Skip to content

মাদ্রাসা নয় চাই কর্মমুখী আধুনিক শিক্ষা

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি


সরকারের সার্বিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা দেশের আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসাগুলোই ধর্মীয় উগ্রবাদী উৎপাদনের প্রধান কারখানা। মাদ্রাসাগুলোতে যে শিক্ষা পাঠ্যক্রম অনুসরণ করা হয়, তা শতভাগ বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতির বিপরীত। এই সকল মাদ্রাসায় কোন জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় না। বিজয় ও স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলিতে হয় না। মাতৃভাষা দিবসের কথাতো বাদই দিলাম। মাতৃভাষা বাংলার প্রতিও যে রয়েছে তাদের ঘোর বিদ্বেষ। অন্যদিকে, রয়েছে বিজাতি উর্দু, ফার্সি ও আরবি ভাষা প্রীতি।

দেশে-বিদেশে বাঙালি এবং পাকিস্তানী ধর্মবীরদের পোশাকের ধরনটা ঠিক এক নয়। উনারা পরিধান করেন সাড়ে সাত মিটারের সালোয়ার কুর্তা আর আমাদের বাঙালি ধর্মবীরেরা পড়েন হাটুর উপরে তোলা আড়াই হাতি লুঙ্গি ও পায়জামার সাথে আরবী জুব্বা। এই নাকি ইসলামিক ড্রেসকোড! বাহ্যিক দৃষ্টিতে ইনারা মেহেদি রঞ্জিত দাড়ি আর টুপি সেই সাথে সুর্মা চর্চিত আঁখি যুগল। মুখে পান জর্দার রক্তাক্ত দাঁত। ভিতরে ও মুখে আরবি, উর্দু ও ফার্সি শব্দের সে কি পাণ্ডিত্য! বেহেস্তের চাবিটা যেন উনাদের পকেটে লোকানো। উনারা সবাই আস্তিক, সৃষ্টির সেরা জীব বা আশরাফুল মাখলুকাত। সৃষ্টিকর্তা বা আল্লাহ্‌র বেষ্ট প্রোডাক্ট।

যাই হোক, আলিয়া, কওমি ও দাওরা হাদিস সহ অন্যান্য মাদ্রাসাগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের খিলাফত রাষ্ট্র বানানোর দীক্ষা দেওয়া হয় এবং তার জন্য জিহাদের শিক্ষা দেওয়া হয়। যারা খিলাফত রাষ্ট্রের বিরোধী, তাদেরকে হত্যা করার জন্য ছাত্রছাত্রীদের “মগজ ধোলাই (Brain Wash)”-র ব্যবস্থা করা হয়। তাছাড়া এসব মাদ্রাসাগুলোতে মুক্তবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষদের হত্যা করার দীক্ষা দেওয়া হয়।

১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রাক্কালে জামায়াত ইসলামীর নেতৃত্বে তাদের অনুচর আলবদর ও আল শামস বাহিনী নৃশংসভাবে যেসব প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল, সেই বুদ্ধিজীবীরা আমাদের জাতীয়তাবাদের প্রেরণা জুগিয়েছেন এবং আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে সাধারণ মানুষকে সাহস ও উদ্দীপনা সঞ্চার করেছিলেন। তাই তাদেরকে হত্যা করা জন্য প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী চক্র পাকিস্তানের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের প্ররোচনায় উন্মাদ হয়ে উঠেছিল। তাদের মনে খুনের নেশা পেয়ে বসে। ধর্ম ব্যবসা এবং ধর্মীয় রাজনীতি যে কতোটা ভয়াবহ, তা আমরা ১৯৭১-এই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা সেই ১৯৭১-এর পুনরাবৃত্তি দেখছি।

সুতরাং প্রশাসনকে মনোযোগ দিতে হবে জঙ্গি উৎপাদনের কারখানার দিকে, অর্থাৎ আলিয়া-কওমি সহ অন্যান্য মাদ্রাসাগুলোর দিকে। আমাদের বোধগম্য নয় যে, কোন খোঁড়া যুক্তিতে ও কার বা কাদের স্বার্থে কওমি মাদ্রাসা সরকারের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ বা পর্যবেক্ষণ চায় না? তাহলে কি রাষ্ট্র অসহায় মাদ্রাসা শিক্ষাকে সংস্কার করতে? শিক্ষা ব্যবস্থার এই বৈপরিত্য বা স্ববিরোধী শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের জন্য যে অভিশাপ বয়ে আনছে, সেই অভিশাপই জন্ম দিচ্ছে জঙ্গিবাদী ও মৌলবাদীদের। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সেই 'টাইম বোমা' আজ বিস্ফোরিত হচ্ছে যখন তখন।

