Skip to content

ভণ্ডের ইতিহাসে একজন মওদুদ আহমেদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি



ভণ্ডের ইতিহাসে একজন মওদুদ আহমেদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে
সাইয়িদ রফিকুল হক

বাংলাদেশে যে-কয়েকজন ভণ্ড-রাজনীতিবিদের নাম পাওয়া যায়—তন্মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য হলো ব্যারিস্টার-নামধারী মওদুদ আহমেদ। তার রাজনীতি সবসময় নিজ-স্বার্থমুখী। আর এখানে রয়েছে সীমাহীন লোভ আর ব্যক্তিস্বার্থ। চিন্তাচেতনার দিক থেকে মওদুদ আহমেদরা সবসময় পাকিস্তানের মুসলিম-লীগের অপআদর্শের পতাকাবাহী। আর ব্যক্তিজীবনেও লোকটি চরম সাম্প্রদায়িক। দেশ ও জাতি তার রাজনীতির কখনও-কোনোপ্রকার সুফলভোগ করেনি। রাজনীতি করে লাভ হয়েছে শুধু মওদুদ আহমেদের। আর তার রাজনৈতিক জীবন কাটছে দালালি করে।

সম্প্রতি মওদুদ আহমেদ গুলশানের একটি বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন। বাড়িটি সরকারি নয়—রাষ্ট্রীয় সম্পদ। ইতঃপূর্বে বাড়িটি ছাড়ার জন্য তাকে বহুবার নোটিস প্রদান করা হলেও তিনি তাতে কোনোপ্রকার কর্ণপাত করেননি। গায়ের জোরে, আইনের জোরে তিনি সবসময় এদেশের সবকিছুকে তুচ্ছজ্ঞান করেন। তারউপরে তিনি এদেশে অনেকবার আইনমন্ত্রীর দায়িত্বপালন করেছেন। আর তোষামোদী করে দেশের অন্যতম সেরা স্বৈরাচার এরশাদ-সরকারের ভাইস-প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত হয়েছিলেন তিনি! ব্যক্তিস্বার্থের রাজনীতিতে তিনি একেবারে সফল।

দলবাজিতে আর ডিগবাজিতে মওদুদ আহমেদের মতো এতো সফল আমাদের বাংলাদেশে খুব কমই আছে। আসলে, তার কাছে আদর্শের রাজনীতি বা দেশ, জাতি, মানুষ, আর মানবতা কোনো বিষয় নয়—তার কাছে মুখ্যবিষয় হলো নিজেদের সামাজিক ও রাষ্ট্রিক মর্যাদাবৃদ্ধি করা। আর তাই, তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি হলো—সবসময় রাজনীতির খাতায় নাম-লিখিয়ে ব্যক্তিজীবনে সমস্ত সুযোগ-সুবিধাভোগ করা।

সংক্ষিপ্ত এই প্রবন্ধে যদি একনজরে একজন মওদুদ আহমেদকে মূল্যায়ন করা হয়—তাহলে, দেখা যাবে তিনি একজন আপাদমস্তক-ভণ্ড। আর তার রাজনীতির মধ্যে দেশ, জাতি ও মানুষের কোনো সম্বন্ধ নাই। সবখানে তার আত্মস্বার্থ আর আত্মচিন্তা। আর সবখানে পাকিস্তানীধারার অপশক্তির সঙ্গে তার চিরদিনের সখ্যতা ও লেজুড়বৃত্তি।

এখানে, খুব সংক্ষেপে একজন মওদুদ আহমেদের কতিপয় ভণ্ডামি তুলে ধরা হলো:

