Home » আলোচনা

আমরা লিখি

লিখেছেন: পলাশ দত্ত

শনি, ১১/১০/০৮ – ২:৪৪ অপরাহ্ন6 টি মন্তব্য

[এটা আসলে নিজের কাছে নিজে ধরা দেয়ার মতো একটি লেখা।
নেত্রকোণা সাহিত্য সমাজ একটা পুরস্কার দেয় খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার নামে। চলতি বছর পুরস্কারটি পেয়েছেন কবি আবু হাসান শাহরিয়ার। পুরস্কার দেয়া উপলক্ষে ফাল্গুনের প্রথম দু’দিন (ইংরেজি ফেব্রুয়ারি মাসে) বসন্তকালীন সাহিত্য উৎসবের আয়োজন করা হয় নেত্রকোণায়। চলতি বছর সাহিত্য উৎসবটিতে কবিতা বিষয়ে কিছু কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেই কথাগুলোই এই লেখা।]

বাংলা কবিতা এখন মরা। বাংলা কবিতা পুরনো হয়ে গেছে।
কবিতার প্রাণ তার ভাষা। এই ভাষাই আজ মরা।
ভাষা তো সবসময়ই একেকটি মৃত্যুর ভেতর দিয়ে একেকটি জন্মের দিকে এগোয়। একলা ভাষার বাঁচা-মরা এইভাবে স্বয়ংক্রিয়তার ওপর ছেড়ে দেয়া যায়। কিন্তু কবিতার ভাষা?
কবিতার ভাষাকে আওয়াজ দিয়ে বাঁচাতে হয়। কবিতার ভাষা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মরতে-মরতে বাঁচার দিকে এগোয় না। কবি/কবিরা ঘোষণা দিয়ে ভাষাকে মরণের হাত থেকে উদ্ধার করেন। বাংলাদেশেও ভাষার এখন দুর্দিন চলছে।
কার ভাষা? কবির ভাষা।
সেই কবি কেনো লেখেন? লিখতে গিয়ে কবিতাকে কী চেহারায় দ্যাখেন তিনি?
*
কেনো লেখেন? প্রশ্নটি মানুষের লেখালেখির সমান বয়সী। কবিতার সমনা বয়সী। লেখার সময় ক’জন জানেন যে তিনি কেনো লিখছেন?
*
লেখার সপক্ষে নানা লোকের নানা যুক্তি। কবি অমিয় চক্রবর্তী বলেছিলেন, “কেন লিখেছি?Ñ এর সম্পূর্ণ উত্তর তাই কোনো লেখকই দিতে পারেন বলে জানি না।” এইখানে তার ‘সম্পূর্ণ’ শব্দটা একটু লক্ষ্যণীয়। তার এই শব্দটির মানে হতে পারে এই যে কেনো লিখির কিছুটা কারণ অন্তত লেখকরা জানাতে পারেন। কিন্তু ঘটনা কি আসলে তাই ঘটে? আমরা তো দেখেছি যে কেনো লিখির উত্তর দিতে গিয়ে লেখকরা সাধারণত তারা কিভাবে লিখে ফেলেন সেই কথাই ব’লে থাকেন।
কেনো লিখবো? এর উত্তর আজ খুব জরুরি। অমিয় চক্রবর্তী বলেছেন বটে “সাহিত্যসৃষ্টির মধ্যেও প্রাণের অপরিমেয় রহস্য নিহিত আছে”; তবু এইটুকু সংকেতে আজ আমি মুক্তি পাচ্ছি না। ‘লেখা’ বিষয়টি যদি আমাদের জন্য সহজাত স্বভাবের বা প্রবণতার অংশ হয় তাহলেও জানতে হবে আমি কেনো লিখি, আমি কেনো লিখবো। লিখে যে সামান্য-অসামান্য স্বাভাবিক তৃপ্তিটুকু পাওয়া যায় সেই তৃপ্তিটুকু পাওয়ার জন্যই লিখি? তাহলে লেখায় যে কিছু বলতে চাই সেটা কেনো? আর কাকেই-বা বলতে চাই? তার মানে কি এই যে আমরা লেখালেখি দিয়ে কিছু একটা করতে চাই? লেখালেখি দিয়ে কিছু হয় নাকি? কিছু করা যায় নাকি লেখালেখি দিয়ে? যদি-বা ধরেও নিই যে কিছু করা যায়Ñ মানুষকে আনন্দ দেয়া যায়, মানুষকে ভাবানো যায়, মানুষকে সচকিত করা যায়, মানুষকে মননে আর একটু এগিয়ে দেয়া যায়, মানুষকে স্বস্তি দেয়া যায়Ñ তাতেও-বা কী? শুধু এই কারণেও কি লেখালেখি চালিয়ে নেয়া যায়?
*
