জামায়াতের নীতিমালা বাংলাদেশ সংবিধানের বিরূদ্ধে!
লিখেছেন: আরিফুর রহমান
আসন্ন সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে হলে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হতে হবে বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে। জামাতে ইসলামী বাংলাদেশ তাদের গঠনতন্ত্রে মৌলিক পরিবর্তন না আনলে এই নিবন্ধনে অংশ নিতে পারবে না। অন্যদিকে জামাত তার ইসলামী রাজনৈতিক চরিত্রটি হারাবে যদি কমিশনের এই শর্ত মানতে চায়। এ এক বিষম ফাঁড়া জামাতের জন্য!
সংশোধিত গনপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের নিবন্ধন সংক্রান্ত অংশের দুটি শর্ত জামাতে নেতাদের এই ফাঁড়া নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ করে তোলে, কারন শর্ত মানতে গেল ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসেবে জামাতের অস্তিত্বই হুমকির সম্মুখীন হবে।
গুরুত্বপূর্ণ প্রথম শর্তটিতে বলা হয়েছে …a political party shall not be qualified for registration if the objectives laid down in its constitution are contradictory to the constitution of the People’s Republic of Bangladesh.
তরজমা: ‘একটি রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের যোগ্যতা লাভ করবে না যদি উক্ত দলের গঠনতন্ত্র গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে সাংঘার্ষিক হয়’।
জামাতের গঠনতন্ত্র পরিষ্কার ভাবে বাংলাদেশের সংবিধান, এই ভুখন্ডের চুড়ান্ত আইনের, বিরোধীতা করছে বলে পরিষ্কারভাবে প্রতীয়মান। বাংলাদেশের বাদবাকি আইন, অধ্যাদেশ, কার্যাবলীসমুহ কোনভাবেই সংবিধানের বিরূদ্ধাচরন করতে পারে না। যদি করেও থাকে তবে ঐ সকল আইন, অধ্যাদেশ, কার্যাবলীসমুহ আপনাতেই বাতিল বলে গন্য হবে।
বাংলাদেশ সংবিধানের ভুমিকাতে বলা আছে… “…. it shall be a fundamental aim of the state to realise through the democratic process a socialist society, free from exploitation, a society in which the rule of law, fundamental human rights and freedom, equality and justice, political, economic and social will be secured for all citizens.”
তরজমা: …. রাষ্ট্রের মৌলিক লক্ষ্য হবে গনতান্ত্রিক পথে একটি শোষনমুক্ত জনভিত্তিক সমাজ কায়েম করা, যে সমাজে আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার ও ব্যাক্তিস্বাধীনতা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সব দিক থেকে প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিশ্চিত করা হবে। (আমার অনুবাদ, বাংলায় সংবিধান হাতে নেই)
অন্যদিকে জামাতের গঠনতন্ত্র সর্বপ্রকার প্রচেষ্টার মাধ্যমে ‘ইসলামের শাসন’ কায়েমের মাধ্যমে পৃথিবীর মানবজাতির জন্য শান্তি ও কল্যাণ অর্জনের কথা বলে থাকে।
এছাড়াও জামাতের গঠনতন্ত্র ‘আল্লা ও সৎলোকের’ ‘অর্গানাইজড’ শাসন কায়েমের মধ্য দিয়ে দমনপীড়ন ও অন্যায় খতম করার কথাও বলে থাকে।
