Skip to content

নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্লজ্জ আওয়ামীলীগ

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

আমি ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ দেখিনি। আমি দেখিনি ২৫ মার্চ কাল-রাতের পাক হানাদার বাহিনীর সেই বর্বর গণহত্যা। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টবর আমি দেখেছি নোংরা রাজনীতির নামে লগি-বৈঠার আঘাতে বলি হওয়া সাধারণ মানুষের করুণ আর্তনাদ! যাতে রক্তাক্ত হয়েছে দেশ, কলুষিত হয়েছে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, বিপন্ন হয়েছে মানবতা, কলঙ্কিত হয়েছে দেশ, ধ্বংস হয়েছে মনুষ্যত্ববোধ, বিকশিত হয়েছে প্রতিহিংসা, নির্মমতা, নৃশংসতা, বর্বরতা আর উগ্ররাজনীতির।
সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তত্ত্ববধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়কে এই অরাজকতা সৃষ্টির জন্য বেছে নেয়া হয়েছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবেই। অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কেএম হাসান যাতে তত্ত্ববধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করতে না পারেন, সেজন্যই তথকালীন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও মহাজোট নেত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছিলেন লগি-বৈঠার আন্দোলন।

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তত্ত্বধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে সদ্য আবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কেএম হাসানের শপথ নেয়ার দিন। আর সেদিনেই ঘটেছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে লগি-বৈঠার বর্বরতম ও নজিরবিহীন হত্যাকান্ডের নির্মম উল্লাস।
ক্ষমতা লোভী শেখ হাসিনা ৫ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে ক্ষমতার নেশায় উন্মাদের মতো আচরণ শুরু করেছিলেন। চারদলীয় জোট যখন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় শান্তিপূর্ণভাবে তত্ত্ববধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তখন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন তার দলের নেতাকর্মীদের লগি-বৈঠা নিয়ে রাজপথে উপস্থিত থাকার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন।

[gallery ids="233562"]


