খাটে না।
কোনও কলেজছাত্রীর গায়ে হাত দিয়েছে কেউ। মেয়েটি চেঁচিয়ে উঠেছে। প্রতিবাদ করছে।
- “আপনার ভিড়ে সমস্যা হলে, লেডিসে যাবেন। ঠ্যালা খেতেই তো জেনারেলে ওঠেন...।”
তারপর থেকে মেয়েটি যতদূর যাবে, তাকে উদ্দেশ্য করে অপমানজনক কথা বলা হবে।
প্রতিবাদ করে দেখেছি। “দাদা আপনার বোন হন নাকি? তাহলে আপনার চুলকাচ্ছে কেন! ভিড় ট্রেনে গায়ে একটু ধাক্কা লাগবে না নাকি...।”
বউকে বলে ফেলি - “বিয়েবাড়ি যাচ্ছো ঠিক আছে, বেশি দেরি করে ফেলবে না। ওয়াশরুম বা লোকজন কম আছে এমন জায়গায় মাকে নিয়ে যেও। আলাদাভাবে কেউ কিছু খেতে দিলে ভেবেচিন্তে খাবে…”।
এসব বলতে আমার পুরুষত্ব অপমানে ডুবে যায়। তবু পরিস্থিতির নিরিখে বলতে হয়। কারন আমি সুপারম্যান নই বলে নয়, এই দুনিয়াটা বিশ্বাস শব্দটাকে হারিয়ে যাচ্ছে বলে।

কাল শুনলাম দিনাজপুরে তিনবছরের একটা বাচ্চার উপর অকথ্য অত্যাচার করেছে এক বয়স্ক ব্যক্তি। সেসব লিখতেও মন চাইছে না, রুচিতে বাঁধছে। ঠিক এরই পাশে নিজের ব্রাউজারের হিস্ট্রি ডিলিট করতে গিয়ে দেখেছি - ‘হার্ডকোর’, ‘পেইনফুল অ্যানাল’, ‘গ্যাং ব্যাং’, ‘ডবল পেনিট্রেশন’ ইত্যাদি শব্দে ভরে আছে। তখন কেউ জানে না আমার মধ্যেও একটা ধর্ষক মন বেড়ে উঠছে, বা বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে। সঠিক পরিস্থিতি পেলে সে দাঁতনখ বের করবে। যে ছেলেটির সফট পর্ণ আর ভালোলাগে না, তার হিংস্রতা চাই। পর্ণ দ্যাখায় কোনও ভুল নেই, ভয় লাগে এই হিংস্রতার উপাসনা দেখলে।
দোষ কাকে দেবো? একঝাঁক ধর্ষকের সাথে ওঠাবসা করতে করতে আমিও হয়তো তাদের দলে ভিড়ে যাচ্ছি। ভিড়ের সুযোগেও যেখানে একটা সাধারণ বাড়ির মেয়ের উপর যৌনচাহিদা মেটানোর চেষ্টা দেখি দেখানে নির্জনতা বা পোষাক আর ফ্যাক্টর নয়।
কারো আধখোলা স্তন দেখে গায়ে শিহরণ জাগে। কিন্তু সেটা দিয়ে ধর্ষণকে ডিফেন্ড করাটা বড়ই সরলীকরণ। যে দেশে দুধের শিশুর উপর হিংস্রতা নেমে আসে। সেখানে পোষাকটা সব সময় ফ্যাক্টর নয়।
যে বোন বোরখা পরে কলেজ যায়। তার দাদাই রাস্তায় দাঁড়িয়ে মেয়েদের কটুক্তি করে! এসবও দেখি। যে বাবা কোনও ক্লাস নাইনের মেয়ের স্কার্টরা হাওয়ায় কিছুটা উঠে যাওয়া দেখে জিভের আগার জল সুড়ুত করে টেনে নেয়, তিনি তাঁর ক্লাস টুয়ের মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে যাচ্ছেন...। ব্যাপারটা এমনই, অন্যের বেলায় সব শালীন। নিজের সাথে না ঘটলে এসব খবর পড়তেও ভালো, শোনাতেও ভালো।
নিজের নিকট আত্মীয়দের কাছে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাই। তখন ভাবি বেশিদিন না বাঁচলেই বোধহয় ভালো। এক বান্ধবী একবার মাঝরাতের দুঃখ শোনাতে গিয়ে হাসতে হাসতে বলেছিলো, ওর মেসো ওকে ক্লাস ফাইভে...। মা চেপে যেতে বলছিলো। লোকলজ্জায় চেপে গ্যাছে। আমি বলেছিলাম দেখিস, বিচার একদিন হবে। মেয়েটির মেসোর মেয়ে ক্যান্সারে মারা গেলো কয়েকমাস আগে। সেদিনও মেয়েটি মনখারাপ করে বলেছিলো - “দ্যাখ মেসো আজ হয়তো মেয়ে হারিয়ে কাঁদছেন, আমিও তো তাঁর মেয়ের বয়সীই ছিলাম…”।
আমি ক্রাইম পেট্রোল দেখি না আমি। আমার ভয় লাগে, ঘেন্না লাগে। কত সহজে বিকিয়ে যায় সত্যঘটনা।
রোমান্স শব্দটা হয়তো উতক্ত করায় নেমে এসেছে, স্বামী বা প্রেমিককেও তো ধর্ষক হতে দেখি। বাবা, ভাই, পড়শি কাকু...।
আমার ভয় করে বর্তমানে দাঁড়িয়ে, আগামী ভেবে। আমার একটা মেয়ে আছে সেও বড় হবে একদিন এই স্বপ্নটাকে সামনে রেখে।

glqxz9283 sfy39587p07