Skip to content

কোরআন মোটেও আইনের বই নয়

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

কোরআনের আইন, শরীয়াহ আইন ইত্যাদি পরিভাষা দেখে দয়া করে কেউ প্রতারিত হবেন না। মনে রাখবেন, কোরআন কোনো আইনের বই না। আবার কোরআনকে সংবিধান হিসেবে পরিচিত করার যে প্রবণতা লক্ষ করা যায় সেটাও একটা ফাঁদমাত্র।

মূলত কোরআন কোনো সংবিধান নয়। অনুরূপ কোরআনকে দণ্ডবিধির বইও বলা চলে না। তবে হ্যা, কোরআনে কিছু আয়াত আছে যা অনেকটা আইনের মত শোনায়, কিছু আয়াত সংবিধানের মত শোনায়, কিছু আয়াত দণ্ডবিধির মধ্যেই পড়ে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সর্বসাকুল্যে কোর’আন ওসবের একটাও নয়।

‘কোরআন কী’ সে প্রশ্নের উত্তর আল্লাহ স্বয়ং দিয়েছেন। বলেছেন এটা উপদেশগ্রন্থ। আবার কোরআনকে বলো হয়েছে ‘ফেরকান’ অর্থাৎ ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা পার্থক্যকারী গ্রন্থ। কাজেই আল্লাহ যেটুকু বলেছেন আমরা কোরআনকে আধুনিকতার মোড়ক পরাতে গিয়ে যেন তার বাড়াবাড়ি না করে ফেলি। মানুষকে নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য উপদেশগ্রন্থই এক জিনিস আর আইন ও সংবিধানের বই সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস।

কোরআনের আইন নিয়ে যদি কেউ কথা বলতে আসে তাদেরকে সোজা প্রশ্ন করবেন, কোরআনে কয়টা আইনের কথা আছে? কোরআনে কয়টা রাষ্ট্র পরিচালনার ধারা-উপধারা, নীতিমালা ইত্যাদি আছে? কোরআনে কয়টা দণ্ডবিধি আছে? আর একটি আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কোর'আনের দুএকটা প্রাসঙ্গিক বানী খুবই অপ্রতুল।

চুরি, ব্যাভিচার আর হত্যার বাইরে সমাজে হাজার হাজার অপরাধ হচ্ছে প্রতিনিয়ত, সেগুলোর শাস্তি কী হবে? আবার চুরির বিধান হাত কাটাই ধরুন। বাপের মানিব্যাগ থেকে ছেলের দশ টাকা চুরিও চুরি, রিজার্ভের আটশ’ কোটি টাকা চুরিও চুরি, উভয়ের শাস্তিই কি হাত কাটা?

এবার তারা শরীয়তের বই হাজির করবে। অথচ আপনি হয়ত জানেন না সেই শরীয়তের বইগুলো আল্লাহর নাজেলকৃত কোন গ্রন্থ নয়। সেটা আজ থেকে শত শত বছর পূর্বের একদল আলেমের/মোল্লাদের রচিত গ্রন্থ, যারা তাদের পারিপার্শিক অবস্থা, স্থান, কাল ইত্যাদি বিবেচনা করে সেই সময়ের মানুষের জন্য প্রযোজ্য বিধি-বিধান রচনা করেছিলেন। সেটা কী করে কোরআনের আইন হয়? সেটা বড়জোর আলেমদের/মোল্লাদের আইন হতে পারে।

বর্তমানের এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে, বিশ্ব যখন প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সমস্যার মুখোমুখী হচ্ছে, তখন হাজার বছর আগের মুফতি-ফকিহদের ঐ বিধান কতটুকু প্রযোজ্য হতে পারে? কিন্তু কোরআনের আইনের ধুয়া তুলে সেই পুরোনো আমলের শরীয়তের বইটাকেই জাতির উপর চাপানোর চেষ্টা চালানো হয়, আর তা দেখে যুগসচেতন মানুষেরা ইসলামকেই ভুল বোঝেন। পরাজয় ইসলামেরই হয়।

সত্য হচ্ছে কোরআন সীমিত পরিসরে ন্যায় ও অন্যায়কে বুঝতে শেখায়। সত্য থেকে মিথ্যাকে পৃথক করে দেয়। ব্যস, এবার মানুষের দায়িত্ব হচ্ছে সে তার সামগ্রিক জীবনে সর্বাবস্থায় সত্য ও ন্যায়কে প্রাধান্য দেবে। কোনো বিধান সেটা প্রয়োগের ফলে আলটিমেটলি মানুষ ন্যায় পাচ্ছে নাকি অন্যায় পাচ্ছে? যদি ন্যায় পেয়ে থাকে তাহলে সেটাই ইসলামের আইন। আর যদি সে আইনের দ্বারা অন্যায়ের বিজয় হয় তাহলে সেটা তাগুতের আইন। আর এই তাগুদের আইন আধুনিক যুগেও বহু ইসলামিক রাষ্ট্রে প্রচলিত।

কোনো রাষ্ট্র, সেটার গঠন যদি এমন হয় যে তার দ্বারা আলটিমেটলি ন্যায় ও সত্যের প্রকাশ ঘটে, রাষ্ট্র পরিচালকরা ন্যায়ের উপর দণ্ডায়মান থাকেন এবং জনগণ ন্যায়, সুবিচার ও শান্তি পায় তাহলে সেটাই ইসলামী রাষ্ট্র। অপরাধীকে দণ্ডবিধির যে ধারায় শাস্তি দিলে ন্যায়ের বিজয় হয় সেটাই ইসলামী দণ্ডবিধি। আলাদা করে ইসলামী দণ্ডবিধি বলে কিছু নেই।

আল্লাহ কেবল বড় বড় কয়েকটা অপরাধ- যেমন, চুরি, ব্যভিচার, হত্যা ইত্যাদির শাস্তি দানের ক্ষেত্রে সীমারেখা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন যে, ওই অপরাধের শাস্তি সর্বোচ্চ ওই পর্যন্তই। চুরির শাস্তি বড়জোর হাত কাটা পর্যন্তই। তার বেশি নয়। তবে নিম্নে যতদূর ইচ্ছা শাস্তি কমিয়ে দেওয়া যায় অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে, এমনকি ক্ষমাও করা যায়। এইসব বিষয়াদির কিছুই কোরআনে পরিষ্কার করে বলা নেই।

এই সীমারেখা নির্ধারিত না থাকলে কী হতে পারে তার দৃষ্টান্ত আমাদের সমাজেই-তো আছে। সামান্য চুরির দায়ে মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। যেখানে কোরআনের মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠত থাকবে, সেখানে কস্মিনকালেও এমন হবার নয়। এমনও বলা আছে সীমা লঙগণকারীদের আল্লাহ্‌ অপছন্দ করেন।

একটি কথা মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ নিজে সত্য, আর সত্য থেকেই আসে ন্যায়। কাজেই ন্যায়ের স্থাপনা হওয়া মানেই আল্লাহর হুকুমত প্রতিষ্ঠিত হওয়া, কোরআনের শাসন কায়েম হওয়া। সুতরাং, আলাদা করে কোরআনের শাসন বলে কিছু নেই।

খোরশেদ আলম
@M.KhurshadAlam


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

চমৎকার বিশ্লেষণ।

ajabul

glqxz9283 sfy39587p07