Skip to content

প্রবাসের অখ্যাত গল্প-৭

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

সুইডেনের শীতের প্রকোপটা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে, বাইরে যাবার আগে গায়ে কাপড় জামা চড়াতে যে সময় নেয় তা বিবেচনা করতে গেলে দুপুরের খাবারের জোগাড় যন্ত্র হয়ে যায়, ঠিক আবার খুলতেও সেই একি সময় | কারুর বাসায় বেড়াতে গেলে কাপড় জামা তো খুলতেই হয় সে সাথে পায়ের জুতা খুলে ঘরে প্রবেশ করাটা স্কেন্ডেনেভিয়ান দেশগুলোতে একটা রীতি , এদেশের মানুষরা তাদের ঘরদোর অসম্ভব সুন্দর আর পরিষ্কার করে গুছিয়ে রাখে যা দেখে হতবাক হতে হয় |


প্রথম প্রথম ধারণা ছিল এ জাতটা এতো নির্জীব আর ঠাণ্ডা প্রকৃতির কেন, এদের মাঝে প্রাণের উচ্ছলতা কোথায় ? এরা কি চীৎকার করে হাসতেও জানে না, বিষয়গুলো নিয়ে খুব ভাবতাম, এদের সাথে মেলামেশা করা নিশ্চয়ই খুবই দুরূহ ব্যাপার, তারপর আমি একজন ভিন দেশের মানুষ গায়ের রংটাও আলাদা, কালো মানুষদের প্রতি হয়তো বা তাদের একটা বিরূপ ধারণা, এসব নানা প্রশ্ন মনের মাঝে উকি দিত | দিন পেরুতে থাকে আর আমিও আস্তে আস্তে সমাজ আর পারিপার্শ্বিকতার সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিচ্ছি , বুঝতে পারছি বিরূপ চিন্তা ভাবনাটা আসলে আমার মনেই বিরাজমান, সকল মানুষের প্রতি এ জাতটার ভালোবাসাটা যেন জন্মগত, প্রকৃতি, মানুষ সব সুন্দের সাথেই যেন এদের সখ্যতা বেশী, সোজাসাপ্টা কথা বলাটা তাদের অভ্যাস, মিথ্যে বলাটা যেন এদের রক্তের মাঝেই বিরাজ করে না, অবশ্য তার প্রয়োজনও হয়না কারণ এদেশে কেউই অভাবে থাকে না, চুরি চামারি, খুন রাহাজানি, দুর্নীতি লুটপাট নাই বললেই চলে | ইদানীং কালে কয়েদীদের অভাবে অনেক রাষ্ট্রীয় জেলখানা বন্ধ করে দিতে হচ্ছে | এ জাতির সাথে মিশতে পারলেই এদের অন্তরের আনন্দ আর উচ্ছলতাকে দেখতে পাওয়া যায়, এরাও প্রাণ খুলে হাসতে জানে, ফ্রি সেক্সের দেশ হলেও যৌনতা এখানে উ-শৃঙ্খলতা নয় যৌনতাকে ভালবাসা ও সম্মানের সাথে উপভোগ করার বিষয় | এরাও প্রকৃতই বন্ধু হয় যে বন্ধুত্বের মাঝে কোন খাদ থাকেনা | যে কোন মানুষকে বিশ্বাস করাই মনে হয় এদের ধর্ম | হিজ হিজ হুজ হুজ মানে হচ্ছে যে যার খরচ বহন করে, কারুর বাসায় আড্ডা হবে তাই সাথে করে নিজের পানীয়টা নিয়ে যাবারই নিয়ম, প্রয়োজন বোধে সবাই মিলে খাবারের আয়োজন করা, যাতে একজনের উপর খরচের ভারটা না বর্তায় | এতসব সামাজিক নিয়মকানুন গুলো রপ্ত করতে নিজের ভেতরের পুঞ্জিভূত