Skip to content

আবদুর রাজ্জাক, এই সময়ের জ্ঞানতাপস – হুমায়ুন আজাদ সাক্ষাৎকার

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি


আমাদের দেশটি ছোটো, আর এর মানুষরাও বেশ ক্ষুদ্র। প্রথাগত ভুয়োদর্শন আমাদের উপদেশ দেয় বেশি না বাড়ার, বেশি উঁচু না হওয়ার। বেশি বৃদ্ধি পেলে ক্রুদ্ধ ঝড়ে ভেঙে পড়ার ভয় আছে। আমাদের প্রকৃতি ও মানুষ যেনো এ-ভয়ে আতংকিত; তাই অভাব এখানে আকাশ-ছোঁয়া বৃক্ষের, দুর্লভ এখানে মহৎ ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব। মাঝারি, নিম্নমাঝারি ও নিম্ন আকারের ব্যক্তি ও বৃক্ষে পূর্ণ আমাদের লোকালয় ও অরণ্য।

কাউকে পাওয়া খুব কঠিন পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলে, যিনি আয় করেছেন মহত্ত্ব, অর্জনে বা ত্যাগে হয়ে উঠেছেন অসাধারণ, এক রকম বিস্ময় ও কিংবদন্তি। জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক আমাদের এই সময়ের সে-অনন্য পুরুষ, যাঁকে ঘিরে কয়েকদশক ধ’রে জড়ো হয়েছে নানা রহস্য; পরিণত হয়েছেন যিনি জীবিত উপকথা বা কিংবদন্তিতে। ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর বহুমুখি পাণ্ডিত্যের নানা গল্প, জীবনের অসংখ্য উপাখ্যান। শারীরিক সৌন্দর্যে দেবতুল্য নন তিনি যে তাঁকে দেখেই দর্শক ভক্ত হয়ে উঠবে; বাগ্মীও নন তিনি যে শ্রোতা তাঁর বাণী আস্বাদ ক’রে স্পর্শ পাবে অমৃতের। মোটা মোটা বই লিখেননি অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, অলংকৃত করেননি জ্যোতির্ময় বিভিন্ন আসন; এমনকি নিজের নামের সঙ্গে তিন অক্ষরের একটি উপাধিও যুক্ত করেননি তিনি। তবু তিনিই হয়ে উঠেছেন আমাদের সাম্প্রতিক জ্ঞানজগতের কিংবদন্তি। এর মূলে আছে সম্ভবত দুটি সহজ কিন্তু অসাধারণ কারণ : প্রাচীন ঋষিদের মতো তিনি নিজের দীর্ঘ ও সমগ্র জীবন ব্যয় করেছেন জ্ঞান আহরণে, এবং ঋষিদের মতোই তিনি অবলীলায় অবহেলা ক’রে গেছেন পার্থিব সাফল্য। জ্ঞানের জন্যে এমন তপস্যা-জীবন, সংসার, সাফল্যের কথা ভুলে - এখন দুর্লভ ব্যাপার; আর তাই রূপ লাভ করতে দেখি জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের মধ্যে। শুধুই জ্ঞানের জন্যে সব ত্যাগ ক’রে তিনি হয়ে উঠেছেন এই সময়ের জ্ঞানতাপস।

ছোটখাটো মানুষ অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক। তাঁর ক্ষীণ কাঠামোতে সত্তর বছর ধ’রেই বেশি মেদমাংস জমতে পারেনি। মুখে একগুচ্ছ দাড়ি, চশমার ভেতরে দীপ্ত দু’টি চোখ। কম দামের পাজামাপাঞ্জাবিচাদর পড়েন। চাদরটা কখনো ঝুলতে থাকে গলায়, কখনো জড়ানো থাকে শরীরে। রাস্তায় হাঁটার সময় বাঁ হাতে অনেকটা নিজেকে জড়িয়ে ধ’রে হাঁটেন। বসার সময় গুটিয়ে নেন নিজেকে, যেনো লুপ্ত হয়ে যাবেন আসনের অভ্যন্তরে। হাত দিয়ে যখন কিছু ধরেন, তখন মনে হয় জিনিসটি বোধহয় এখনি গড়িয়ে পড়বে হাত থেকে। ওই হাত যেনো কিছুই ধ’রে রাখতে জানে না।