পাশাপাশি, জঙ্গি উৎপাদনের কারখানা কওমি মাদ্রাসাকে সরকার যে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, তা আসলে “জেনেশুনে বিষ পান” করার শামিল। সরকার যদি নিজেই আত্মঘাতী হয়, তাহলে তো জনগণ কার কাছ থেকে প্রতিকার পাবে?

স্বাধীনতার পর দেশে অনেকগুলো শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে। যেমন, কুদরত ই খুদা শিক্ষা কমিশন, কবির চৌধুরীর শিক্ষা কমিশন ইত্যাদি। প্রতিটি শিক্ষা কমিশনই সকল মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিকায়ন ও সংস্কারের কথা বলা হয়েছে এবং আস্তে আস্তে পর্যায়ক্রমে মাদ্রাসা শিক্ষাকে বিলোপের কথাও বলা হয়েছে। কারন কর্মমুখী ও যুগোপযোগি শিক্ষাই জাতিকে মেধাবী ও স্বচ্ছল করে। আর অনুৎপাদনমুখী শিক্ষাই বা শিক্ষা ব্যবস্থাই জঙ্গিবাদের ধারক ও বাহক।

আমরা শিক্ষা কমিশনের বাস্তবায়ন দেখতে চাই। একই রাষ্ট্রে মানব বিধ্বংসী শিক্ষা ব্যবস্থা থাকবে, আবার কর্মমুখী তথা উৎপাদনমুখীও শিক্ষা ব্যবস্থা থাকবে – এই ধরনের বৈপরিত্ত বা স্ববিরোধী শিক্ষা কাঠামো জাতির জন্য অত্যন্ত ভয়ংকর। জঙ্গিবাদী শিক্ষা ব্যবস্থার কাছে কর্মমুখী শিক্ষা এখন হুমকির মুখে। মুক্তবুদ্ধি আক্রান্ত হচ্ছে জঙ্গিদের চাপাতির কাছে। আমরা চাই এমন শিক্ষা ব্যবস্থা এবং আদর্শিক পরিবেশ, যেখানে কেউ জঙ্গিবাদের শিক্ষাদীক্ষা পাবে না এবং যে শিক্ষা ব্যবস্থা ও পারিবারিক কাঠামোতে কেউ “মগজ ধোলাইয়ের” শিকার হবে না।

কওমি ও আলিয়া সহ সকল মাদ্রাসাগুলোকে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি জঙ্গি উৎপাদন, বিস্তার ও প্রতিরোধে দেশের ইসলামী দলগুলোর ভূমিকা কি, সেই বিষয়ে আমার যথেষ্ট চিন্তা ভাবনার অবকাশ রয়েছে। জঙ্গি দমন ও বিস্তার প্রতিরোধে সরকারের স্বরাষ্ট্র, অর্থ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় ভিত্তিক উদ্যোগ অতি জরুরী।

আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ যেমন ছেলেমেয়েদের সুনাগরিক হতে প্রভাবিত করে, তেমনি কর্মময় উৎপাদনমুখী সুশিক্ষা মানুষের সুকুমারবৃত্তিকে প্রসারিত করে এবং তাকে অন্ধকার জগত থেকে আলোর জগতে নিয়ে যায়। সেই লক্ষেই আমাদের জঙ্গি উৎপাদনের কারখানার দিকেই মনোনিবেশ করতে হবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমরা যেমন ঐক্যবদ্ধভাবে সুশিক্ষার আলোকে মৌলবাদের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করতে পারব, তেমনি যৌক্তিকভাবে মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে অব্যাহত রেখেই জঙ্গিবাদ-মৌলবাদের বিরুদ্ধে তীব্র গণপ্রতিরোধমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক
@Khurshad Alam​

glqxz9283 sfy39587p07