এ-কথা আমি বিশ্বাস করি যে কবিতা মানুষের সুখ-দুঃখ-আনন্দ-কষ্টে বেঁচে থাকার সহযোগ হতে পারে। মানুষের এই মহান উপকারটুকু করার জন্যই কি লিখবো? এই লেখালেখি আমাদের কী দেবে? মরার পরও মানুষ আমাদের কবিতা পড়েব, পড়ে সহযোগ পাবে; ফলত এই নশ্বর পৃথিবীতে আমরা কিঞ্চিৎ অমর হয়ে উঠবোÑ এই দুষ্টলোভে লিখবো? তা যদি না-ও হয়, এই জীবতকালে মানুষ কবিতা পড়ে কবি বলবে, খ্যাতি পাবো, কপাল ভালো হলে জীবিকার খানিকটা বা পুরোটাই অর্জন কার যাবে লিখেÑ এই সম্ভাবনার হাতছানি মনে জেনে লিখবো?
আমাদের যে প্রতিদিনের বেঁচে থাকা সেইখানে লেখালেখির জায়গা কোথায়? আমাদের প্রতিদিনের বেঁচে থাকায় কিভাবে সাহায্য করে লেখালেখি? এখানে হয়তো আপনি বলবেন একক ব্যক্তির কল্যাণ করা লেখালেখির মহৎ উদ্দেশ্যের মধ্যে পড়ে না। হয়তো প্রশ্ন করবেন পৃথিবীল কোন্ জিনিসটিই-বা কোনো একক ব্যক্তির কল্যাণ করার কথা ভাবে? একক কল্যাণের উদ্দেশ্যে এই পৃথিবীতে কিছুই তো করা হয় না। এই কথাগুলি ঠিক।
পৃথিবীতে মানুষ একাএকা নিজের মতো বাঁচে। তাকে ওইভাবে একাএকাই নিজের মতো করে বাঁচতে হয়। এই বেঁচে থাকার পথে সে আরো কিছু সঙ্গীকে জুটিয়ে নেয়। জুটিয়ে নিয়ে তারা পারস্পরিক সহযোগিতায় বাঁচতে থাকে জীবনে। কিন্তু ওই যে সামান্য ক’জন মানুষকে সে জুটিয়ে নিলো তারা তো তার উপকারে এলো, তারা তো তাকে সাাহয্য করলো জীবনে বেঁচে থাকতে। কবিতাও কি তেমনই সাহায্য করে জীবনে বেঁচে থাকতে?
*
কবিতা আমাদের কিভাবে সাহায্য করে? সরল করে বললে কারো কারো কবিতা আমাদের অভূতপূর্ব একটা জগতের সন্ধান দেয়। সেই অভূতপূর্ব জগত প্রত্যক্ষ করার আনন্দে-স্বাদের আমরা সেই কবিতাটিতে আনন্দের সন্ধান পাই, সেই কবিকে আমরা ভালোবেসে ফেলি। এখানে মূল বিষয়টি হচ্ছে অভূতপূর্ব জগত। যে-জগত অভূতপূর্ব সেই জগতটি আমরা দেখি। অর্থাৎ এই যাপিত জীবন থেকে একরকমের পালিয়ে যাই আমরা ওই অভূতপূর্ব জগতে। বিষয়টা হচ্ছে সংক্ষুব্ধ জগত থেকে পলায়নের মাধ্যমে এক স্বস্তির সন্ধান আমাদের দেয় কবিতা; অন্তত দেয়ার চেষ্টা করে। তাহলে মানুষকে এই পালানোর স্বস্তি দেয়ার জন্যই কি লিখবো? না-হয় বুঝলাম মানুষকে পালানোর সুযোগ করে দেয়ার জন্য কবিতা লিখবো। কিন্তু আমাদের কী দেবে কবিতা? কবিতার কি দায় নেই আমাদের কিছু দেয়ার?
*
আমার জীবনে ভালোবাসার কোনো-কোনো মানুষকে হারানোর, ভালোবাসার কোনো-কোনো মানুষকে হত্যার বেদনা মিশে আছে। তাদের হত্যার, তাদের হারানোর বেদনা আমাকে কুড়ে কুড়ে খায়। সেই বেদনা আমার ব্যক্তিগত। সেই হত্যাকাহিনি আমি কাউকে বলতে পারি না। সেই হত্যাকাহিনি কবিতার পঙক্তি হয়ে বেরিয়ে আসতে চায়। আমার ব্যক্তিগত সেই হত্যাযজ্ঞ কেনো হবে কবিতা? কী করে হবে? কেনো আমি আরো মানুষকে পড়তে দেবো সেই রক্তমাখা কান্না? কেনোই-বা মানুষ পড়বে তা?
ওইগুলি আসলে পাঠকের কবিতা নয়! কারণ পাঠকের জন্য যা লেখা হয় তা একধরনের শিল্প! ওইসব লেখায় শিল্পসৃষ্টির অজ্ঞাত এক গূঢ় আস্বাদ লুকিয়ে থাকে! তাহলে আমি কেনো লিখবো?
*