কুসংস্কার আর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে নিজের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছে বৈকি | প্রেমিক আর প্রেমিকা বাইরে রেস্তরাতে খেতে যাবে যে যার দাম চুকিয়ে দেবে বিষয়টা যেন পূর্বেই অলিখিত একটা চুক্তি | এখানে বন্ধু মানেই একজন বন্ধু আর বান্ধবী মানেই প্রেমিকা হতে হবে তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক থাকতেই হবে এমন কথা নাও হতে পারে | বিস্ময়কর এক জগত আর পরিবেশের সাথে দিন দিন আমি মিশে যেতে থাকি |
অক্টোবর মাসের মাঝা মাঝি সময়ে বেশ কয়েকজন বন্ধু বান্ধবী মিলে শীতকালীন ছুটিতে ক্লাস বন্ধ হলেই আমাদের এক সপ্তাহের অবকাশ পালন শুরু হবে, মুরা থেকে এক ঘণ্টার পথ ইদ্রে পাহাড়ের পাদদেশ আর সেখানেই আমাদের একটা বাংলো ভাড়া নেয়া আছে, পুরো একটা সপ্তাহ স্কিং করে কাটাবো, লিফট আমাদের পাহাড়ের চূড়ায় উঠিয়ে নিয়ে যাবে আর সেখান থেকেই বরফে আচ্ছাদিত পাহাড়ের গা ঘেঁষে পায়ে স্কি চাপিয়ে তীব্র গতিতে নীচে নেমে আসা, তিনটা গাড়ীতে আমরা চোদ্দ জন ভাড়া নেয়া বাংলোতে ঢুকে গেলাম কিন্তু বিপদ শোবার জায়গা বাংলোতে সবে মাত্র বারটি, দুজন মেয়ে বান্ধবী অন্য কারুর সাথেই বিছানা শেয়ার করতেই হবে, আমি কেমন যেন গায়ে জ্বর জ্বর অনুভব করছি জানালা দিয়ে ঘরের বাইরে সাদা চাদরে ঢাকা পাহাড়টা দেখতে পারছি, নিজের এই অস্বাভাবিক আচরণটা লুকাবার চেষ্টা করছি কারণ বান্ধবীদের যে কোন একজন যদি আমার বিছানায় ভাগাভাগি করে শোবার প্রস্তাব দিয়ে বসে তবে নির্ঘাত আমি অসুস্থ হয়ে পরবো | বুঝতে পারছি এ নিয়ে বেশি ভাবা ভাবির কিছু নাই , কপালে যা ঘটার তা তো ঘটবেই, নির্ধারিত হলো, আমাদের মাঝে যে কয়জনের বিছানা নীচে তাদের সাথে বান্ধবী দুজন বিছানা ভাগাভাগি করে নেবে আর বিছানাটা ঠিক দরজার পাশে তাই এটাই প্রথম নির্ধারিত জায়গা, আমার ভাবনা শুধু একটাই এই প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় গরম পোহাতে ঘুমের ঘোরে বান্ধবীটি যদি আমার লেপের নীচে ঢুকেই যায় তবে আমি দরজা খুলেই ভো এক দৌড়ে পাহাড়ের চূড়ায় চলে যাবো আর সেখানেই বরফের তলায় আমার সমাধি স্থাপিত হবে, আর আজ রাতেই নির্ঘাত সেটা ঘটাতে যাচ্ছে | আজ সকালেই রওনা দেবার আগে দেশে ছোট বোনের সাথে টেলিফোনে এই স্কি করার বিষয়টা জানিয়ে ছিলাম, মনের মাঝে যে কি ভয় উত্তেজনা কাজ করছিল তা বলে বোঝাতে পারিনি, বলে ছিলাম এই বরফের দেশেই পাহাড়ের চূড়ায় কোন গাছের সাথে প্রচণ্ড ধাক্কা লেগে