Skip to content

পরিবর্তনের হাওয়া (২য় ও শেষ পর্ব)

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

উৎসর্গ: দেশের সকল যাত্রা অভিনেতা অভিনেত্রীদের




প্রথম পর্বের পর।
প্রথম পর্ব

চার

চান্স অবশ্য সিরাজ একটা পেয়ে যায়। আসছে পৌষ মাসে সে মঞ্চে উঠবে। চরিত্র যদিও ছোট জমিদারের লাঠিয়াল, তিন বার মঞ্চে উঠবে সংলাপ আছে দুইটা। এতেও সিরাজের দুঃখ নাই, চান্স পেয়েছে তাতেই খুশি।
দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা শুধু সংলাপ দুইটা আওড়াতে থাকে। এক বছরে কত লক্ষবার যে সে সংলাপ গুলো মানুষজন কে শুনাল তার কোন হিসেব নেই! গ্রামের মানুষজন বলাবলি করতে লাগল আধপাগল ছেলেটি যাত্রায় চান্স পেয়ে পুরাই পাগল হয়ে গেছে।

ময়নার কাছে কিন্তু এই পাগলামিটাই অনেক ভালো লাগে। ওর মনের দৃঢ় বিশ্বাস সিরাজ এবার ভালো অভিনয় করে সামনের বার অনেক বড় চরিত্র পাবে, এভাবেই একদিন অনেক বড় অভিনেতা হয়ে উঠবে। ময়না উলের মাফলার বোনে আর সিরাজের কথা ভাবে। ও ঠিক করেছে এবার ও যাত্রা দেখতে যাবে। মাফলার টা ও সিরাজের জন্যই বানাচ্ছে। সিরাজকে মাফলার টা দিয়ে মনের কথা খুলে বলবে- দুই জনে মিলে একটা যাত্রার দল বানাবে। সেই যাত্রাপালা নিয়ে ওরা দেশে দেশে ঘুরে বেড়াবে।

পাঁচ

অবশেষে আসে সেইদিন। যাত্রার পেন্ডেল ভর্তি মানুষ আর মানুষ। নিজেদের গ্রামের ছেলে অভিনয় করবে সেটা না দেখলে কি চলে! এত মানুষজন দেখে শরিফ উদ্দিনের মেজাজ গরম হয়ে উঠে। কি এক লাঠিয়ালের অভিনয় করবে সেটা দেখতে এত মানুষ! তবে শরিফের মনে মনে একটু ভয় ভয়ও লাগতে থাকে- সিরাজ যদি ভালো অভিনয় করে তাহলে তো গ্রামের মধ্যে ওর সন্মান বেঁড়ে যাবে। সিরাজের সন্মান বাড়া মানে রমিজের সন্মান বাড়া। পৌষের হাড়কাপা শীতের মাঝেও শরিফ উদ্দিন চিন্তায় ঘামতে থাকে।

প্রথমে বন্দনা করি আল্লাহ-নবীর নাম
এরপরে বন্দনা করি মা ও বাবার নাম
পশ্চিমে বন্দনা করি মক্কা শরীফের
উত্তরে বন্দনা করি হিমালয় পর্বত
পুবেতে বন্দনা করি সূর্য মহারাজা
দক্ষিণে বন্দনা করি বঙ্গোপসাগর


বন্দনার মাধ্যমে যাত্রা শুরু হয়ে যায়। সবাই অপেক্ষা করতে থাকে কখন সিরাজ মঞ্চে উঠবে! একসময় সিরাজ উঠে আসে। সবাই জয়ধ্বনি দেয়। এই দৃশ্যে সিরাজের কোন সংলাপ নেই। সিরাজ জমিদারের পেছনে দারিয়ে থেকে জমিদারের সাথে বেরিয়ে যায়। একটু পর সিরাজ আবার মঞ্চে আসে। এই দৃশেই সিরাজের সংলাপ আছে। প্রজাদের কষ্ট দেখে জমিদারের সাথে তার কথা কাটাকাটি হবে। শরিফ উদ্দিনের শরীর ঘামতে থাকে। সিরাজ কে সেখে মানুষজনের প্রতিক্রিয়া কি হয় সেটা দেখার জন্য আশেপাশে তাকায়। তার নজর পড়ে ময়নার উপর। ময়না মুগ্ধ নয়নে সিরাজের দিকে তাকিয়ে আছে। এটা দেখে রাগে তার শরীর কাঁপতে থাকে। মনে মনে বলে-“ হারামজাদী, আর মানুষ পাস নাই। কুত্তার বাচ্চারে দেখতে আইছস”।