এখানে লেখার কারণ সম্পর্কে দুই কবির দুটি বক্তব্য উল্লেখ করতে চাই।
একজনের নাম জীবনানন্দ দাশ। তার কথা হচ্ছে সৎ কবিতা খোলাখুলিভাবে নয় কিন্তু নিজের স্বচ্ছন্দ সমগ্রতার উৎকর্ষে শোষিত মানবজীবনের কবিতা, সেই জীবনের বিপ্লবের ও তৎপরবর্তী শ্রেষ্ঠতর সময়ের কবিতা।
আরেকজন হচ্ছেন অমিয় চক্রবর্তী। তিনি দ্যাখেন কবিতায় তিনি যে-উপমা ব্যবহার করেন শেষ পর্যন্ত তার মানে গেছে বদলে, যে-উদ্দেশ্য নিয়ে লিখছেন তারও গভীরে তার সমস্ত জীবনের উদ্দেশ্য, বা তার কালের উদ্দেশ্য, দেশ বা জাতির উদ্দেশ্য ধরা পড়ে গেছে।
এই দুজনের কথাকে মিলিয়ে নিলে লেখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে খানিকটা স্পষ্ট হওয়া যায়। একজন বলছেন সৎ কবিতা শোষিত মানবজীবনের কবিতা; আরেকজন বলছেন তিনি যে-উপমা ব্যবহার করেন শেষ পর্যন্ত তার মানে বদলে যেতে দ্যাখেন দেশ-জাতির উদ্দেশ্যে। অর্থাৎ কবি একটি ব্যক্তিগত আক্ষেপ থেকেই কবিতা লেখেন, তবে সেই কবিতা শেষ পর্যন্ত সার্বজনীন। অর্থাৎ কবির ব্যক্তিগত আক্ষেপ থেকে লেখা কবতিাকে শেষ পর্যন্ত সার্বজনীন হতে হয়।
*
এই সার্বজনীনতার যাত্রায় কল্পনার ভূমিকা কতোটুকু? কবিতা লেখার ক্ষেত্রে কল্পনা জিনিসটার মূল্য কেমন? জীবনানন্দই একদা বলেছিলেন বটে যে কল্পনাপ্রতিভাই হলো কবিতা। কল্পনা মানে কি বানানো? বানিয়ে-বানিয়ে কিছু কথা বলা? তাই কি কবিতা?
বানিয়ে-বানিয়ে কথা বলা মানে মিথ্যে কথা বলা। বানিয়ে-বানিয়ে কথা বলা মানে কল্পনার কথা বলা। বানিয়ে-বানিয়ে কথা বলা মানে অবাস্তব কথা বলা। কবিতা কি কল্পনা করে লেখার জিনিস? নিজের কল্পজগতকে নিজের কল্পবাস্তবতাকে ঠেলে পাঠকের সামনে হাজির করে দেয়াটাও কি কবিতা নাকি?
এখানে এই ‘নিজের’ শব্দটার দিকে একটু বিশেষভাবে নজর দেয়া উচিত। আমার ‘নিজের’ কল্পবাস্তবতা আর মানুষের কল্পবাস্তবতা তো এক জিনিস নয়। পৃথিবীর মানুষের প্রায় সবার একটি কল্পবাস্তবতার জগৎ থাকে। উল্টো দিকে কবিরও নিজস্ব একটি কল্পবাস্তবতার জগৎ থাকে; সেই জগতে কবি ব্যথা পান, সেই জগতে কবি আনন্দিত হন, সেই জগতে কবি নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হন। কবি মানুষটা কবি বলেই তার সেই সমস্ত কথা আগ্রহোদ্দীপক ঢঙে লিখে ফেলতে পারেন।
*
আর এইখানেই ঘটে বিপদ, যা ঘটবার। সেই সমস্ত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ারাশিকেই কবিতা বলে ভ্রম করতে থাকেন কবিতার-মতো-বাক্য রচনায় সিদ্ধহস্ত-স্বল্প সিদ্ধহস্ত কবিরা। তারা মনে করেন এই জগতটাকে দেখবার অন্য একটা চোখ তারা পেয়েছেন; জগতের ঘটনাবলির অন্য আর এক প্রচ্ছন্ন মানে তাদের কাছে ধরা দিচ্ছে। এই মনে হওয়ার দৌলতে তারা তাদের ওই দ্যাখার ঘটনাটিকে মনে করেন কবিতার প্রক্রিয়া। মনে করেন তাদের ওই প্রতিক্রিয়াই কবিতা।
