Skip to content

জুম্মার নামাজের আগে মসজিদের ইমাম বললো, “মেয়েরা শয়তানের জাত!”

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি



জুম্মার নামাজের আগে মসজিদের ইমাম বললো, “মেয়েরা শয়তানের জাত!”
সাইয়িদ রফিকুল হক

জুম্মার নামাজ ঘরে পড়া যায় না। তাই, একরকম বাধ্য হয়েই আমাদের মসজিদে যেতে হয়। কিন্তু মসজিদে গিয়েও শান্তি ও স্বস্তি নাই। সেখানে একশ্রেণীর কাটমোল্লা-মার্কা-ইমামদের অত্যাচারে দেশের নিরীহ ও সাধারণ মুসলমান আজ অতিষ্ঠ। সবখানে এইসব অল্পশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, অশিক্ষিত, বেএলেম আর জাহেল-ইমামদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে।

জুম্মার নামাজ পড়ার জন্য তড়িঘড়ি করে মসজিদে যাচ্ছি। আর মসজিদের কাছাকাছি আসতেই নিজের কানে শুনলাম: ইমামসাহেব বললো, “মেয়েরা শয়তানের জাত!”
কথাটি শোনার পর চারপাশের লোকজন যেন একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল! আর কারও মুখে যেন কোনো কথা নাই। শুধু মসজিদের কাছে রাস্তার পাশে একটা দোকানে বসা একজন বললেন, “হুজুর আইজ মনে হয় ক্ষেপে গেছেন। আর মহিলাগো বিরুদ্ধে ওয়াজ করতিছেন!”
একটু পরে মসজিদের ওই ইমাম আবার বললো, “‘মেয়েরা শয়তানের জাত’ কথাটা শুনে আপনারা বেজার হইয়েন না। তয় কথাটা আমার না। কথাটা আমাদের রাসুলের (সা.)। আর রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন—মেয়েরা হলো শয়তানের জাত!”
[কথাটি শুনে থমকে দাঁড়ালাম আর খুব চমকেও উঠলাম। এরা কীভাবে আজকাল ধর্মের অপব্যাখ্যা করছে। কোথাকার কোন কথা আজ কোনখানে বলছে। এদের উদ্দেশ্য ও মতিগতি মোটেও ভালো নয়। অথচ, আমাদের নবীজী সা. বলেছেন, “তিনটি জিনিস আমার প্রিয়—(১) নারী (২) সুগন্ধি (৩) সালাত বা নামাজ (বুখারী ও মুসলিম)।

মসজিদের ওই ইমাম দেখলো, তার কথা শুনে সাধারণ মুসল্লীরা রাগান্বিত হতে পারে। তাই, সে একটু পরে কথাটা ঘুরিয়ে বললো, “মেয়েরা শয়তানের জাত—কথাটা ঠিক আছে—তবে সবাই না। আর মেয়েরা যে শয়তানের জাত—কথাটা শুনে মুসল্লী ভাইয়েরা আবার আমাকে ভুল বুঝবেন না। তবে সব মেয়ে নয়। যারা রাস্তাঘাটে বেপর্দা চলাফেরা করে আর বোরকা পরে না—তারাই শুধু শয়তানের জাত—আর যারা বোরকা পরে তারা ভালো। আর মনে রাখবেন: মেয়েদের থেকেই সর্বপ্রকার শয়তানের ও শয়তানীর উৎপত্তি। এরাই পুরুষদের ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে। তাই, এদের থেকে আমাদের সাবধানে থাকতে হবে।”
এই হুজুরেরও কিন্তু বউ আছে। হয়তো সে বোরকা পরে। তাই, তার সাত খুন মাফ! আর এইজন্যে সে এখন সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে দেশের অধিকাংশ সম্ভ্রান্ত মহিলাদের বিরুদ্ধে তার মনগড়া, বানোয়াট, ভিত্তিহীন, মিথ্যা, আজেবাজে ও উদ্ভট ওয়াজ শুরু করেছে। এগুলো দেশবিরোধী একটি চক্রান্তকারীগোষ্ঠীর পরিকল্পিত তথ্যসন্ত্রাস।

আমার তখনই মনে হলো: মেয়েরা শয়তানের জাত হলে আমাদের রাসুল সা. ১৩-১৪টি বিবাহ করতেন না। এসব এইজাতীয় পাতিহুজুর ও ভণ্ডদের শয়তানীকারসাজি। এরা ইসলামের নামে এভাবেই আজ কুরআন-হাদিসের অপব্যাখ্যা করছে, আর সবখানে কুপরিকল্পিতভাবে তাদের স্বার্থের মনগড়া কথাই বলছে। এরা আমাদের দেশের চিহ্নিত-চক্রান্তকারীগোষ্ঠী।
বোরকা পরলেই কি একটি মেয়ে ভালো হয়ে যায়? জানি, এর সপক্ষে কেউ কোনো যুক্তি দেখাতে পারবেন না। আর বোরকার ইতিহাস কবে থেকে? আসুন দেখি, আমাদের রাসুলুল্লাহ সা.-এর পত্নীগণ বোরকা পরেছেন কিনা?