সিরাজ ময়নার ঐ মুগ্ধ দৃষ্টি দেখেছিল কিনা জানি না। কিন্তু ও কোনও সংলাপ দিতে পারল না, হাত পা কাঁপতে আরম্ভ করল। মঞ্চের পেছন থেকে অধিকারী সংলাপ বলে দিল, সিরাজ সেটা বলার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। এক দৌড়ে মঞ্চ থকে নেমে অদৃশ্য হয়ে গেল। যে মানুষজন একটু আগে সিরাজের নামে জয়ধ্বনি করেছিল তারাই এবার সিরাজের নামে তামাশা করতে লাগল। পাগল পাগল বলে দুয়োধ্বনি দিতেই ভুলল না। কেউ কেউ আবার সিরাজের পাশাপাশি রমিজকে নিয়েও তামাশা করতে ছাড়ল না। শরিফ উদ্দিনের বুক থকে পাথর নেমে গেল, মুখে হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু পরক্ষনেই ময়নার কথা মনে পড়তেই মেজাজ আবার গরম হয়ে গেল। মেয়েকে এবার বিয়ে দিতেই হবে, লক্ষণ ভাল না।

ছয়

একবছর আর সিরাজের কোন খোজ পাওয়া গেল না। পরের বছর পৌষ মাসে গ্রামে ফিরে এলো। আবার আগের মতই যাত্রা দেখা শুরু করল যেন কিছুই হয় নি। এদিকে ময়নারও বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসে। আসছে বৈশাখ মাসে বিয়ে। ছেলের বাড়ি জগন্নাথ গঞ্জ ঘাট। স্টিমার ঘাটে ছেলের দোকান আছে, এছাড়াও বাপের অনেক সয় সম্পত্তি আছে। ময়নাকে আর ঘর থেকে বের হতে দেয়া হয় না। বন্ধী জীবন আর কাটতে চায় না। আগে পালা লিখে বা পড়ে সময় কাটাত কিন্তু শরিফ সব খাতা পুড়ে ছাই করে যমুনার জলে ভাসিয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে রমিজ মির্জা তার ব্যবসা আরও বৃদ্ধি করে চলে। কলাবাগানের পাশাপাশি এখন গরুর খামার দিয়েছে ২০ টা গাভী প্রতিদিন দুধ দেয়।

সাত

এভাবেই চলতে থাকে চন্দ্রার মানুষদের জীবন। সময় গড়িয়ে যায়। পরিবর্তনের হাওয়া বয়ে যায় দেশ জুড়ে। মুজিব মারা যায়, জিয়া আসে। জিয়া মারা যায় এরশাদ আসে। এরশাদ যায় খালেদা আসে। খালেদা যায় হাসিনা আসে। খালেদার হাত ঘুরে আবার হাসিনার কাছে আসে ক্ষমতা। সেই পরিবর্তনের হাওয়া লাগে চন্দ্রা গ্রামেও। শরিফ উদ্দিন ও রমিজ মির্জার দৌরাত্ব আর নেই।
পাঁচ বছর পরপর ক্ষমতার পালা বদলের সাথে সাথে মালিকানার পরিবর্তন ঘটে শরিফ উদ্দিনের সম্পত্তির। রমিজের ছেলেদের মাঝে ঐক্যের অভাবে ব্যবসায় ধ্বস নামে। আজ তারা সর্বশান্ত।
চন্দ্রা আজ আর চর নয় ব্রিজ তৈরি হয়েছে নদীর উপর দিয়ে। চন্দ্রায় পাটকল, চিনিকল, ইটভাটা গড়ে উঠেছে। পৌষ মাসে আর মেলা বসে না- মদ আর জুয়া খেলার আসর বসে। কেউ আর যাত্রা দেখে না- স্যাটালাইট টিভিতে হিন্দি ছিনেমা দেখে।

ময়না আর সিরাজ এখন কই আছে তা কেউ জানে না। সেই বছরেরই মাঘ মাসের এক ঘন কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে তারা গ্রাম থকে পালিয়ে যায়। এরপর যাত্রার দল নিয়ে দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায়। চারদিকে তাদের দলের নাম ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৮১ সালে বৃহত্তর ময়মনসিংহের সেরা যাত্রার দল হিসেবে স্বর্ণের মেডেলও জিতে। এখন দেশে যাত্রা নিষিদ্ধ। ওরা কোথায় আছে, কি করছে, কেমন আছে? সে খবর আর কেউ রাখে না। আমরা এখন স্মার্ট হয়েছি হিন্দি সিরিয়াল দেখি এসব যাত্রাফাত্রার লোকের খোজ আমরা নেই না। তবে আমি প্রায় রাতেই স্বপ্নে দেখি ওরা ভালো নেই। টাকার অভাবে ওদের সন্তান স্কুলে যেতে পারে না। যে মানুষটার গলাদিয়ে একসময় সংলাপের পর সংলাপ বের হত সেই মানুষটার গলা দিয়ে কতদিন যে ভালো কোন খাবার নামে নি তার কোন হিসেব নেই। আমাদের সংস্কৃতির আদি যোদ্ধারা আজ জীবন যুদ্ধে পরাজিত।
আমার স্বপ্ন যেন সত্যি না হয়। ময়না ও সিরাজের সন্তান মানুষের মত মানুষ হয়ে বেড়ে উঠুক। সবাই মিলে সুখে থাক এই কামনা করি। আর আপনারা যদি কেউ ময়নার ও সিরাজের খোজ জানেন তো আমাকে জানিয়েন।