  • শেখ হাসিনার নির্দেশে আওয়ামী লীগ সারাদেশ থেকে ভাড়া করে অস্ত্রবাজ, সন্ত্রাসী ও গডফাদারদের আগে থেকেই ঢাকায় এনে জমা করা হয়েছিল। যাদেরকে জনগণ ২৮ অক্টোবরের দিন অস্ত্রহাতে রাজপথে দেখেছিলেন, ইতিপূর্বে তাদেরকে আর কখনো রাজপথে দেখা যায়নি।  
    ২৮ অক্টোবর ২০০৬, সেদিন ঢাকার রাজপথে একটি বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরির জন্য আওয়ামী লীগ পূর্ব থেকেই পরিকল্পনা গ্রহণ করে রেখেছিল। কিন্তু সেই বিভীষিকাময় পরিস্থিতি এতো নির্মম, পৈশাচিক, নৃশংস, জঘন্য, অমানবিক, বর্বর ও মনুষ্যত্বহীন হবে এটা দেশের জনগণ কখনো ভাবতে পারেন নি।
    ২০০৬ সালের ২৮, ২৯, ও ৩০ অক্টোবর আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছিল তা যেকোন সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজে নজিরবিহীন বলে পর্যবেক্ষরা মনে করেন। এ সময়ে সৃষ্ট সংঘাতে সারাদেশে নিহত হয়েছিল ৩২ জন সাধারণ মানুষ। এর মধ্যে ২৮ অক্টোবর নিহত হয়েছিল ১৪ জন। ২৯ অক্টোবর নিহত হয়েছিল ১৫ জন। ৩০ অক্টোবর নিহত হয়েছিল ৩ জন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ১৫টি জেলায় এসব হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছিল। এ সময় লগি-বৈঠার আঘাতে আহত হয়েছিল আরও প্রায় ২ হাজার মানুষ। আহতদের মধ্য অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে এখনো জীবন-যাপন করছেন। কারো কারো দুই হাত কেটে নেয়া হয়েছিল। ওই সময় প্রকাশ্যে ব্যবহার করা হয়েছিল আগ্নেয়াস্ত্র, লগি-বৈঠা, রামদা ও তলোয়ার। ছোড়া হয়েছির হাত বোমা ও পেট্রল বোমা। আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের লাগাতার কর্মসূচি চলাকালে নেতাকর্মীরা চালায় ব্যাপক অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট। এসব থেকে রেহাই পায়নি পৌরসভা ভবন, সরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ক্লিনিক। রাজনৈতিক দলের অফিস, ব্যক্তিগত চেম্বার, বাসগৃহ, দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সরকারি ও বেসরকারি বাস, ট্রাক, জীপ, কার, পিক-আপ, টেম্পু ও রিকশা প্রভৃতি। কোনো কোনো এলাকায় বাড়ি লুটপাট করতে গিয়ে উঠোনের টিউবওয়েল পর্যন্ত উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল সন্ত্রাসীরা।
    ২০০৬ সালে আওয়ামীলীগ নেতা-কর্মীদের নির্মমতা আর পৈশাচিকতা আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগকেও হার মানিয়েছিল। আশরাফুল মাখলুকাত অর্থাৎ সৃষ্টির শ্রেষ্ট জীব হিসেবে মানুষের মর্যাদা ক্ষুন্ন করেছিল। যে আচরণ পশুও পশুর সাথে করে না, শুধুমাত্র ক্ষমতার জন্য, রাজনৈতিক মতবিরোধের জন্য আওয়ামীগ সেই অমানবিক, হিংস্র ও পৈশাচিক আচরণ করেছে মানুষের সাথে। সেই লোমহর্ষক, বর্বর ও নৃশংসতার দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়েছিল গোটা দেশ, থমকে দাঁড়িয়েছিল কোটি কোটি মানুষ, হতভম্ব ও বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল দেশের আপামর জনতা। 
    এ ঘটনা শুধু বাংলাদেশের নয়, গোটা বিশ্বের বিবেকবান মানুষের হৃদয় নাড়া দিয়েছিল। জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব থেকে শুরু করে সারা বিশ্বে ওঠেছিল প্রতিবাদের ঝড়। অবাক হয়েছিল বিশ্ববিবেক। ঘৃণা ও নিন্দা জানিয়েছিল তারা।
    ক্ষমতার বাইরে থাকলে ক্ষমতার জন্য আওয়ামীলীগ কত জঘন্য হতে পারে, তা জনগণ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে আওয়ামীলীগ প্রধান শেখ হাসিনা জাতির কাছে ওয়াদা করেছিল যে, তারা বিরোধী দলে গেলেও আর কখনো হরতাল করবেন না। কিন্তু সেই আওয়ামীলীগ প্রধান শেখ হাসিনাই চারদলীয় জোট সরকারের ক্ষমতা থাকাকালীন সময়ে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ১৭৬ দিন হরতাল দিয়েছিলেন।
    ২০০৯ সালের নির্বাচনে দেশের জনগণ আওয়ামীগকে ভোট দিয়ে, তাদের সেবক নির্বাচিত করেছিল। কিন্তু আওয়ামীলীগ জনগণের সেবার পরিবর্তে জনগণের ওপর প্রভুত্ব করা শুরু করল। আওয়ামীলীগ নিজেদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য পার্লামেন্টে একের পর এক নতুন নতুন আইন তৈরি করা শুরু করল। আওয়ামীলীগ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার করা শুরু করল। আওয়ামীলীগ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও কয়েকটি মিথ্যা মামলা দিয়েছেন। ফেব্রুয়ারীর ৮ তারিখে খালেদা জিয়ার একটি মামলার রায় হওয়ার কথা রয়েছে। এই মামলার রায়ে খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করা হবে। আওয়ামীগ বিরোধী দলকে কঠোর হস্তে দমন করে, দেশে একদলীয় বাকশাল কায়েম করতে চায়। এককভাবে ক্ষমতা কুঙ্গিগত করে রাখতে চায়। কিন্তু বাংলার গণতন্ত্রকামী জনগণ এটা হতে দেবেনা।
    রাজনীতিবীদের কেন মানুষ গালি দেয়, সেটা আমি আগে জানতাম না। এখন জেনেছি এবং খুব ভালভাবেই জেনেছি।
    যে “তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা জ্বালাও-পোড়াও ও ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড চালিয়েছিলেন, অথচ অবাক হওয়ার বিষয় যে, প্রধান বিরোধী দলের দাবি উপেক্ষা করে সেই শেখ হাসিনাই ২০১৪ সাল থেকে নিজেই ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন দিচ্ছেন।
    যে নিরপেক্ষ তত্ত্বধায়ক সরকারের দাবিতে ২০০৬ সালে আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ কর্মকান্ডের মাধ্যমে সারা দেশকে রণক্ষেত্রে পরিনত করেছিলেন। অথচ ২০১৪ সাল থেকে সেই শেখ হাসিনাই নিজেই ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন দিয়ে পূনঃ পূন ক্ষমতায় থেকে যেতে চান। আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য লগি-বৈঠার আন্দোলন করা হয়েছিল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য। আর এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্ত করে নিজেই অধীনেই লোক দেখানো নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতাকে ঠিকিয়ে রাখতে চান।  হায়রে রাজনীতি। অবশ্য ক্ষমতাই যাদের মূল নেশা তাদের কাছে তো মর্যাদা আর মনুষ্যত্ববোধ মূল্যহীন। জনগণের চাওয়া-পাওয়া মূল্যহীন।
    এমপিওভুক্তির দাবিতে ছয়দিন ধরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনশন চালিয়ে আসার পর বেসরকারি প্রাথমিকের শিক্ষকরা প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস পেয়ে কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন। এবিষয়ে গত ৪ ফেব্রুয়ারী রবিবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শিক্ষা সমাবেশে’ প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “এটুকু আমি বলব, চাপ দিয়ে কিন্তু কেউ কিছু আদায় করতে পারবে না। “কেউ যদি মনে করেন, সরকারের এটা শেষ বছর.. অমনি দাবি করলেই আমরা সব শুনে ফেলব.. আমি কিন্তু ক্ষমতার পরোয়া করি না। ক্ষমতায় থাকি, না থাকি; আমার কিন্তু আসে যায় না।”
    মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি যদি সত্যিই ক্ষমতার পরোয়া না করেন, তাহলে পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দিয়ে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিয়ে বাংলাদেশের জনগনকে দেখিয়ে দিন যে, আপনি সত্যিই ক্ষমতার প্রত্যাশি নন। আর যদি আপনি নিজেই ক্ষমতায় থেকে আবার নির্বাচন দেয়ার পরিকল্পনা করেন তাহলে জনগন আপনাকে ক্ষমতার লোভী বলে জানবে। মনে রাখবেন অবৈধভাবে ক্ষমতা ঠিকিয়ে রাখার লোভ হল রাজনীতির একটি ভাইরাস!
    মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, একদলীয় বাকশালী চিন্তা-চেতনা বাদ দিয়ে, ক্ষমতার লোভ ছেড়ে দিয়ে, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিয়ে দেশকে বহুদলীয় গনতন্ত্রের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। এই প্রত্যাশাই রইল!

glqxz9283 sfy39587p07