আমাদের রাসুলুল্লাহ সা.-এর কোনো স্ত্রী কোনোকালে-কোনোদিন একবারও বোরকা পরেননি। তাঁরা সবসময় শালীন পোশাকপরিধান করেছেন। আর বোরকা এলো তো এই সেদিন! তাহলে, এইসব কাটমোল্লার এইজাতীয় আজেবাজে কথা বলার মানে কী? এদের একমাত্র অসৎউদ্দেশ্য হলো: আমাদের দেশে মোল্লাতান্ত্রিক ও ভোগবাদী সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এতে এরা ষোলোআনা ভোগ-দখলসহ নিজেদের রিরংসাবৃত্তি চরিতার্থ করতে পারবে।

আসুন দেখি, এখন বোরকা পরছে কারা? এদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

১. মৌলবাদী-মানসিকতাসম্পন্ন একশ্রেণীর মহিলা;
(এরা মনে করে: বোরকা পরলেই সে মুসলমান হয়ে গেল! আর তার কোনো পাপ হবে না।)
২. জঙ্গি-আধাজঙ্গি;
(দেশের নিষিদ্ধ-ঘোষিত জঙ্গিসংগঠনের সকল মহিলাকর্মী সবসময় বোরকাপরিধান করে নাশকতাসৃষ্টি করছে। সম্প্রতি এদের অনেকেই বোরকাপরিহিত অবস্থায় গ্রেফতার হয়েছে।)
৩. জঙ্গিবাদী ধ্যানধারণায় বিশ্বাসীরা;
(এরা সঠিকভাবে ধর্মপালন না করেও লোকদেখানো ধার্মিক সাজার জন্য এখন ভিতরে-বাইরে কিংবা কেউ-কেউ শুধু বাইরে বোরকা পরছে।)
৪. মহিলা-ছিনতাইকারী, মহিলা-পকেটমার, মহিলা-অজ্ঞানপার্টির সদস্যরা ইত্যাদি;
(আজকাল সর্বত্র একশ্রেণীর মহিলা নিজেদের স্বার্থে বোরকাপরিধান করছে।)
৫. মহিলা-ডাকাতশ্রেণী;
(এরা বোরকা পরে ছদ্মবেশে মানুষের জানমালের ক্ষতি করছে।)
৬. সমাজের বা রাষ্ট্রের সর্বত্র বসবাসকারী পতিতা, কলগার্ল, বেশ্যা ইত্যাদি।
(এরা এদের ব্যবসার প্রয়োজনে এগুলো ব্যবহার করছে।)
৭. ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর মহিলা-ক্যাডারগণ।
(এদের উদ্দেশ্য ভালো নয়। তাই, এরা সবসময় ছদ্মবেশধারণ করে থাকে। ইসলামীরাজনীতির ধারক-বাহকরা নিজেদের স্বার্থে এদের অসৎউদ্দেশ্যে ব্যবহার করে থাকে।)
৮. একশ্রেণীর সত্যিকারের সহজ-সরল-ধার্মিক মুসলমান-নারী।
(এদের ব্যাপারে আমাদের কোনো আপত্তি নাই। কিন্তু এদের সংখ্যা একেবারে কম। আর এরা কখনও বোরকা নিয়ে রাজনীতি করেন না।)

দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে বোরকা দেশের একটি অসৎশ্রেণীর বিভিন্ন ধান্দাবাজির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর এই বোরকাপরিধান করলেই সে ভালো! আর সে পবিত্র! আর কোথায় লেখা আছে এদের এসব শয়তানীকথাবার্তা?
ইসলামে শালীন পোশাকপরার কথা বলা হয়েছে। আর প্রয়োজনে পর্দার কথাও বলা হয়েছে। আর তা শুধু ‘নারীদের বাইরে বের’ হওয়ার সময়। আর এইসময় মুসলমান-নারীদের অতিরিক্ত চাদর ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বোরকা কোথায়? আর কুরআনের কোথায় বোরকাপরার কথা আছে? এসব এইজাতীয় টাউট-বাটপাড়-লোভী ইমামদের সম্পূর্ণ মনগড়া কথাবার্তা। এরা নারীদের শুধু ভোগের জন্য এসব চাতুর্যপূর্ণ কথা বলছে।

এইসব কাটমোল্লা আমাদের দেশের সাধারণ মা-বোনদের আজ ‘শয়তানের জাত’ বলে গালি দিয়ে তাদের জোরপূর্বক বোরকাপরিয়ে নিজেদের ভোগের ‘মহিলা-মোল্লা’ বানাতে চাইছে। এই শয়তানদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এখনই সময়।





সাইয়িদ রফিকুল হক
পূর্বরাজাবাজার, ঢাকা,
বাংলাদেশ।
০৭/০৭/২০১৭

glqxz9283 sfy39587p07