বিঃদ্রঃ কষ্ট করে পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ

মন্তব্য


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

ময়না ও সিরাজরা আমাদের গর্ব বাট আমলাতন্ত্র আর নষ্ট নেতাদের সাথে নষ্ট কিছু লোকের কারনে তারা আর ফিরতে পারবে না
আমদের সন্তানরা একদিন জানবে
বাংলাদেশে যাত্রাশিল্প নামে একটা শিল্পছিল যা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে Sad Sad

''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""

কষ্ট পোড়াতে চাই বলে অশ্রু খুঁজি........


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

হুম
Sad Sad Sad

________________________________

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমি বিচলিত বর্তমান
এবং অন্তিম সংগ্রামের কথা বলছি।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

smile :) :-) smile :) :-) smile :) :-) smile :) :-) smile :) :-)

****************
????????????
--------------------


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

আপনার লেখনি আমাকে ভালো লাগায় ভাসায়।

..................................................................

মেরুদণ্ড-ব্যাক্তিত্ববোধ-মান সম্মান-সৃজনক্ষুধা সমস্ত কিছু জলাজ্ঞলি দিয়া গায়ে ‘তোষামোদী’র চাদর জড়াইয়্যা মিলিটারি স্টাইলে ‘ইয়েস স্যার’ বইল্যা- বিরাট “দায়িত্বশীল” আচরণের মধ্যে আছি।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

স্রদ্ধেও মারুফ ভাই। পত্র মারফত সালাম নিবেন। পর সমাচার এই যে, আমি আপনার তেল মারা দেখিয়া আনন্দে গদগদ হইয়া পরিরাছি।

________________________________

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমি বিচলিত বর্তমান
এবং অন্তিম সংগ্রামের কথা বলছি।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

আপনারে তেল মারতে যাবো কেনো? আপনি কি আমার প্রেমিকার ছোটো ভাই? সামিরার উপরে চালানো সব ট্রিটমেন্ট কেনো আমার উপরেও ছাড়েন?

..................................................................

মেরুদণ্ড-ব্যাক্তিত্ববোধ-মান সম্মান-সৃজনক্ষুধা সমস্ত কিছু জলাজ্ঞলি দিয়া গায়ে ‘তোষামোদী’র চাদর জড়াইয়্যা মিলিটারি স্টাইলে ‘ইয়েস স্যার’ বইল্যা- বিরাট “দায়িত্বশীল” আচরণের মধ্যে আছি।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

অনেক সুন্দর করে আমাদের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরলেন।
যাত্রা শিল্প ধংস হয়ে যাবার মূল কারণ, কিছু বিকৃত রুচির মানুষের অশ্লীল কর্মকাণ্ড।

~-^
উদ্ভ্রান্ত বসে থাকি হাজারদুয়ারে!


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

ধন্যবাদ

________________________________

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমি বিচলিত বর্তমান
এবং অন্তিম সংগ্রামের কথা বলছি।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

এক কথায় অসাধারণ। Star Star Star Star Star

--------------------------------------------------------
সোনালী স্বপ্ন বুনেছি
পথ দিয়েছি আধারী রাত ........


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

ধন্যবাদ জিনিয়াস ভাই।

________________________________

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমি বিচলিত বর্তমান
এবং অন্তিম সংগ্রামের কথা বলছি।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

পড়লাম। ঐতিহ্যের কথা মনে করে দেওয়ায় ধন্যবাদ ।

----------------------------------------------------------------
ইচ্ছে আছে উড়ব সোজা, কিম্বা বেঁকে ...


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

অসাধারণ Star Star Star Star Star

___________________
------------------------------
শ্লোগান আমার কন্ঠের গান, প্রতিবাদ মুখের বোল
বিদ্রোহ আজ ধমনীতে উষ্ণ রক্তের তান্ডব নৃত্য।।
দূর্জয় গেরিলার বাহুর প্রতাপে হবে অস্থির চঞ্চল প্রলয়
একজন সূর্যসেনের রক্তস্রোতে হবে সহস্র নবীন সূর্যোদয়।।


ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

ধন্যবাদ

________________________________

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমি বিচলিত বর্তমান
এবং অন্তিম সংগ্রামের কথা বলছি।

glqxz9283 sfy39587p07