ঘটনার মূল সূত্র তো আসলে অন্য জায়গায়। তাদের ওই দ্যাখার ক্ষমতা ঠিক থাকলেও ঠিক নেই তাদের দ্যাখা। তারা জানেন না কী দেখতে হয়। তারা জানেন না কিভাবে দেখতে হয়। দেখতে হয় মানুষের কল্পবাস্তবতাকে। দেখতে হয় মানুষের কল্পপ্রবণতার চোখ দিয়ে। নিজের কল্পবাস্তবতাকে দ্যাখার দরকার নেই। দরকার নেই নিজের চোখ দিয়ে দ্যাখার। মানুষের কল্পবাস্তবতাকে মানুষের চোখ দিয়ে দেখতে পারলে যে-প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় বা যে-প্রচ্ছন্ন বাস্তবতার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় তাকে কবিতার-মতো-বাক্যে প্রকাশ করতে পারলে তা-ই কবিতা।
*
নিজের সুখ-দুঃখ নিজের আনন্দ-বেদনাকে কবিতার-মতো-বাক্যের প্রলেপ দিয়ে সার্বজনীন করে তুললেই তা কবিতা হয় না। নিজের চোখের বদলে মানুষের চোখ দিয়ে দেখতে না-পারার ব্যর্থ ফাঁকিটুকু ঠিকই ধরা পড়ে মনোজ্ঞ পাঠকের কাছে। নিজের কল্পজগতের অস্তিত্ব-অভিজ্ঞতা ফেনিয়ে ফেনিয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে লিখে রাখা ওইসব কবিতার-মতো-বাক্য পাঠকের সামনে জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে কবির ছুড়ে দেয়া একটা মিথ্যার ডালি ছাড়া আর কিছু নয়। এই মিথ্যুকেরা কবিতায় নিজের বানানো নিজের সৃষ্ট কল্পনার কথা বলে যায় আজন্ম। তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় মানুষের কল্পনার, মানুষের ভালোবাসার, মানুষের অস্তিত্বের অসীম কল্পজগৎ।
*
কোন্ মানুষের কল্পনা? সেই মানুষ যারা কবিতা লেখালেখিতে জড়িত নন। শুধু যে লেখেন না তা-ই নয়, মানুষগুলো হয়তো কবিতা পড়েনও না।
মানুষ কি কবির মনের অনুভব জানার জন্য কবিতা পড়েন? আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মতই হয়তো এই যে, না; কবির মনের অনুভব জানার জন্য মানুষ কবিতা পড়ে না। কিন্তু, এই উদ্দেশ্যে কবিতা পড়া হলেও কবির মনোভাবটুকু কি কোনোদিন জানা সম্ভব হয়ে উঠে মানুষের পক্ষে? এর উত্তরও ‘না’। যতোদিন না কবি স্বয়ং বলে দিচ্ছেন তার কবিতার উৎসমুহূর্তটুকু। আবার উৎসমুহূর্ত বলে দিলেও পাঠক কিন্তু কবিতা পড়ে ওই উৎসমুহূর্তের অনুভববিন্দুতে কিংবা ঘটনাপ্রবাহে গিয়ে পৌঁছতে পারেন না। তিনি নিজেরই কোনো এক মুহূর্তের ঘটনাবিন্দুতে দাঁড়িয়ে কবিতাটির মর্মানুভবটুকুকে সেখানে চলে বেড়াতে দেখেন।
মানুষ তার জীবনে এগোতে এগোতে ক্রমশ নানা মূল্যে জীবনেক বুঝে উঠতে থাকে। ভরপুর হয়ে উঠতে থাকে জীবনের নানা অভিজ্ঞতায়। সেই অভিজ্ঞতাই তার সব, তার সম্বল। জীবনের সেইসব অভিজ্ঞতাই মানুষকে দিয়ে কবিতা ভালো লাগিয়ে নেয়, খারাপ লাগিয়ে নেয়। অভিজ্ঞতার অভাবেও কবিতা মানুষের কাছ থেকে দূরে থেকে যায় কখনো-কখনো।
শুধু কি এদের কাছ থেকেই দূরে থেকে যায় কবিতা? না, তাদের কাছ থেকেও দূরে থেকে যায় যারা কবিতার চর্চা করেন। যারা কবিতাকে একটি চর্চাযোগ্য মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। যারা কবিতাকে কায়দার সমন্বয় বলে ভাবেন।
*
কোনো এক অজ্ঞাত কারণে অনেকানেক কবিতা-চর্চাকারীর ধারণা হয়েছে যে কবিতা বস্তুটাকে বুঝে নিতে হয়। তারা একটা ধারণা ছড়িয়েছেন যে কবিতা বস্তুটা মাথা খাটিয়ে বুঝবার মতো একটা কিছু; কবিতার মানে থাকে; কবিতায় কিছু এটা বোঝানো হয়।