তাঁর সঙ্গে প্রত্যেক সন্ধ্যায় আমার দেখা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে। দাবা খেলতে ভালোবাসেন তিনি। এটা তাঁর দ্বিতীয় নেশা। পৌনে ছটার দিকে ক্লাবে এসে খেলার সাথী কেউ না থাকলে চুপ ক’রে ব’সে থাকেন নির্দিষ্ট আসনটির এক কোণায়। সাথী এলেই খেলা শুরু হয়ে যায়। তাঁর দাবা খেলায়ই ধরা পড়ে তাঁর চরিত্রের তিনটি বড় বৈশিষ্ট্য। দাবাড়ুরা সাধারণত একটু অহমিকাসম্পন্ন হ’য়ে থাকে – তারা একটি জিনিশ খুবই ঘেন্না করে, তা হলো হারা। খুবই পছন্দ করে তারা জিততে। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক একের পর এক খেলে যেতে থাকেন, চাল ফেরত দিতে থাকেন বিপক্ষকে; কিন্তু জিতে উল্লাস আর হেরে বিষাদ বোধ করেন না কখনো। তাঁর সারাটি জীবনেও ঘটেছে তাই। জীবনের ইঁদুর দৌড়ে তিনি অংশ নেন নি, কখনো অধিকারের বিজয়ের বাসনায় কেঁপে ওঠেননি তিনি। পরাভুত হ’য়ে বিপর্যস্ত বোধ করেননি কখনো। দাবা খেলার সময় তিনি বিপক্ষের ঘুঁটি একটি একটি ক’রে খান, আর পাশের টেবিলে না জমিয়ে জমাতে থাকেন নিজের বাঁ মুঠোতে। এক সময় মুঠোতে ঘুঁটি জ’মে জ’মে উপচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে প’ড়ে যায় চারদিকে। ধ’রে রাখার অভ্যাস নেই তাঁর। জীবনকেও তিনি এমনভাবেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়েছেন সত্তর বছর ধ’রে। দাবা খেলেন তিনি মোটামুটি – অধিকাংশ চালই সাধারণ; কিন্তু মাঝে মাঝে তিনি দিতে থাকেন অনুপ্রাণিত চাল আর শিউরে ওঠে দর্শকেরা, কেননা অমন চালের কথা কেউ ভাবেনি। ওই অনুপ্রাণিত দূরদর্শী চালগুলোর মধ্যেই আছেন অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক। জ্ঞানজগতের বিভিন্ন সমস্যা ও বিষয় সম্পর্কেও তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ বেশ সাধারণ। কিন্তু হঠাৎ আলোর ঝলক লেগে কখনো কখনো আলোকিত হয় তাঁর অন্তর্লোক, তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে আসে অনুপ্রাণিত অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ। ওই জ্যোতিটুকুই তো তিনি। তাঁর আরো একটি বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে দাবার চালেই : তিনি কারও পরামর্শ মতো চাল দেননা তা যতো অসাধারণ চালই হোক, তিনি নিজের বোধে নির্দ্বিধায় দেন খুবই ভুল চাল, এবং হেরে গিয়ে অনুতাপ করেননা। জীবনেও আবদুর রাজ্জাক তেমনি। একটা কোমল অথচ অত্যন্ত শক্ত গোঁ রয়েছে তাঁর ভেতর, যা তাঁকে চালিয়েছে সারা জীবন।

…কথা বলতে বলতে হেসে উঠেন; শব্দ শুনে মনে হয় তাঁর ভেতর খলখল ক’রে উঠছে নিষ্পাপ একটি শিশু। সারা মুখে চোখে ছড়িয়ে পড়ছে সারল্যের দ্যুতি। কথা বলেন ভরাট স্বরে। কখনোই বিশুদ্ধ চলতি বাঙলা বলেননা। আঞ্চলিক, চলতি বাঙলা ও ইংরেজী মিশিয়ে কথা বলতে থাকেন...আটপৌরে কথা বলেন ঢাকার আঞ্চলিক ভাষায়...

...বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটি পুরোনো বাংলোবাড়ির একতলায় বাস করেন তিনি। বাড়িটি তৈরী করা হয়েছিলো ১৯০৬ সালে বাঙলা ও আসামের একাউন্টেন্ট জেনারেলের বাসগৃহ হিসেবে। একটি বিশাল কক্ষে তিনি একলা থাকেন – চিরকুমার ও অবিবাহিত এ-বয়স্ক জ্ঞানতাপস বিশাল কক্ষটিতে নিঃসঙ্গ ঋষির জীবনযাপন ক’রে যাচ্ছেন বিশশতকের দ্বিতীয়ার্ধে। দিনের বেলা কক্ষটিতে ছড়িয়ে থাকে কিছুটা আলো আর অনেকটা অন্ধকার। কক্ষটির দক্ষিণ দিকে একটি বিরাট পড়ার টেবিল, বসার জন্য রয়েছে আরামদায়ক চেয়ার। কক্ষের এদিকে সেদিকে শুধু বই – সাহিত্য, অর্থনীতি, শিল্পকলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, ইতিহাস, দাবা ও আরো অজস্র বিষয়ের বই। বইগুলোর মধ্যে খুবই স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে বিশ্বকোষগুলো...