১. স্বার্থলোভে একজন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ দেশস্বাধীনের আগে-পরে আওয়ামীলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ডের পর একটা রাতও পার হয়নি—তার আগেই তিনি ঘাতকদের পক্ষ নিয়ে চুপচাপ সটকে পড়ে ঘাপটিমেরে বসে রইলেন। আর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সুযোগ খুঁজতে লাগলেন।
২. বাংলাদেশের জাতীয় স্বৈরাচার ও বাংলার এজিদ জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতাদখল করলে মওদুদ আহমেদগং একসময় সুযোগ বুঝে একলাফে জিয়াউর রহমানকে ‘ইসলামের ও বাংলাদেশের খলিফা’ হিসাবে স্বীকার করে তার হাতে বাইয়াতগ্রহণ করে তারই (জিয়ার) নির্দেশে দেশটাকে আবার পাকিস্তান বানানোর কাজে লেগে পড়েন। আর ১৯৭৮ সালে, জিয়ার নেতৃত্বে ‘বিএনপি’ গঠনের সময় মওদুদ আহমেদরা বিরাট ভূমিকাপালন করেন। এতে একটা সময় তিনি বিএনপি’র বড়সড় একটা পদও লাভ করেন।
৩. জিয়াউর রহমান ষড়যন্ত্র করে এক প্রহসনমূলকবিচারে বীরউত্তম-খেতাবধারী বীরমুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহেরকে ১৯৭৬ সালের ২১-এ জুলাই রাতের আঁধারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিলো। এর সমর্থকও ছিল মওদুদ আহমেদগংরা। অথচ, তিনি বিএনপিতে থাকাকালীন সময় বহুবার কর্নেল তাহের-হত্যার সঙ্গে জিয়াউর রহমানের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন! আবার এই মওদুদ আহমেদই ১৯৯৫ সালে, ইংরেজিতে একটি গ্রন্থরচনা করলেন (গ্রন্থটির নাম: ‘এ স্টাডি অব পলিটিক্যাল অ্যান্ড মিলিটারি ইন্টারভেনশন ইন বাংলাদেশ’)। এখানে, তিনি কর্নেল তাহের-হত্যার সঙ্গে জিয়াউর রহমানের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করেছেন। আসলে, মওদুদ আহমেদরা ক্ষমতালোভী ও ভণ্ড। এদের কোনো নীতি, চরিত্র ও সততা বলে কোনোকিছুই নাই।
৪. ১৯৮১ সালের ৩০-এ মে জিয়াউর রহমান নিহত হলে মওদুদ আহমেদরা আনুগত্যপ্রকাশ করে বিএনপি’র সাত্তার-সরকারের প্রতি। এইসময় মওদুদ আহমেদগং দেশের স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে একাত্মতাপ্রকাশ করে ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-বিকৃতি’র অপকর্মটি চালাতে থাকেন।
৫. ১৯৮২ সালের ২৪-এ মার্চ এরশাদ কর্তৃক সাত্তার-সরকার উৎখাত হলে এর মাত্র কিছুদিন পরে মওদুদ আহমেদ একদৌড়ে এরশাদকে ‘ইসলামের সেবক ও বাংলার দ্বিতীয় খলিফা’ হিসাবে স্বীকার করে তার দলে যোগদান করেন। আর তিনি ভুলে গেলেন জিয়ার আদর্শ! আর এইসময় তিনি মন্ত্রীত্বও বাগিয়ে নেন। তিনি এভাবে দীর্ঘদিন এরশাদের দালালি করে এরশাদ-সরকারের মন্ত্রী, উপপ্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী ও উপরাষ্ট্রপতি হয়েছেন।
৬. ১৯৭১ সালে, শহীদ হয়েছিলেন দেশবরেণ্য সুরকার আলতাফ মাহমুদ। তাঁর সম্মানে দেশস্বাধীনের পরে বঙ্গবন্ধু সহৃদয়চিত্তে শহীদ আলতাফ মাহমুদের পরিবারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঢাকার চামেলীবাগে একটি বাড়ি প্রদান করেছিলেন। আর এই বাড়ি থেকে ১৯৮২ সালে—শহীদ আলতাফ মাহমুদের পরিবারকে উচ্ছেদ করেন একজন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ। তিনি এই উচ্ছেদ-অভিযানের অন্যতম প্রধান কুশীলব।
৭. ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর স্বৈরাচার এরশাদের পতন ঘটলে এই মওদুদ আহমেদ ঝড়ের বেগে বেগম খালেদা জিয়াকে ‘বাংলার তৃতীয় খলিফা’ হিসাবে স্বীকার করে তার আঁচলের তলে ঠাঁই নেন। দেশটাকে তিনি আবার পাকিস্তান বানানোর কাজে নেমে পড়েন।
