Skip to content

প্রতিশোধ

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

প্রবাসী রিফাত মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে কোন একটা রেস্টুরেন্টে চাকরি করছে প্রায় নয় বছর ধরে। বিকেল পাঁচটা হতে রাত একটা পর্যন্ত নানা ধরণের কাবাব বানানোই তার কাজ। তার বানানো কাবাবের সুনামের কারণেই রেস্টুরেন্টে সব সময় ভীড় লেগে থাকে। তাইতো তার মালিক তাকে রেস্টুরেন্টের কর্মচারীদের মধ্যে সব চাইতে বেশি বেতন দেন।

প্রতি মাসে দেড় লক্ষ টাকা বেতন চাট্টিখানি কথা নয়। তাই রিফাতের সংসার তরতর করে উন্নতি করতে থাকে। মফস্বল শহরে ভালো জায়গাতে জমি কিনেছে। পাঁচতলা বাড়ি তৈরি করা শুরু করেছে রিফাতের বাবা। রিফাতের ইচ্ছে আর মাত্র পাঁচ বছর বিদেশে কাজ করার পর একেবারে দেশে চলে আসবে। বাড়ি ভাড়া দিয়েই পুরো জীবন আরামে কেটে যাবে।

এর মাঝে মা-বাবা রিফাত দেশে আসলে রিফাতের জন্য পাত্রী দেখতে থাকেন। পাশের এলাকার আফিয়াকে তারা রিফাতের জন্য পছন্দ করেন। রিফাতও আফিয়াকে দেখে আর না করতে পারেনা। কারণ এমন আগুনের মত সুন্দর মেয়ে দেখে তারও বিয়ের ইচ্ছে জেগে ওঠে। সেও বিয়েতে রাজি হয়ে যায়। অবশেষে ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে যায়। এর প্রায় দেড় বছর পর তাদের ঘর আলোকিত হয়ে একটি পুত্র সন্তান আসে।

সন্তান জন্মের প্রায় ছয় মাস পর একদিন রিফাত তার স্ত্রী আফিয়াকে বলে তার জন্য একটি সারপ্রাইজ আছে। জবাবে আফিয়া বলে সেও রিফাতের জন্য একটি চরম সারপ্রাইজ রেখেছে। কিন্তু আগে রিফাতকে তার সারপ্রাইজ বলতে হবে, তারপর আফিয়া তারটা বলবে। রিফাত জানায় কাল বিকেল ২টায় সে তার সামনে থাকবে। মানে রিফাত কাল দেশে আসছে। আফিয়া বলে রিফাতের সারপ্রাইজ রিফাত বাড়িতে আসার পরই পাবে।

যথারীতি রিফাত দেশে আসে। বাড়িতে গিয়েই সে দেখতে পায় তার মা-বাবা তার ছেলেকে কোলে নিয়ে কান্না করছে। রিফাত জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে বাড়িতে, আফিয়া কোথায়?
জবাবে রিফাতের মা-বাবা জানায় আসে পাশের সবাই দেখেছে আফিয়া আজকে সকালে ঘর থেকে হাতে ব্যাগ নিয়ে একটি ছেলের সাথে বাইকে করে পালিয়েছে। তার ছয় মাসের বাচ্চা ছেলেকে ফেলে গেছে, সাথে করে ঘর থেকে বাড়ির ঢালাইয়ের জন্য রাখা ১৫লক্ষ টাকাও নিয়ে গেছে।

রিফাতের পুরো পৃথিবী থমকে যায়। তার মাথা লাটিমের মত ঘুরতে থাকে। সে তার ঘরে প্রবেশ করে। টেবিলের উপর একটি চিঠি। সেখানে লেখা "তোমার জন্য সারপ্রাইজ, আমাকে আর খুঁজতে চেষ্টা করবেনা"।

রিফাত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে তার রুমে দরজা জানলা বন্ধ করে বসে আছে। তার একটাই প্রশ্ন কি কারণে আফিয়া তাকে ছেড়ে চলে গেলো। কখনও ঝগড়া হয়নি তাদের, কখনও কথা কাটাকাটি হয়নি, কখনও সে আফিয়াকে কষ্ট দেয়নি। তাহলে তার কি অপরাধ ছিলো?