...একদিন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে। আমি তাঁর বাসায় প্রবেশ করি। তাঁর ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়াই, বাইরের উজ্জ্বল আলোর সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা ঘরটিতে। উঁচু সিলিংয়ের বিশাল ঘর ভ’রে ছড়িয়ে আছে অন্ধকার। অন্ধকার টেবিল, তাকে এখানে সেখানে দাঁড়ানো এলানো ছড়ানো বইগুলোকে ছায়ামূর্তির মতো মনে হলো...এ-বাড়িতে কোনো শিশুর কোলাহল নেই, যদিও শিশুদের তিনি খুব ভালোবাসেন। কোনো নারীর স্পর্শ নেই, চুলের ঘ্রাণ নেই...ছোটো চৌকিটিতে আরো ছোটো হয়ে ঘুমিয়ে আছেন তিনি। জাগরণে কিছু অধিকার করতে চাননি কখনো তিনি, নিদ্রার মধ্যেও কোনো অধিকার বিস্তার করেননি...


...অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের মতো মানুষদেরই বোধহয় পুরোনো কালে জাতিস্মর বলা হতো। বাল্যকাল থেকেই সব দেখে এসেছেন দু-চোখ খুলে, আর স্মৃতিতে তা জমে আছে অমলভাবে। তবে তিনিও জানেন স্মৃতি বড়ো প্রতারক। জ্ঞান অর্জন করেছেন তিনি দুটি উপায়ে; - নিরপেক্ষ নিস্পৃহ দর্শক হিসেবে, আর পুস্তক পাঠ ক’রে...উৎসাহ তাঁর সব কিছুতে; মানববিষয়ক সব কিছুতেই তাঁর উৎসাহ, তাই জ্ঞানের যে-সমস্ত শাখা মানবকেন্দ্রিক, তার সবই আয়ত্তের সাধনা করেছেন তিনি...

...অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক জন্মেছিলেন আজ থেকে প্রায় সত্তর বছর আগে। ১৯১৪ সালে। জন্মের তারিখ জানেন না তিনি...

...ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবন শুরু হ’তে-না-হ’তেই একজন তাঁকে ঢুকিয়ে দিয়েছিলো জ্ঞানের জগতে। একদিন তিনি পাঠাগারের বইয়ের আলমারিগুলোর কাছে ঘুরঘুর করছিলেন। যেখানে সারিসারি বইভরা আলমারি সেখানে ঢোকার অধিকার ছিলো না ছাত্রদের। তিনি তাকিয়ে দেখছিলেন বইয়ের আলমারিগুলো। বুড়ো লোকটি, যে ভেতর থেকে বই এনে দিতো, সে জ্ঞানার্থী আবদুর রাজ্জাকের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকায়।
কী চাও? তাঁকে জিজ্ঞেস করে বুড়ো লোকটি।
বই পড়তে চাই। উত্তর দেন তরুণ ছাত্র আবদুর রাজ্জাক।
ভিতরে ঢুইক্কা বই দেখতে চাও? বেশ দয়ালু কণ্ঠে জানতে চায় বুড়ো।
হ, ঢুকতে দিলে তো ভিতরে যাই। উত্তর দেন আবদুর রাজ্জাক।
বুড়ো লোকটি তাঁকে নিয়ে যান ভেতরে, যেখানে শুধু বই আর বই...


হুমায়ুন আজাদ – আপনি কি মনে করেন উপাচার্য হওয়ার জন্য পণ্ডিত হওয়া দরকার?
আবদুর রাজ্জাক – না, একেবারেই না। উপাচার্য পদটা তো বুড়ো বয়সে পাণ্ডিত্যের পুরস্কার না। উপাচার্য পদের জন্য দরকার ভালো প্রশাসক, পণ্ডিতের দরকার নাই।

হুমায়ুন আজাদ – ক্লাসে বক্তৃতা দিতে কেমন লাগতো আপনার?
আবদুর রাজ্জাক – খুব খারাপ। ছাত্রদের মুখের দিকে চাইলেই খুব মায়া হতো। মনে হতো আহা, ওদের কোনো কিছুতেই কোনো আগ্রহ নাই। আমার কথায় তো নয়ই। দু-একটি ছাত্র আমাকে জানিয়েছিলো আমি নাকি এক আধটি ছেলের মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বক্তৃতা দিয়ে যেতাম। পুরোনো কলাভবনে আমার ক্লাসের পাশেই ছিলো একটি পুকুর। সেই পুকুরে হাঁস ভাসতো অনেকগুলো। আমি জানলার বাইরে পুকুরের হাঁসগুলোর দিকে তাকিয়ে বক্তৃতা দিয়ে ঘন্টা শেষ করতাম।