৮. ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পরে মওদুদ আহমেদ তার নির্বাচনী এলাকার মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষশক্তির উপর স্টিমরোলার চালিয়েছিলেন। তিনি এইসময় আওয়ামীলীগ, বামপন্থীসহ সকল প্রগতিশীলদলের অনেক নেতা-কর্মীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ও মামলা-মোকাদ্দমা-দায়ের করে এলাকাত্যাগে বাধ্য করেন। ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ-নির্বাচনে তিনি হেরে যান। আর এতে তিনি ভয়ানক ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। অতঃপর ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি জয়লাভ করে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে পরাজিতদলের স্থানীয় নেতাদের কয়েকজনের বাড়িঘর দখল করে নেন। অনেকে তার ভয়ে ঢাকায় আত্মগোপন করে।
৯. ২০০১ সালের ১লা অক্টোবরের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতসহ চারদলীয়-জোট বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতাদখল করলে মওদুদ আহমেদ আবার মন্ত্রীত্বলাভ করেন। এই নির্বাচনের আগে দেশে সেই সময় ৭৫লক্ষ হিন্দু-ভোটার ভোট দিতে পারেনি। এর অন্যতম রূপকার হলো আজকের মওদুদ আহমেদ। তাছাড়া, ২০০৬ সালে বিএনপি-দলীয় প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমেদের কথিত ও পাগলাপ্রকৃতির তত্ত্বাবধায়ক-সরকারের অন্যতম রূপকার ও প্রবক্তা ছিলেন এই মওদুদ আহমেদ।
১০. ২০০১ সালের নির্বাচনের পর রাষ্ট্রক্ষমতাদখল করে বিএনপি-জামায়াতজোট ১০০দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলো। এখানে, বিরোধীদলের নেতা-কর্মীদের উপর স্মরণকালের ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়। এরপর বিরোধীদলকে দমন করার জন্য চালু করা হয় (১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ‘অপারেশন সার্চলাইটে’র আদলে) ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’। আর এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীসহ বহু সাধারণ মানুষ প্রাণ হারায়। এরও অন্যতম রূপকার একজন মওদুদ আহমেদ। তিনি এইসময় একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী নিজামী-মুজাহিদগংদের সঙ্গে মন্ত্রীসভায় থাকতে বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ করেননি। আর এখনও তিনি রাজাকারদের খুব ভালোবাসেন।
১১. বর্তমানেও একজন মওদুদ আহমেদ বিএনপি’র পাশাপাশি জামায়াত-শিবিরের গোলামি করতে ব্যস্ত। আর পাকিস্তানের গন্ধ যেখানে আছে তিনিও সেখানে আছেন।
১২. বাংলাদেশে ২০১০ সালে শুরু হওয়া একাত্তরের চিহ্নিত-যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে তার নানাপ্রকার ভণ্ডামি। তিনি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা করেছেন নানাভাবে। আর তিনি প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে ‘আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ-ট্রাইব্যুনালে’রও বিরোধিতা করেছেন।

আর তিনিই এখন সরকারি-রাষ্ট্রীয় বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ‘পথনাটক’ করছেন। তার বিন্দুমাত্র লজ্জা নাই—তিনি এতোদিন সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এই বাড়িটি দখল করে রেখেছিলেন। তার বাড়ি-গাড়ির কোনো অভাব নাই। আর তিনিই এখন বলছেন: তার বাড়ি নাই! এইরকম ভণ্ড বাংলাদেশে খুব কমই আছে। তাই, বলছিলাম ভণ্ডের ইতিহাসে একজন মওদুদ আহমেদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে!

পুনশ্চ: ঢাকা-উত্তর সিটি-কর্পোরেশন গুলশানের রাষ্ট্রীয় সম্পদ তথা বাড়িটি অবৈধ দখলমুক্ত করায় অবশ্যই ধন্যবাদের দাবিদার। আর দলমতনির্বিশেষে সকলপ্রকার ভণ্ডকে এভাবে উচ্ছেদ করা হোক।





সাইয়িদ রফিকুল হক
পূর্বরাজাবাজার, ঢাকা,
বাংলাদেশ।
০৯/০৬/২০১৭

glqxz9283 sfy39587p07