আমি হয়তো তুষারের নিচে হারিয়ে যাবো , তোরা কেউ আমাকে খুঁজে পাবি না, গত রাতে এ দিকটায় বেশ তুষার পাত হয়েছে কাজেই ইদ্রে অঞ্চলের সব পাহাড়গুলো তুষারে তুষারে টইটুম্বুর অবস্থা, কিন্তু এখন এসে দেখছি বিপদ আরও ভয়াবহ, একজন জলজ্যান্ত ভিন দেশী স্বর্ণকেশী মেয়ের সাথে কিনা রাতে আমার বিছানায় ভাগাভাগি করে ঘুমাতে হবে | এই ঠাণ্ডায় আমার গা দিয়ে ঘাম ঝরার উপক্রম অথচ বান্ধবীর আচরণ দেখে মনে হচ্ছে এটা কোন বিষয়ই না, তার হাব ভাব দেখে মনে হচ্ছে এ রকম হাজারটা রাত হাজারটা ছেলের সাথে বিছানা ভাগাভাগিতে সে অভ্যস্ত | বাংলোতে পৌছতে আমাদের প্রায় বিকেল গড়িয়ে গেছে, তাড়াতাড়ি যে যার পায়ের মাপের জুতা ও স্কি ভাড়া করতে পাশের দোকানে যেতে হবে, আমি মনে মনে ঠিক করেই নিলাম আমি জ্বর হয়েছে ভান করে নিজের বিছানা থেকে বান্ধবীকে পাশের অন্য কারুর বিছানায় পাঠিয়ে দেব, বান্ধবীকে কেমন করে বোঝাই যে আমি অন্য এক পরিবেশ আর সমাজ থেকে এসেছি যেখানে একজন বান্ধবী বিয়ের আগে অন্য একটি ছেলের বিছানায় ভাগাভাগি করে ঘুমাবার কথা ইহ কালেও চিন্তা করে না , আমি এমন একটা সমাজ থেকে তোমাদের মাঝে এসে পরেছি যেখানে একটি ছেলে একটি মেয়ের পাশে বাসে পর্যন্ত বসতে পারে না যেখানে মেয়েদের বসার জায়গা থাকে আলাদা , একটি ছেলে পঞ্চাশ মেইল পথ ট্রেনের দরজায় ঝুলে থাকলেও নির্ধারিত মেয়েদের আসনে বসতে গেলেই গণধোলাই খেয়ে জীবন হারাবে | ইচ্ছে হচ্ছে সবাইকে চিৎকার করে বলি “ তোমরা কেউ আমাকে অসামাজিক ভেবো না, আমিই সেই, যে কিনা কলেজে পড়ার সময় বড় মাঠের পাশের রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে পাশের বাসার রমিতাকে চিঠি ছুড়ে দিতে গিয়ে পাশের নর্দমায় সাইকেল নিয়ে পরে গিয়েছিলাম, আমাকে এই বিদেশ ভুঁইয়ে এখন কিনা জলজ্যান্ত একটা মেয়ের সাথে এক বিছানায় ঘুমাতে হবে” ! কয়েকজন দরজা খুলে বাইরের দরজার পাশে বরফ সরাতে ব্যস্ত, রান্নার যোগাড় তেমন কিছু না গামলা ভর্তি কাচা সালমন মাছ আর সবজি মিশিয়ে সাথে রুটি আর মাখন | ভাবছি গলা দিয়ে এ খাবার ঢুকলেই হয়, যে যার পায়ের মাপে স্কি করার জুতা দেখতে অনেকটা ভারী এপোলো যানের যাত্রীদের জুতার মত, সাথে স্কি করার বোর্ড যা কিনা জুতার সাথে আটকে থাকে এসব গুছিয়ে দরজার পাশে রেখে দিলাম | আমি আর আমার মাথায় ওই একটাই চিন্তা আমাকে বলতেই হবে আমার জ্বর এসেছে আমাকে একা বিছানায় ঘুমাতেই হবে, মাথায় সব এলোমেলো চিন্তা ভিড় করেছে, ভাবনার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি, হঠাত্ বান্ধবীর প্রশ্নে ধ্যান ভাঙ্গল , “তুমি বিছানার ভেতরের নাকি বাইরের দিকটা নেবে ?” মনে মনে উত্তর দিলাম মনে হয় আমি, আমি মানে ইয়ে, আজ রাতে ওই পাহাড়ের চূড়ায় তুষারের নিচে চলে যাবো, তোমরা কেউ আমাকে খুঁজে পাবে না | আমি নিজেকে অনেকটা স্বাভাবিক আর স্মার্ট করে নিয়ে বললাম “ একদিক হলেই হবে |” মেয়েটি উত্তর দিল “ওহ আচ্ছা ” | একটু অবাক হয়ে রইলাম কিছুক্ষণ, একটা ছেলের সাথে একই বিছানায় ঘুমাতে হচ্ছে আর তিনি কিনা উত্তর দিলেন “ওহ আচ্ছা” | আমার মাথায় সেই চিন্তা আর মানসিকতার তখন জন্ম হয়নি যে বন্ধুত্ব আর যৌনতায় যে আকাশ পরিমাণ দূরত্ব, তার কারণ আমার জন্ম আমার পরিবেশ আমার বেড়ে ওঠা, আমার কুসংস্কার | সব কিছুর ঊর্ধ্বে আজ বুঝতে পারছি আমি মানুষের মত চিন্তা করতে শিখি নাই | রাতের বেলাটা না ঘুমিয়েও এক দুঃস্বপ্নের মাঝে কাটিতে দিলাম, বিছানার এক কোনাতে দেয়ালের সাথে গা ঘেঁষেই শুয়ে আছি, আর মেয়েটা কিনা নিশ্চিন্তে তার লেপটা গায়ে টেনে ঘুমিয়ে পড়লো ? রাতে বার বার মনে হচ্ছিল বান্ধবী হয়তো আমার লেপের নীচেই চলে আসতে পারে তাই লেপটাকে গায়ের সাথে পেঁচিয়ে নিলাম | এ রকম একটা ভয়ের রাত পার করতে করতে তুষারের সাদা চাদরে ঢাকা পাহাড়ের ডান দিকটায় সূর্যের আলো দেখা দিচ্ছে , আমি বিছানা থেকে উঠে জানালার ধারে সুইডেনের তুষারে ঢাকা ইদ্রে ফিয়েল মানে ইদ্রে পাহাড়ের চূড়া দেখতে থাকি, বরফে ঢাকা পৃথিবী দেখতে এতটা উজ্জ্বল স্বর্ণালী রঙের তা দেখে বুঝতে চেষ্টা করছি এই ভিনদেশী স্বর্ণকেশী মেয়েদের মানসিকতা কতটা স্বচ্ছ যেন স্বর্ণালী সূর্যের মতই তাদের অন্তরে বন্ধুত্বের আলো বিচ্ছুরিত হয় |
খুব সকালেই আমর সবাই ঘুম থকে উঠে বলতে গেলে অর্ধ নগ্ন অবস্থায় যে যার মত প্রকৃতির কর্ম শেষ করেই হালকা নাস্তা করে নিলাম কাঁধে একটা ছোট ব্যাগের ভেতর একটা ফ্লাক্সে গরম দুধ মিশ্রিত চকলেট আর মিষ্টি বনরুটি ভরে নিয়ে লিফট অভিমুখে রওনা দিলাম | মহাকাশ যানে নভোচারীদের পারার মত জুতা পরে প্রথমত হেটে যেতে একটু অসুবিধা হচ্ছিল তবে খানিক পথ হেটে যাবার পর অভ্যস্ত হয়ে গেলাম, লিফটের কাছাকাছি এসেই স্কি বোর্ড কাঁধ থকে নামিয়ে জুতার সাথে জুড়ে দিলাম, ব্যাস, এইবার বেশ হলো তো, আমি এক কদমও সামনের দিকে এগুতে পারছিনা, যত বার এই প্রকাণ্ড বোর্ড দুটো নিয়ে সামনের দিকে হাটার চেষ্টা করছি ততবারই হয় পা পিছলে পেছনের দিকে উল্টে পড়ে যাচ্ছি নয়তো সামনের দিকে উপর হয়ে পড়ছি | আসে পাশের