হুমায়ুন আজাদ – পাকিস্তান বলতে এখন আমরা ইসলামি পাকিস্তান বুঝি। আপনারাও কি ইসলামি পাকিস্তান চেয়েছিলেন?
আবদুর রাজ্জাক - মোটেই না। পাকিস্তানে ধর্মের বাড়াবাড়ি পরবর্তী ঘটনা। মুহম্মদ আলি জিন্নাহকে ধার্মিক লোক বলা যায় না, ইসলামের জন্য তাঁর বিশেষ মাথাব্যথা ছিলো না। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্টে পাকিস্তানের স্বাধীনতা উৎসব অনুষ্ঠানটি আর ১৫ই আগস্টে ভারতের স্বাধীনতা উৎসব অনুষ্ঠানটি তুলনা করলেই ব্যাপারটা বোঝা যায়। পাকিস্তানের স্বাধীনতা উৎসবের প্রোগ্রামে ধর্মের কোনো নামগন্ধও ছিলো না। মওলানা আকরাম খাঁ, শাব্বির আহমদ ওসমানি, লিয়াকত আলিকে দিয়ে জিন্নাকে অনুরোধ জানান অনুষ্ঠানে কিছু ধর্মকর্ম রাখতে। অনুষ্ঠান শুরু হ’লে দেখা যায় জিন্না সরদার আওরঙ্গজেব খানকে ডাকেন কোরান থেকে কিছু আবৃত্তির জন্যে। আওরঙ্গজেব খান ধর্মের ধার ধারতেন না। তিনি মঞ্চে এসে দু-একটা সুরাকলমা প’ড়েই বিদায় নেন। অন্যদিকে ভারতের স্বাধীনতা অনুষ্ঠান হয়েছিলো সম্পূর্ণরূপে হিন্দুবিধিমতে। পাকিস্তানে ধর্মের বাড়াবাড়ি পাকিস্তান হওয়ার পরের ঘটনা।

১৯৪৫ সালে উচ্চশিক্ষার্থে বিলেত যাত্রা করেন অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক। পড়াশোনা করবেন নিজের খরচে। সম্বল মাত্র সাড়ে চারশো পাউণ্ড। বোম্বে থেকে জাহাজে উঠেন। সৈনিকদের জাহাজ। পাঁচ হাজার সৈন্য আর চারশো যাত্রী নিয়ে উনিশ দিনে জাহাজ বিলেতে পৌঁছোয়। বিলেতে থাকেন পাঁচ বছর নিজের খরচে। মাঝে বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে গ্রন্থাগারবিজ্ঞান পড়ার জন্য আরো সাড়ে চারশো পাউণ্ড দেয়। মোট নশো পাঊণ্ডে, মাসে পনেরো পাউণ্ড ব্যয় ক’রে, পাঁচ বছর কাটিয়ে দেন।

...ডিগ্রী না নিয়ে প্রচুর বই ও প্রচুর অধীত বিদ্যা নিয়ে মালজাহাজে চেপে দেশে ফিরে আসেন আবদুর রাজ্জাক। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দেন। পদোন্নতির জন্যে কখনো দরখাস্ত করেননি, যদিও কয়েকবার তাঁকে পদোন্নতি দেয়ার চেষ্টা করা হয়...

...কোনো উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়িত না করার ঋষিসুলভ ঔদাসীন্য তাঁর স্বভাবগত। থেকে গেছেন চিরকুমার ও অবিবাহিত। কোনো বই লেখার উদ্যোগ নেন নি। পড়েছেন বিপুল, জ্ঞান দান করেছেন ঘনিষ্ঠ ছাত্রদের, যারা তাঁর কাছে এসেছে, বা তিনি খুঁজে বের করেছেন যাদের...

...অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে অনেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনীতিকের মিশ্রণ ব’লে মনে করেন। ১৯৮০র মে মাসে তিনি ‘স্টেট অব দি নেশন’ নামে একটি বক্তৃতা দেন। তাঁর বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন অনেকেই। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্তের বিরোধিতা ক’রে সলিমুল্লাহ খান বাংলাদেশ : জাতীয় অবস্থার চালচিত্র নামে একটি বই’ই রচনা করেন; সম্প্রতি অধ্যাপক মনসুর মুসাও একটি প্রবন্ধে অধ্যাপক রাজ্জাকের বক্তব্যের ত্রুটি ধরেছেন। ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি অনেকেরই আক্রমণের লক্ষ্য, কেননা তাঁরা মনে করেন ওই শব্দটি রাজনৈতিক ও দলীয়, তা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক আলোচনায় ব্যবহৃত হ’তে পারে না...