জামাতের গঠনতন্ত্রের ভুমিকায় এরশাদ করা হচ্ছে: যে আল্লা মানবজাতিকে পাঠিয়েছেন খিলাফত (ইসলামী শাসনব্যাবস্থা) চালু করতে, এবং মানবজাতিকে দায়িত্ব দিয়েছেন ‘মনুষ্য প্রণীত’ আইন ফেলে দিয়ে ‘আল্লাহ প্রদত্ত’ আইন ও জীবনব্যাবস্থা চর্চা করতে।
এটা প্রতীয়মাণ হচ্ছে যে জামাতের গঠনতন্ত্র বাংলাদেশ সংবিধানের মূল লক্ষ্যের সাথে মোটেও একমত হতে পারছে না। এছাড়াও জামাতের নীতিমালানুসারে বাংলাদেশের সংবিধান ‘মন্যুষ্য প্রণীত’ বিধায় সরাসরি বাতিলযোগ্য (আস্তাগফেরুল্লা)। জামাতের নীতিমালায় এমন আরো অনেককিছু পাওয়া যায় যা বাংলাদেশ সংবিধানের সরাসরি বিরোধীতা করে থাকে।
যেমন: সংবিধানের পরিচ্ছেদ ৭(১) অনুসারে ‘গনপ্রজাতন্ত্রী’র সকল ক্ষমতা জনগনের এবং এই ক্ষমতা শুধুমাত্র সংবিধানের আওতা ও ক্ষমতাবলেই প্রযোজ্য’।
সুতরাং, জামাত যদি নিবন্ধিত হবার কোনরকম ইচ্ছাও রাখে তবে গঠনতন্ত্রে মৌলিক পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সংবিধানের ভুমিকার সাথে সম্মত হবার মাধ্যমেই পারবে।
শর্ত দুই: নিবন্ধনেচ্ছু রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে যদি ধর্ম, বর্ন, ভাষা ও লৈঙ্গিক কোন প্রকার বৈষম্য দৃশ্যমান থাকে তবে ঐ দল নিবন্ধনের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না। এই শর্তটি সরাসরি বাংলাদেশ সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদ থেকে এসেছে।
কিন্তু জামাতের গঠনতন্ত্রানুসারে, শুধুমাত্র ধার্মিক মুসলমানগনই কেবল দলের সদস্য বা নেতৃত্বে আসতে পারবে। জামাতে যোগ দিতে হলে একজন মুসলমানকে আল্লা ও তার নবী’র প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের ছবক নিতে হয়, এবং শুধুমাত্র আল্লা ও রসূলের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবার কড়ার দিতে হয়।
মোদ্দাকথায় শুধুমাত্র ধার্মিক মুসলমানগনই কেবল এই দলের নেতৃত্বের হকদার!
সংবিধান বিশেষজ্ঞের মতে, জামাতের গঠনতন্ত্রের এই মৌলিক বৈশিষ্টটি বাংলাদেশ সংবিধানের সরাসরি বিরূদ্ধে যায়। যদি কোন দল ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য চর্চা করতে চায় এবং এই চর্চাকে অধিকার বলে দাবি করে তবে তার অর্থই হবে বাংলাদেশের সংবিধানের আলোচ্য অংশগুলি ছুঁড়ে ফেলা।
জামাতের জন্য এই শর্তের অর্থ হলো, জামাতের গঠনতন্ত্রে অমুসলিমদেরও দলে যোগ দেবার ও নেতৃত্ব দেবার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
জামাত আরেকটি শর্ত নিয়েও গাঁইগুই করছে। নারী অংশগ্রহন সংক্রান্ত এই শর্তটিতে বলা হয়েছে নিবন্ধনেচ্ছু যেকোন দলের সংবিধানে এই সদুদ্দেশ্য পরিষ্কার্ দৃশ্যমান থাকতে হবে যে ২০২০ সাল নাগাদ কেন্দ্রীয় কমিটি সহ সকল কমিটিতে নূন্যতম এক তৃতীয়াংশ নারী সদস্য রাখার হবে।
আগস্ট ১৯ তারিখে এই অধ্যাদেশ জারি হবার পরেই জামাতের সেক্রেটারি মুজাহিদ উচ্চ আদালতে উপোরোক্ত তিনটি শর্তের বিরূদ্ধে একটি রিট পিটিশন দাখিল করে। তার মতে এই তিনটি শর্ত ‘অসাংবিধানিক’ (আল্লায় মালুম, এই আজগুবি ‘লজিক’ মুজাহিদ কৈথাইকা পাইলো!!)