অনেকানেক কবিতা-চর্চাকারীই কখনোই মানুষকে বলেন না যে, কবিতা নামের বস্তুটি মানুষকে জীবনে বেঁচে থাকতে সাহায্য করবে; তা তোমাদের সংকটে-আনন্দে-বিপদে সঙ্গ দিয়ে শক্তি দেবে, সাহস যোগাবে, একাকিত্ব ঘোচাবে।
*
আসলে আমরা একটা কানাগলির শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছি; যেখানে আজ কবির নিজের কল্পজগতের প্রকাশটিকেই মেনে নেয়া এবং ধরে নেয়া হচ্ছে কবিতা বলে। যেখানে বানিয়ে-বানিয়ে নিজের কথা বলাই কবিতার শেষ কথা। যেখানে কবিতা মানেই আত্মপ্রেমের মহোৎসব।
*
সেই আত্মপ্রেম যে-আত্মপ্রেম থেকে নিতাই জানতে চেয়েছিলো “হায়, জীবন এতো ছোটো কেনে, এই ভুবনে”।
নিতাইয়ের এই আক্ষেপমাখা প্রশ্নের পেছন-পেছন একটি চিন্তা চলে আসে আমাদের মনে। মনে হয় মানুষের আয়ুর যে-ধারণা তার শেষবিন্দুই কি নিতাইয়ের জীবনের ওই ছোটোত্ব? উল্টোদিকে নিতাইয়ের আক্ষেপের বহর দেখে তো এও মনে হয় যে ভুবন বস্তুটা বেশ বড়ো একটা কিছু! আসলে তার এই ভুবন হলো আমাদেরই এই জগৎ; যে-জগত আমাদের চোখে সার্বক্ষণিক দৃশ্যমান, যে-জগতের ধারণার সঙ্গে মহাবিশ্ব নামক একটা বস্তুও খানিকটা মিশে গেছে।
কিন্তু নিতাই যে মানুষের আয়ুষ্কালকে জীবনের শেষবিন্দু ভেবে নেয় সেখানে আমাদের সামান্য আপত্তি জানানোর আছে। আমরা বলবো যে জীবন কেবলই একজন-মানুষের-আয়ুর-শেষবিন্দুতে বাঁধা পড়ে থাকে না।
*
নিতাই নিজের আয়ুকেই ‘জীবন’ মনে করে। ‘জীবন’কে ওইরকম নিতাইয়ের মতো করে না ভাবলে আমরা দেখতে পাই যে তা ক্রমবিস্তারমান এবং ক্রমঘটমান একটি প্রণালী ছাড়া কিছুই নয়। আমাদের ‘জীবনে’র ধারণা তখন আর আমাদের প্রত্যেকের একার জীবনযাপনের, একার ‘জীবনে’ সিদ্ধিলাভের, শীর্ষে ওঠার ‘জীবন’টুকুই হয়ে থাকে না। তখন আমরা আমাদের সমগ্র চারপাশ মিলে যে-প্রবহমান তৈরি-হয়ে-ওঠা এবং প্রবহমান সমগ্র মিলে যে-‘জীবন’ তার অস্তিত্ব অনুভব করে উঠি। সেই ‘জীবনে’র ধারণায় থেকে আমাদের মনে হয় যে ‘জীবনে’র যে চলতে থাকা, গড়ে ওঠা এবং ভেঙে যাওয়া এবং আবার চলতে থাকাÑ তারই অস্তিত্বের উদ্ভাসন মানুষের ‘জীবনে’র সমস্ত ঘটনাবলি। যুগে-যুগে ‘জীবন’ এইভাবেই চলেছে। শুধু ভাঙা আর গড়া।
*
‘জীবন’ নামের যে-অস্তিত্বটির কথা আমরা ভাবছি তার অনেক গুণের একটি হলো অনির্ণেয়তা। কিংবা বলতে পারি অনিশ্চয়তা। এই জীবন আমাদের কখনোই জানার সুযোগ দেয় না আমাদের সামনে কী আছে। আমরা কখনোই বুছে উঠতে পারিনি সামনে ঠিক কী ঘটতে চলেছে। জীবন তার অনির্ণেয়তার দাপটে আমাদের সবসময়ই অন্ধকারে রেখে গেছে, আমাদের সীমিত অর্থের যে-জীবনÑ প্রত্যেকের নিজের জীবনের আয়ুকেই শেষ মনে করার যে-প্রবণতাÑ সেই জীবন সম্পর্কেও।
আমাদের সীমিত অর্থের জীবনে আমরা মুর্হুমুহু নানা অনুভবক্রিয়ার সম্মুখীন হই। সেইসব ক্রিয়া আমাদের কোন্ মানসিক অবস্থায় ঠেলে পাঠিয়ে দেবে কিংবা পৌঁছে দেবে সাদরে তা আমাদের প্রত্যেকের নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা ছাড়া জানা হয়ে ওঠে না কখনোই। তাহলে প্রতি মুহূর্তের এই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ধাক্কা আমরা সামলাবো কিভাবে?