হুমায়ুন আজাদ – আপনি কি ‘জাতির পিতা’ ধারণায় বিশ্বাস করেন?
আবদুর রাজ্জাক – ‘জাতির পিতা’ ধারণাটি দিয়ে বোঝানো হয়ে থাকে যে একটি লোকের মধ্যেই জাতির আশাআকাঙ্ক্ষা মুর্ত হয়ে ওঠে। একটি জাতির আশাআকাঙ্ক্ষা ও আরো বহু ব্যাপার সংক্ষেপে জড়ো হয় ওই একটি শব্দবন্ধে। ওয়াশিংটনকে যখন বলা হয় আমেরিকার জাতির পিতা, গান্ধিকে ভারতের, জিন্নাকে পাকিস্তানের, তখন শুধু এটাই বোঝানো হয় যে ওই কয়েকজন মানুষ স্বাধীনতা লাভের জন্য বিশেষভাবেই গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানও ওই অর্থে বাঙলাদেশের স্বাধীনতা লাভের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন।

হুমায়ুন আজাদ – শেখ মুজিব যেভাবে দেশ শাসন করছিলেন তাতে কি তাঁর রক্তাক্ত পরিণতি অনিবার্য ছিলো?
আবদুর রাজ্জাক – বিশেষ কোনো পদ্ধতিতে দেশ শাসনের অনিবার্য পরিণতিরূপে হত্যাকাণ্ডকে মেনে নেওয়া যায় না। ব্যাপারটি বোঝার জন্যে জানতে ও বুঝতে হবে হত্যাকারী কারা? কী এমন ঘটেছিলো যাতে তারা এতোটা বিক্ষুদ্ধ হলো যে তাদের হত্যার পথ বেছে নিতে হলো? তিনি কীভাবে দেশ শাসন করতেন সে-ব্যাপারটি এই হত্যার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতিক দর্শন ঠিক কি ভ্রান্ত আমি সে-বিবেচনায় যেতে যাই না, শুধু এটুকুই বুঝতে পারি যে তিনি একটা ব্যাপার বিশেষভাবে স্পষ্ট ক’রে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে সামরিক বাহিনীর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার কিছু নাই। সেনাবাহিনী রাষ্ট্রে যে-গুরুত্ব দাবি করে শেখ মুজিব তাদের তা দিতে রাজী ছিলেন না। তাদের মতে তাদের যথেষ্ট মর্যাদা দেয়া হয় নি। তাদের ক্ষুণ্ণ করার জন্যেই এমন ঘটে।

হুমায়ুন আজাদ – গত এক দশকের বাঙলাদেশি রাজনীতির প্রধান লক্ষণ কী ব’লে আপনার মনে হয়?
আবদুর রাজ্জাক – প্রশ্নটা এতো নির্বিশেষ ভাষায় করা হয়েছে যে উত্তরটাও নির্বিশেষই হবে। এটা ঠিক যে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ – রিকশাওয়ালা, বস্তিবাসীরা শেখ মুজিবুর রহমানের সময় একটু বেশি সোজাভাবে দাঁড়াতো, একটু বেশি শক্তিশালী বোধ করতো। তাঁর পরে যে তারা খুব খারাপ আর্থিক অবস্থায় পড়ে গেছে, বা তাঁর সময়ে যে খুব ভালো আর্থিক অবস্থায় ছিলো, তা না। তবে এটা আমি খুব স্পষ্টভাবেই বুঝি যে এখন বিপুল সংখ্যক মানুষ অনেকটা অসহায় বোধ করে, আগে এমন অসহায় বোধ করতো না। সমাজের যত বেশি সংখ্যক মানুষ বুঝতে পারে যে সমাজে তারাও গুরুত্বপূর্ণ, তারাও সমাজের জন্যে অপরিহার্য, ততোই ভালো। গান্ধি বা জিন্না জনগণের নেতা ছিলেন, জনগণের অংশ ছিলেন না, কিন্তু মুজিবের সময় জনগণ এমন বোধ করতে থাকে যে শেখ মুজিব তাদেরই অংশ। বর্তমানে এ-অবস্থাটা নাই।

হুমায়ুন আজাদ – আমার কাছে বাঙলাদেশের সমাজকে নষ্ট সমাজ ব’লে মনে হয়। আপনার কেমন মনে হয়?
আবদুর রাজ্জাক – আমি এর সঙ্গে একেবারেই একমত নই। বরং আমার কাছে এই এলাকাটিকেই সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল এলাকা ব’লে মনে হয়। বাঙলাদেশে ছোটো থেকে বড় হওয়ার, তুচ্ছ অবস্থা থেকে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার যে-সুযোগ রয়েছে, তা এই উপমহাদেশের আর কোথাও নাই। শুধু উপমহাদেশে কেনো, সারা পৃথিবীতেও নাই।

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক বিশেষ কোনো দার্শনিক বা তাত্ত্বিক ধারার অনুসারী নন। তাঁকে উদার মানবতাবাদী বললে খিলখিল ক’রে হেসে ওঠেন, বুর্জোয়া চিন্তাধারার বললেও তেমনি হাসেন। তিনি জ্ঞানান্বেষী, যে-কোন ধারা থেকে তা আহরণে তিনি উৎসাহী। রাষ্ট্রচিন্তায় তিনি গণতান্ত্রিক। আর্থিক শোষণহীন গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা সম্ভবত তাঁর পছন্দ। বাঙলাদেশের জন্যে কোন ধরনের ব্যবস্থা তাঁর কাম্য, স্পষ্টভাবে তিনি তা জানাতে দ্বিধান্বিত, কেননা তাঁর বিশ্বাস যে-কোনো ব্যবস্থাই কালপরম্পরায় পরিবর্তিত হয়ে যেতে বাধ্য।

