Skip to content

‘জেরুজালেম মুসলমানদের’ কোথায় লেখা আছে?

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি




‘জেরুজালেম মুসলমানদের’ কোথায় লেখা আছে?
সাইয়িদ রফিকুল হক

পৃথিবীতে আল্লাহবিশ্বাসী তিনটি ধর্মের মানুষদেরই প্রথম কিবলা হলো—‘মসজিদুল আকসা’ বা ‘বায়তুল মুকাদ্দাস’। এটি বর্তমানে ইসরাইলরাষ্ট্র-অধিকৃত জেরুসালেমে (বা জেরুজালেমে) অবস্থিত। সুদীর্ঘকাল যাবৎ এটি নিয়ে মুসলমানসম্প্রদায়ের সঙ্গে ইহুদী-খ্রিস্টানসম্প্রদায়ের বিরাট দ্বন্দ্ব রয়েছে। তবে মুসলমানদের এই দ্বন্দ্ব সর্বাপেক্ষা ইহুদীদের সঙ্গে। ইহুদী-খ্রিস্টান-মুসলমান—এই তিনপক্ষই বলেছেন—এটি তাদের উপাসনালয়। কথা সত্য। সবাই এখানে তাদের ধর্মপালন করেছেন। এই তিন ধর্মের নবীরাই এখানে এসেছেন এবং তাঁরা এটিকে তাঁদের পবিত্র স্থান বলে উল্লেখ করেছেন। এখানে, উল্লেখ্য যে, আমাদের ধর্মের নবী হজরত মুহাম্মদ সা. কখনও জেরুসালেমে আসেননি (শুধু ‘শবে মিরাজে’র ঘটনায় তিনি এখানে এসেছিলেন বলে স্বীকার করা হয়)। বাকী রইলো ইহুদী-খ্রিস্টান। তাদের নবীরা এখানে এসেছেন, অবস্থানগ্রহণ করেছেন, এবং তাঁরা এটিকে তাঁদের প্রধান কেন্দ্র বানিয়েই ধর্মপ্রচারও করেছেন।
এই হিসাবে ইহুদীসম্প্রদায় জেরুসালেমে অবস্থিত ‘বায়তুল মুকাদ্দাসে’র প্রথম দাবিদার। বায়তুল মুকাদ্দাসকেন্দ্রিক তাঁদের ইতিহাস ৪০০০-৫০০০ বছরের। খ্রিস্টানসম্প্রদায়ের ইতিহাস প্রায় ২০০০ বছরের। আর মুসলমানসম্প্রদায়ের ইতিহাস মাত্র ১,৪০৭ বছরের! সেই হিসাবে ‘বায়তুল মুকাদ্দাসে’র প্রথম দাবিদার ইহুদীসম্প্রদায়। এখন ইহুদীসম্প্রদায় কীভাবে তাদের অধিকৃত পবিত্র স্থান জেরুসালেমকে শুধু রাজনৈতিক কারণে ফিলিস্তিনী-মুসলমানদের হাতে ছেড়ে দিবে?

এবার আসুন, আমরা খুব সংক্ষেপে পর্যালোচনা করে দেখি আমাদের (ইহুদী, খ্রিস্টান ও মুসলমানদের) বংশধারার ইতিহাস:

ইহুদীসম্প্রদায়ের আদিপুরুষ হলেন হজরত ইসহাক আ.। তিনি আল্লাহর নবী হজরত ইব্রাহিম আ.-এর পুত্র। হজরত ইব্রাহিমের স্ত্রী সায়রা ওরফে সারার গর্ভজাত সন্তান হলেন এই হজরত ইসহাক আ.। অপরদিকে, ইব্রাহিম নবীর দাসীর সন্তান হলেন হজরত ইসমাইল আ.। হজরত ইব্রাহিম আ. তাঁর এই পুত্র ও দাসী-স্ত্রী হাজেরাকে আরবদেশে (একসময়কার জাজিরাতুল আরব ও বর্তমানের সৌদিআরবে) বহিষ্কার করেছিলেন। সেই হিসাবে আরবরা হজরত ইসমাইলের বংশধর। ইব্রাহিম নবী আ. ইহুদী-মুসলমান সবার কাছেই শ্রদ্ধার পাত্র। এমনকি মুসলমানদের একমাত্র ধর্মগ্রন্থ আল-কুরআনেও হজরত ইব্রাহিম নবী আ.-কে ‘মুসলমানদের জাতির পিতা’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এছাড়াও, কুরআনে ইহুদীবংশের আরও অনেক নবীর নাম রয়েছে। এঁদের মধ্যে হজরত দাউদ আ. হজরত সুলাইমান আ., হজরত ইয়াকুব আ. প্রমুখ। কিন্তু আরববিশ্বসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মুসলমানরা কখনও-কোনোকালে নিজেদের ধর্ম ছাড়া আর-কারও ধর্মকে স্বীকারও করে না এবং মানেও না! এখানেই সংকটের সৃষ্টি। ইহুদীদের ‘আল্লাহ’ আর মুসলমানদের ‘আল্লাহ’ কখনও পৃথক নয়। এমনকি খ্রিস্টানসম্প্রদায়ের আল্লাহও অভিন্ন। তাই, দেখা যায়, ইহুদী-খ্রিস্টান-মুসলমান তিন সম্প্রদায়ই তাদের সৃষ্টিকর্তাকে ‘আল্লাহ’ বলেন। তবুও কেন এতো দ্বন্দ্ব? এর মূলে রয়েছে আমাদের-মুসলমানদের হীনমানসিকতা। আমরা আজও অন্যের ধর্মকে স্বীকার ও মান্য করতে শিখিনি। আজকের দিনে মুসলমানরা আল্লাহর কথা অর্ধেক মানে আর বাকী অর্ধেক মানে না। তার কারণ, আমরা আল্লাহর প্রেরিত নবী মুসা-ঈসাকে মানি। কিন্তু তাঁদের সম্প্রদায়কে মানি না। তাদের মানুষও বলে মনে করি না! আর সবসময় তাদের শত্রুই মনে করি। তাহলে, এই পৃথিবীতে শান্তি আসবে কোত্থেকে? আমাদের মনে রাখতে হবে, মুসলমানদের নবী সা.-এর আগে আল্লাহর নবী হয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন হজরত মুসা আ. ও হজরত ঈসা আ.। তাঁদের অনুসারীদের মানা আমাদের কর্তব্য। তাদের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু একজন মুসলমান হিসাবে আমরা কি তা করছি? আমাদের আরও মনে রাখতে হবে: আল-কুরআনের বহু আগে এই পৃথিবীতে ‘আল্লাহর কিতাব’ হিসাবে নাজিল হয়েছে ‘তাওরাত-যাবুর-ইঞ্জিল’। এগুলো মুসলমান অস্বীকার করতে পারে না। মুসলমানদের ঈমানের অপরিহার্য দিক ‘ঈমানে মুফাসসালে’র মধ্যেও ‘তাওরাত-যাবুর-ইঞ্জিল’সহ কুরআনের উপর বিশ্বাসস্থাপনের কথা বলা হয়েছে। এখন মুসলমানসম্প্রদায় এদের ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারবে না।
খ্রিস্টানসম্প্রদায় জেরুসালেম বা মসজিদুল আকসা নিয়ে এতো মাতামাতি করে না। কিন্তু এব্যাপারে আমরা মুসলমানরা কাউকে একচুল ছাড় দিতে নারাজ? কিন্তু কেন? আল্লাহ কি আমাদের একার? তিনি তো সব মানুষের প্রভু। তিনিই তো পৃথিবীতে তাঁর পবিত্র কিতাব দিয়ে হজরত মুসা-ঈসা আ.কে পাঠিয়েছিলেন। তবে আমরা কেন সেই নবীদের সম্প্রদায়কে অস্বীকার করছি? আর তাদের সঙ্গে অহেতুক শত্রুতাসৃষ্টি করছি?