রিফাতের বন্ধুরা আসে তার সাথে দেখা করতে। তারা তাকে জানায় আফিয়ার এলাকার চেয়ারম্যানের ভাগ্নে নাজিম নামের ছেলের সাথে আফিয়া পালিয়েছে। এখন আফিয়া কোথায় আছে রিফাত বন্ধুদের খবর নিতে বলে। বন্ধুরা রিফাতকে প্রশ্ন করে, যে স্ত্রী রিফাতের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাকে ধোকা দিয়ে আরেকজনের সাথে পালিয়ে যায় তাকে খোঁজার মানে কি?
রিফাত জবাবে বলে "আমি বদলা নিতে চাই। কঠিন বদলা"।

রিফাত এখন সিলেটের পথে রওয়ানা হয়ে গেছে। তার সাথে কয়েকজন বন্ধু এসেছে যারা সব কিছু প্লান করে রেখেছে। রাত বারোটা নাগাদ তারা সিলেটের জাফলংয়ের একটি বাংলো বাড়ির সামনে এসে থামে। দুইজন গাড়িতে বসে থাকে, বাকি দুইজনকে নিয়ে রিফাত দরজায় নক করে।

ভেতর থেকে একজন প্রশ্ন করে "কে?"
আবারও নক করার পর দরজা খুলে নাজিম নামের ছেলেটা বের হয়ে আসে। ঠিক তখনই তার নাকে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করে ফেলা হয়। আর ভেতরের ঘর থেকে হুটোপুটির আওয়াজে আফিয়া বের হবার সাথে সাথে তাকেও ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করে ফেলা হয়।

আধ ঘন্টা পর অফিয়ার জ্ঞান ফেরে। সে দেখে তার মুখ টেপ দিয়ে বাঁধা। তার এক হাতের সাথে নাজিমের হাত হ্যান্ডকাফ দিয়ে তালা মেরে দেয়া, নাজিমের আরেক হাত টেবিলের লোহার একটি অংশের সাথে হ্যান্ডকাফ দিয়ে আটকানো। নাজিম ফ্লোরে মৃত অবস্থায় পড়ে আছে। কারণ আফিয়া নড়াচড়া করার পরও নাজিমের কোন সাড়া শব্দ নেই। রিফাত তখন একটা চেয়ার টেনে তার সামনে বসে।

"আমি জিজ্ঞেস করবোনা তুমি আমার সাথে এমন কেন করলে হ্যান ত্যান। আমার হয়তো কোন কমতি আছে, হয়তো আমার কোন ভুল ছিল। অথবা আমি আসলে তোমার যোগ্যই ছিলামনা। তবে আমার প্রশ্ন একটাই। আমাদের দেড় বছর বয়সের ছেলে কি দোষ করেছে? সে কি নিষ্পাপ নয়?"

"যাই হোক এতকিছু চিন্তা করার সময় নেই। নাজিমকে আমি মেরে ফেলেছি। তোমার কাছে কোন প্রমাণ নেই যে কাজটা আমিই করেছি। তুমি গলা ফাটিয়ে সবাইকে বললে কেউ তোমার কথা বিস্বাস করবেনা। আমি চলে যাবার একঘন্টা পর এখানে পুলিশ আসবে। সবাই জানবে নাজিমকে তুমি খুন করেছো কারণ তার হাত তোমার হাতের সাথে বাধা। খুনের জন্য তোমার নূন্যতম শাস্তি হবে ফাঁসি।"

"এখন তোমার সামনে বাঁচার জন্য মাত্র একটি রাস্তাই খোলা আছে। (একটি ধারালো ছুরি অফিয়ার সামনে দিয়ে) তোমার তো একহাত খোলা আছে। নিজের হাত বা হাতের হ্যান্ডকাফ কোনটাই এই ছুরি দিয়ে তুমি কাটতে পারবেনা। আমি চলে যাবার পর এক ঘন্টা শেষ হবার আগেই যদি তুমি নাজিমের লাশ থেকে তার হাত এই ছুরি দিয়ে কেটে মুক্ত হও, তাহলেই তুমি বেঁচে যাবে"।