হুমায়ুন আজাদ – শ্রেণীহীন সমাজব্যবস্থা আমাদের জন্য কতোটা দরকার?
আবদুর রাজ্জাক – আর্থনীতিক অসাম্য থাকা উচিত না, বেশি অসাম্য থাকা ভয়ংকর। একেবারে থাকবে না, এটাকে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য বলে মনে হয় না। ষাট বছর কেটে যাওয়ার পরেও সোভিয়েট ইউনিয়নে শতকরা দশজন লোক কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য, আর ওই শতকরা দশজন লোকই সব কিছু স্থির ও নিয়ন্ত্রণ করে। এটাতো অসাম্য দূর করার কথা না। আর্থনীতিক অসাম্য দূর হয়েছে, আর বেশি কিছু না। শুধু অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব দিলে সমাজকে তো ঠিকমতো সংজ্ঞায়িত করা হয় না। আমি যদি ব্যক্তি হিশেবে মূল্য না পাই অথচ আমার আয় যদি অন্যের সঙ্গে সমান হয়, তবে তা মূল্যবান না। এটা ঠিকই সোভিয়েট ইউনিয়নে আর্থ অসাম্য দূর হয়েছে। তবে তার জন্যে মূল্য দিতে হয়েছে। সেই মূল্য হচ্ছে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে অবিমিশ্র অসাম্য।

হুমায়ুন আজাদ – বিশ্বব্যাপী এখন রাজনীতিতে মন্দির-মসজিদের প্রত্যাবর্তন ঘটছে। আপনার কি মনে হয় আগামী পঞ্চাশ বছরে সারা গ্রহ ভ’রে বিভিন্ন রকম ধর্মরাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে?
আবদুর রাজ্জাক – ধর্মের মূল কথা হচ্ছে এই জীবন মৃত্যুপরবর্তী এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মহান জীবনের একটি অত্যন্ত গৌণ উপাংশ মাত্র। এ ছাড়া ধর্মের আর কোনো সংজ্ঞা নাই। আমার মনে হয় না যে এমন বিশ্বাসের পুনঃপ্রতিষ্ঠা লাভের কোনো যুক্তিসঙ্গত সম্ভাবনা আছে। এখন মানুষ নানান কথা কয়ে তাকে ধর্ম বলে চালানোর চেষ্টা করছে। ওই বিশ্বাস যে এ-জীবন তাৎপর্যপূর্ণ নয়, পরলোকই সব, এমন বিশ্বাস ফিরে আসে নাই। পাঁচ-ছশো বছর আগে মানুষেরা সত্যিই বিশ্বাস করতো যে এ-জীবন নশ্বর, আসল জীবন প’ড়ে আছে সামনে মৃত্যুর পর। এখন ধর্ম বলতে যা বলা হয় তা আমি বুঝি না।

হুমায়ুন আজাদ – পৃথিবী এখন যারা চালাচ্ছে, তাদের কতোজনকে আপনি উন্মাদ বা অসুস্থ মনে করেন?
আবদুর রাজ্জাক – উন্মাদ কিনা বলতে পারিনা, তবে পৃথিবী যারা চালাচ্ছে, যেমন আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, জাপান প্রভৃতি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানেরা সবাই বুড়ো, অনেকটা বাতিল মানুষ...যারা এখন পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, তাদের কেউ পাঁচ-দশ বছরের বেশি বাঁচবে না। আমার ধারণা পৃথিবীর তরুণেরা তাদের শাসকদের চেয়ে নিজেদের মধ্যে অনেক বেশি মিল দেখতে পায়...বয়স যত বাড়ে মানুষ ততো আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে, অন্যের কথা মনে থাকে না। আর এ-দেশে তো তা ভয়াবহ।

হুমায়ুন আজাদ – তবু পৃথিবীটা তো বুড়োরাই চালাচ্ছে!
আবদুর রাজ্জাক – এই তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো বিপদ।

হুমায়ুন আজাদ – আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে জ্ঞানচর্চার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আপনি কী ধারণা পোষণ করেন?
আবদুর রাজ্জাক – আমাদের সমাজে লেখাপড়া বেড়েছে, শিক্ষায় অনেক অগ্রসর হয়েছি আমরা। কিন্তু জ্ঞানের ক্ষেত্রে আমরা কতোটা কন্ট্রিবিউট করতে পারছি, তা পরিমাপ করার সহজ কোন উপায় নাই। আমরা কেউই এতো পণ্ডিত না যে জ্ঞানের হাজারটা শাখায় কে কী করছে, তার মূল্যায়ন করতে পারি। তবে আন্তর্জাতিক সমতার মানদণ্ড প্রয়োগ ক’রে কিছুটা হিশেব করা যেতে পারে। পৃথিবীর উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রশিক্ষকদের সঙ্গে তুলনা করতে পারি আমাদের ছাত্রশিক্ষকদের। আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই যে আমাদের বিপুল সংখ্যক তরুণ পৃথিবীর প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শ্রেষ্ঠ ছাত্রদের সমতুল্য বা প্রায় সমতুল্য। ’৪৭ এর আগে এমন ছিলো না।