সুপ্রাচীনকাল থেকে ইহুদীসম্প্রদায় তাদের কিবলা হিসাবে ‘বায়তুল মুকাদ্দাস’কে ব্যবহার করে আসছে। আবার খ্রিস্টানসম্প্রদায়ও এটিকে তাদের পুণ্যভূমি হিসাবে মান্য করে আসছে। কারণ, তাদের নবী হজরত ঈসা আ. এই মসজিদে আল্লাহর ইবাদত করেছিলেন। আর মুসলমানসম্প্রদায়ও বলেছে—এটি তাদের প্রথম কিবলা। কিন্তু আমাদের তো এখন কাবাশরীফ আছে! এমতাবস্থায়, বায়তুল মুকাদ্দাসের প্রতি মুসলমানদের এতো জোরালো দাবি করাটা সমীচীন নয়। পৃথিবীতে শান্তির স্বার্থে মুসলমানদের তথা ফিলিস্তিনীদের অতিসত্বর ইহুদীদের পবিত্র স্থান ‘জেরুসালেম ও তার মসজিদ’ দখলের দাবি থেকে সরে আসতে হবে। তবেই কেবল ‘স্বাধীন ফিলিস্তিনরাষ্ট্রে’র জন্য সুবাতাস বইতে পারে।
বায়তুল মুকাদ্দাস ও জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে বিশ্বে মুসলমানদের সঙ্গে ইসরাইলীদের নতুনভাবে সংকটসৃষ্টি হতে যাচ্ছে। অবশ্য এটি সংকট নয় বিভ্রান্তি। ফিলিস্তিনীদের সঙ্গে ইসরাইলীদের দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। এই দ্বন্দ্বনিরসনের জন্য বহুরকমের চেষ্টা তদবির করেও সকলপক্ষ এখন ব্যর্থ। কিন্তু এই ব্যর্থতার মূলে শুধু ইসরাইলীরা দায়ী নয়। এখানে, ফিলিস্তিনীরাও সমভাবে দোষী এবং তারা বহুলাংশে দায়ী বলা চলে। তাদের অপরাধসমূহও কম নয়।

বর্তমান-মুসলমানসম্প্রদায় ইসরাইলীদের কোনোকিছুই মেনে নিতে একেবারে নারাজ। কিন্তু কেন? তারা কি মানুষ নয়? তাদের কি রাষ্ট্র থাকতে পারে না?

ইসরাইলকে বর্তমানে একটি ‘রাষ্ট্র’ হিসাবে স্বীকার না করে ফিলিস্তিনীরা তাদের রাষ্ট্র পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। এভাবে সংঘাত চলতেই থাকবে! কিন্তু এতে লাভ কী? ফিলিস্তিনীদের উচিত বিশ্বে শান্তিপ্রতিষ্ঠার জন্য ইসরাইলরাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়ে নিজেদের রাষ্ট্রের স্বীকৃতি-আদায় করে নেওয়া। ‘ইসরাইল’ ও ‘ফিলিস্তিন’ নামে দুটি রাষ্ট্র হতে বাধা কোথায়? শান্তির আশায় ফিলিস্তিনীদের নিজেদের স্বার্থেই ইসরাইলের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সংঘাত-সহিংসতা চিরতরে দূর করা অত্যাবশ্যক। নইলে, ফিলিস্তিনীরা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফিলিস্তিনীদের মাথাউঁচু করে বাঁচতে হলে অবশ্যই ইসরাইলরাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিতে হবে। আর তাদের শুধু ফিলিস্তিনরাষ্ট্রের গোঁড়ামি থেকে অতিসত্বর বেরিয়ে আসতে হবে। ইসরাইল ও ফিলিস্তিন নামে দুটি রাষ্ট্র ব্যতীত এই সংঘাত-সংঘর্ষ কখনও থামবে না।
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এক হিসাবে তিনি ঠিকই করেছেন। ইতিহাসের আলোকে তিনি হয়তো এমনটি করেছেন। ইসরাইলীরা জেরুসালেম-শহরের দাবিদার। আর এক্ষেত্রে, ফিলিস্তিনীরাও যদি এই জেরুসালেম-শহরের কিছু অংশ চায়—সেক্ষেত্রে, তারা শুধু শান্তিপূর্ণ আলাপআলোচনার মাধ্যমেই জেরুসালেমের কিছু অংশ হয়তো পেতে পারে। তবে সবার আগে তাদের ইসরাইলরাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়ে নিজেদের ভবিষ্যতের ভিতরচনা করতে হবে।