*
ঠিক এইখানে একটা কথা বলবার আছে। আমরা বলবো যে আমাদের মাঝেই কোনো কোনো মানুষের সেই ক্ষমতা থাকে যারা একক জীবনের ধাক্কায় জন্ম নেয়া ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে মানুষের মুখের কথায় লিখে রেখে যেতে পারেন। তাদের আমরা বলি কবি।
সেইসব লিখে রেখে যাওয়া কথা আমাদের বৃহৎ জীবনের কাছ থেকে আঘাত পাওয়ার মুহূর্তগুলোতে আমাদের একা করে ছেড়ে না-দিয়ে সঙ্গে থেকে আগলে রাখে। রাখতে চায়।
*
বৃহৎ জীবনের ভেতরে যে-মানুষগুলো বেঁচে থাকে তাদের ভাষা বারেবারে পাল্টায়।
ভাষা কেনো পাল্টায়? এর বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা নিশ্চিতভাবেই আছে ভাষাবিজ্ঞানীদের কাছে। কিন্তু ওই ব্যাখ্যাই কি আসল ব্যাখ্যা? ওই ব্যাখ্যা তো ভাষা পাল্টে যাওয়ার পর দাঁড় করানো হয়। ভাষা পাল্টে যাওয়ার পর নানা কায়দা-কানুন করে জানানো হয় যে এইভাবে ভাষা পাল্টেছে। পাল্টো আজ এই হয়েছে।
ভাষার ওপর যদি আসলেই মানুষের হাত থাকতো তাহলে আজকের মানুষ ওই হিসেব করে বলে দিতে পারতো আজ থেকে দেড়শো বছর পরের ভাষা কী হবে।
*
আমিও আজ বলতে পারবো না আগামী দেড়শ বছর বাংলা ভাষার চেহারা কী হবে।
কিন্তু বাংলা কবিতার ভাষা?
আমার সামনে ৮০ বছর আগের ভাষাটা আছে। কবে একদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষার হাত থেকে কবিতাকে বাঁচাতে নতুন ধরনের এক কবিতাভাষার জন্ম দিয়েছিলেন একদল কবি; কবে একদিন রবীন্দ্রনাথকে ভেঙেছেনে নতুন এক কবিতাভাষা বানালেন একদল কবি; কবে একদিন বাংলা কবিতাকে মুখের ভাষার একটু কাছে নিলেন একদল কবি; সেইসব প্রায় ৮০ বছর আগের কথা।
৮০ বছর পরও আমরা কবিতা লিখছি। কোন্ ভাষায়? নিদেনপক্ষে ৮০ বছরের পুরনো এক ভাষায়।
ওই ভাষাটা অবশ্য কালের ধর্মে ইতিমধ্যে কিছুটা বদলেছে। ওই সামান্য বদলে বেঁচে থাকা আসলে মরারই অন্য এক রূপ।
*
বাংলা কবিতা এখন মরা। মরা কবিতায় প্রাণ দিতে কী করতে হবে? ভাষাটাকে প্রাণ দিতে হবে। ভাষার শরীর থেকে ৮০ বছরের জ্বরা ঝেড়ে ফেলতে হবে।
*
১০০ বছর আগের বাংলা কবিতার ভাষাটা তো আমার চোখের সাৎেমনে আছে। ওই ভাষার কবিতার আর আজকে লেখা কবিতার ভাষা তো একই সময়ে দ্যাখার সুযোগ আছে আমার। কী দেখি? দেখি ওই ভাষার প্রাণটাই এখনো ধরে আছে আজকের ভাষা। কোন্ ভাষা ধরে আছে ওই ১০০ কিংবা ৮০ বছর আগের ভাষার প্রাণ?
কোন্ ভাষা আবার! আমাদের লেখার ভাষা। বিশেষ করে কবিতার ভাষা। এর কারণও হয়তো আছে। কারণ কবিতা একটা মান ভাষায় লেখা হয়। যে-ভাষা সমাজের মোটামুটি শিক্ষিত অংশ বলে।
এখন আমি কি বলবো যে নানান আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা লেখা শুরু হোকÑ ভাষা বদলের আকাক্সায়? না। আজকের মরা বাংলা কবিতার প্রাণ লুকিয়ে আছে আজকের মানুষে প্রচল ক্রিয়াপদের ভেতর।
সেইখানে আমাদের যেতে হবে॥