হুমায়ুন আজাদ – আমাদের সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, যেমন বিশ্ববিদ্যালয়, বিচারালয়, বিভিন্ন একাডেমি বিশেষ মহিমা অর্জন করতে পারছে না। এর কী কারণ ব’লে আপনার মনে হয়?
আবদুর রাজ্জাক – ওইসব প্রতিষ্ঠানের মহিমা বা মূল্য কতোটা তা ওই আন্তর্জাতিক সাম্যের মাপকাঠি দিয়েই নির্ণয় করতে হবে। আমি এ-দেশের জাতীয় অধ্যাপক, বিদেশে গিয়ে যদি সহকারী অধ্যাপকও হ’তে না পারি, তবে মহিমা থাকে কোথায়? শিল্পী, কবি, শিক্ষক, সেনাবাহিনী, আমলা সব কিছু মাপার জন্যেই দরকার আন্তর্জাতিক সাম্যের মাপকাঠি। আমার ধারণা ওই প্রতিষ্ঠানগুলো যা ব’লে নিজেদের দাবি করে, কিন্তু তা হয়ে উঠতে পারে নাই ব’লেই এমন অবস্থা।

হুমায়ুন আজাদ – আপনি তো আশাবাদী।
আবদুর রাজ্জাক – আমি জানি না। আমি তথ্য নিই, আর তথ্যভিত্তি ক’রেই সিদ্ধান্তে পৌঁছি।

হুমায়ুন আজাদ – আপনি তো বেশ ঠাণ্ডা মেজাজের মানুষ।
আবদুর রাজ্জাক – সাধারণত। তবে মাঝে মাঝে মেজাজ নষ্ট হয়। কম বয়সে বেশি নষ্ট হতো।

হুমায়ুন আজাদ - প্রথাগত ব্যাপার ও চিন্তার প্রতি কি আপনি শ্রদ্ধাশীল?
আবদুর রাজ্জাক – শুধু প্রথাগত ব’লেই কোনো কিছুকে উড়িয়ে দেয়ার প্রয়োজন বোধ করি না, আবার প্রথাগত ব’লেই মেনে নেয়ার প্রয়োজনও বোধ করি না।

হুমায়ুন আজাদ – আপনি কি প্রথাগত ধর্মে বিশ্বাসী?
আবদুর রাজ্জাক – বিশ্বাস অবিশ্বাসের কথাটা ওঠে না। কারণ ধর্ম সম্পর্কে কথাবার্তা বলার আগ্রহ আমি কখনো বোধ করি নাই।

হুমায়ুন আজাদ – মৃত্যু সম্পর্কে ভাবেন?
আবদুর রাজ্জাক – বিশেষ না। তবে মরতে হবে এই পর্যন্ত নিশ্চিত।

হুমায়ুন আজাদ – জ্ঞানের কোন শাখাগুলো আপনাকে আকর্ষণ করে?
আবদুর রাজ্জাক – মানুষ সম্পর্কে যা তার সবই।

হুমায়ুন আজাদ – শুনেছি বাজার করতে আপনি পছন্দ করেন?
আবদুর রাজ্জাক – খুব। নিয়মিত বাজার করা শুরু করেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার পর। রান্না শিখেছি ছোটবেলায়ই। আমি যে-কোন দেশে গেলেই দুটি জিনিশ দেখি, একটা কাঁচাবাজার, অন্যটা বইয়ের দোকান। আমার মনে হয় কাঁচাবাজার আর বইয়ের দোকান সম্ভবত সমাজের অবস্থার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট নির্দেশক। যে-দেশে বইয়ের দোকান নাই সে-দেশে লেখাপড়া খুব হয় তা বিশ্বাস করি না। কাঁচাবাজার দেখলেই বোঝা যায় দেশের অবস্থা কেমন। বইয়ের দোকানে গিয়ে কী ধরনের বই পাওয়া যায়, কেমন বিক্রি হয়, তা দেখেই দেশের জ্ঞানচর্চার অবস্থা বোঝা যায়। একবার তুরস্কে গিয়েছিলাম। সেখানে বইয়ের দোকানে শতকরা ত্রিশপঁয়ত্রিশটা বই কম্যুনিজম সম্পর্কে, শতকরা ত্রিশপঁয়ত্রিশটা বই ইসলাম সম্পর্কে। সুতরাং ওই দেশে যে টেনশন থাকবে তা বোঝার জন্য হাফেজ হওয়ার দরকার নাই।