‘ইসরাইল কিছুই নয়! ইহুদীরা মানুষ নয়! তাদের হত্যা করা জায়েজ!’—এইজাতীয় প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বর্বরোচিত চিন্তাভাবনা অবশ্যই আজকের মুসলমানদের পরিত্যাগ করতে হবে। সাধারণ ফিলিস্তিনীদের চিরশান্তির স্বার্থে ইসরাইলকে একটি রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে নিজেদের ফিলিস্তিনরাষ্ট্রকে সত্যিকারের স্বাধীন করতে বাধা কোথায়? তাইলে অবশ্যই এই সংঘাত চিরতরে বন্ধ হবে। আর নয়তো—জেরুসালেম আমাদের, বায়তুল মুকাদ্দাস আমাদের—মুসলমানদের এসব দাবি কখনওই গ্রাহ্য হয়নি আর হবেও না। আমাদের মনে রাখতে হবে: আল্লাহ মুসলমানের একার নয়। আল্লাহ সকলের। মুসলমানরা কি আজ ভুলে গেছেন—এই আল্লাহ মুসা নবীর অনুসারী তথা ইহুদীদের জন্য বেহেশতো থেকে (আসমানের মাধ্যমে) খাবার পাঠাতেন! এই বেহেশতি খাবারের নাম ‘মান্না-সালওয়া’। কই, আমরা তো মুসলমান হয়ে একদিনও এইরকম উৎকৃষ্ট ও পবিত্র খাবার খেতে পারলাম না! আর এসব কথা তো আমাদের কুরআনেই লেখা আছে। তবুও কেন আল্লাহর বান্দা ইহুদীসম্প্রদায়কে স্বীকৃতি দিতে মুসলমানদের এতো বাধা?

সামান্য একটা জেরুসালেম-শহরের জন্য মুসলমানদের এতো রক্তক্ষয় করাটা বোকামি এবং নৈতিকতার অবক্ষয়। এর থেকে ফিলিস্তিনী-মুসলমানদের অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। আর মনে রাখতে হবে: ছোট্ট একটা জেরুসালেম-শহরের চেয়ে ফিলিস্তিনীদের জন্য আজ সর্বাপেক্ষা জরুরি ও প্রয়োজন একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ফিলিস্তিনরাষ্ট্র। হোক না তা ক্ষুদ্র। তবুও তাদের সব প্রয়োজন মিটাবে এই স্বাধীন-সার্বভৌম ফিলিস্তিনরাষ্ট্র।

আরববিশ্বের ও আমাদের বাংলাদেশের কিছুসংখ্যক ধর্মব্যবসায়ী সবসময় বলে থাকে, “জেরুজালেম আমাদের! জেরুজালেম মুসলমানদের!” কিন্তু কোথায়-কীভাবে? এর সপক্ষে প্রমাণ কোথায়? পারলে একটি হাজির করেন।

‘জেরুজালেম মুসলমানদের’—একথা কোথায় লেখা আছে?



সাইয়িদ রফিকুল হক
২২/১২/২০১৭

glqxz9283 sfy39587p07