VN:F [1.5.0_759]
Rating: 0.0/5 (0 votes cast)
শেয়ার করুনঃ
  • Facebook
  • Google Bookmarks
  • Digg
  • Technorati
  • del.icio.us
  • Live
6 টি মন্তব্য | 30 বার পঠিত | |

  • আমিনুল ইসলাম মামুন ১১/১০/০৮ ৩:৪৮ অপরাহ্ন 1
    আমিনুল ইসলাম মামুন

    ভালো লাগলো। ধন্যবাদ (F)

  • গেদু চাচা ১১/১০/০৮ ৪:২৪ অপরাহ্ন 2

    সময় কইরা পড়তইবো, লেখক ও লেখার প্রতি বাড়তি আগ্রহ আছে।

  • নাসরিন ১১/১০/০৮ ১০:৫২ অপরাহ্ন 3
    নাসরিন

    আপনার এই লেখাট বেশ ভাল করে পড়তে হবে সময় নিয়ে। পড়েছি। মনে হচ্ছে এর গভীরতা অনেক বেশী। ভাল করে বুঝার জন্য আবারো পরবো। ধন্যবাদ আপনার কবিত্ব এবং বিইতার প্রতি দায়বদ্ধতাকে। ভাল থাকুন।

  • তুষার আহাসান ১১/১০/০৮ ১১:২৬ অপরাহ্ন 4
    তুষার আহাসান

    হুম্-ম্,ফের পড়ব,বুঝব। (Y)

  • নকীব ১১/১০/০৮ ১১:৩১ অপরাহ্ন 5
    নকীব

    লেখালেখি মানে নিজেকে কাল নিরবধী তলব করা……….হেনরিক ইবসেন

  • শামিম ১১/১০/০৮ ৬:৩৬ পুর্বাহ্ন 6

    অসম্ভব ভালো লেগেছে। তোমার নতুন কি বই বেরিয়েছে?
    ভালো থেকো। আর মাথা ঠান্ডা রেখো।

ট্র্যাকব্যাকঃ

আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে মন্তব্য করার জন্য!