যাই হোক! মহান উচ্চ আদালত ২৮শে আগস্ট সরকারের কাছে ব্যখ্যা চেয়েছেন গনপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের এই তিনটি শর্ত কেন ‘অবৈধ’ ঘোষিত হবে না। যখন সরকার এর উত্তর প্রস্তুতে ব্যাস্ত, এদিকে নির্বাচন কমিশনে দলগুলির নিবন্ধনের সময়সীমা পার হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। অক্টোবর ১৫ যার শেষদিবস।
এমতাবস্থায়, বিন্পি-জামাত জোটের শরীক জামাতে ইসলামী খোদ নিবন্ধন পদ্ধতিটাই বাতিল ঘোষনা করতে হাউকাউ করছে। বিন্পিকেও তারা নিজেদের পাশে পাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছিলো। যদিও উ্ক্ত তিনশর্তে বিন্পির কিছুই যায় আসে না, কারন যেকোন সময় যেকোন পরিবর্তন আনতে পারে বিন্পি দলের গঠনতন্ত্রে।
আশ্চর্যের বিষয় এই, যে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন, জামাত ও অন্যান্য ধর্মভিত্তিক দলগুলির রাজনৈতিক কর্মকান্ডে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও, শুধুমাত্র আইনটির পরিপূর্ণ প্রয়োগ না হবার কারনেই এই ধরনের দলগুলি গত তিন দশক ধরে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।
এছাড়াও ১৯৭২ এর সংবিধান ধর্মের ওপর ভিত্তি করে যেকোন প্রকার সংগঠন, রাজনৈতিক দল গঠন নিষিদ্ধ ঘোষনা করেছিলো। জামাত, যারা ১৯৭১ এ বাঙলাদেশ সৃষ্টির বিরুদ্ধে ছিলো, এই সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে আপনিতেই ভেঙ্গে গিয়েছিলো। জিয়াউর রহমান পরে সংবিধানে কাটাছেড়া করে জামাতকে আবার পুনর্গঠিত হবার সুযোগ করে দিয়েছিলো।
তবে ১৯৭৪ এর বিক্ষআ Special Powers Act (SPA), এখনো বলবৎ, এবং জামাতের শাস্তি হতে পারে এই আইন ভঙ্গ করার দায়ে।
পঁচাত্তর পরবর্তী সকল সরকারই ১৯৭৪ বিক্ষআ’র ব্যাবহার করেছে প্রতিপক্ষকে দমনে অথচ, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি দমনে তারা বরাবরই অন্ধের ভুমিকা নিয়েছে।
ডেইলিস্টারে শওকত লিটনের নিবন্ধের অনুবাদ
সর্বশেষ: প্রথম আলোর সংবাদ অনুসারে, বিন্পি এবং জামাত লিখিত আবেদনে নিবন্ধিত হবার জন্য এক হফতা বেশি সময় চেয়েছে।






সকলের অবগতির জন্য: ইহা ডেইলিস্টারে শওকত লিটনের নিবন্ধের অনুবাদ
নেন ৫ তারা দিলাম যদি, নিজে অনুবাদ করে থাকেন। খ্যামন আছেন? অনেক দিন বাদে দেখলাম।
আরিফুর রহমান ১২/১০/০৮ ১১:৩৫ অপরাহ্ন
না, অনুবাদ আমার না, আরিফুর রহমান অনুবাদখানা করে দিয়েছেন দয়া পরবশ হয়ে।
(আমার অনুবাদ, বাংলায় সংবিধান হাতে নেই)
সংবিধানে যেভাবে আছে তাও উল্লেখ থাকুক: “…গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা–যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে;”
আরিফুর রহমান ১২/১০/০৮ ৭:১৯ পুর্বাহ্ন
ধন্যবাদ দৌবারিক!
এবার দেখি কি করে জামাত। ধন্যবাদ আপনাকে
জামায়াতকে এই দেশ ছাড়া করা উচিত।
ট্র্যাকব্যাকঃ
আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে মন্তব্য করার জন্য!
আমার মেনু
আরিফুর রহমান
এই পর্যন্ত 108 টি ব্লগ লিখেছেন
প্রিয় পোস্ট
1 জন ব্যবহারকারি এই পেইজটি পড়ছেন!
1 জন অতিথি
সদস্যরা হলেনঃ