এতটুকু বলে রিফাত সেখান হতে বের হয়ে যায়। রিফাতের বন্ধু একটি ভয়েপ কল এপ থেকে পাশের থানায় ফোন করে বলে যে থানা থেকে দশ মিনিটের দূরত্বে বাংলো বাড়িতে ঢাকা থেকে আসা এক মেয়ে একটি ছেলেকে খুন করেছে। দেরি করলে খুনি মেয়েটি পালিয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি এসে যেনো খুনিকে গ্রেফতার করা হয়।

আর ওদিকে আফিয়া বারবার ফাঁসির দড়ির কথা মনে করতে থাকে। সে ধারালো বড় ছুরিটা হাতে তুলে নেয়। ডান হাতের সব শক্তি দিয়ে যখনই নাজিমের হাতের কব্জি কেটে ফেলে হ্যান্ডকাফ থেকে নিজেকে মুক্ত করে তখনই নাজিম নড়ে ওঠে। তারপর জোরে চিৎকার করে ওঠে নারকীয় যন্ত্রনায়। হতবিহ্বল আফিয়া পাথরের মূর্তি হয়ে যায় নাজিমকে জীবিত দেখে।

ঠিক একটু পরই পুলিশ এসে পড়ে। অফিয়াকে গ্রেফতার করে এবং নাজিমকে হাসপাতালে পাঠায়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। নাজিম মারা যায়। পুলিশী তদন্তে খুনের মোটিভ সম্পর্কে কিছুই বের হয়না। আফিয়া অনেকটা মানসিক প্রতিবন্ধীর মত হয়ে যায়।

আদালতে প্রমান হয় যে খুনের আগে নাজিমকে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করে নেয়া হয়। ক্লোরোফর্মের স্যাম্পল ঘরের ভেতর থেকেই জব্দ করা হয়। ধারালো ছুরিতে আফিয়ার হাতের ছাপ স্পষ্ট আছে। অত:পর রায়ে আসামি আফিয়াকে বয়সের কথা বিবেচনা করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। কিন্তু আফিয়াকে প্রথমে মানসিক রোগ নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানো হবে। সুস্থ্য হবার পর তার শাস্তি কার্যকর করা হবে।

পাবনার মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে দীর্ঘ তিন বছর চিকিৎসার পর আফিয়া সুস্থ্য হয়। তখন একদিন রিফাত তার ছেলেকে নিয়ে আসে আফিয়ার সামনে। তাদের পাঁচ বছর বয়সের ছেলে তখন দূরে একটি চেয়ারে বসে ছিল। রিফাত অফিয়াকে বলে,,,

"শুধু দূর থেকে দেখো আমার ছেলেকে। সে তোমার কেউ নয়। আর খবরদার কোন কথা বলবেনা। তোমার কোন কথা বলার অধিকার নেই। তুমি আমাকে এতবড় ধোকা দিতে পারলে আমি কি তোমাকে একটা মিথ্যে বলতে পারিনা?

হ্যা আমি তোমাকে মিথ্যে বলেছিলাম যে নাজিমকে আমি হত্যা করেছি। কিন্তু আমি তাকে হত্যা করিনি। আমি শুধু জাষ্ট একটু বেশি ক্লোরোফর্ম দিয়ে তাকে অজ্ঞান করে রাখি। তুমি তাকে মৃত মনে করে হাতের কব্জি কেটে ফেলেছ।অতিরিক্ত রক্তপাতের কারণে তার মৃত্যু হয়। তোমার সাথে আমার আর কখনও দেখা হবেনা।"

এতটুকু বলে রিফাত আফিয়ার হাতে সেই কাগজের টুকরোটা দিয়ে সামনে থেকে চলে আসে। সেখানে লেখা "তোমার জন্য সারপ্রাইজ! আমাকে আর খুঁজতে চেষ্টা করবেনা"।

(সমাপ্ত)

glqxz9283 sfy39587p07