সবাই একটু আড় চোখে আমাকে দেখে বুঝতে পারছে হয়তো এই সেই ছেলে যে কিনা রমিতাকে চিঠি ছুড়ে দিতে গিয়ে সাইকেল নিয়ে নর্দমায় গড়াগড়ি খাচ্ছিল | যাক সবাই আমার বিষয়টা নিয়ে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল, সাথে সাথে একজন বন্ধু ও বান্ধবী আমাকে টেনে তুলে বুঝিয়ে দিল পায়ের পাতা বাঁকা করে মানে কচ্ছপের ন্যায় সামনের দিকে হেটে যেতে হবে, তারপর লিফট পেছনের দিকে ঝুলে ঝুলে একটা বসার চেয়ার চলে আসতেই আমাকে হুট করে বসে যেতেই লিফট আমাকে টেনে পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যাবে | খুব কসরত করেই প্রথম কাজটা শেষ করে নিলাম, পাশেই আমার বান্ধবী থাকাতে সুবিধা হলো বেশী কারণ তাকে অনুকরণ করেই আমি জীবনের প্রথম সুইডেনের ইদ্রে ফিয়েলে উঠে যাচ্ছি, লিফট যতই আমাদের উপরের টেনে টেনে তুলছে মনে হচ্ছে শীতের এই তুষারে আচ্ছাদিত পাহাড়ের চূড়া আমাকে আরও ওপরে ওঠার জন্যে হাত ছানি দিচ্ছে. পৃথিবীটা যেন শুধুই তুষারের সাদা চাদরে ঢাকা, উজ্জ্বল সূর্য পাহাড়ের গায়ে স্বর্ণালী আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে , এরকম প্রকৃতি মনে হয় এখানেই দেখা যায়, এই দেশের মানুষগুলো হয়তো তাই এই স্বর্ণালী স্বচ্ছ আলোর মতই সুন্দর আর তাদের মনটাও কাঁচের মত পরিষ্কার যেন এপাশ থকে ওপাশ দেখা যায়, কোথাও কোনও আবর্জনা আর ময়লার রেশ মাত্র নেই | লিফট পাহাড়ের মাঝা মাঝি আসতেই বাতাসের গতিও শনশন শব্দে তার শক্তি তো তীব্রতা জানান দিচ্ছে , বান্ধবী আমাকে এবার বলে দিচ্ছে কি করে লিফট থেকে নামতে হবে, লিফটে উঠে পরেছি ঠিকই কিন্তু নামতে হলে যে এক ভিন্ন কসরত ততো আমার জানা নাই, লিফট টা পাহাড়ের শেষ প্রান্তে আসতেই পাহাড়ের কাছাকাছি চলে আসবে সমতল জায়গার কাছে আসতেই আমাদেরকে লিফট থেকে দাড়িয়ে পরতে হবে আর ঠিক তক্ষনি মাটিতে পা লেগে গেলেই লিফটের চেয়ার আমার মাজার নীচের অংশে খানিক ধাক্কা দিয়ে সামনের দিকে ঠেলে দিল | বাহ কাজটা যে এত সহজেই হয়ে যাবে ভাবতে পারিনি | আমাদের আগে আরও দুজন এসে গেছে যারা আমাদের অপেক্ষায় দাড়িয়ে আছে, তারা দুজনাতেই আমার বন্ধু আর বান্ধবী, তবে প্রেমিক ও প্রেমিকা, এসব দেশে বন্ধু হলেই যে প্রেমিক আর বান্ধবী হবার মানেই প্রেমিকা তা ঠিক নয়, বন্ধুত্বের বন্ধন ছেলে মেয়েদের মাঝে শুধুই বন্ধুত্বের সম্পর্ক, প্রেমিক প্রেমিকা যা কিনা নির্ভর করে একের প্রতি অপরের যে আকর্ষণ তার ওপর | ভালোবাসাটার তিনটা স্তর, মানে আমি যেটা আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি সেটা অনেকটা পছন্দ করা এরপর ভালোলাগা তারপর ভালবাসা, খুবই পরিষ্কার ব্যাখ্যা হয়তো দেয়া গেলনা তবে ইউরোপে ছেলে মেয়েদের অবাধ মেলামেশাতে বাধা না থাকলেও ভালোবাসাটা সম্পূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক বিষয় তাই এদের ভালবাসায় সততা থাকে আর থাকে একের প্রতি অপরের বিশ্বাস এই সততা আর বিশ্বাস না থাকলে ভালবাসা নিরর্থক | কিছুটা দুরে দাড়িয়ে তারা একে অপরের সাথে আলিঙ্গন বদ্ধ হয়ে আকাশের পাহাড়ের এই সুন্দরের মাঝে নিজেদের একে অপরকে যেন বিলিয়ে দিচ্ছে, খানিক দূর থেকে আমাদের দেখেই বলে উঠলো তোমাদের অপেক্ষাতেই দাড়িয়ে আছি, কাছে এসে আমাকে বুঝিয়ে দিল কি করে হাটুকে ভাজ করে একটু উপুড় হয়ে একবার ডানে আবার একটু দাড়িয়ে দ্রুত বামে ঘুরে গিয়ে পাহাড়ের গা ঘেঁষে ঘেঁষে তুষার কাটতে কাটতে নীচের দিকে নামতে হবে, প্রথম দিকে ডান থেকে বয়ে ঘুরতে গিয়েই আমি আছাড় খেয়ে পড়ে গিয়ে অন্তত বিশ থেকে পঁচিশ মিটার গড়িয়ে পরলাম, মাথায় মোটা টুপি, চোখে ডুবুরীদের মত চশমা সব কিছু ছিটকে পড়ে গেল ভার বা গীতি নিয়ন্ত্রণে হাতের লাঠি দুটো খুঁজে পেলেই হয় | তুষারের মাঝে গড়াগড়ি দিয়ে নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তে পড়তে গায়ে সাম্মানতম আঘাত বা ব্যথা লাগলো না, আমি আবার উঠে দাড়িয়ে মনে মনে স্থির করলাম একবার না হয় রমিতাকে চিঠি ছুড়ে দিতে গিয়ে নর্দমায় পরেছিলাম, কিন্তু এই তুষার ঘেরা পাহাড়ের চূড়ায় আমার প্রেম হোক বা নাই হোক আমি আবার উঠে দাঁড়াব | এভাবেই পাহাড়ের গায়ে আঘাত প্রতিঘাতের মাঝেই আমার স্কিং করা শেখা হলে গেল খুব অল্প সময়ের মাঝেই | এভাবেই কিছুক্ষণ স্কি করার পর সবাই পাহাড়ের এক প্রান্তে এসে পায়ে লাগানো বোর্ড তুষারের মাঝে গেঁথে নিয়ে হেলান দিয়ে সূর্যের দিকে মুখ করে সারিবদ্ধ ভাবে বসে গেলাম | পিঠের ব্যাগে থাকা ফ্লাক্সের গরম চকলেট দুধ আর মিষ্টি রুটি খেয়ে দুপুরের ক্ষুদা নিবারণ ও কিছুক্ষণ বিশ্রামের কাজটা সেরে নিছি, ভাবছি পৃথিবীটা এতটা মনোরম এতটাই সুন্দর এই আলো বাতাস পাহাড় পর্বত তুষার সবুজ সব কিছুকে আমরা নিমিষেই ধংশ করে দিতে চাই প্রকৃতিকে ভালবাসতে না জানলে আমরা কি একটি সুন্দর বন রক্ষা করতে পারব, আমাদের তো আরও একটা সুন্দর বন তৈরি করার ক্ষমতা নাই তবে কেনই বা আমার এক প্রকৃতির উপর ধংশের কয়লা পুড়িয়ে সুন্দরকে শেষ করে দেব |
/// মাহবুব আরিফ কিন্তু

glqxz9283 sfy39587p07