হুমায়ুন আজাদ – আপনি যাঁদের সংস্পর্শে এসেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্তত দুজনের নাম বলবেন, যাঁদের আপনি অসাধারণ ব’লে গণ্য করেন?
আবদুর রাজ্জাক – জয়নুল আবেদীন, জসীমউদ্দীন। অসাধারণ বলতে সাধারণত যা বোঝা হয় তার থেকে খুবই ভিন্ন রকম এঁরা। জসীমউদ্দিন যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন, তখন নানাজন খুবই বিরক্ত করেছে তাঁকে। আমি বলতাম আমরা ম’রে গেলে কেউ নামও নেবে না, জসীমউদ্দীনের নাম অনেক বছর থাকবে।

হুমায়ুন আজাদ – সৃষ্টিশীল ও পণ্ডিতদের মধ্যে কোন শ্রেণীটিকে আপনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?
আবদুর রাজ্জাক – গুরুত্বপূর্ণ তো নিঃসন্দেহে সৃষ্টিশীল মানুষ, তবে মানুষ হিসেবে তাঁরা এমন যে তাঁদের সঙ্গে বাস করা খুবই কঠিন। আমরা শিক্ষকেরা তো পাণিনিও না, পাণিনির টীকাকার মাত্র।

হুমায়ুন আজাদ – আপনি কোন বই লিখলেন না কেনো?
আবদুর রাজ্জাক – আলস্যবশত। হয়তো বা জেনেছি, তাও খুবই অকিঞ্চিৎকর। তবে এটা প্রতারণাও হ’তে পারে।

হুমায়ুন আজাদ – আপনার যা চরিত্র তাতে তো আপনার হওয়া উচিত ছিলো একজন সুখী আর সংসারী ব্যক্তি।
আবদুর রাজ্জাক – আমি সুখী আর সংসারী দুই-ই তো।

হুমায়ুন আজাদ – আপনি আর কতো বছর বাঁচবেন বলে আশা করেন?
আবদুর রাজ্জাক – আমি যে-কোন মুহূর্তে বিদায়ের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। কোনো দুঃখ নাই। কতো বছর বাঁচবো, তা ভাবি না। জীবনমৃত্যু সম্পর্কে আমি বেশি ভাবি না। আমি অনেক বেঁচেছি, সত্তর বছর। নিজের হাতে জীবন নেবো, এই কথা কখনো ভাবি নাই, যে-কোনো মূহূর্তে মারা গেলে দুঃখ নাই। অনেক তো বেঁচেছি।

...দিনরাত্রির রহস্যজড়ানো একটি বড় ঘরে ব’সে আছি আমরা দুজন; একজন বলেন, ‘অনেক বেঁচেছি।’ আরেকজন মনে মনে বলে, ‘আমি আরও বাঁচতে চাই।’ একজন অনেক জেনেছেন, তার মৃত্যুর কোনো ভয় নেই। অন্যজন জানে নি কিছুই, কিন্তু মৃত্যুর ভয়ে সারাক্ষণ আতংকিত...
...আমার মুখোমুখি এখন এক কিংবদন্তী; জ্ঞানের ও ঔদাসীন্যের, কিন্তু আলোআঁধার জড়ানো সন্ধ্যায় আমার চোখ দেখতে পাচ্ছে একজন মানুষকে, যাঁর পোশাক, বসার ভঙ্গি, উচ্চহাসি আর দশজনের মতোই সহজ সরল সাধারণ।
এ সাধারণত্বকেই তো অসাধারণ ক’রে তুলেছেন নিজের জীবনে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক – একালের জ্ঞানতাপস – শুধু জ্ঞানের জন্যে জীবনকে অবহেলা ক’রে।

জ্ঞানের কাছে জীবন পরাভুত হ’লে জন্ম নেন একজন অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক।

আবদুর রাজ্জাক, এই সময়ের জ্ঞানতাপস – হুমায়ুন আজাদ সাক্ষাৎকার
২ ডিসেম্বর ১৯৮৪, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৩৯১

ডিসক্লেইমারঃ পূর্বে নানান মিডিয়ায় প্রকাশিত। পাঠকদের উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দেয়ার জন্যই আবার সংগ্রহ করে দেয়া হলো।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

ধন্যবাদ শেয়ার করার জন্য।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

আপনাকেও ধন্যবাদ।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

ধন্যবাদ , সোজা প্রিয়তে

attorney


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

পড়লাম। ধন্যবাদ। এখানে কি স্বাক্ষাতকারের পুরাটা এসেছে নাকি সিলেক্টিভ কিছু প্রশ্ন আর উত্তর। ভালো মানের কোন অনলাইন রেফারেন্স দিতে পারবেন ?

___________
জয় বাংলা,জয় বঙ্গবন্ধু


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
নিচের লিঙ্কে দেখ্তে পারেন।
লিঙ্ক

glqxz9283 sfy39587p07